কালান্তরের কড়চা

শেষ পর্যন্ত দফারফার কর্মসূচি

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

জবর খবর, যুক্তফ্রন্ট অবশেষে তাদের পাঁচটি দাবির অশ্বডিম্ব প্রসব করেছে। পাঁচ দফা দাবিকে অশ্বডিম্ব বলার জন্য পাঠকদের কাছে ক্ষমা চাই।

এই দফাগুলোকে অশ্বডিম্ব বলার কারণ এই যে এই দাবিগুলো থোড় বড়ি খাড়া। সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্দলীয় সরকার গঠন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং ভোটের সময় বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েনসহ যে পাঁচ দফা দাবি ঘোষণা করা হয়েছে, তা বিএনপি জোটেরও দাবি। একটি আলাদা ফ্রন্ট গঠন করে বিএনপির পুরনো দাবিগুলো নিয়ে জাতীয় ঐক্য কিভাবে গড়া যাবে, তা আমার বোধগম্য নয়।

আমি তো মনে করেছিলাম, এত কাঠখড় পুড়িয়ে গণফোরাম ও বিকল্পধারা যখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং তাদের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তাত্ত্বিকরাও এসে জুটেছেন তখন দেশের মানুষের সামনে সুশাসন ও আইনের শাসন (ড. কামাল হোসেনের পেট-থিওরি) প্রতিষ্ঠার এবং দেশের তরুণ সমাজের ভবিষ্যৎ গড়ার এমন এক স্বপ্নদর্শন তুলে ধরা হবে, যাতে এই কর্মসূচি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে যুক্তফ্রন্টের জয়জয়কার পড়ে যাবে। যেমন পড়ে গিয়েছিল ১৯৫৩ সালে আদি ও অকৃত্রিম যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা ঘোষিত হওয়ার সময়।

তখন ছিল হক-ভাসানীর যুক্তফ্রন্ট। এখন কামাল ও বি চৌধুরীর যুক্তফ্রন্ট। পার্থক্য এই যে আগেরটা ছিল আদি ও আসল যুক্তফ্রন্ট। এর পেছনে ছিল সারা দেশের মানুষের সমর্থন।

আর এটি নকল দুই নম্বর যুক্তফ্রন্ট। আগের যুক্তফ্রন্ট ছিল জনগণের ঐক্য। বর্তমান যুক্তফ্রন্ট কিছু হতাশ নেতার ঐক্য। পেছনে জনসমর্থন আছে কি না সন্দেহ। নতুন বোতলে পুরনো মদ ঢেলে যে কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে, তাতে দেশের মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের আকৃষ্ট হওয়ার কোনো কারণ নেই। এই দাবিতে যদি জনগণ আকৃষ্ট হতো, তাহলে বিএনপির এই একই দাবিতে দেশের মানুষ বহু আগে সাড়া দিত। বিএনপিকে আন্দোলনের মাঠ ছেড়ে দিয়ে দিল্লি, ওয়াশিংটন ও নিউ ইয়র্কে গিয়ে ধরনার রাজনীতি করতে হতো না।

যা হোক, যুক্তফ্রন্ট তো হয়েছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের মঞ্চে উদ্ভাসিত মুখ নিয়ে ড. কামাল হোসেন দুই পাশে তাঁর ‘সহযোদ্ধাদের’ নিয়ে বসে আছেন, সেই ছবিও দেখলাম। হঠাৎ লক্ষ করে দেখলাম, মঞ্চে ড. কামাল হোসেনের প্রধান সহযোদ্ধা ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী নেই। যিনি যুক্তফ্রন্টের প্রধান নেতা, তিনিই ফ্রন্টের কর্মসূচির ঘোষণায় এই ‘ঐতিহাসিক সমাবেশে’ নেই কেন? প্রকাশিত খবরে দেখলাম, তিনি সভার উদ্দেশে রওনা হয়ে অসুস্থতার কারণে বাড়ি ফিরে গেছেন।

তাজ্জবের কথা! একজন ডাক্তার মানুষ, তিনি সামান্য কারণে দলের ঐতিহাসিক সমাবেশে না এসে বাড়ি ফিরে গেলেন, এ কেমন কথা! আদি যুক্তফ্রন্টের নেতা শেরেবাংলা তো ৮৪ বছর বয়সে হাঁটুর ব্যথা, শরীরে অসুস্থতা নিয়ে ২১ দফা ঘোষণার সভায় হাজির হয়েছিলেন। ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী তো শেরেবাংলার বয়সে পৌঁছেননি এবং নিজে ডাক্তার। তাহলে ফ্রন্টের ‘ঐতিহাসিক সভা’ এড়ালেন কেন, নাকি অন্য কারণে অসুস্থতার অজুহাতে সভায় অনুপস্থিত রইলেন?

স্বাভাবিকভাবেই বাজারে এ নিয়ে গুজব রটেছে। একটি গুজব, যুক্তফ্রন্টের একটি কর্মসূচি হলো, স্বাধীনতাযুদ্ধে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিরোধিতা করেছে, ফ্রন্ট তাদের সঙ্গে ঐক্য গড়তে যাবে না। এই প্রস্তাব নাকি ডা. চৌধুরীর ছেলে মাহী বি চৌধুরীর। তিনি চান, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের ফ্রন্ট থেকে দূরে রেখে দেশের তরুণ প্রজন্মকে ফ্রন্টের দিকে আকৃষ্ট করতে। বাবা বি চৌধুরী তাতে রাজি নন। কারণ তিনি নিজে স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে দল করেছেন, মন্ত্রিত্ব করেছেন। তা ছাড়া এ ধরনের কর্মসূচি থাকলে ভবিষ্যতে বিএনপি জোটের সঙ্গে ঐক্য করা যাবে না। এটা নিয়ে ছেলে ও ফ্রন্টের সঙ্গে ডা. চৌধুরীর মতবিরোধ এবং কর্মসূচি ঘোষণার বৈঠকে অনুপস্থিতি।

আমার এই খবর বা গুজবটি বিশ্বাস হয়নি। কারণ যুক্তফ্রন্টের পাঁচ দফা দাবি এবং অন্য লক্ষ্যগুলো পড়ে দেখলাম, তাতে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভায় শুধু ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী নন, তাঁর ছেলে মাহী বি চৌধুরী ও তাঁর দল বিকল্পধারার সাধারণ সম্পাদকও আসেননি। শুধু সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। এর কারণটা কী? ফ্রন্টের অন্যান্য শরিকের সঙ্গে বিকল্পধারার কি কোনো গুরুতর মত বিরোধ? যদি তা-ই হয়, তাহলে কি গোড়াতেই গলদ? জাতীয় ঐক্য দূরের কথা, নেতায় নেতায় ঐক্যই হচ্ছে না।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টও বিশাল নির্বাচনী জয়ের পর এক মাসও নিজেদের ঐক্য ধরে রাখতে পারেনি। হক সাহেবের কৃষক শ্রমিক পার্টির সঙ্গে অন্যান্য শরিক দলের বিবাদ শুরু হয়েছিল। এর সুযোগ নিয়ে কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকার যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত করে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারার গভর্নর শাসন প্রবর্তন করে। বর্তমান দুই ডাক্তারের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন জেতার আশা যেখানে শূন্য, সেখানে নির্বাচনে যাওয়ার আগেই তাঁদের মধ্যে ঐক্যের ভাঙন দেখা যাচ্ছে। পরিণতি কী হবে?

লন্ডনের বাজারে গুজব, নির্বাচনে যাওয়ার আগে ফ্রন্টের মধ্যে ‘কালনেমির লঙ্কা ভাগ’ নিয়ে বিবাদ চলছে। ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী আবার রাষ্ট্রপতি হতে চান? তাহলে ড. কামাল হোসেন কী হবেন? প্রধানমন্ত্রী? বিএনপি জোটের সঙ্গে ঐক্য করতে গেলে প্রধানমন্ত্রীর পদটি তারেক রহমানের জন্য বরাদ্দ করতে হবে। অসুস্থ খালেদা জিয়া দলীয় নেতৃত্বে থেকেই সন্তুষ্ট থাকতে পারেন; কিন্তু প্রধানমন্ত্রী পদটি ছেলের জন্য নিশ্চিতকরণ ছাড়া কোনো ঐক্য গড়তে রাজি হবেন না।

অন্যদিকে তারেক রহমানকে গলাধঃকরণ ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রবসহ কারো কারো পক্ষে গলায় কই মাছের কাঁটা বেঁধার মতো হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলন ছাড়া ঐক্যের কণ্ঠিবদল হবে কি না সন্দেহ। বিএনপির তাতে ক্ষতি নেই। বিএনপি দুই ডাক্তারের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠনে এ জন্যই খুশি, যুক্তফ্রন্ট তাদের ভোট কাটবে না, কাটবে আওয়ামী লীগের ভোট। এতেও যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে জয়ের আশা নেই। নির্বাচনে জয়ের আশা যদি থাকে, সে সম্ভাবনা বিএনপির। যুক্তফ্রন্ট তাদের সঙ্গে আসুক আর না আসুক বিএনপির ক্ষতি নেই। সরকারের জন্য যুক্তফ্রন্ট কাগুজে হুংকার। আসল হুংকার নয়।

বাংলাদেশে একদল ঘটক আছে, যারা কোনো বিয়ের সম্পর্ক নিয়ে ঘটকালি করতে গেলে সে বিয়ে ভেঙে যায়। এটি ড. কামাল হোসেন ও ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সম্পর্কেও সত্য। ড. কামাল হোসেন আওয়ামী লীগ থেকে এবং ডা. বদরুদ্দোজা বিএনপি থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব দল গঠন করেছেন এবং এতে সফল না হওয়ায় তাঁদেরই মতো হতাশ ও ব্যর্থ রাজনীতিকদের মধ্যে ঘটকালি করে ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শূন্যের সঙ্গে অসংখ্য শূন্য যোগ করলে যা হয়, বারবার তা-ই হয়েছে।

বাংলাদেশে ভাদ্র মাস এলেই কই মাছ উজায়। নির্বাচনের সময়ও ফ্রন্ট, জোট উজায়। এতে আওয়ামী লীগের ভয় পাওয়ার কিছু আছে বলে মনে করি না। আওয়ামী লীগ জোট যদি নিজেদের ঐক্য বজায় রেখে তরুণ প্রজন্মের কাছে অর্থবহ নতুন ও বাস্তব কর্মসূচি তুলে ধরতে পারে এবং যত বেশি সম্ভব শিক্ষিত, যোগ্য, সৎ তরুণ প্রার্থী আসন্ন নির্বাচনে মনোনয়ন দিতে পারে, তাহলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নৌকাই আবার বর্তমানের উত্তাল রাজনীতির সমুদ্র পার হবে বলে আমার বিশ্বাস। – কালের কন্ঠ

লন্ডন, সোমবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment