কাপুরুষের জবানবন্দী

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

আমাদের সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা চাকরি ত্যাগ ও দেশ ত্যাগের পর একটি বই লিখেছেন, ‘এ ব্রোকেন ড্রিম’ অর্থাৎ একটি স্বপ্নভঙ্গ। আমি বইটি সম্পর্কে ইতোপূর্বে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলাম, বিচারপতি স্বপ্নভঙ্গের বেদনা থেকে বইটি লেখেননি, লিখেছেন প্রতিশোধ গ্রহণের জ্বালায়। বর্তমান সরকার সম্পর্কে এখন তার মনে ব্যক্তিগত ক্রোধ আছে। এই ক্রোধ প্রশমিত হলে ঠাণ্ডা মাথায় বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার সমস্যা, বিচারকদের সমস্যা, নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিচার বিভাগের সম্পর্ক এবং বিচার বিভাগের সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে তার নিজের অভিজ্ঞতাযুক্ত করে যদি এই আত্মজৈবনিক বইটি লিখতেন, তাহলে দেশের উপকার করতেন, নিজেরও উপকার করতেন।

তার উপর আমার আস্থা ছিল। ভেবেছিলাম তিনি তাই করবেন। কিন্তু তিনি ঠিক উল্টোটি করেছেন। তার দেশ ত্যাগের পর থেকেই বাজারে গুজব রটছিল, তিনি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য এমন একটি বিস্ফোরণমুখী বই লিখবেন, যাতে সরকারের পতনের পথ প্রশস্ত হয়। আরও গুজব ছিল, এই বই লেখার কাজে তাকে উৎসাহ জোগাচ্ছেন ঢাকার কয়েকজন শীর্ষ আইনজীবী ও রাজনীতিক, যারা সুশীল সমাজের সঙ্গেও যুক্ত। তাকে আর্থিক সাহায্য জোগাচ্ছেন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দণ্ডিত এক ধনী ব্যক্তির ভাই। তিনি বিদেশে সাবেক বিচারপতির সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং তাকে ঘোস্ট রাইটারও জোগাড় করে দিয়েছেন।

তার বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে আরও গুরুতর অভিযোগ ছিল। প্রধান বিচারপতি পদে থাকাকালে তিনি তার মেন্টর তিন প্রবীণ আইনজীবীর পরামর্শে ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত রায় প্রদানের পর পরই ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত দেড় শ’র মতো সরকার দলীয় এমপির নির্বাচন বৈধ নয় রায় দিয়ে সরকারের পতন ঘটানোর জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী এই সরকারের পতন ঘটলে তিনি রাষ্ট্রপতি হবেন। তার বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগতো ছিলই, তার সঙ্গে অভিযোগ ছিল, তিনি পাকিস্তান আমলে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশেও তিনি দেশ প্রেমের পরিচয় দেননি। বরং গোপনে ভারতে বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ করে হাসিনা সরকারের পতন ঘটানোর জন্য তাদের পরামর্শ দিচ্ছিলেন।

যদিও বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি থাকা কালে তিনি নিজের মুখে স্বীকার করেছেন, ১৯৭১ সালে তিনি পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর দ্বারা গঠিত শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন, তথাপি তার এই স্বীকারোক্তিকেও আমি তেমন গুরুত্ব দেইনি। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের সময় এক শ্রেণীর দেশ প্রেমিকও পরিবার পরিজনকে রক্ষা এবং কৌশলগত কারণে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন। তাদের সকলেই রাজাকার ছিলেন না। একই সঙ্গে সাবেক বিচারপতি সম্পর্কে প্রচারিত অন্য অভিযোগগুলোও বিশ্বাস করিনি। ভেবেছি, এটা তার শক্তিশালী শত্রু পক্ষের রটনা।

কিন্তু তার সম্পর্কে আমার এই অবিচল আস্থাটি এখন আর নেই। তার সম্পর্কে আমারও স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। ঢাকায় তার সঙ্গে দুই দুইবার বৈঠকে আমার মনে হয়েছিল, তিনি ডক্টর জেকিল। একজন মহানুভব বিচারপতি। দেশের বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং মর্যাদা রক্ষাই তার একমাত্র কাম্য। কিন্তু তার বইটি পড়া এবং সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেয়া সাক্ষাতকারের বক্তব্য জেনে মনে হয়েছে, তিনি আসলে মি. হাইড।

তার বই এবং সাম্প্রতিক সাক্ষাতকারের বিবরণ পড়ে মনে হয়েছে, তার সম্পর্কে বাজারের যে অভিযোগগুলোকে গুজব মনে করেছি, তা ফিকসন নয়, ফ্যাক্টস। একজন কাপুরুষই কেবল এ কাজগুলো করতে পারেন। এ জন্যে তার বই ও সাক্ষাতকারের বক্তব্যকে আমি নাম দিয়েছি ‘কাপুরুষের জবানবন্দী।’ বিশ্বের বহু মনস্তাত্ত্বিক বলেছেন, ‘সাধারণত কাপুরুষেরাই দেশদ্রোহী হয়।’ তাদের অপরাধী চিত্ত কোন কিছুই সাহসের সঙ্গে ব্যক্ত করতে পারে না। কোন কাজও প্রকাশ্যে করতে পারে না। তাদের নিশাচরের মতো গোপন ভূমিকা। ক্লাইভ থেকে কুইসলিং সকলের একই চেহারা। ক্লাইভ যদি দেশপ্রেমিক হতেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার গৌরব অর্জনের পরই আত্মহত্যার মতো কাপুরুষোচিত পথ বেছে নিতেন না।

জাস্টিস সিনহাও এক কাপুরুষ। এই ধৃষ্টতামূলক কথাটি তার সম্পর্কে বলতে এখন আর আমার দ্বিধা নেই। তিনি কাপুরুষ বলেই একজন দেশদ্রোহী। এখন পিটিআইয়ের কাছে নিজ মুখে স্বীকার করেছেন, তিনি ভারতের মোদি সরকারকে হাসিনা সরকারের ওপর সমর্থন প্রত্যাহারের জন্য অর্থাৎ এই সরকারকে উচ্ছেদের কাজে সাহায্য জোগাতে আবেদন জানিয়েছেন, এ জন্যে তিনি ভারত সফর করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন। এসব তো দেশপ্রেম নয়, দেশদ্রোহিতা।

নবাবী আমলে এক নবাব আরেক নবাবকে হত্যা করে তার সিংহাসনে বসতেন। যেমন নবাব সরফরাজ খাঁকে হত্যা করে আলিবর্দী খাঁ বাংলার নবাব হয়েছিলেন। তাকে কেউ বিশ্বাসঘাতক ও দেশদ্রোহী বলে না। কিন্তু মীর জাফরকে বলে। তিনি নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্য বিদেশীদের কাছে ধর্ণা দিয়েছিলেন, তাদের সাহায্য জুগিয়েছিলেন। এস কে সিনহা বর্তমান বাংলাদেশে একই কাজ করেছেন। এখনতো তার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, তিনি প্রধান বিচারপতির পদে বসেই সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছেন। দেশে-বিদেশী হস্তক্ষেপ ডেকে আনার চেষ্টা করেছেন।

সেই চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বিদেশে পালিয়ে গিয়ে শুধু সরকারের বিরুদ্ধে নয়, দেশের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তিনি সাহসী হলে দেশ থেকে পালিয়ে না গিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে তার অভিযোগগুলো দেশের মাটিতে বসেই বলতেন। তার বিরুদ্ধে আনীত বিভিন্ন দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়েমের অভিযোগের মোকাবেলা করতেন। তারেক রহমানের মতো বিদেশে পালিয়ে গিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে সত্যমিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালাতেন না।

তিনি হিন্দু বলে তাকে প্রধান বিচারপতি পদ থেকে সরানো হয়েছে এরূপ একটি চরম অসত্য তিনি প্রচার করলেন কি করে? তিনি হিন্দু বলেই হাসিনা সরকার একাধিক যোগ্য মুসলমান বিচারপতিকে ডিঙ্গিয়ে তাকে প্রধান বিচারপতি করেছিলেন বাংলাদেশে সেক্যুলার রাষ্ট্র। কিন্তু তারপরও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কেউ রাষ্ট্রীয় উচ্চপদে নেই, এই বৈষম্য ঘোচানোর পদক্ষেপ হিসেবেই শেখ হাসিনা তাকে প্রধান বিচারপতি পদে বসিয়েছিলেন। তার যোগ্য প্রতিদান তিনি সাবেক বিচারপতির কাছ থেকে পেয়েছেন।

বিচারপতি সিনহার দেশদ্রোহিতার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকার প্রমাণ পাওয়া গেছে তার নিজের স্বীকারোক্তিতে। পিটিআইয়ের কাছে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর কি ধরনের নির্যাতন চলছে, তাও তিনি মোদি সরকারকে জানিয়েছেন’ আমার আশঙ্কা, সম্ভবত তার মুখে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের বিবরণ শুনেই সম্প্রতি বিজেপির এক নেতা হুঙ্কার দিয়েছেন বাংলাদেশ তারা দখল করে নেবেন। সিনহা সাহেবকে বলব, এটা সাম্প্রতিক কালের সবচাইতে বড় দেশদ্রোহিতা। তিনি জানেন, ভারতে একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকার ক্ষমতায়। তিনি কি চান, বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন চলছে ভারতে এই ধরনের প্রচার চালিয়ে সেখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাতে অথবা মোদি সরকারকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে প্ররোচিত করতে? তাতে তো শুধু হাসিনা সরকারের ক্ষতি হবে না, ক্ষতি হবে বাংলাদেশের এবং সকল বাঙালীর। ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য কেউ কি দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়?

বাংলাদেশে অবশ্যই হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে, ভারতেও দলিত এবং মুসলমানেরা চরমভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। তবু দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সৌহার্দ্য ও শান্তি বজায় আছে। সিনহা সাহেব নিজের রাগের জ্বালা মেটাতে এই শান্তি সৌহার্দ্য নষ্ট করতে চান। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন বন্ধ করতে হলে দরকার সংখ্যালঘুদের মধ্যে জোরালো ঐক্য ও শক্তিশালী নেতৃত্ব। এই নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণের জন্য সিনহা সাহেবের উচিত ছিল দেশে থাকা এবং সকল ভয় ভীতি উপেক্ষা করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সাহসী নেতৃত্ব দেয়া। তা না করে তিনি যা করছেন তা হলো দেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে দু’দেশেই সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টির চক্রান্ত পাকানো।

বাংলাদেশে হিংস্র মৌলবাদীদের উত্থান সম্পর্কে ভারত সরকার যে উদ্বিগ্ন সে কথা সিনহা সাহেব জানেন বলে তার সাক্ষাতকারে বলেছেন। তাহলে তিনি কি করে দিল্লীকে প্ররোচনা দেন হাসিনা সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে না দেয়ার জন্য ব্যবস্থা নিতে? হাসিনা সরাকর ক্ষমতা থেকে উৎখাত হলে কারা ক্ষমতায় আসবে সিনহা সাহেব কি জানেন না? আসবে বিএনপি-জামায়াত সরকার। তাদের উগ্র সাম্প্রদায়িক এবং স্বৈরাচারী চেহারা বিচারপতি সিনহা কি আগে দেখেননি? তারপরও তিনি হাসিনা-সরকারকে স্বৈরাচারী আখ্যা দিয়ে প্রকৃত স্বৈরাচারীদের ক্ষমতায় আনতে চান? তাতে তার লাভ হবে কি? কিছু অর্থ, রাষ্ট্রপতির পদ? রাষ্ট্রপতির পদে বসে কি তিনি বিচার বিভাগে তার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটাতে পারবেন? বিএনপি-মনোনীত রাষ্ট্রপতিদের বিশেষ করে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও ইয়াজউদ্দীন আহমদের হাত পা বাঁধা কি করুণ পরিণতি ঘটেছিল, তা তিনি জানেন না?

আমার ধৃষ্টতার পুনরাবৃত্তি করছি। দেশপ্রেমের অভাব এবং কাপুরুষতার জন্যই সিনহা সাহেব দেশ ত্যাগ করেছেন। কোন সরকারই কাউকে দেশত্যাগে বাধ্য করতে পারে না। এক এগারোর সময় শেখ হাসিনা নির্যাতিত হয়েছেন। জেলে গেছেন, দেশত্যাগ করেননি। সিনহা সাহেবও পারতেন সকল চাপের মুখে দেশে থাকতে এবং তার নীতি ও আদর্শের জন্য লড়াই চালাতে। তাতে নির্যাতিত হলে তার ইমেজ আরও বাড়ত। দেশে সরকারের দুর্নীতি, স্বৈরাচার সম্পর্কে তিনি যেসব কথা বিদেশে গিয়ে বলছেন সেসব কথা দেশে বসেই জনগণকে জানাতে পারতেন। কিন্তু নিজের আচরিত কর্মই দেশবাসীর কাছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছে। তাই বিদেশে গিয়ে তাকে সত্য মিথ্যা জড়িয়ে সরকার বিরোধী প্রচারণা চালাতে হচ্ছে।

এই প্রচারণাকে লুফে নিয়েছে একটি সাধারণ নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের এলাই কামাল হোসেনদের যুক্তফ্রন্ট। আসলে তাদের হয়ে সিনহা সাহেব বহুদিন ধরেই কাজ করেছেন এবং এখনও করছেন। এতকাল পর বিচারপতি সিনহা বিদেশী সংবাদ সংস্থার কাছে বলছেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান সরকার প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত।’ সিনহা সাহেব যদি সত্যই এত সত্যবাদী যুধিষ্ঠির হন তাহলে এই ‘প্রহসনের সরকারের’ দ্বারা মনোনীত হয়ে প্রধান বিচারপতি পদে এতকাল রইলেন কেন? সরকার যদি অবৈধ হয় তাহলে তাদের দ্বারা মনোনীত হয়ে প্রধান বিচারপতি পদে থাকাও কি অবৈধ নয়? – জনকন্ঠ

লন্ডন, ৯ অক্টোবর, মঙ্গলবার, ২০১৮। প্রকাশিত : ১০ অক্টোবর ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment