কালের আয়নায়

কবিগুরু, বিচারের বাণী এবার নিভৃতে কাঁদেনি

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী –

একুশ আগস্টের গ্রেনেড হামলার রায় বেরোবার পর মনে হলো, একটি ট্রিলজি পাঠ সমাপ্ত করলাম। এই ট্রিলজির প্রথম খণ্ড হলো, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার; দ্বিতীয় খণ্ড হলো, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং তৃতীয় খণ্ড হলো, ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার বিচার। এই বিচারগুলো হবে এবং অপরাধীরা দণ্ড পাবে- এ কথা কোনোদিন ভাবতেও পারিনি। চার দশক পরে হলেও বঙ্গবন্ধু ও ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও সাজা হয়েছে এবং ১৪ বছর পর গ্রেনেড হামলার বর্বর ঘাতকদের বিচার ও শাস্তি হয়েছে। এটা আমার জীবনকালে দেখে গেলাম বলে পরম স্বস্তি অনুভব করছি। সব বিচারই বিলম্বিত হয়েছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ন্যায় বিচার জয়যুক্ত হলো- এটা কম কথা নয়। এক ঐতিহাসিক ঘটনা। জাতি আজ কলঙ্কমুক্ত।

এই তিনটি মামলার রায়ের জন্য আমাদের বিচার বিভাগের সাহস ও ন্যায় পরায়ণতাকে যেমন অভিনন্দন জানাতে হয়, তেমনি অভিনন্দন জানাতে হয় হাসিনা সরকারকে; বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে, যার শাসনামলে এবং যার উদ্যোগে বিশ ও একুশ শতকের এই জাতিদ্রোহী বর্বর ঘাতকদের বিচার ও দণ্ড হলো। এদের মধ্যে কেউ কেউ পালিয়ে থেকে আদালতের দণ্ড আপাতত এড়াতে পারলেও প্রকৃতির দণ্ড যে এড়াতে পারবে না, সে সম্পর্কে আমি নিঃসন্দেহ। মীরজাফর ও জগৎ শেঠের দল কি প্রকৃতির দণ্ড এড়াতে পেরেছিল?

এই তিনটি মামলাকে ট্রিলজি বা তিন খণ্ডের কাহিনী আখ্যা দিয়েছি এ জন্য যে, মামলাগুলো একই ঘটনার ধারাবাহিকতা। ১৯৭১ সালের বর্বর গণহত্যা দিয়ে যার শুরু, ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ড এবং ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা তারই ধারাবাহিকতা। উদ্দেশ্যও ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা, তার গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শের ভিত্তি ভেঙে ফেলে দেশটিকে পাকিস্তানের সেটেলাইট অথবা আধা পাকিস্তান বানানো। এ জন্য একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতিরা যেমন পাকিস্তানের হানাদার সেনা বাহিনীর কোলাবরেটর হয়েছিল, তেমনি ‘৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা যুদ্ধের শীর্ষ নেতাদের হত্যকাণ্ডে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দাচক্র সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। ২০০৪ সালে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে যে গ্রেনেডগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল, তাও পাঠানো হয়েছিল পাকিস্তান থেকে।

বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় নেতাদের হত্যা চক্রান্তে অন্যতম পালের গোদা ছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। তেমনি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা করার চক্রান্তের অন্যতম মূল নায়ক ছিলেন জিয়াপুত্র তারেক রহমান। প্রথম দিকে মনে হয়েছিল, যদিও ২১ আগস্টের ঘটনার সময় খালেদা জিয়া ক্ষমতায় ছিলেন; কিন্তু তার পুত্র ও দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতার এই চক্রান্ত সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না, পরে এই থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ে। জানা যায়, খালেদা জিয়া এই ষড়যন্ত্রে জড়িত না থাকলেও এ সম্পর্কে তিনি অবহিত ছিলেন এবং এই চক্রান্তের সাফল্য সম্পর্কে তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল।

সম্ভবত এই আশ্বাস পেয়েই তিনি গ্রেনেড হামলার কিছুদিন আগে এক জনসভায় দম্ভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আর কোনোদিন ক্ষমতায় আসবে না। প্রধানমন্ত্রী হওয়া দূরের কথা, শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদেও আবার ঢোকার সুযোগ পাবেন না।’ আবার একইভাবে কয়েক বছর পর সংঘটিত ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতি অভ্যুত্থানের সময় তিনি এই ভেবে নিশ্চিত হয়েছিলেন অথবা তাকে হয়তো আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, এই অভ্যুত্থানের সাফল্য অবধারিত। ফলে এবার তিনি শেখ হাসিনাকে আলটিমেটাম দিয়েছিলেন, ‘হাসিনাকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে। নইলে পরিণতি ভালো হবে না।’

ভাগ্যের পরিহাস, এই দুই দফা চক্রান্তে ‘৭৫-এর পুনরাবৃত্তি ঘটানো যায়নি। তবে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের অসংখ্য সাধারণ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করা সম্ভব হয়েছে। হাসিনা বেঁচে যান। চক্রান্ত ব্যর্থ হয়। যে দলের প্রতিষ্ঠাতাদের চক্রান্তে জাতির পিতাসহ জাতীয় নেতারা মর্মন্তুদ মৃত্যুবরণ করেছেন, যারা দু’দুবার (১৯৭৫ ও ২০০৪) আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মীকে হত্যার চেষ্টা করেছেন, যারা পুলিশের তালিকার দাগি অপরাধীকে দেশের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী করেন, যে দলের শাসনামলে পুলিশের গুলিতে পিতার কোলে তিন বছরের শিশুপুত্র মারা গেলে তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আল্লার মাল আল্লায় নিয়ে গেছে’; সেই দল এখন ক্ষমতা হারিয়ে দেশে গণতন্ত্র গেল গেল বলে চিৎকার জুড়েছে। আর সেই চিৎকারে গলা মিলিয়েছেন দেশের একটি সুশীল সমাজের শীর্ষ নেতারা। অন্য কোনো দেশ হলে এই ঘাতকদের দলকে বেআইনি ঘোষণা করা হতো। এই ঘাতকদের নিয়ে জোট বেঁধেছেন একশ্রেণির জন সমর্থনহীন রাজনৈতিক নেতা দেশে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং আইনের শাসন তথা সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য।

কোনো সন্দেহ নেই, ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধী, ১৯৭৫ ও ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের বর্বর ঘাতকদের বিচার ও দণ্ডদানের ব্যবস্থা বাংলাদেশকে কলঙ্কমুক্ত করেছে এবং দেশটিতে হত্যা ও চক্রান্তের রাজনীতির পুনরাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করবে। তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। লুৎফুজ্জামান বাবর ও আবদুস সালাম পিন্টু (খালেদা সরকারের উপমন্ত্রী)সহ ১৯ জনের ফাঁসির আদেশ এবং ১১ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। তারেক রহমান এখন ব্রিটেনে পালিয়ে থাকলেও ব্রিটিশ সরকার এখন তাকে বাংলাদেশ সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যাপারে এই অজুহাত দেখাতে পারবে না যে, তাদের দেশের আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত কোনো অপরাধীকে তার দেশে ফেরত পাঠাতে তারা পারে না। তারেক রহমানের মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়নি। এখন ব্রিটিশ সরকার কী বলবে? যদিও বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ বলছে, তারেক রহমানকে গুরু পাপে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অবশ্যই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় দেশে চক্রান্তের রাজনীতির মূলোৎপাটন করতে না পারলেও তাদের বিষদাঁত ভেঙে দিয়েছে। জামায়াতকে সঙ্গে নিয়েও সন্ত্রাসের রাজনীতি ও চক্রান্তের রাজনীতিতে তারা আর সুবিধা করতে পারছে না। যারা গলা ফুলিয়ে হুঙ্কার দিয়েছিল, তাদের নেত্রীকে দুর্নীতির মামলায় দণ্ড দেওয়া হলে দেশে আগুন জ্বলবে; তারা এখন ছাইয়ের গাদার ওপর শুয়ে আছেন। তারেক রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ ঘোষিত হওয়ার পরও বিএনপির সিপাহসালার মির্জা ফখরুল একটি মামুলি বিবৃতি দিয়েই গা বাঁচিয়েছেন। জোট গঠনের নামে ঘোঁট পাকানো হচ্ছে এক দল জনগণ দ্বারা বারবার প্রত্যাখ্যাত, দল বদলকারী, হতাশ ও ব্যর্থ রাজনীতিকের সঙ্গে। ঘটা করে এর নাম দেওয়া হয়েছে যুক্তফ্রন্ট। ইতিমধ্যে কেউ কেউ এদের নাম দিয়েছেন যুক্তফ্রড। কারণ জনগণকে প্রতারণা করা ছাড়া এদের রাজনৈতিক মূলধন কিছু নেই।

দেশে কি আওয়ামী লীগের বিরোধিতা থাকবে না, বিরোধী দল থাকবে না? নিশ্চয়ই থাকবে। তা না হলে দেশটিতে গণতন্ত্র টিকবে না। এই বিরোধী দল গড়ে উঠবে অসাম্প্রদায়িক ও সুস্থ গণতন্ত্রের ভিত্তিতে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধকে অসম্মান না জানিয়ে; কিন্তু দেশটির চার দশকের বেশি রাজনীতিতেও তা হয়নি। ‘৭১-এর পরাজিত শত্রুরা বারবার মাথা তোলার চেষ্টা করেছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতি নয়, কখনও মিলিটারি ক্যু, কখনও ক্যান্টনমেন্টে গঠিত রাজনৈতিক দলের চেহারা নিয়ে বন্দুকের সাহায্যে দেশ শাসন এবং কখনও জামায়াত ও উগ্র মৌলবাদীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছে এবং সেই চেষ্টা এখনও চলছে।

আওয়ামী লীগ গণ আন্দোলনের মাধ্যমে যখনই ক্ষমতায় এসে স্বাধীনতার এবং রাষ্ট্রের চিহ্নিত শত্রুদের কঠোর হাতে দমন করতে চেয়েছে, তখনই তারা মরাকান্না শুরু করেছে গণতন্ত্র গেল, মানবাধিকার গেল, আওয়ামী লীগ স্বৈরাচারী শাসন চালাচ্ছে ইত্যাদি। এদের সঙ্গে সম্প্রতি ঘটা করে জোট বেঁধেছেন ড. কামাল হোসেন, ড. ইউনূস, ডা. বদরুদ্দোজা প্রমুখ। দেশে এদের হাঁড়ি নেই। যত কদর বিদেশে। এই বিদেশি কদর নির্ভর করেই এরা দেশের রাজনীতিতে অমাবস্যার চাঁদ হয়ে মাঝেমধ্যে দেখা দেন।

এদের মধ্যে ড. কামাল হোসেনই আইনের শাসন ও সুশাসনের নামে সবচেয়ে বেশি উচ্চকণ্ঠ; কিন্তু তার নিজের দল গণফোরামেই নেতৃপদে আছেন সহকর্মী হত্যার দায়ে অভিযুক্ত এক ব্যক্তি। আবার এখন যে বিএনপি দলের সঙ্গে তিনি আঁতাত গঠন করেছেন, সেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও গ্রেনেড হামলার মামলায় দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত অপরাধী। আদালতের বিচারে অপরাধী হওয়ার পরও তিনি নিয়ম অনুযায়ী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পদে ইস্তফা দেননি বা তাকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়নি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যিনি প্রায় উন্মাদ, সেই ড. কামাল হোসেন আইনের বিচারে অপরাধী সাব্যস্ত এই তারেকের নেতৃত্বাধীন দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যাচ্ছেন দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আন্দোলন শুরু করতে।

ড. কামালদের সমর্থক দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকাটিও পারেনি এই বিষয়টি হজম করতে। তাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সদস্য মিজানুর রহমান খান সম্প্রতি তার কলামে আদালতের বিচারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ পাওয়ার পরও তারেক রহমান কীভাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পদে থাকেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন। বিএনপির স্থায়ী চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও দুর্নীতির দায়ে দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগ করছেন। যে দলের ঘাড়ে সওয়ার দুর্নীতি ও খুনের মামলার দুই দণ্ডিত নেতা, ড. কামাল হোসেনরা এদের নিয়ে করবেন দেশে গুড গভর্ন্যাস ও রুল অব ল’ প্রতিষ্ঠা; হাসব, না কাঁদব? মিজানকে ধন্যবাদ এমন একটি প্রসঙ্গ তার পাঠকদের কাছে তুলে ধরার জন্য। – সমকাল

লন্ডন, ১২ অক্টোবর, শুক্রবার, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment