দশ দিগন্তে

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জেতার সম্ভাবনা কেন?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

জয়ন্তী সেনগুপ্তা পশ্চিম বঙ্গের একজন রিসার্চ স্কলার। তার গবেষণার বিষয় ‘দ্য কজ এন্ড কনসিকোয়েন্সেস অব রাইজ অব ফার রাইট ইন সাউথ এশিয়া’। বর্তমানে ম্যাসাচুয়েটস-এ অধ্যাপনা করেন। সম্প্রতি লন্ডনে এসেছিলেন একটি লেকচার ট্যুরে। আমার ভারতীয় বন্ধুদের কাছে খবর পেয়ে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে একটি বক্তৃতা কক্ষে তার বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিলাম। তার বক্তৃতা খুবই পাণ্ডিত্যপূর্ণ। মোদ্দাকথা, ভারতীয় উপমহাদেশে যে আজ হিন্দু, বৌদ্ধ ও ইসলাম ধর্মের উগ্রবাদীদের এই অভ্যুদয়, তার মূল কারণ অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গান্ধী ও জিন্নার নেতৃত্বের মধ্যে নিহিত।

অধ্যাপক সেনগুপ্তার মতে, গান্ধী, জিন্না দু’জনেই ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত। দু’জনেই ওয়েস্ট মিনস্টার টাইপের গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। কিন্তু রাজনীতি করতে গিয়ে তারা দু’জনেই ধর্মাশ্রয়ী স্লোগানের আশ্রয় নিয়েছেন। গান্ধী রাম রাজত্ব প্রতিষ্ঠার ধ্বনি তুলে হিন্দু আশ্রম-জীবন যাপন করতেন। জিন্না বিলাসবহুল পাশ্চাত্য ধারার জীবনযাত্রা বর্জন না করেও ভারত ভাগ করে মুসলিম হোমল্যান্ড (পাকিস্তান) প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছিলেন। পরিণতি গণতান্ত্রিক ভারতের বুকে আজ উগ্র হিন্দুত্ববাদের প্রতিষ্ঠা। আগামী সাধারণ নির্বাচনেও জয়লাভের জন্য হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার আবার বিতর্কিত রাম মন্দির পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্লোগান তুলেছে। আর জিন্নার স্বপ্নের গণতান্ত্রিক মুসলিম হোমল্যান্ডে আজ গণতন্ত্রের ধ্বংসস্তূপের উপর কট্টর শরিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এর পরিণতি, গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই এখন চরম দক্ষিণ পন্থিদের রাজত্ব চলবে বেশ কিছুকালের জন্য। ফলে এই অঞ্চলে হিংসা, বিভেদ ও রক্তপাত বাড়বে। সমাজ ও অর্থনীতির সুষম বিন্যাস সম্ভব হবে না। রাজনীতি অস্থিতিশীল থাকবে। যেহেতু ইউরোপে ও আমেরিকাতেও এখন ফার রাইটস বা চরম দক্ষিণ পন্থিদের জয়-জয়কার চলছে, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতার আন্দোলন খুবই দুর্বল, তাতে বর্তমান শতকের প্রথমার্ধকে ভিক্টোরিয়ান ক্যাপিটালিজমের আরও হিংস্র অভ্যুত্থানের যুগ বললে অত্যুক্তি করা হবে না।

অধ্যাপক জয়ন্তী সেনগুপ্তার এক ঘণ্টার গোটা বক্তৃতাটাই ছিল আমার কাছে খুবই উপভোগ্য। কারণ তার বক্তৃতায় উপমহাদেশে রাজনীতির আলোচনাই ছিল বেশি। মিয়ানমারে অহিংসা পরম ধর্ম—এই নীতি ও আদর্শের প্রবর্তক বৌদ্ধদের চরম হিংস্র ও বর্বর নীতির অনুসরণ এবং রোহিঙ্গা সমস্যা সম্পর্কে তিনি চমত্কার বিশ্লেষণ দিয়েছিলেন (সময় ও সুযোগ হলে আগামীতে তা নিয়ে লেখার ইচ্ছে রইল)।

তার বক্তৃতা শুনেই তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ইচ্ছে হলো। স্কুল অব ইকোনমিক্সের ক্যাফেটেরিয়ায় তিনি কফির টেবিলে তার পরিচিত জনের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন। আমি অনাহূতভাবেই সেই টেবিলে গিয়ে হাজির হলাম।

প্রথমে একটু হতচকিত হলেও আমি হুইল চেয়ারে বসা দেখে এবং বাংলাদেশের সাংবাদিক জেনে আমার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী হলেন। আমি সরাসরি বললাম, উপমহাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে আপনার বিশ্লেষণ ভালো লেগেছে। আপনি কি মনে করেন, আগামী সাধারণ নির্বাচনেও বিজেপি ক্ষমতায় আসবে? তিনি বললেন, আমি ভবিষ্যদ্বাণী করি না। অতটা দূরদৃষ্টি আমার নেই। তবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে পারি। সেই বিশ্লেষণ সঠিক হতে পারে এবং নাও পারে।

কফির কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, ভারতের আগামী সাধারণ নির্বাচনে মোদী আবার ক্ষমতায় আসবেন বলে আমার ধারণা। তবে আগের বারের মোদী ঝড় এখন নেই। তার সেই জনপ্রিয়তাও নেই। টেনেটুনে তিনি ক্ষমতায় থাকবেন। তবে বহু রাজ্য হারাবেন। এটা ঘটবে দুই কারণে। প্রথম, কংগ্রেসে কোনো ক্যারিসমেটিক লিডার নেই। সর্বভারতীয় নেতা হওয়ার মতো ম্যাচুরিটি রাহুল গান্ধী এখনো অর্জন করেননি। বাঘের মতো গর্জালেই বাঘ হওয়া যায় না। দ্বিতীয় কারণ বাম গণতান্ত্রিক নেতাদের মধ্যে অনৈক্য, কংগ্রেস সম্পর্কে কারো কারো অনীহা এবং লক্ষ্য ও নীতি নির্ধারণে বিভ্রান্তি।

তিনি বললেন, ভারতে বিজেপি’র উত্থানের একটি বড় কারণ, কংগ্রেসে পরিবারতন্ত্র স্থাপনে সোনিয়া গান্ধীর অদূরদর্শী জেদ। বিজেপির বাজপেয়ী সরকারের পর কংগ্রেস নির্বাচন জয়ী হয়ে প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা প্রণব মুখার্জিকে প্রধানমন্ত্রী হতে না দিয়ে ব্যুরোক্রাট ড. মনমোহনকে প্রধানমন্ত্রী পদে বসানো ছিল বড় ভুল। রাহুল গান্ধীকে তড়িঘড়ি করে কংগ্রেস সভাপতি না করে প্রণব বাবু বা অনুরূপ কোনো প্রবীণ নেতার অধীনে আরও কিছুকাল শিক্ষানবিশী করানো উচিত ছিল। তা না করায় নরেন্দ্র মোদী তার বয়স এবং ১৩ বছর গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার জোরে ভারতের রাজনীতিতে ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ হয়ে গেছেন। অবশ্য এই অবস্থান তিনি বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি।

এরপর একটু হেসে বললেন, ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদের অভ্যুত্থানের জন্য বাম গণতান্ত্রিক জোটের বড় শরিকদের এবং দেশটির সুশীল সমাজেরও বড় অংশের মধ্যে বিভ্রান্তি, অন্ধ কংগ্রেস-বিদ্বেষ কম দায়ী নয়। বামেরা যদি কেন্দ্রে জ্যোতি বসুকে সে সময় প্রধানমন্ত্রী হতে দিতেন এবং আমেরিকার সঙ্গে কংগ্রেস সরকারের ঘনিষ্ঠ হওয়ার শিশুসুলভ অভিযোগ তুলে মনমোহন সরকারের সঙ্গে পরবর্তীকালে সম্পর্ক ছিন্ন না করতেন, তাহলে ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদের এই জয়যাত্রা এত সহজে সম্ভব হতো না। ভারতের বামদের বড় অংশ ইন্দিরা ও কংগ্রেস-বিদ্বেষে নাক দিয়ে এখন নরুন পেয়ে তাকডুম তাকডুম করছেন। পশ্চিমবঙ্গেও এই বামদের সহজে ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা কম। তৃণমূলকে হটাতে গেলে তারা বিজেপিকেই ক্ষমতায় ডেকে আনবেন।

নিজের কথা শেষ করেই তিনি আমার দিকে তাকালেন। বললেন, আমার কথা তো শুনলেন। এবার আপনার দেশের কথা বলুন। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ তো সহোদরা। বললাম, আমার ধারণা আগামী সাধারণ নির্বাচনটি যথাসময়ে হলে আওয়ামী লীগ কায়ক্লেশে হলেও জয়লাভ করবে। সেনগুপ্তা বললেন, কায়ক্লেশে জিতবে কেন? হাসিনা সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তো সারা বিশ্বে তাক লাগিয়েছে। বলেছি, বিশ্বে তাক লাগিয়েছে। কিন্তু এই উন্নয়নে সাফল্যের ফসল আওয়ামী লীগ ঘরে তুলতে পারেনি। দলের একশ্রেণির মন্ত্রী, এমপি এই ফসল খেয়ে ফেলেছে। তাদের দুর্নীতি ও অপশাসন জনগণের চোখে উন্নয়নের সব সাফল্যকে আড়াল করে ফেলেছে।

জয়ন্তী সেনগুপ্তা বললেন, তারপরও আপনি আশা করেন, আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে জিতবে? সকল বিরোধী দল এক হওয়ার পরও? বলেছি, জিতবে একটি কারণে। আওয়ামী লীগ এবার যোগ্য ও সৎ প্রার্থী মনোনয়ন দানে সতর্ক হয়েছে। তা ছাড়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এখন বিরাট ক্যারিশমা। তার বিকল্প নেতৃত্ব দেশে নেই। যেসব পুরনো নেতা এবং সুশীল সমাজ এই সরকারের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হয়েছে তাদের রাজনৈতিক কোনো ক্রেডিবিলিটি নেই। ভারতের একশ্রেণির বাম ও সুশীলের কংগ্রেস বিদ্বেষের মতো বাংলাদেশে এই সুশীল ও বামদেরও একমাত্র মূলধন হাসিনা-বিদ্বেষ। আর বিএনপি তো এই হাসিনা-বিদ্বেষ থেকে অন্তত দশবার তার জীবন নাশের চেষ্টা করেছে। জন সাধারণের কাছে তাই বিএনপি ও সুশীল সমাজ সমানভাবে এক্সপোজড্। হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ অভিন্ন এবং দাবিগুলোও অভিন্ন। কেবল নিজেরা এক হতে পারছেন না। একটু অপেক্ষা করুন, এই সুশীল ও প্রবীণ নেতাদের ঐক্য ও যুক্তফ্রন্ট কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা দেখতে পাবেন।

অধ্যাপক সেনগুপ্তা বললেন, আমি ভেতরের কথা জানি না, কিন্তু বাইরে দেখে মনে হয়, বিএনপি নবগঠিত জাতীয় ঐক্য ও যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে মিশেও আগামী নির্বাচনে জিতবে পারবে না একটি বড় কারণে। রাজনীতিতে বিএনপির একমাত্র মূলধন ভারত বিদ্বেষ ও ভারত ভীতি প্রচার। এই হাতিয়ারটি এখন একেবারেই ভোঁতা হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগকে ভারতের তাঁবেদার দল বলে তারা এখনো প্রচার করতে পারে, এই প্রচারণা বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। বরং প্রমাণিত হয়েছে বিএনপি পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা চক্র আইএসআই-এর অর্থ ও অন্যান্য সাহায্যে পরিচালিত হয়।

তিনি বললেন, আরও একটি বড় ব্যাপার, সিভিল এন্ড মিলিটারি ব্যুরোক্রেসির যে সাপোর্ট ছিল বিএনপির শক্তি ও সমর্থনের উত্স— সেটি এখন নেই। নব প্রজন্মের বাংলাদেশ আর্মি এখন পাকিস্তানি প্রভাব থেকে অনেকটাই মুক্ত এবং তাদের পেট্রিয়েটিজমও প্রশ্নাতীত। দেশটির ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে তারা নিজেদের স্বার্থ সুবিধা সংরক্ষিত রাখতে বেশি আগ্রহী। রাজনীতিকদের মাথায় ডান্ডা ঘোরাবার ইচ্ছা তাদের কম। একই কথা নব্য ধনীদের সম্পর্কে। জিয়া পরিবারের—বিশেষ করে তারেক রহমানের চাহিদা এত বেশি ছিল যে, তার এবং তার পরিবারের কাছে জিম্মি হয়ে থাকাটা তারা পছন্দ করেনি। এখনো করছে না। বাংলাদেশ সম্পর্কে গবেষণা করতে গিয়ে আমি এটা জানতে পেরেছি।

বলেছি, এখন ওদের ঐক্য জোটের একমাত্র ভরসা, ভারত ও আমেরিকার মতো কোনো বড় শক্তির সাহায্য, সমর্থন। কিন্তু পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে তাতে তারা সফল হবে কিনা আমার সন্দেহ আছে। সেনগুপ্তা বললেন, আমি যতদূর জানি, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন তার বন্ধু ড. ইউনুসকে সাহায্য করার জন্য বাংলাদেশের ব্যাপারে যতটা নাক গলাতে চেয়েছিলেন, বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন ততটা আগ্রহী নন। আর ভারতের বিজেপি সরকার? তারা নিজেরা সাম্প্রদায়িক হতে পারেন, কিন্তু বাংলাদেশে বিএনপি সরকারের সাম্প্রদায়িকতা যে ভারতের জন্য অহিতকর এবং পাকিস্তানের জন্য হিতকর এই সত্যটা তারাও জানেন। – ইত্তেফাক

[ লন্ডন, ১৩ অক্টোবর, শনিবার, ২০১৮ ]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment