দশ দিগন্তে

কামাল-তারেকের এই যৌথ নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ কী?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে নানা জনে নানা দামামা বাজাতে শুরু করেছেন। কেউ বলছেন, ড. কামাল হোসেন বাংলাদেশের ভাবী প্রধানমন্ত্রী। তার সঙ্গে যে নন্দীভৃঙ্গিরা আছেন, তাদের একজন তাকে মাহাথিরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আসলে এই ঐক্যফ্রন্ট গঠনের আগেই এর নেতৃত্বে একটা “রক্তপাতহীন ক্যু” হয়। সেই ক্যু’তে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী কুপোকাত হন। ড. কামাল হোসেন প্রকারান্তরে একক নেতা হয়ে যান। ক্যুয়ে পরাজিত হলে যা হয়, ডা. চৌধুরীর দলের সুযোগ সন্ধানীরা তাকে ছেড়েছেন। তারা পাল্টা বিকল্পধারা গঠন করে ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাকে মূলধন করেই ঐক্যফ্রন্টের নেতারা একই কুমির ছানা বারবার দেখানোর মতো পাল্টা বিকল্পধারাকে দেখিয়ে দাবি করছেন ঐক্যফ্রন্টের আকার বাড়ছে।

আমার ধারণা, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী সরে যাবার পরও ঐক্যফ্রন্টে নীতি ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব যায়নি। ফ্রন্টে নেতৃত্বের ক্যুটি ঘটিয়েছে বিএনপি ও জামায়াত। তারা তারেক রহমানের নির্দেশে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে ঐক্যফ্রন্ট থেকে সরিয়েছে। ড. কামাল হোসেন তাদের শিখণ্ডি হয়ে নেতৃত্বে এসেছেন। আসল নেতৃত্বে ফ্রন্টের সংখ্যা গরিষ্ঠ অংশের নেতা তারেক রহমান। ঐক্যফ্রন্টের ভূমিকা সম্পর্কে ড. কামাল হোসেন বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে যেসব কথা বলে এসেছেন, সে সম্পর্কে মিডিয়ায় যে খবর বেরিয়েছে, তার হেডিং হলো, “ড. কামালের ভূমিকায় খুশি তারেকসহ ফ্রন্ট নেতারা।”

এই ফ্রন্ট নেতারা বলতে বিএনপি ও জামায়াত। ঐক্যফ্রন্ট বলতেই বিএনপি ও জামায়াত। তারাই ফ্রন্টের সংখ্যা গরিষ্ঠ নেতৃস্থানীয় দল। তারাই ড. হোসেনকে ফ্রন্টের শীর্ষে বসিয়েছেন, তাকে দিয়ে তাদের কথাই বলাচ্ছেন। ফ্রন্টে জামায়াতকে নেওয়া হবে না বলে ড. কামাল বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে যে কথা বলেছেন, তা কি সত্যের অপলাপ নয়? জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা ত্যাগের কোনো ঘোষণা বিএনপি দেয়নি। জামায়াত বিএনপি’র ২০ দলীয় জোটে রয়েছে। সুতরাং বিএনপি’র কোলে বসে জামায়াত কি ঐক্যফ্রন্টে ঢুকে পড়েনি।

বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে ড. কামালকে বলতেই হয়েছে, “ফ্রন্ট কোনো একক নেতৃত্বে নয়, যৌথ নেতৃত্বে চলছে।” এই যৌথ নেতৃত্বে কারা সে কথা তিনি বলতে পারেননি। এই যৌথ নেতৃত্বের নামে ফ্রন্টের আসল নেতৃত্ব তারেক রহমানের হাতে। সময়কালে বেরিয়ে আসবে এই সত্যটা। ফ্রন্টের আসল নেতা ও নীতিনির্ধারক যে তারেক রহমান এটা আড়াল করার জন্যই রব-মান্না প্রমুখ ড. কামাল হোসেনকে মহাথির আখ্যা দিয়ে তাকে ফ্রন্টের একক নেতা বলে চালানোর চেষ্টা করেছিলেন। বিএনপি এটা হতে দেয়নি। তারা জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের নেতাদের এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করে এ কথা বাইরে চাউর হতে দেননি যে, নেতৃত্বের প্রশ্নে ফ্রন্টে অনৈক্য আছে। তারা ড. কামালকে দিয়েই বলিয়ে দিয়েছেন, ফ্রন্ট কোনো একক নেতৃত্বে চলছে না। যৌথ নেতৃত্বে চলছে। এই যৌথ নেতাদের আসল নেতার নামটি আপাতত উহ্য রয়েছে।

নির্বাচন এখনো হয়নি। তার তফসিল ঘোষণাও হয়নি। নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট জয়ী হবে তার কোনো সামান্য নিশ্চয়তাও নেই। তার আগেই ফ্রন্টের মধ্যে তাদের সরকারের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বুঝতে বাকি থাকে না এই প্রধানমন্ত্রী পদের ব্যাপারে ফ্রন্টে অনৈক্য আছে এবং অনৈক্য ধামাচাপা দেওয়ার জন্যই এই ব্যাপারে ড. কামাল বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে কিছু গত্বাঁধা কথা বলে এসেছেন।

বিএনপি এই বিতর্কে যোগ দেয়নি। তারা জানেন, ফ্রন্ট যদি নির্বাচনে জয়ী হয়, তাহলে ফ্রন্টের শীর্ষ শরিক হিসেবে তার পার্লামেন্টারি পার্টিতেও তারা অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াতের সদস্যরাই হবেন সংখ্যা গরিষ্ঠ। এই সংখ্যা গরিষ্ঠের ইচ্ছায় কে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হবেন, তা বিএনপি’র এখন বলার দরকার নেই। ড. কামালের মনে এ সম্পর্কে যদি আশা থাকে, তা ভবিষ্যতে আশা কুহকিনী বলে প্রমাণিত হতে পারে।

জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার নামে যে ফ্রন্ট গঠিত হয়েছে, তা দেশে অনৈক্যের প্রক্রিয়াকেই জোরদার করেছে। আমি তাই এর নাম দিয়েছি জাতীয় অনৈক্য ফ্রন্ট। এটা আসলে নতুন বোতলে পুরনো মদ। বিএনপি-জামায়াতের ২০ দলীয় জোটে আরেকটি গ্রুপের যোগদান ও জোটের সম্প্রসারণ। নতুন নাম দেওয়া হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এই ঐক্যফ্রন্ট গড়ার সূচনাতেই অনৈক্যের শুরু। এই ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু করার আদি নেতা ছিলেন ড. কামাল, ডা. বদরুদ্দোজা, কাদের সিদ্দিকী প্রমুখ। কিছুদিনের মধ্যে কাদের সিদ্দিকী সরে যান। থাকেন ড. কামাল ও ডা. চৌধুরী। তারপর চলে যান ডা. চৌধুরীও। ড. কামাল বিএনপি-জোটের সঙ্গে আঁতাত করার পর সেই জোটেও ভাঙন ধরেছে। দুটি শরিক দল জোট থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ঐক্য প্রচেষ্টা থেকে সরে গিয়েও বিকল্পধারা অনৈক্যের ধাক্কা এড়াতে পারেনি। নতুন বিকল্পধারা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ জাতীয় রাজনীতিতে ঐক্যের বদলে অনৈক্যের সানাই বাজছে। সন্দেহ নেই এই অনৈক্যের সানাই শীঘ্রই আরো জোরেসোরে শুরু হবে।

কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক লীগ এই তথাকথিত ঐক্যফ্রন্টে না থাকা সম্পর্কে যে কারণটি দর্শিয়েছে, তাতে তারা আসল সত্যটিই বলেছেন। তাদের কথা, তাদের আশা ছিল “আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জোটের বাইরে একটি গণতান্ত্রিক ঐক্য জোট গঠিত হবে। যে জোট জনগণের প্রকৃত দাবি-দাওয়া তুলে ধরবে। কিন্তু ড. কামাল হোসেন তার বদলে নিজেই গিয়ে একটি জোটে যোগ দিলেন।” কৃষক শ্রমিক লীগই স্পষ্ট করে বলে দিল, ড. কামাল কোনো নতুন জোট গঠন করেননি। তিনি নিজেই একটি জোটে গিয়ে যোগ দিলেন। কৃষক শ্রমিক লীগ এই জোটটির নাম বলেনি। কিন্তু বুঝতে বাকি থাকে না, এই জোট বিএনপি-জামায়াত জোট।

আসলে আগামী সাধারণ নির্বাচনেও লড়াইটা হবে স্বাধীনতার পক্ষের ও বিপক্ষের শক্তির মধ্যে। সেক্যুলার ভার্সাস কম্যুনাল ফোর্সের মধ্যে। স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষের শক্তির জোট আওয়ামী মহাজোট এবং স্বাধীনতার বিরোধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির জোট বিএনপি ও জামায়াতের ২০ দলীয় জোট। বর্তমানের নতুন নাম জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এই ফ্রন্টেরই শিখণ্ডি নেতা ড. কামাল হোসেন। মূল নেতা তারেক রহমান। কামাল হোসেন বলেছেন, ঐক্যফ্রন্ট যৌথ নেতৃত্বে চলছে। একথা স্বীকার করতে হলে বলতে হবে এটা কামাল-তারেকের যৌথ নেতৃত্ব। এই নেতৃত্ব কতোদিন টিকবে এবং কবে ড. কামালকে ইরানের বনি সদরের ভাগ্য বরণ করতে হবে সেটাই এখন দেখার রইলো।

শত্রুকে দুর্বল ভাবতে নেই, তাই তথাকথিত ঐক্যফ্রন্টকেও দুর্বল ভাবা উচিত নয় এবং আওয়ামী লীগ তা ভাবছে না। কিন্তু এই ফ্রন্টকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়। আওয়ামী লীগ গুরুত্ব দিলে এই ফ্রন্টের গুরুত্ব বাড়বে। জনগণও এই ফ্রন্টকে গুরুত্বের সঙ্গে নেবে। আওয়ামী লীগের উচিত এদের সভা-সমাবেশকে বাধা না দিয়ে বাধামুক্তভাবে তা করতে দেওয়া। এই একুশ শতকে বাংলার মানুষ আর আগের মতো নয়। তারা অনেক বেশি রাজনীতি সচেতন। ফ্রন্টের নেতারা সভা-সমাবেশ করে যা বলবেন, তা থেকেই দেশের মানুষ সহজেই বুঝে নেবে বিড়াল ও বানরের এই পিঠা ভাগের মৈত্রীর আসল উদ্দেশ্য কী? এখন আসরে শুধু নেপথ্যে অপেক্ষমাণ শিয়ালের আগমনের অপেক্ষা।

কারা এই ঐক্যফ্রন্টে জমায়েত হয়েছেন? অতীতের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের হোতা, নাগরিক অধিকারের স্বঘোষিত প্রবক্তা, আইনের শাসনের একান্ত অনুসারী এবং সঙ্গে সাম্প্রদায়িক ও মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতার অনুসারী শক্তিশালী গোষ্ঠী। এই জগাখিচুড়ির লক্ষ্য হিসেবে বলা হচ্ছে, দেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। কিন্তু তাদের বক্তব্য ও কার্যক্রম লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়, তাদের একমাত্র লক্ষ্য শেখ হাসিনা ও তার নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ। ১৯৭৫ সালে যেমন এই দেশপ্রেম বর্জিত চক্রান্তকারী জোটের লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধু ও তার সেক্যুলার সরকারকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ, ২০১৮ সালেও তাদের অনুসারীদের লক্ষ্য শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ। জনগণের চোখে এই সত্যটি আড়ালে রাখার জন্যই চক্রান্তকারীদের জোটের নতুন নামকরণ এবং তার শিখ্লি নেতারূপে ড. কামাল হোসেনকে বেছে নেওয়া।

তিনি বুঝতে পারছেন না, এই তথাকথিত ঐক্যফ্রন্টের নেতা হিসেবে তিনি একটি স্টপগ্যাপ এরেঞ্জমেন্ট। প্রকৃত নেতার আবির্ভাবের সময় ও সুযোগ হলে তাকে ভীষ্মের মতো শরশয্যা গ্রহণ করতে হবে। ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে যে অমর্যাদাকরভাবে ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব থেকে সরানো হয়েছে, তাকে তার চাইতেও অমর্যাদাকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে। তিনি পরিচিত হতে চান জাতীয় ঐক্যের অগ্রদূত হিসেবে, ইতিহাসে চিহ্নিত হবেন ভগ্নদূত রূপে। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব হতে পারে, কিন্তু ইতিহাস তাকে যে মর্যাদা ও সম্মানের শীর্ষ শিখরে বসিয়েছে, তা থেকে তাকে সরানো কারো পক্ষেই সম্ভব হবে না।

২০০১ সালেও ড. কামালেরা হাসিনা ও হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলেন। এই ষড়যন্ত্র দ্বারা নিজেরা ক্ষমতায় যেতে পারেননি। ডেকে এনেছিলেন বিএনপি-জামায়াতের অভিশপ্ত শাসন। ২০১৮ সালেও তিনি আবার ষড়যন্ত্রে নেমেছেন। কিন্তু দেশের মানুষ সচেতন। এই ষড়যন্ত্র কামাল-তারেক যৌথ নেতৃত্বের জন্য অবশ্যই বুমেরাং হবে। – ইত্তেফাক

লন্ডন, ২০ অক্টোবর, শনিবার, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment