তৃতীয় মত

এখন তিনি মাইনাস টু থিয়োরির নব ব্যাখ্যার নায়ক

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

যেসব বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্ট বিএনপির প্রকাশ্য সমর্থক, তাদের চেয়েও যারা নিরপেক্ষ এবং সুশীল সমাজের সমর্থক সেজে বিএনপিকে কৌশলী সমর্থন দেন, তাদের আমি বাহবা দিই।

তারা সাপকে দড়ি বানাতে পারেন এবং দড়িকে সাপ বানাতে পারেন। সম্প্রতি তাদের একজনের একটি লেখা পড়ে বুঝলাম, এরা যদি জার্মানির হিটলারের প্রচার সচিব গোয়েবলসের জমানায় জন্মাতেন, তাহলে গোয়েবলস এদের প্রত্যেককে তার ‘লাই ম্যানুফ্যাকচারিং টিম’র সদস্য করে নিতেন।

আমরা সবাই জানি, এক-এগারোর সময় মাইনাস টু থিয়োরির উদ্ভাবক সুশীল সমাজের শীর্ষ নেতারা- বিশেষ করে ড. কামাল হোসেন। মইন-ফখর সরকার সেটা বাস্তবায়নের জন্য লুফে নিয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার লড়াকু ভূমিকার জন্য ব্যর্থ হয়। এই থিয়োরি সম্পর্কে যদিও বলা হয়, এর উদ্দেশ্য ছিল হাসিনা এবং খালেদা- দুই নেত্রীকেই দেশের রাজনীতি থেকে বিদায় করা।

কিন্তু এর আসল টার্গেট যে ছিলেন শেখ হাসিনা, তা ধরা পড়তে বেশি দেরি হয়নি।

যাহোক এই মাইনাস টু থিয়োরি এখন ইতিহাসের জঞ্জাল। কিন্তু সুশীল সমাজের অন্তর্ভুক্ত কিছু নিরপেক্ষতার ভেকধারী বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্ট আবার মাইনাস টু থিয়োরিকে জঞ্জাল থেকে তুলে এনে সাফসুতরা করে ড. কামাল হোসেন এবং বিএনপির মহিমা প্রচারের কৌশলী কাজে লাগাচ্ছেন। এই কলামিস্টদের (নাকি বুদ্ধিজীবী বলব?) একজন লিখেছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে নাকি মাইনাস টু থিয়োরি চমৎকার কাজ দিয়েছে।

বিএনপি খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে বিব্রত ছিল। কারণ তারা দু’জনেই আদালত কর্তৃক দণ্ডিত আসামি। ঠিক এ সময় ড. কামাল হোসেন বিএনপির সম্মতি ও সহযোগিতায় গঠিত ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব গ্রহণ করায় বিএনপি খালেদা-তারেককে দলের নেতৃত্ব থেকে না সরিয়েও কামাল হোসেনের নেতৃত্বে নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেল। আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও খালেদা-তারেক দলের নেতৃত্ব থেকে কার্যত মাইনাস হয়ে গেলেন।

এই সুশীল বুদ্ধিজীবী অথবা কলামিস্টের দীর্ঘ বক্তব্যের সারাংশ আমি নিজের ভাষায় তুলে ধরলাম। নইলে উদ্ধৃতির পরিসর দীর্ঘ হয়ে যেত। যে কামাল হোসেন মাইনাস টু থিয়োরির উদ্ভাবক এবং যিনি গণতন্ত্রের একনিষ্ঠ পূজারি হয়েও এক-এগারোর আধাসামরিক সরকারকে সমর্থন দিয়েছেন এবং তাদের ক্ষমতায় রাখার জন্য এই মাইনাস টু থিয়োরির অন্যতম প্রধান উদ্ভাবক হয়েছিলেন, তিনি এখন একই থিয়োরি দ্বারা বিএনপিকে খালেদা-তারেকের নেতৃত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন- এই প্রচারণা পাগলকেও বিশ্বাস করানো যাবে কি?

এই প্রচারণার দুটি উদ্দেশ্যই স্পষ্ট। একটি উদ্দেশ্য- ড. কামাল যে বিএনপি জোটে যোগ দিয়েছেন, এই সত্যটা ঢাকা দিয়ে দেখানো তার নেতৃত্বই বিএনপি-জামায়াত জোট মেনে নিয়েছে। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য- বিএনপিকে দুর্গন্ধমুক্ত করা। খালেদা জিয়া ও তারেক দু’জনেই গুরুতর অপরাধে আদালতের বিচারে দণ্ডিত অপরাধী। এই অপরাধীদের মাথায় নিয়ে একটা রাজনৈতিক দল চলে কীভাবে? তাই দল বা জোটটি কৌশলে এই নেতৃত্বকে পাশে সরিয়ে রেখে কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ধোয়া তুলসীপাতা হয়ে মাঠে নামতে চাইছে।

এই প্রচারণায় হাঁড়ি হাটে ভেঙে দিয়েছে প্রথমে কাদের সিদ্দিকীর কৃষক জনতা লীগ এবং পরে বিএনপি-জামায়াত জোটেরই দুটি শরিক দল। তারা এই বক্তব্যের ভিত্তিতেই জোট ত্যাগ করেছেন। কৃষক শ্রমিক লীগ বলেছে, আমরা আশা করেছিলাম, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জোটের বাইরে কামাল হোসেন একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ধারায় তৃতীয় জোট গঠন করবেন। তিনি তা না করে নিজেই বিএনপি জোটে যোগ দিয়েছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যে বিএনপি-জামায়াত জোটের নতুন মুখোশ, এই সত্যটি কাদের সিদ্দিকীর দল ভালোভাবেই তুলে ধরেছে।

অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াত জোট থেকে বেরিয়ে আসা দুটি দল আরও অপ্রিয় সত্যকে প্রশ্ন হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।

তারা বলেছে, যে কামাল হোসেন মাইনাস টু থিয়োরির উদ্ভাবক, যে থিয়োরি বাস্তবায়নের জন্য খালেদা জিয়াকে প্রথমে সাবজেলে বন্দি রেখে সৌদি আরবে নির্বাসনে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং যে কামাল হোসেনের দ্বারা সমর্থিত এক-এগারোর সরকার খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে দুর্নীতি মামলা করেছিল, সেই মামলাতেই তার দণ্ড হয়েছে। সেই কামাল হোসেনকে আমরা জোটে গ্রহণ করি কী করে? তাছাড়া তিনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করবেন কী করে?

তিনি নিজেই তো ছিলেন এক-এগারোর গণতন্ত্র বিরোধী সরকারের একজন কারিগর।

উপরিউক্ত তিনটি দলই ছোট দল। কিন্তু সত্য প্রকাশে অনেক সময় ছোট দল বড় দলের চেয়ে বড় ভূমিকা গ্রহণ করে, তা আগেও প্রমাণিত হয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আসল পরিচয়টি এখন শুধু এই তিনটি ছোট দলের চোখে নয়, দেশের অনেক মানুষের চোখেই ধরা পড়েছে। তারা বুঝতে পারছেন, জাতীয় ফ্রন্ট আসলে বিএনপি-জামায়াতের ২০ দলীয় জোটের নতুন নাম। জোটে কিছুটা যোগ-বিয়োগ ঘটেছে। দুটি ছোট দল বেরিয়ে গেছে। ড. কামাল হোসেন তিনটি (জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, গণফোরাম) ছোট দল নিয়ে যোগ দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের চোখে ধুলা দেয়ার জন্য এর নতুন নাম দেয়া হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

খালেদা জিয়া জেলে এবং তারেক রহমান বিদেশে থাকতে বাধ্য হওয়ায় তাদের বিকল্প হিসেবে নয়, তাদের মনোনীত হিসেবে ড. কামাল হোসেনকে নেতৃত্বে খাড়া করা হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোটে সাময়িক নেতৃত্ব গ্রহণের মতো আরও অনেকে ছিলেন।

যেমন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তার বহুরূপী চরিত্রের জন্য খালেদা জিয়া তাকে বিশ্বাস করেন না। অন্যদিকে যিনি এক সময় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ছিলেন, সেই বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে তারেক রহমান ভয় পান। ভাবেন জ্যেষ্ঠতা ও অভিজ্ঞতার জোরে তিনি বিএনপির নেতৃত্ব দখল করতে পারেন। তাই ড. কামাল হোসেনের দ্বারা কৌশলে তাকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে নেতৃত্ব গ্রহণ করতে দেয়া হয়নি।

ড. কামাল হোসেনের ওপর আস্থা রাখতে তারেক রহমানের দ্বিধা নেই। ড. হোসেন বিএনপি জামায়াতকে না ছাড়লে তাদের সঙ্গে ঐক্য করবেন না বলে যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা থেকে সরে এসেছেন। তিনি বলেছিলেন, তাদের ফ্রন্ট থেকে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করা হবে না, কিন্তু ফ্রন্টের দাবির মধ্যে সেই দাবিও রয়েছে। তারেক রহমান জানেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আসল শক্তি বিএনপি ও জামায়াত।

অন্য শরিক দলগুলোর শক্তি ও জনবল কোনোটাই নেই। ফ্রন্টের নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা ও নেতৃত্ব থাকবে বিএনপি-জামায়াতের হাতেই। তিনি লন্ডনে বসে তা নির্ধারণ করবেন। কামাল হোসেন হবেন লন্ডনের নেতার ঢাকার ভাইসরয়। প্রয়োজন ফুরোলে তাকে নেতৃত্ব থেকে সরাতে তারেক রহমানের এক সেকেন্ড সময়ও লাগবে না।

এই আসল সত্যটি চাপা দেয়ার জন্যই সুশীল সমাজের অন্তর্গত একদল ‘নিরপেক্ষ’ পর্যবেক্ষকের এই প্রচারণা। ড. কামাল হোসেন যা নন, তা-ই তাকে সাজানো হয়েছে। অর্থাৎ তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সর্বশক্তিমান নেতা। অন্তত বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে তাকে সেভাবেই তুলে ধরে তার নেতৃত্ব ও ফ্রন্টের একটা গ্রহণ যোগ্যতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে।

এসব প্রচার-প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী দেশের প্রকৃত গণতান্ত্রিক দলগুলোর উচিত আওয়ামী লীগের মহাজোটে আরও শক্তভাবে অবস্থান গ্রহণ এবং ’৭১-এর অসমাপ্ত সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে জয়লাভ করা। এই সত্যটা সবাইকে বুঝতে হবে, এটা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সাধারণ নির্বাচনী দ্বন্দ্ব নয়। এটা স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার পক্ষের ও বিপক্ষের শক্তির চূড়ান্ত লড়াই।

এই লড়াইয়ে হেরে যাওয়া চলবে না। হেরে গেলে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পরিণতি ঘটবে বাংলাদেশের ভাগ্যে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়েও ড. কামাল হোসেনের ভূমিকা ছিল রহস্যমূলক। ২০০১ সালের নির্বাচনের সময় তার ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। ২০১৮ সালে সব বিভ্রান্তি, রহস্য ও বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে তিনি আসল চেহারায় দেখা দিয়েছেন। দেশের মানুষকে এই বিভ্রান্তিমুক্ত হয়ে স্বাধীনতা ও অস্তিত্ব রক্ষার সর্বশেষ যুদ্ধে জয়ী হতেই হবে। – যুগান্তর

লন্ডন, ২১ অক্টোবর, রোববার, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment