তৃতীয় মত

এবার ব্যক্তি নয়, জয়ী হোক প্রতীক

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

ঢাকা থেকে এক তরুণ সাংবাদিক বন্ধু টেলিফোনে ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, গাফফার ভাই, দুঃখের কথা আর কী বলব, এবারেও মনোনয়নবাণিজ্য জমজমাট দুপক্ষেই দুই জোটেরই শীর্ষ নেতাসহ সাধারণ মনোনীত প্রার্থীদের অনেকের নাম ঘোষিত হয়েছে দুএকদিনের মধ্যেই বাকিদের নাম ঘোষিত হবে তাদের নাম ঘোষণার দিন যত পেছুচ্ছে, মনোনয়নবাণিজ্যও নাকি ততটাই রমরমা হচ্ছে পুরনো এবং জনগণের দ্বারা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকাংশই দুজোটে মনোনয়ন পাচ্ছে বলে জানা গেছে

বলেছি, ব্যাপারে আমাদের কিছু করার নেই। যদি জোটগুলো খারাপ প্রার্থী মনোনয়ন দেয় তাহলে তারা দেশটাকে ডোবাবে, নিজেদেরও ডোবাবে। আমরা সাবধানবাণী যতটা উচ্চারণ করার তা করেছি। আমাদের বিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতারা তাতে যদি কান না দেন, আমরা কী করতে পারি?

তরুণ সাংবাদিক বন্ধু এবার একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করলেন, বললেন, আপনিতো গত দুমাস ধরেই আওয়ামী লীগ সরকার শেখ হাসিনার পক্ষে দুহাতে কলম চালিয়েছেন। নির্বাচনে এই জোটের মনোনীত প্রার্থীদের নামের চূড়ান্ত তালিকা দেখার পর যদি দেখেন, অধিকাংশ মনোনয়নপ্রাপ্ত ব্যক্তি আপনার অপছন্দের, জনগণের অপছন্দের ব্যক্তি, তাহলেও আপনি কি আওয়ামী লীগ জোটকে সমর্থন দিয়ে কলম চালাবেন?

বলেছি, আওয়ামী জোটের মনোনীত ব্যক্তিদের অধিকাংশই খারাপ লোক হলে দুঃখ পাব। তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ জোটকে সমর্থন দেয়া ছাড়া আমি বা আমাদের মতো ব্যক্তিদের উপায় নেই। আমি বহুকাল ধরেই লিখে আসছি আওয়ামী জোট বিএনপি জোটের মধ্যে এই লড়াই দুটি গণতান্ত্রিক দলের মধ্যে লড়াই নয়। এখানে পক্ষ বাছাইয়ের সুযোগ খুবই সীমিত। এটা৭১এর মুক্তিযুদ্ধেরই সম্প্রসারিত রূপ। যুদ্ধ এখনও অসমাপ্ত রয়ে গেছে। সশস্ত্র যুদ্ধ থেকে এই যুদ্ধ এখন নির্বাচনী যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়েছে। এই যুদ্ধে একপক্ষে রয়েছে স্বাধীনতা অসাম্প্রদায়িকতার দল নেতা। অন্যপক্ষে রয়েছে স্বাধীনতা বিরোধী, সাম্প্রদায়িক গণতন্ত্র বিরোধী চক্রগুলো। তাদের সঙ্গে এসে এখন যোগ দিয়েছে স্বাধীনতা যুদ্ধের কিছু সাবেক নেতাও। এরা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত পথভ্রষ্ট অভিশপ্ত। বর্তমানে এদের আগের চরিত্র নেই

তরুণ সাংবাদিক বন্ধু বললেন, কিন্তু এই স্বাধীনতা অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষের জোটেও যদি খারাপ বিতর্কিত চরিত্রের দল ব্যক্তি এসে ভিড় জমায় এবং জোট তাদের গ্রহণ করে তাহলে কী হবে? আওয়ামী জোটে স্বাধীনতার শত্রু জামায়াত নেই, কিন্তু মৌলবাদী হেফাজতের একটা অবস্থান তো রয়েছে। তাকে বলেছি, রাবণের মতো দৈত্যকে বধ করার জন্য রামকে হনুমান আর বানরদের নেতা সুগ্রীবের সহায়তা নিতে হয়েছিল

তাকে আরেকটি উদাহরণ দিলাম। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানি জমানায় পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) প্রাদেশিক নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। একদিকে শাসক মুসলিম লীগ, অন্যদিকে হকভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট। এই যুক্তফ্রন্টের সহায়ক শক্তি ছিল তখনকার অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি। সে সময় মুসলিম লীগ শাসকেরা তাদের প্রচারণা দ্বারা সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ধারণা তৈরি করেছিলকমিউনিস্টরা নাস্তিক, আল্লাখোদা মানে না এবং ইসলাম পাকিস্তানের শত্রু

এহেন কমিউনিস্ট পার্টিকে যুক্তফ্রন্ট সঙ্গে নিয়েছে, এটা ছিল যুক্তফ্রন্টের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের বিরাট প্রচারণা। এই প্রচারণা ঠেকানোর জন্য সাম্প্রদায়িক দল নেজামে ইসলামকে যুক্তফ্রন্টে গ্রহণ করা হয়। রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে যুক্তফ্রন্টের প্রগতিশীল অংশ এবং সমর্থক কমিউনিস্ট পার্টিও তা মেনে নিয়েছিল। তথাপি নাস্তিক ইসলামের শত্রু কমিউনিস্টদের সঙ্গে হাত মেলানোর জন্য যুক্তফ্রন্টের বিরুদ্ধে প্রচারণার অন্ত ছিল না। যদিও কমিউনিস্ট পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তফ্রন্টে ছিল না

এসময় ঢাকায় এক ছাত্র সমাবেশে মওলানা ভাসানী বক্তৃতা দেন। তাকে কিছু ছাত্র প্রশ্ন করে, নাস্তিক কমিউনিস্টদের সঙ্গে যুক্তফ্রন্টের জোটবদ্ধতা মওলানা সাহেব কীভাবে সমর্থন করেন? মওলানা সাহেব জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি যদি একটা অন্ধকূপের মধ্যে পড়ে যাই এবং আমার বাঁচার আশা না থাকে, তখন শয়তান যদি সেই কুয়োর মধ্যে দড়ি ফেলে আমি সেই দড়ি ধরে উঠব। মওলানা ভাসানীর এই উক্তিকে কেন্দ্র করে মুসলিম লীগ সমর্থক কাগজগুলোতে কুয়োতে পতিত মওলানা ভাসানী শয়তানের দড়ি ধরে উঠছেনএই কার্টুন ছাপা হয়েছিল

হেফাজত এবং জামায়াত দুটিই মৌলবাদী দল। কিন্তু তাদের মধ্যে পার্থক্য আছে। হেফাজত বাংলাদেশে ইসলামের কিছু অতীতের মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর জামায়াত সৌদি অর্থে প্রতিষ্ঠিত পরিচালিত একটি রাজনৈতিক সন্ত্রাসী দল। যাদের লক্ষ্য ইসলামের নাম ভাঙিয়ে সৌদি ওয়াহাবিতন্ত্র বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করা। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে এবং পাকিস্তানি হানাদারদের বাঙালি গণহত্যায় অংশ নিয়েছে। হেফাজতের এই কলঙ্ক নেই। বিএনপির আশ্রয়ে জামায়াতের যে বাড়বাড়ন্ত, তাকে ঠেকাতে হলে হেফাজতিদের কিছু কনসেশন দিয়ে কাছে টানা রাজনৈতিক কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়

এই জাতীয় কৌশল জাতীয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সবাই গ্রহণ করে। হিটলারের ফ্যাসিবাদকে রোখার জন্য ব্রিটেন আমেরিকা কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নকে মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিল। আবার কমিউনিজম ধ্বংস করার জন্য আমেরিকা আরেক কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চীনকে মিত্র হিসেবে গ্রহণ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল। বাংলাদেশের সিপিবিবাসদের বাম নেতারা কি জানেন না, পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম তথা সাবেক বাম জোট নন্দীগ্রাম সিঙ্গুরে কৃষক বিদ্রোহ দমনের জন্য দিল্লির জামে মসজিদের খতিবকে ডেকে এনে কৃষকরা যাতে আন্দোলন না করে সেজন্য তাদের কাছে ফতোয়া দিয়েছিলেন। তাতে ব্যর্থ হয়ে কমিউনিস্ট সরকার কৃষকদের ওপর গুলি চালিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী উর্দুভাষী এবং জামায়াতপন্থী অবাঙালিদের খুশি করার জন্য তাদের দাবিতে তসলিমা নাসরিনের বই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, তাকে কলকাতা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। দোষ কেবল নন্দ ঘোষের অর্থাৎ বাংলাদেশের হাসিনা সরকারের!

সেদিন মনের আবেগে ঢাকার এক সাংবাদিক বন্ধুকে অনেক কথাই বলেছি। অতীতের স্মৃতিচারণ করেছি। ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশরাজ পাকিস্তানইস্যুতে সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। নির্বাচনের প্রধান ইস্যুটি ছিল ভারতকে স্বাধীনতা দেয়া নয়। দেশটিকে স্বাধীনতা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম লীগের দাবি মতো ভারত ভাগ করে পাকিস্তান নামে আরেকটি রাষ্ট্র গঠন করা হবে কিনা তা ছিল মেইন ইস্যু। নির্বাচনে মুসলিম লীগের মনোনীত অধিকাংশ প্রার্থী ছিল ব্রিটিশরাজের পা চাটা খাজা, নবাব, স্যার, খানবাহাদুর, খানসাহেব ইত্যাদি খেতাব পাওয়া ব্যক্তি। তারা সুযোগ বুঝে মুসলিম লীগে ঢুকে পড়েছিল এবং ছেচল্লিশের নির্বাচনে প্রার্থী ছিল

তা নিয়ে মুসলিম লীগের ভেতরেই প্রতিবাদ ওঠে। জিন্নার কাছে এই প্রতিবাদের ঢেউ পৌঁছে। তিনি মুসলিম লীগের নেতাকর্মীদের বোম্বাইয়ে (বর্তমানে মুম্বাই) তার মালাবার হিলের বাসায় ডাকেন। তিনি তাদের বলেন, ‘এই নির্বাচন কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়। এই নির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভর করে পাকিস্তান হবে কী হবে না! আপনারা যদি সত্যই পাকিস্তান চান, তাহলে আমি যদি কলাগাছকে নমিনেশন দেই, তাহলে সেই কলাগাছকেই ভোট দিতে হবে

তরুণ সাংবাদিক বন্ধু বললেন, আপনি কি এই কাহিনীটি দ্বারা বোঝাতে চাচ্ছেন, এবারের নির্বাচনে শেখ হাসিনা যদি কলাগাছকে নমিনেশন দেন, তাহলে আমাদের উচিত হবে তাকেই ভোট দেয়া। বলেছি, আমার কথাটার অর্থ তাই দাঁড়ায়। এখন পর্যন্ত আওয়ামী জোটের মনোনীত প্রার্থীদের যে তালিকা বেরিয়েছে, তাতে বেশকিছু পুরনো অপছন্দের মুখ দেখে আমরা অসন্তুষ্ট হতে পারি। কিন্তু আমরা যদি একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের আবার ক্ষমতায় দেখতে না চাই, তাহলে নৌকার প্রতীকধারী যে হোক তাকেই ভোট দিতে হবে। এবারের নির্বাচন দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী গণতান্ত্রিক জোটের মধ্যে লড়াই নয়, এই লড়াই স্বাধীনতার পক্ষের বিপক্ষের শক্তির মধ্যে। এখানে প্রার্থীর ভালোমন্দ বাছাইয়ের অবকাশ কম

তরুণ সাংবাদিক বললেন, হয়তো আপনার কথাই ঠিক। কিন্তু এবারের নির্বাচনে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ভোটদাতারা প্রার্থীর নির্বাচন প্রতীকের চেয়ে তার ব্যক্তিগত গুণাগুণের ওপর জোর দিচ্ছে। প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে সাধারণ মানুষের কল্যাণে তার কী ভূমিকা ছিল বা আছে তার বিচারবিবেচনা ভোটদাতাদের কাছে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে মনে হয়। আরও একটা কথা আপনাকে বলি, টাকার খেলা এবারের নির্বাচনেও হবে। মানুষ টাকা নেবে, কিন্তু ভোট দেবে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে। এটা যদি হয় তাহলে এবারের নির্বাচনের ফল অনেক হিসাবনিকাশ পাল্টে দেবে

আমি বলেছি, তোমার কথা সত্য হতে পারে। কিন্তু আমার প্রত্যাশা ব্যক্তি যত বিতর্কিত হোক, নির্বাচনে প্রতীক জয়ী হবে এবং সেই প্রতীকটি নৌকা। – যুগান্তর

লন্ডন, ২৫ নভেম্বর, রবিবার, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment