দশ দিগন্তে

আসন্ন নির্বাচনে কী হতে যাচ্ছে?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

দেশে হচ্ছে নির্বাচন। কিন্তু বিদেশে বসে রোজই আমাকে বারবার একটি প্রশ্নের জবাব দিতে হচ্ছে, আসন্ন নির্বাচনে কী হতে যাচ্ছে বলে আপনি মনে করেন? এই প্রশ্নের জবাব দিতে এখন আর আমি দ্বিধা করি না। সরাসরি বলি, আওয়ামী মহাজোট জয়ী হবে। তবে বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নয়। সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা আওয়ামী লীগ পাবে। এবার আর প্রথমবারের মতো সুবিধাবাদী বিশেষ কাউকে ভাড়া করে মন্ত্রী বানাতে হবে না। এরশাদের দলকে বিরোধী দল করা এবং সেই দলকেই আবার ক্ষমতাসীন দলে আসন দিতে হবে না।

স্বাভাবিকভাবেই এরপর প্রশ্ন আসে, তাহলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি’র কী হবে? জবাব দেই, বিএনপি-জামায়াত জোট একাদশ জাতীয় সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল হবে। তারা যদি অন্যান্য বারের মতো নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে ‘আমাদের বিজয় ছিনতাই করা হয়েছে’ বলে চেঁচামেচি শুরু না করে শান্তভাবে সংসদে এসে বসেন, তাহলে আওয়ামী জোট সরকারকে দেশ শাসনে শক্তিশালী বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু দেশে দ্বিদলীয় গণতন্ত্রের শুভ সূচনা হবে।

বন্ধুদের বলেছি, এটা আমার ধারণা, শক্তিশালী ধারণা, এ ধারণা সফল হওয়ার সম্ভাবনা ষোলোআনা। যদি না হয় তাহলে বুঝব আমার পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগেনি। আমার আরও ধারণা, ড. কামাল হোসেন এবার নির্বাচনে না দাঁড়িয়ে ভুল করেছেন। বেগম খালেদা জিয়ার তিনটি আসনের একটিতে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নামলে তিনি সম্ভবত এবার জয়ী হতে পারতেন এবং জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের নেতা হতেন। তা যদি হতো, তাহলে দেশের মানুষ আগামী সংসদে চাচা-ভাতিজির লড়াইটা দেখে মজা পেত।

এখন প্রশ্ন নির্বাচনে ড. কামাল অংশগ্রহণ না করায় বিরোধী দলের নেতা হবেন কে? কামাল হোসেন বলেছেন, ঐক্যফ্রন্টে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারাই সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন করবেন। কথাটা শুনতে ভালো। কিন্তু বাস্তবে কতটা কাজ দেবে প্রশ্ন সেটাই। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল যদি তার নেত্রীর বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত হন, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী সংসদে বিরোধী দলের নেতা হবেন। কিন্তু প্রশ্ন, খালেদা জিয়ার আসনে দাঁড়িয়েও তিনি সংসদে নির্বাচিত হতে পারবেন কি? ঐক্যফ্রন্টের কর্নেল (অব.) অলি, আ.স.ম. রব প্রমুখের সম্পর্কেও একই প্রশ্ন। এরা নির্বাচিত হলে ঐক্যফ্রন্টে নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে কোন্দল দেখা দেবে। ঐক্য ভেঙে যাবে। আর নির্বাচিত না হতে পারলে (রব, মান্না প্রমুখের জন্য সেই আশঙ্কাটাই বেশি) সংসদে বিএনপি, জামায়াত জোট তথা ঐক্যফ্রন্টের অবস্থা হবে মুণ্ডুকাটা মুরগির মতো। এই অবস্থাটা আশঙ্কা করেই আমার প্রার্থনা, ঐক্যফ্রন্টের মির্জা ফখরুল যেন অন্তত নির্বাচিত হন। বিএনপি হোক একাদশ সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল। গণতন্ত্র দ্বিপদ। ক্ষমতাসীন দলের পাশাপাশি শক্তিশালী বিরোধী দল সংসদে না থাকলে প্রকৃত গণতন্ত্র অচল।

বিএনপি এখন নেতৃত্বহীন এবং অসংগঠিত অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও আসন্ন নির্বাচনে শক্তিশালী বিরোধী দল গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা তারা পাবে। আমার এই ধারণার কারণ, অতীতে দেশ শাসনে খালেদা সরকার যতই নির্যাতন চালিয়ে থাকুক না কেন, বর্তমানে তিনি জেলে এবং নিজেই নির্যাতিত। সেজন্যে দেশে তার জন্য একটি “সিমপ্যাথি ভোট বক্স” তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী জোট সরকারের কিছু মন্ত্রী, এমপির নানা ধরনের অপকর্মে দেশে যে একটি “প্রোটেস্ট ভোট বক্স্ ” তৈরি হয়েছে, তার ভোট পাবে বিএনপি। তাতে এই নির্বাচনে বিএনপি’র জন্য একটা সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি হয়েই আছে।

বিএনপি নির্বাচনে আসায় সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি। বিএনপি নির্বাচনে না এলে জেনারেল এরশাদ তার লাঙ্গল-প্রতীক নিয়ে তিনশ আসনেই প্রার্থী দেবেন বলেছিলেন। বিএনপি নির্বাচনে আসায় সেই সুযোগটি তার নেই। এখন আওয়ামী মহাজোটে অবস্থান করে চরম দরকষাকষি করে যদি শেষ পর্যন্ত চল্লিশটির মতো আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পান সেটাই তার লাভ। কিন্তু এই কয়টি আসনেও তিনি তার প্রার্থীদের কি জয়ী করে আনতে পারবেন? আমার সন্দেহ আছে।

আওয়ামী লীগ জোটসঙ্গী হিসেবে অনেক আসনে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দিলেও বিএনপি-জোট তথা ঐক্যফ্রন্ট তাকে ছাড় দেবে কেন? রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর বিরাট জয় দেখে সাধারণ নির্বাচনে অনুরূপ জয়ের আশায় জিভ চেটে লাভ নেই। করপোরেশনের নির্বাচন এবং সাধারণ নির্বাচন সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। এরশাদ সাহেব যদি ভেবে থাকেন, জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচনে নিজেদের ভোট এবং আওয়ামী লীগের ভোট মিলিয়ে সহজেই জয়ী হবেন তাহলে ভুল করছেন। এবার জাতীয় পার্টিকে দেওয়া বহু নির্বাচন কেন্দ্রে ভোটদাতারা খুব ক্ষুব্ধ। এসব কেন্দ্র আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি। আওয়ামী লীগের যোগ্য ও ত্যাগী প্রার্থী রয়েছে। তাদের নমিনেশন না দেওয়ায় এলাকায় বিক্ষুব্ধ মানুষ অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। রাস্তায় নেমে মানববন্ধন করেছে। আমার আশঙ্কা, বহু এলাকার বিক্ষুব্ধ ভোটদাতারা জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থীকে, বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে থাকলে বিএনপির ধানের শীষে ভোট দেবে। অনেক আসনেই জাতীয় পার্টির পরাজয় হবে অনিবার্য। ভোটের ফসল যাবে বিএনপির ঘরে।

এবারের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অবস্থা দাঁড়াতে পারে বিলাতের লিবারেল ডেমোক্রাটিক পার্টির মতো। এই লিবারেল পার্টি ব্রিটেনে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় যেতে পারেনি। কিন্তু ব্রিটেনের রাজনীতিতে তার একটা শক্তিশালী অবস্থান ছিল। কিন্তু নিক ক্লেগের নেতৃত্বের সময় ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে নীতিহীন ভূমিকা গ্রহণ করে লিবারেল পার্টি সাময়িকভাবে লাভবান হয়েছিল, কিন্তু এখন ব্রিটিশ রাজনীতিতে সম্পূর্ণ ভরাডুবি ঘটেছে দলটির।

আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী মহাজোটের সম্ভাব্য জয়লাভ সত্ত্বেও যদি এরশাদ সাহেবের জাতীয় পার্টির এক ধরনের ভরাডুবি ঘটে, তাহলে বিস্মিত হব না। এমনিতেই দলটির ক্রেডিবিলিটি নেই। এরশাদ সাহেবের বহুরূপী চরিত্র এবং মনোনয়ন বাণিজ্যে অভিযুক্ত হওয়া ছাড়াও দলের সেক্রেটারি রুহুল আমিন হাওলাদারের নির্বাচন-প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যাওয়া এবং দলের সাধারণ সম্পাদকের পদও হারানো নির্বাচনের প্রাক্কালেই দলটির জন্য অশনিসংকেত দিয়েছে।

এই পার্টির তুলনায় আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জেপি, রাশেদ খান মেননের ওয়ার্কার্স পার্টির মতো ছোট অথচ দুর্নামমুক্ত দলগুলো, এমনকি ইসলামি দলগুলোও মহাজোটের শক্তি বৃদ্ধি করেছে এবং তার নির্বাচন বিজয়ের নিশ্চয়তা বাড়িয়েছে বলে মনে করি। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী মহাজোটের জয় এবং সংসদে বিএনপি জোটের শক্তিশালী অবস্থান দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যেক নিরাপত্তা দেবে বলে আমার বিশ্বাস। আমার একটা আশঙ্কা, বিএনপি’র ছত্রছায়ায় মানবতার চিহ্নিত শত্রু জামায়াতিরা যেন আগামী সংসদে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না পায়।

বিএনপি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। এই দল জামায়াতের প্রভাব এবং তারেক রহমানের নেতৃত্ব থেকে মুক্ত হলে একটি স্বৈরাচারী ও স্বাধীনতার মূলনীতি-বিরোধী দলের চরিত্র থেকে বেরিয়ে এসে দেশের অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক কাঠামো মজবুত করার কাজে সহায়তা জোগাতে পারবে এবং দেশে দ্বিদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতি সকল হুমকি থেকে মুক্ত হবে। দেশের বামপন্থি রাজনীতি এখন নির্বীর্য। কয়েকটি বামদল আওয়ামী মহাজোটে আছে। সিপিবি-বাসদ আলাদা জোট গঠন করেছে। এবারের নির্বাচনে এটাও প্রমাণিত হবে দেশের বামপন্থি রাজনীতি এতদিনের বামদশা থেকে মুক্ত হয়ে কিছুটা শক্তি অর্জন করবে কিনা। দেশের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র রক্ষার জন্য বামদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া ও শক্তিশালী হওয়া একান্ত আবশ্যক।

১৯৭০ সালের মতো দেশ একটা বড় ক্রাইসিস পিরিয়ড পার হচ্ছে। ’৭০-এর নির্বাচনের মতো এবারের নির্বাচনের উপরেও নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যত্। সত্তরে সংগ্রামের অগ্রদূত ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সমাজ ঐক্যবদ্ধ ছিল। এবারে সেই ঐক্য নেই। এখানেই দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তির জন্য একটা বড় ভয়। দেশের মানুষকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ রাখা গেলে আওয়ামী লীগ মহাজোটের পক্ষে দেশের প্রগতিশীল রাজনীতি ও উন্নয়নের অর্থনীতির গতি ধরে রাখা সম্ভব হবে। সেজন্যেই আশা করছি, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এবারের নির্বাচনেও সকল ঝঞ্ঝা অতিক্রম করে আওয়ামী লীগের নৌকা তীরে গিয়ে পৌঁছবে।

সব কথার শেষ কথা, বিএনপি-জামায়াত তথা ঐক্যফ্রন্ট কেন আসন্ন নির্বাচনে জয়ী হবে না, সে সম্পর্কে আমার আশা ও বিশ্বাসের কারণ, মনীষীরা বলেছেন, যে যুদ্ধে স্বয়ং সেনাপতি প্রথমেই রণাঙ্গন থেকে পলায়ন করেন, তার সেনাদল কখনো জয়ী হতে পারে না। এখন বহু তোড়জোড় করে ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর সেনাপতিই যেখানে রণাঙ্গন থেকে পালিয়েছেন, তার বাহিনী কী করে যুদ্ধে জয়ী হবেন? তিনি ঘরে বসে হুঙ্কার দিচ্ছেন। তার স্তাবকেরা তাকে মালয়েশিয়ার মাহাথিরের সঙ্গে তুলনা করছেন। এটা কী ঠাট্টা, না তামাশা? – ইত্তেফাক

[ লণ্ডন ডিসেম্বর, ২০১৮ ]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment