কালান্তরের কড়চা

নির্বাচনী রাজনীতি এবং এরশাদ সাহেবের অসুস্থতা

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

প্রাচীন যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত বিশ্বের ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাই প্রত্যেক রাজা এবং সম্রাটের দরবারে একজন বিদূষক রয়েছেন—যিনি নানারকম কৌতুকময় কথা বলে বা কাজ করে রাজা ও রাজদরবারকে অবসরকালীন আনন্দ দান করতেন। সেই প্রাচীন যুগে রাজা বিক্রমাদিত্যের দরবারে একজন গোপাল ভাঁড় ছিলেন। যার কৌতুক কাহিনি বর্তমান আধুনিক যুগেও বাংলাদেশে ছেলে-বুড়োর মধ্যে জনপ্রিয়। মধ্যযুগে মোগল সম্রাট আকবরের দরবারে ছিলেন বীরবল। এই বীরবলের গল্প এখন পর্যন্ত সারা উপমহাদেশে বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয়।

আধুনিক যুগের সূচনা পর্বেও রাজদরবারে যে বিদূষক ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় নবাব সিরাজউদ্দৌলার দরবারে গোলাম হোসেনের উপস্থিতিতে। ডি এল রায়ের শাহজাহান নাটকেও দেখা যায় একজন বিদূষকের সরব ভূমিকা। অবশ্য এই শেষোক্ত দুজন বিদূষকের চরিত্র বাস্তব না কাল্পনিক তা আমার জানা নেই। ইউরোপের রাজদরবারেও যে অতীতে বিদূষক ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় শেকসপিয়ার, ইবসেন প্রমুখের নাটকে।

বর্তমান আধুনিক যুগেও যে বিদূষকরা গতায়ু হয়েছেন তা নয়। তবে তাঁদের অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে। এখন রাজদরবারে নয়, রাজা এবং শাসকদের মধ্যেই আবির্ভাব ঘটে ভাঁড় ও বিদূষকের। সাদ্দাম হোসেনের আমলে ইরাকি শাসককুলের অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যক্তি কমিক আলির নাম এখন কে না জানে? কমিক আলি নামের পেছনে তাঁর আসল নাম ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। এ যুগে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর রিপাবলিকান দলেরই এক সিনেটর প্রকাশ্যেই কপাল চাপড়ে বলেছিলেন, ইংরেজি থেকে বাংলায় তা তরজমা করলে দাঁড়ায়—‘ওহ্ গড, আমরা তোমার কাছে চেয়েছিলাম একজন সুশাসক, তুমি তার বদলে এক মিথ্যাবাদী ভাঁড়কে আমাদের মাথায় চাপিয়ে দিলে!’

ট্রাম্পের তুলনা ট্রাম্পই। তাঁর সঙ্গে অন্য কারো তুলনা করা চলে না। করতে চাইলে বাংলাদেশের জাতীয় পার্টির নেতা জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে হয়তো করা যেত। তাঁর নাম করা যেত টিনপট ট্রাম্প। ট্রাম্পের মতো বিশাল ক্ষমতা ও আধিপত্য তাঁর নেই, কিন্তু কয়েকটি বিষয়ে তাঁদের মধ্যে চরিত্রগত মিল বিস্ময়কর। অসত্য কথা বলা, মুহূর্তে ভোল পাল্টানো, কাজে ও কথায় ভাঁড়ামি এবং নারীপ্রীতি। ট্রাম্প ও এরশাদ দুজনেরই কোনো চক্ষুলজ্জা নেই।

এরশাদ সাহেব যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, তখন তাঁর চরিত্রের চক্ষুলজ্জাহীনতার দিকটাই শিল্পী কামরুল হাসানের চোখে বেশি পড়েছিল। তিনি এরশাদ সাহেবের ওপর একটা কার্টুন এঁকে তার ক্যাপশন দিয়েছিলেন ‘বিশ্ব বেহায়া।’ এই কার্টুনটি নিয়ে শুধু বাংলাদেশে নয়, বাংলাদেশের বাইরেও হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। কামরুল হাসান মারা গেছেন এবং এরশাদ সাহেবও বিশ্ব বেহায়া খেতাবের স্বত্বটি হারিয়ে ফেলেছেন। এই খেতাব এখন চলে গেছে বিশ্বের একটি সুপারপাওয়ারের নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে।

আমাদের সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এখন খেতাবহীন, রাষ্ট্রক্ষমতাহীন এবং তিনি যে পার্টির নেতা, সেই দলেরও সর্বময় কর্তৃত্বে তিনি নেই। প্রমাণিত হয়েছে তাঁর স্ত্রী রওশন এরশাদ স্বামীর চেয়ে রাজনীতিতে অনেক বেশি বিচক্ষণ এবং জাতীয় পার্টির একটা বড় অংশ তাঁর প্রতি অনুগত। এসব সত্ত্বেও এরশাদ সাহেব যে দেশের রাজনীতিতে এখনো টিকে আছেন তার বড় কারণ, দেশের দুটি বড় দলের মধ্যে অস্বাভাবিক লড়াই। এই লড়াইয়ের চমৎকার সুযোগ তিনি নিচ্ছেন। দুই দলই তাঁর অপরাধ ভুলে তাঁকে নিজ নিজ দলে টানাটানি করছেন। ফলে এরশাদ সাহেব ক্ষমতা হারানোর পর জনরোষ এড়াতে পেরেছেন। জেলজীবন সংক্ষিপ্ত করতে পেরেছেন। দলের নেতৃত্ব ধরে রাখতে পেরেছেন। জেলে বসে সংসদ সদস্য হতে পেরেছেন। বড় সমস্যা দেখা দিলে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আশ্রয় নিতে পারছেন, এক কথায় বাংলাদেশের রাজনীতির পিটার প্যান তিনি।

তবু বাংলাদেশের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক মহলের বড় অংশটি এরশাদ সাহেবের অতীতের গুরুতর অপরাধগুলো ভুলে গিয়ে আওয়ামী মহাজোটে তাঁর অবস্থান এ জন্য মেনে নিয়েছে যে কয়েক বছর কারাবাসের পর তিনি হয়তো সংশোধিত হয়েছেন। বিএনপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হয়েও বাংলাদেশে মৌলবাদী অভ্যুত্থানের চরম আশঙ্কার সময়ে তিনি নিজের স্বার্থে হলেও সেক্যুলার গণতান্ত্রিক শিবিরে যোগ দিয়েছেন এবং হিংস্র মৌলবাদীদের নির্বাচন বিজয় ঠেকাতে সাহায্য করেছেন। এটা একটা বড় কথা। এই কথাটাকেই সবাই গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর স্বৈরাচারী অতীত নিয়ে টানাটানি করেননি।

কিন্তু মেঘ দেখলেই যেমন ভেক ডাকে, তেমনি নির্বাচন এলেই এরশাদ সাহেব জনগণকে দেওয়া তাঁর অঙ্গীকারের কোনো তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক বহুরূপী সেজে দুই জোটের মধ্যে সাপুড়ের বাঁশি বাজাতে শুরু করেন। জোটের সঙ্গে আসন বণ্টনের দর-কষাকষি এবং মনোনয়ন বাণিজ্য থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামানোর অভিযোগ এবারও তাঁর এবং তাঁর সদ্য বিদায়ী দলের সম্পাদক রুহুল আমিন হাওলাদারের বিরুদ্ধে উঠেছে। তিনি গতবারের মতো এবারও হাসপাতাল-আশ্রিত হয়েছেন। তাঁর দলের সাময়িক হেডকোয়ার্টার এখন হাসপাতাল। তাঁর রাজনৈতিক বাণিজ্যেরও অস্থায়ী প্রধান কেন্দ্র এখন হাসপাতাল।

গতবারের সাধারণ নির্বাচনের সময় তিনি যেমন অসুস্থ হয়েছিলেন, এবারও তেমনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। গতবারও অভিযোগ উঠেছিল তিনি চিকিৎসার নামে বিদেশে যাচ্ছেন তারেক রহমানের সঙ্গে রাজনৈতিক ডিল করে কয়েক কোটি টাকা পাওয়ার জন্য। এবারও তেমনি অসুস্থতার ধুয়া তুলে সিঙ্গাপুরে যেতে চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে, তিনি সিঙ্গাপুরে যেতে চান তারেক রহমানের সঙ্গে একটা রাজনৈতিক ডিল করা এবং আর্থিক লাভের জন্য। ডিলটি সফল হলে তিনি জোট পরিবর্তনের ঘোষণা দেবেন।

এই অভিযোগ বা গুজবটি সঠিক বলে আমি মনে করছি না। কিন্তু অনেকে যে সঠিক মনে করছেন, তার কারণ, নিজেকে অসুস্থ বলে এরশাদের ঘোষণা এবং তাঁকে চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি করা। কিন্তু কারা তাঁকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে দিচ্ছে না—সরকার, না তাঁর নিজের দল, সে কথাটি মুখ ফুটে বলছেন না, অন্তত এখন পর্যন্ত আমার জানা মতে বলেননি। গত নির্বাচনের সময়ও তিনি এই খেলা খেলেছেন এবং তাঁকে দেশের হাসপাতালেই রাখা হয়েছিল।

এরশাদ সাহেব বলছেন এক কথা, তাঁর দলের কোনো কোনো শীর্ষ নেতা বলছেন আরেক কথা। এরশাদ সাহেবের অসুস্থতার কথা প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রুহুল আমিন হাওলাদার (তখন মহাসচিব ছিলেন) বলেছেন, তাঁর নেতার অসুস্থতা এমন কিছু নয়। তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন।  আরেক নেতা বলেন, তাঁর যে অসুস্থতা, দেশেই তাঁর চিকিৎসা সম্ভব। আমার ধারণা, এরশাদ সাহেব সত্যি সত্যিই অসুস্থ হলেও যদি দেশে থাকেন এবং বার্ধক্যজনিত এই রোগের চিকিৎসা দেশেই করান, তাহলে তাঁর সম্পর্কে প্রচারিত গুজবগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হবে। আওয়ামী মহাজোটে জাতীয় পর্টির অবস্থান নিশ্চিত হবে এবং বিএনপি-জামায়াত শিবির দেশবাসীর মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির কোনো সুযোগ পাবে না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অসুস্থতা এখন একটি ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারেক রহমান এক-এগারোর সময় যখন জেলে, তখন খবর ছড়ানো হলো কয়েকজন সেনা কর্তার হাতে মার খেয়ে তাঁর হাড়গোড় ভেঙে গেছে। তিনি গুরুতর অসুস্থ। এর পর তিনি আর রাজনীতি করবেন না। এই মর্মে আধা সামরিক সরকারকে মুচলেকা দিয়ে চিকিৎসার জন্য জামিন নিয়ে লন্ডনে চলে যান। গত ১০ বছরেও দেশে ফেরেননি। আদালত তাঁকে একটি মামলায়ই ১০ বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন। দেশে থাকলে এক-এগারো সরকারের আমলেই তাঁকে এই দণ্ড পেতে এবং ভোগ করতে হতো।

১০ বছরেও লন্ডনের মতো উন্নত চিকিৎসার দেশে তাঁর রোগমুক্তি ঘটেনি এবং প্যারলে মুক্তির বিধিবিধান লঙ্ঘন করে লন্ডনেই পড়ে আছেন। লন্ডনের বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি বলেছেন, তিনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। কিন্তু রাস্তাঘাটে বাংলাদেশি দেখলেই তিনি খুঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করেন। তারেক মাতা খালেদা জিয়াও দুর্নীতির মামলায় জেলে যাওয়ার সাত দিন না যেতেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর পছন্দের হাসপাতাল ছাড়া তিনি চিকিৎসা নেবেন না বলেছিলেন। বিএনপির নেতারা তাঁর গুরুতর অসুস্থতার কথা বলে কান্না শুরু করেছিলেন। এখন দেখা যাচ্ছে, জেলগমনের কয়েক মাস পরও দেশের চিকিৎসাতেই দেশনেত্রীর অসুস্থতা সেরে গেছে। যেটুকু আছে সেটুকু বয়সের জন্য।

রাজনৈতিক অসুস্থতা এখন দেশের এক শ্রেণির নেতার মধ্যে ক্রনিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন ফ্রন্টের নেতৃত্ব নিয়ে নেপথ্যের গণ্ডগোলের সময় প্রাথমিক এক অনুষ্ঠানে হাঁটুর বাতের ব্যথায় আসতে পারেননি। ডা. বদরুদ্দোজা ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে তাঁকে না রাখার জন্য বিএনপির ষড়যন্ত্রের সময় ‘হঠাৎ অসুস্থ হয়ে’ ফ্রন্টের কর্মসূচি ঘোষণার গুরুত্বপূর্ণ সভায়ই আসতে পারেননি। অতঃপর ফ্রন্টের সভায় তাঁর আসা আর হয়নি। সেটাই তাঁর অগস্ত্য যাত্রা।

বাংলাদেশে এই রাজনৈতিক অসুস্থতা বা রোগ অনেকটা সংক্রমণের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি ও বজায় রাখার জন্য এই রোগটি থেকে জাতীয় রাজনীতিকে মুক্ত করা প্রয়োজন। নইলে কোনো রাজনৈতিক নেতা সত্যি সত্যি রোগাক্রান্ত হলেও মানুষ ভাববে এটা রাজনৈতিক রোগ এবং দেশের রাজনীতি ক্রেডিবিলিটি হারাবে। সে যাই হোক, আমি সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের যদি রাজনৈতিক রোগও হয়ে থাকে, তার আশু রোগমুক্তি কামনা করি। প্রার্থনা করি তাঁর প্রেমিক জীবনের যেমন অবসান হয়নি, রাজনৈতিক জীবনের যেন অবসান না হয়। – কালের কন্ঠ

লন্ডন, রবিবার, ৯ ডিসেম্বর ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment