দশ দিগন্তে

আজ জাতির ভাগ্য নির্ধারণের দিন

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

 

আজ রবিবার। ত্রিশে ডিসেম্বর। সাল ২০১৮। বাংলাদেশের মানুষের জন্য আরেকটি ভাগ্য নির্ধারণের দিন। এই ভাগ্য নির্ধারণ কোনো দৈবশক্তি করবে না। করবে বাংলাদেশের মানুষ। ভোটার তালিকায় যাদের নাম, তারা এখন হয়ত তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোটদানের জন্য লাইনে অপেক্ষা করছেন অথবা ভোট কেন্দ্র খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের ভোটটি দিয়ে ফেলেছেন। এটা ব্যালট যুদ্ধ। ১৯৭০ সালে এই যুদ্ধে জয়লাভের ফলেই আওয়ামী লীগের পক্ষে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব গ্রহণ ও জয়লাভ সম্ভব হয়েছিল।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর গত প্রায় পাঁচ দশকে দেশের অবস্থা সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। দেশের জনসংখ্যা ৭ কোটি থেকে ১৬ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। কৃষি অর্থনীতি নির্ভর দেশটি আধা শিল্প নির্ভর দেশে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকলে শীঘ্রই দেশটি পুরোপুরি উন্নত দেশ নয়, উন্নত দেশগুলোর কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছবে। দেশটির প্রবৃদ্ধির হার ব্রিটেন এবং ভারতের চাইতেও বেশি। তার অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত। মন্দা, দুর্ভিক্ষ দূর হয়েছে, গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নতি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অশিক্ষিত ও দরিদ্র— এই শব্দদু’টি বাংলাদেশে এখন প্রায় অনুপস্থিত। দেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণ প্রায় সমাপ্তির পথে।

সারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শেখ হাসিনা এখন একজন গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী। বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চেও বাংলাদেশ এখন প্রভাবশালী দেশ। দেশটির রাজনীতি অনেকটাই স্থিতিশীল। ব্রিটেনে কনজারভেটিভ পার্টি ক্ষমতায় এলেই সাম্প্রদায়িক ও হিংস্র বর্ণবাদী চক্রগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে, বাংলাদেশে তেমনই বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলেই সাম্প্রদায়িক ও হিংস্র মৌলবাদী চক্রগুলো প্রশ্রয় পায়। তারা সন্ত্রাস শুরু করে। হাসিনা সরকারের আমলে এই সন্ত্রাস বারো আনা দূর করা হয়েছে।

এ সবই সম্ভব হয়েছে গত দু’দফা আওয়ামী লীগ একটানা ক্ষমতায় থাকার ফলে। যদি আজকের সাধারণ নির্বাচনেও আওয়ামী মহাজোট জয়ী হয়, তাহলে দেশ রাতারাতি সোনায় মণ্ডিত হবে এমন কথা বলি না। রাতারাতি দুর্নীতি, অপশাসন দূর হবে তাও বলি না। যা হবে তা হলো— বর্তমানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে, আরও দ্রুতগতি পাবে। সংবিধানে ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অসাম্প্রদায়িকতা দৃঢ়মূল হবে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ রক্ষা পাবে। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে যে ধারাবাহিকতা দূর করা এখনো সম্ভব হয়নি, হাসিনা সরকার এবারেও ক্ষমতায় এলে দারিদ্র্য দূর করার পর দুর্নীতি ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করার সুযোগ পাবেন।

শেখ হাসিনা দুই দফা একটানা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিশালী চক্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাস দমন, তলাবিহীন অর্থনৈতিক ঝুড়ি মেরামত এবং তার বিস্ময়কর উন্নয়নের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। দেশটিকে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠা দান করেছেন। আজকের নির্বাচনে তার জোট জয়ী হলে তার পরবর্তী কর্মসূচি হবে সমাজ দেহ থেকে দুর্নীতির মূলোৎপাটন এবং নব্য ধনীদের শোষণ থেকে জাতিকে মুক্ত করা। এজন্য তার দলকেও কঠোর হাতে সংশোধন ও সংস্কার করতে হবে। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র বিরোধীদের একটার পর একটা চক্রান্ত থেকে দেশকে মুক্ত করার পর শেখ হাসিনা যে দলের ভেতরের শত্রুদের (enemy within) দমনের জন্য কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করবেন তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

আজকের নির্বাচনে যদি নৌকা জয়ী না হয় দেশের মানুষের ভাগ্যে যে সর্বনাশ ঘনিয়ে আসবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে উচ্ছেদ করে যে ধর্মান্ধ ফ্যাসিবাদ দেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে— তা বিএনপি-জামায়াতের আগেকার শাসনামলের ইতিহাসকেও ম্লান করে দেবে। আমার বিশ্বাস, বাংলার মানুষ এ ভুলটি এবারেও করবে না। দেশ-বিদেশের পর্যবেক্ষকদেরও তা-ই ধারণা। শনিবারের (২৯ ডিসেম্বর) ‘গার্ডিয়ানে’ বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পর্কে খবরের হেডিং দেওয়া হয়েছে ‘Bangladesh poised to re-elect P.M’ (বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীকে পুনর্নির্বাচিত করার পথে)।

এই জয় ঠেকাবার জন্য কম ষড়যন্ত্র, কম চক্রান্ত হয়নি। এই চক্রান্ত সফল হওয়ার অর্থ বাংলাদেশে কোনো বিকল্প গণতান্ত্রিক শাসন নয়, বিএনপি-জামায়াতের মধ্যযুগীয় আধা তালেবানি শাসন ফিরে আসা। ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপি-জামায়াত জোটের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন এখন স্বীকার করছেন বিএনপি যে জামায়াতিদের ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সুযোগ দেবে— এটা জানা থাকলে তিনি ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব গ্রহণ করতেন না। এটা কি আত্মোপলব্ধি, না তার ইচ্ছাকৃত রাজনৈতিক পদস্খলন সম্পর্কে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা? আমার ধারণা, এটা তার বিলম্বিত আত্মোপলব্ধি নয়, তার ফ্রন্টের অনিবার্য পরাজয়ের সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়ে নিজের ভূমিকার সাফাই নিজে গাওয়া। তিনি যখন তার রাজনৈতিক মিত্র ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে তার অজান্তে পরিত্যাগ করে তথাকথিত ঐক্যফ্রন্টের নেতা হন, তখন অনেকেই তাকে সাবধান করেছিলেন (একজন কলামিস্ট হিসেবে আমি তো বার বার করেছি), বিএনপি ও তারেক রহমান তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য তাকে ব্যবহার করবে। কাজ ফুরোবার আগে তাকে কলার খোসার মতো ত্যাগ করবে।

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কাজ ফুরোবার আগেই বিএনপি তাকে কলা দেখাচ্ছে। জামায়াতিদের সংশ্রব ত্যাগ করা দূরের কথা— তাদের ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করায় মনোনয়ন দিয়েছে এবং এখন এটা সর্বজনবিদিত যে নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট জয়ী হলে (যে সম্ভাবনা নেই) ড. কামাল নয়, সরকার গঠন করবে বিএনপি’র কোনো নেতা বা পরবর্তী ধাপে তারেক রহমান। হাসিনা-বিদ্বেষী মনোভাব থেকে তার শত্রু শিবিরে যোগ দিয়ে তিনি ক্ষমতায় যেতে পারবেন না। কারণ, তিনি নির্বাচনে দাঁড়াননি। যে তারেক রহমানকে তিনি ঘৃণা করেন, তারই ক্ষমতায় যাওয়ার পথ প্রশস্ত করতে চাইছেন। এটা তিনি গোড়া থেকেই জানেন, এখন সাফাই গাইলে চলবে না।

ড. কামাল হোসেন তার রাজনৈতিক জীবনের চরম ভুলটি করলেও দেশবাসী সেই ভুলটি করবে না। আজকের নির্বাচনেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। আজকের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মহাজোট ভূমিধস বিজয় পাবে না। কিন্তু সরকার গঠনের মতো কমফোর্টেবল মেজরিটি পাবে। বিএনপি শক্তিশালী অবস্থানে আসবে এবং সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল গঠন করার সুযোগ পাবে। এটা দেশে সুস্থ দ্বিদলীয় গণতন্ত্রের জন্য আবশ্যক। আমার ধারণা, সংসদীয় দলে ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব নিয়ে মারাত্মক বিবাদ দেখা না দিলে বিএনপি সংসদে একটি কার্যকর বিরোধী দল গড়ে তুলতে পারবে। এমনকি বিএনপিতে নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটতে পারে।

আমার পর্যবেক্ষণ যদি সঠিক হয়, তাহলে আওয়ামী মহাজোটে অবস্থান করেও জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টির একাদশ সংসদে অবস্থান খুব আশাপ্রদ হবে না। তার বার্গেইনের ক্ষমতা কমবে। তিনি অসুস্থ। একই অবস্থা ড. কামালেরও। হয়ত ভোল বদলকারী এই দুই বয়স্ক নেতারই এই নির্বাচনের পর রাজনীতি থেকে মহাপ্রস্থানের ঘণ্টা বেজে উঠবে। কথাটা একটু নির্দয় শোনালেও বলব, এটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা বড় রকমের সুস্থতা আনবে।

এই নির্বাচনের পর পরাজিত পক্ষ যে দামামা বাজাবে এই নির্বাচন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হয়নি, তা ধোপে টিকবে না। ভারতের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনগুলোতে কী হচ্ছে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন নির্বাচনে যে ব্যাপক হিংসাত্মক ঘটনা ঘটছে, তার তুলনায় শেখ হাসিনাকে অনেকেই এই বলে অভিনন্দন জানাবেন যে, তিনি তার দেশে এত বাধা-বিপত্তি ও চক্রান্তের মুখেও তুলনামূলক শান্ত ও স্বাভাবিক পরিবেশে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পেরেছেন। নির্বাচনী হাঙ্গামায় এ পর্যন্ত যে দু’ব্যক্তি মারা গেছেন, তারাও আওয়ামী লীগের লোক।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভুগেছে। সন্ত্রাস, দুর্নীতি দেশটাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে তার লাগাম টেনে ধরতে পেরেছেন, তাকে নির্মূল করতে পারেননি। এই নির্মূল করার কাজে আরও এক টার্ম তাকে ক্ষমতায় থাকতে দেওয়া দরকার। ব্রিটেনে টোরি প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার এবং লেবার প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার দু’জনেই দেশকে নতুনভাবে গড়ার কাজে তিন দফা ক্ষমতায় থাকার দাবি জানিয়েছিলেন। ব্রিটেনের মানুষ দু’জনকেই একটানা তিনদফা ক্ষমতায় থাকতে দিয়েছিলেন। একটি সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার কাজে বাংলার মানুষ শেখ হাসিনাকেও পরপর তিনদফা ক্ষমতায় থাকতে দিবেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

আজ রবিবার ৩০ ডিসেম্বর। নতুন ইংরেজি বছর শুরুর সূচনায় বাংলাদেশে নৌকার জয় এবং গগনভেদী জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু এবং জয় হাসিনা শ্লোগান শুনব— এটা দেশপ্রেমিক সকল মানুষের সঙ্গে আমারও একান্ত প্রার্থনা। – ইত্তেফাক

[ লন্ডন, ২৯ ডিসেম্বর, শনিবার, ২০১৮ ]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment