দশ দিগন্তে

মন্ত্রিসভায় নতুন ও পুরাতনের যোগ-বিয়োগের তাত্পর্য

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

 

এবারের নির্বাচন দেশবাসীকে তিনটি সারপ্রাইজ দিয়েছে। এক. কেউ ভাবেনি, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয়ের অধিকারী হবে এবং বিএনপি শক্তিশালী জোট গঠন করেও এমনভাবে বিলুপ্তির পথে যাবে। দুই. নতুন মন্ত্রিসভায় ৩৬ জন পুরনো ও অভিজ্ঞ মন্ত্রীর বাদ পড়া। তিন নম্বর সারপ্রাইজটি ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য। আমি কখনোই ভাবিনি যে, কয়েকজন দক্ষ ও সফল মন্ত্রীও নতুন মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হবেন না।

শেখ হাসিনার নতুন মন্ত্রিসভায় যোগ-বিয়োগের এই ফল কী দাঁড়াবে জানি না। এর আগের বারেও মন্ত্রিসভা গঠনে এই ধরনের একটি সারপ্রাইজ হাসিনা দিয়েছিলেন। তোফায়েল, আমু প্রমুখ প্রবীণ নেতার কাউকে মন্ত্রিসভাতে নেননি। এমনকি মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেননকেও নেননি। পরে মেনন ও তোফায়েলকে তিনি মন্ত্রী হওয়ার অফার দেন। তারা গোসা করে তা প্রত্যাখ্যান করেন। কিছুদিন পর আবার অফার গ্রহণ করে মন্ত্রী হন।

এবার নির্বাচনেও তারা জিতেছেন, সুতরাং আমির হোসেন আমুসহ এরা সকলেই নতুন মন্ত্রিসভাতে থেকে যাবেন এমনটা মনে করা হয়েছিল। এমন যে খণ্ডিত জাসদের হাসানুল হক ইনু, যিনি তথ্যমন্ত্রী হিসেবে উঠতে বসতে খালেদা জিয়ার বাপান্ত করে ছাড়তেন, তিনিও মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। ভবিষ্যতে তারা আবার মন্ত্রিসভায় স্থান পাবেন কিনা আমি জানি না। তবে এটা নতুন মন্ত্রীদের জন্যও শক থেরাপির কাজ করবে। দপ্তর পরিচালনায় দ্রুত অভিজ্ঞতা অর্জন, যোগ্যতা প্রদর্শন এবং কথায় নয় কাজে প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করতে না পারলে তারাও সহসা ঝরাপাতা হয়ে যেতে পারেন।

আমি আওয়ামী লীগে এবং আওয়ামী সরকারে একটা বড় ধরনের রদবদল আশা করেছিলাম। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে অভিযুক্ত আগের সংসদের আওয়ামী লীগ সাংসদদের অন্তত পঞ্চাশ ভাগ নমিনেশন বঞ্চিত হবে আশা করেছিলাম। তা হয়নি। কিন্তু মন্ত্রিসভায় ঢালাওভাবে অধিকাংশ পুরনো মন্ত্রী বাদ পড়েছেন।

এটা দেশবাসীকে নিশ্চয়ই খুশি করেছে যে, এই সরকারে ব্যাপকভাবে নতুন রক্তের সঞ্চালন করা হয়েছে। ব্রিটেনে টোরি সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের পদত্যাগ করার সময় দলের ঝুনো নেতাদের বাদ দিয়ে জুনিয়র ও অনভিজ্ঞ মন্ত্রী জন মেজরকে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রোমোট করায় দলের অনেকেই হায় হায় করে উঠেছিলেন। কিন্তু জন মেজর একে একে অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে এবং শেষ পর্যন্ত প্রথমে মনোনীত এবং পরে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হয়ে তার দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও কারো যোগ্যতা বিচারের অসাধারণ বিচক্ষণতা রয়েছে। তিনি যখন ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিরাটভাবে জিতে ডা. দীপুমনির মতো একজন জুনিয়র ও প্রায় অপরিচিত মহিলাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেন তখন আমি শঙ্কিত হয়েছিলাম এবং সেই শঙ্কা আমার লেখায় প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু দীপুমনি প্রমাণ করেছিলেন তার দক্ষতা।

পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক ও ড. ইউনূসের চক্রান্ত মোকাবিলায় শেখ হাসিনার সাহস ও দূরদর্শিতার পাশাপাশি দীপুমনির ভূমিকাও আমি দেখেছি। আমার বলতে দ্বিধা নেই অর্থমন্ত্রী হিসেবে মুহিত ভাই এবং প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বিশ্বব্যাংককে মোকাবিলায় “দুর্বলতা” না দেখালে পদ্মাসেতুর বারো আনা এতদিনে হয়ে যেত। এই ব্যাপারে শেখ হাসিনার সাহস ও দূরদর্শিতার কোনো তুলনা হয় না।

পরবর্তীকালে আমার সহপাঠী বন্ধু রফিকুল্লা চৌধুরীর মেয়ে এবং রাজনীতিতে নবাগত শিরিন শারমিন চৌধুরীকে সরাসরি জাতীয় সংসদের স্পিকার পদে মনোনীত করায় আমি রীতিমতো আতঙ্কিত হয়েছিলাম। কিন্তু প্রমাণিত হয়েছে, আমার ধারণা ভুল ছিল। শিরিন জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে বিস্ময়কর দক্ষতার পরিচয় দেখিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছেন।

এজন্যে এবারে মন্ত্রিসভায় নবাগতদের অন্তর্ভুক্তি আমাকে শঙ্কিত করেনি। বরং আনন্দিত করেছে। দীপুমনি ও শিরিনের মতো নতুন প্রতিভা এই মন্ত্রিসভা থেকে আরও বেরিয়ে আসবে বলে আমার বিশ্বাস। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে আবদুল মোনেমের মতো একেবারেই নতুন মুখের নিয়োগ মন্ত্রকের দক্ষতা বাড়াবে। নিউইয়র্কে বাংলাদেশের একজন নতুন কূটনীতিক হিসেবে তিনি অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। শেখ হাসিনা একজন নতুন ও অনভিজ্ঞ রাজনীতিককে উপরে টেনে তুলে অভিজ্ঞ ও দক্ষ নেতা ও মন্ত্রী হিসেবে রূপান্তরিত করতে পারেন, তার প্রমাণ সদ্যপ্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

নতুন মন্ত্রিসভায় নতুন নতুন মুখ দেখে আমি খুশি। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদেও এই ধরনের রদবদল দেখলে খুশি হতাম। বিশেষ করে আমার একান্ত প্রত্যাশা ছিল, মন্ত্রিসভায় না হোক উপদেষ্টা পরিষদে ড. ফরাসউদ্দীন অথবা ড. আতিউর রহমানের মতো অর্থনীতি সংক্রান্ত নতুন চিন্তাভাবনার মানুষের দেখা পাব। প্রধানমন্ত্রী তাদের যোগ্যতার কথা জানেন। সুতরাং ভবিষ্যতে দেশ গঠনের উন্নয়নমূলক কাজে তাদের মেধা ও অভিজ্ঞতাকে তিনি কাজে লাগাবেন বলে আমার বিশ্বাস।

বর্তমান মন্ত্রিসভায় কর্মদক্ষতার সঙ্গে অভিজ্ঞতা ও ম্যাচুয়িরিটির যোগ ঘটানোর জন্য সাবেক মন্ত্রীদের মধ্য থেকে দু’একজনকে রাখা হলে ভালো ছিল। এটা দরকার ছিল এই মন্ত্রিসভাকে দলীয় মন্ত্রিসভার ছাপমুক্ত রাখার জন্য। দেশের ভেতরের ও বাইরের ষড়যন্ত্র থেকে গণতান্ত্রিক ঐক্যকে রক্ষার প্রয়োজন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বরং বেড়েছে। এই ঐক্যের প্রতিফলন বর্তমান মন্ত্রিসভাতেও থাকা উচিত। এটা আমার মতো একজন গরিবের পরামর্শ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে মোস্তফা কামাল লোটাসের নিযুক্তি আমার কাছে তাত্পর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। তিনি একজন শীর্ষ ব্যবসায়ী এবং গত সরকারেও মন্ত্রী হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি যে অর্থমন্ত্রী হবেন এটা আগে থেকেই বাজারে প্রচলিত গুজব ছিল। কয়েকমাস আগে ঢাকায় ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ কাগজটির লন্ডন এডিশন প্রকাশের জন্য জাঁকজমকপূর্ণ একটি অনুষ্ঠান হয়। তাতে লোটাস কামাল উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট বাংলাদেশিদের মধ্যে গুঞ্জন চলছিল। কামাল বাংলাদেশের ভাবী অর্থমন্ত্রী।

গুজবটি সত্যে পরিণত হয়েছে। লোটাস কামালের আগে হাসিনা সরকারের দুই অর্থমন্ত্রী ছিলেন সাবেক ব্যুরোক্রাট। শাহ কিবরিয়া এবং আবদুল মুহিত। মোস্তফা কামাল লোটাস অর্থমন্ত্রী হওয়াতে দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ভার চলে গেল ব্যুরোক্রাটদের হাত থেকে ব্যবসায়ীদের হাতে। তাতে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বব্যাংকের প্রভাবমুক্ত হয়ে আরও গতিশীল হতে পারে। তবে এটা নির্ভর করে নয়া অর্থমন্ত্রী একশ্রেণির নব্য ধনীর কবল থেকে যদি নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেন।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাংক তথা আমেরিকার একাধিপত্য থাকা সম্পর্কে আশির এবং নব্বইয়ের দশকেও বলা হতো অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাছাই করে দেয় নেপথ্যে বসে বিশ্ব ব্যাংক। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা শুধু এই মিথটি মিথ্যা প্রমাণ করেননি, দেশের অর্থমন্ত্রককেও বিশ্বব্যাংকের থাবামুক্ত রেখেছেন।

নতুন অর্থমন্ত্রী মোস্তফা কামাল লোটাসকে ব্যাংকিং খাত থেকে শুরু করে অর্থনীতির সকল খাতকে সুস্থ ও পুনর্গঠিত করতে হলে একদিকে একশ্রেণির অসাধু নব্য ধনী এবং অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের উদ্দেশ্যমূলক মুরুব্বিয়ানা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য ও সহযোগিতা তিনি পাবেন। কিন্তু দলের ভেতরে ও বাইরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ও মাফিয়াতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও তাকে সাহস ও দক্ষতার প্রমাণ দেখাতে হবে। ব্যুরোক্রেসির হাত থেকে অর্থমন্ত্রক মুক্ত হওয়ার তাত্পর্যটিও আমাদের ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হবে। – ইত্তেফাক

[ লন্ডন, ১৯ জানুয়ারি, শনিবার, ২০১৯ ]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment