তৃতীয় মত

রাজনীতিতে অহঙ্কার ও উপেক্ষা যেন স্থান না পায়

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

ঢাকার এক অ্যাডভোকেট বন্ধুর সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ হচ্ছিল। মাঝে মাঝে তার সঙ্গে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করি। তিনি যেহেতু দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন, ফলে তার কাছ থেকে মোটামুটি সঠিক খবর পাই। তার প্রমাণ পেয়েছি।

সেদিন তার সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল শেখ হাসিনার বিশাল নির্বাচন জয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাঠানো অভিনন্দন বার্তা নিয়ে।

এটা ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন এবং তাতে শেখ হাসিনার দলের জয়ের অকুণ্ঠ স্বীকৃতি। বিশ্বের সুপার পাওয়ারের এই স্বীকৃতি পরাজিত বিএনপি-জামায়াত শিবিরে দারুণ হতাশা এবং আওয়ামী লীগ শিবিরে মহা উল্লাসের জন্ম দিয়েছে।

অ্যাডভোকেট বন্ধু বললেন, এত উল্লাস ও উচ্ছ্বাসের মধ্যে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা হয়তো লক্ষ করেননি, ট্রাম্পের এই অভিনন্দন বার্তার মধ্যে কিছুটা খোঁচা রয়ে গেছে। তাতে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের স্বচ্ছতা সম্পর্কে নিরপেক্ষ তদন্ত, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলার খবর, সাংবাদিকদের নির্যাতন ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করে হাসিনা সরকারকে কিছু উপদেশ দেয়া হয়েছে।

বলেছি, এ তো দেখছি ‘ভূতের মুখে রাম নাম’। আমেরিকায় ইতিপূর্বে জর্জ বুশ ও আল গোরের মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, সুপ্রিমকোর্টের একশ্রেণীর বিচারপতি জর্জ বুশকে জেতানোর জন্য চাতুরীর আশ্রয় গ্রহণের অভিযোগ প্রকাশ্যেই উঠেছিল। আল গোর এই ব্যাপারে মামলা-মোকদ্দমায় যেতে চাননি বলে জর্জ বুশ প্রেসিডেন্ট হতে পেরেছিলেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন তো আরও বিতর্কিত। তার নির্বাচনে রাশিয়ান কানেকশন নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে। সংবাদপত্রের ও সাংবাদিকদের সঙ্গে তার সম্পর্ক অহি-নকুলের। তাদের দমনের জন্য তিনি সদা ব্যস্ত।

তার মানবতাবিরোধী যুদ্ধ চক্রান্ত, নারীঘটিত ঘটনা ও ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার অভিযোগে সারা আমেরিকা সরগরম। সেই ট্রাম্প বাংলাদেশকে নির্বাচনে স্বচ্ছতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সহনশীল আচরণের ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছেন। ট্রাম্পের শুধু এ ধরনের কথাবার্তাই নয়, আমেরিকার মতো দেশে তার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়া এই শতকের সবচেয়ে বড় প্রহসন।

এ প্রসঙ্গেই অ্যাডভোকেট বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিরাট কারচুপি এবং প্রতিপক্ষের ওপর ব্যাপক পুলিশি নির্যাতন চলেছিল বলে যে প্রচারণা চলছে তা কতটুকু সঠিক বলে আপনি মনে করেন? তিনি বললেন, কতটা অনিয়ম হয়েছে তা জানি না। তবে আওয়ামী লীগের নৌকার পক্ষে যে জোয়ার দেখা দিয়েছিল তাতে এক-আধটুকু অনিয়ম-অত্যাচার না হলেও আওয়ামী লীগের জয় হতো।

অ্যাডভোকেট বন্ধু একটু হেসে বললেন, এবারের নির্বাচনে যদি অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে আমি অখুশি নই, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ও ২০০১ সালের নির্বাচনে ব্যাপক জাল ভোট, আওয়ামী লীগের প্রার্থী-সমর্থক ও ভোটদাতাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন, হত্যা-ধর্ষণের যে রেকর্ড সৃষ্টি করা হয়েছিল, ডিসেম্বরের নির্বাচনে তার কতটুকু ঘটেছে? যদি ঘটে থাকে, তাহলে আমি বলব, ‘BNP is being paid by its own coin’- বিএনপিকে তার অর্থ দ্বারাই ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে।

বন্ধুর কথা শুনে আমারও মনে পড়ল ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত সারা দেশে বিভীষিকার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। তখনও ড. কামাল হোসেন ছিলেন বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠীর অঘোষিত উপদেষ্টা।

তার চোখের সামনেই শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবনের পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সংযোগ কেটে দেয়া হয়েছিল, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও ভোটদাতাদের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার চালানো হয়েছিল। তখন ড.

কামাল হোসেন এবং তার সুশীল সমাজ ছিলেন নির্বাক। এখন তার মুখে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অনবরত কথার খই ফুটছে।

এখন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের দোহাই তুলে বিএনপির অভিযোগের অন্ত নেই। বিএনপি অতীতের আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখতে চাইলে দেখবে সেই চেহারা বীভৎস। শুধু জাতির পিতা ও জাতীয় নেতাদের হত্যা করা নয়, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা আওয়ামী লীগের নামগন্ধ ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন।

এখন তা বিএনপির জন্যই বুমেরাং হয়েছে। ক্ষমতায় থাকতে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের সম্পর্কে ঠাট্টা-টিটকারি ছাড়া বিএনপির শীর্ষ নেতারা কথাই বলতেন না।

মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেস নেতাদের উপদেশ দিয়েছিলেন, তোমার প্রতিপক্ষের সম্পর্কে ঠাট্টা-তামাশা করো না। তুমি জানো না, আজ যে দুর্বল, কাল সে তোমার চাইতেও সবল হয়ে দাঁড়াবে কিনা। ভারতে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের নিয়ে একশ্রেণীর কংগ্রেস নেতা ঠাট্টা-তামাশা করতেন। কিন্তু মাত্র কয়েক বছর আগে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির লোকসভায় সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র দুই। আজ তারা সেখানে ব্রুট মেজরিটির অধিকারী। কংগ্রেসকে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা থেকে তাড়িয়েছে।

বাংলাদেশে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালে যখন-তখন আওয়ামী লীগকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করতেন। একবার দম্ভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ আগামী ৫০ বছরেও ক্ষমতায় আসতে পারবে না।’ সেই আওয়ামী লীগ এখন পরপর দুই টার্ম ক্ষমতায় থাকার পর তৃতীয় টার্মে ক্ষমতায় রয়েছে।

আর রাজরাণীর দাপট ছিল যে খালেদা জিয়ার, তিনি এখন দুর্নীতির দায়ে জেলে এবং তার পুত্র যুবরাজ তারেক এখন আদালতের দণ্ড ঘাড়ে নিয়ে বিদেশে পলাতক।

ড. কামাল হোসেন বিএনপির তারেক রহমান বা একশ্রেণীর নেতার মতো অর্বাচীন নন। তিনি প্রবীণ ও প্রাজ্ঞ আইনজীবী এবং রাজনীতিক। কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতিতে ঢুকে তিনিও আওয়ামী লীগ সম্পর্কে ঠাট্টা-তামাশা শুরু করেছিলেন।

এবারের নির্বাচনের ক’দিন আগে এক সভায় ড. কামাল হোসেন আওয়ামী লীগের নেতাদের টিটকারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনারা তো ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে হেরে যাচ্ছেন। কী বলেন? ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়ার আগে কিছু ভালো কাজ করে যান, আমরা সাহায্য দেব।’ এই টিটকারিদাতা ড. কামাল হোসেনের দল এখন নির্বাচনে পরাজিত এবং তিনিও তার চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী এবারেও ‘যঃ পলায়তি, সঃ জীবুতি।’

প্রতিপক্ষকে তুচ্ছ জ্ঞান করলে তার পরিণতি কী ঘটে, তার বহু উদাহরণ বিদেশেও আছে। ভারত গত শতকের মধ্যভাগে ব্রিটেনের উপনিবেশ থাকাকালে ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চার্চিল মহাত্মা গান্ধীকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন ‘Naked fakir’ বা ন্যাংটা ফকির। আর ভারতকে স্বাধীনতা দান সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘I have not become the prime minister of Britain to preside over the liquidation of the British Empire’ (আমি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে নিলামে চড়াবার জন্য প্রধানমন্ত্রী হইনি।’)

সেই চার্চিলের জীবিতকালেই মহাত্মা গান্ধীর সমাধিতে গিয়ে ব্রিটিশ রাণী ও প্রধানমন্ত্রীকে মাথা নিচু করে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে হয়েছে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ফজলুল হক পরাজিত হলে মুসলিম লীগ নেতা জিন্নাহ দম্ভ করে বলেছিলেন, ‘ফজলুল হকের জন্য এটা ওয়াটার লু’র যুদ্ধে পরাজয়। তার রাজনীতির এখানেই শেষ।’

এর আট বছর পর ১৯৫৪ সালে এই হক সাহেবই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) নির্বাচনে জিতে মুসলিম লীগের ঘাঁটি চিরদিনের জন্য উচ্ছেদ করেছিলেন।

এ রকম উদাহরণ আরও দেখাতে পারি। তালিকা লম্বা করে লাভ নেই। আমার বলার কথা, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। এবারের নির্বাচনে বিশাল বিজয়ের অধিকারী আওয়ামী লীগ যেন অহঙ্কারে স্ফীত না হয়। পরাজিত বিরোধীদের সঙ্গে যেন সংযত আচরণ করে। দুর্দিনে যে দলগুলো, বড় আর ছোট- যাই হোক, মহাজোটে এসে আওয়ামী লীগের পাশে দাঁড়িয়েছিল, সুদিনে তাদের যেন আওয়ামী লীগ অবহেলা ও উপেক্ষা না করে।

নির্বাচনে জয় সাময়িক জয়, চূড়ান্ত রাজনৈতিক জয় নয়। ১৯৭১ সালে রণক্ষেত্রের যুদ্ধে জয়ী হয়েও আমরা চূড়ান্ত রাজনৈতিক যুদ্ধে জয়ী হইনি। ১৯৭৫ সালের ট্র্যাজেডি আমাদের মানতে হয়েছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচন যুদ্ধে বিশাল জয়ের পরও কী ঘটবে, আমরা তা জানি না। সামনে বর্তমান সরকারের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

তাতে জয়ী হতে হলে মহাজোটের শরিকদের সমর্থন ও সাহায্য ভবিষ্যতেও দরকার হবে। রাবণ বধের যুদ্ধে হনুমান আর সুগ্রীবের মতো বানরের সাহায্যও রামের দরকার হয়েছিল। মহাজোটের শরিক দলগুলো নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করবে। আমি তাদের বানর বলছি না। কেবল উদাহরণ দেয়ার জন্য হনুমান ও সুগ্রীবের কথা উল্লেখ করেছি।

দেশে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল গড়ে উঠুক। কিন্তু সেটি স্বাধীনতার শত্রুপক্ষ দ্বারা গঠিত বিরোধী দল নয়। স্বাধীনতার শত্রুপক্ষের চক্রান্তের রাজনীতি মোকাবেলার জন্য সামনে আরও বড় যুদ্ধ অপেক্ষা করছে। আওয়ামী লীগের উচিত মহাজোটকে দুর্বল না করে আরও শক্তিশালী করা।

দেশের সব পেশার সব শ্রেণীর মানুষকে মহাজোটে টেনে আনা। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- ‘একতারা যাহাদের তারাও সম্মান যেন পায়।’ শেখ হাসিনা তার নির্বাচনোত্তর চিন্তা-ভাবনায় আমার কথাগুলোকে একটু স্থান দিন। – যুগান্তর

লন্ডন, ২৭ জানুয়ারি, রোববার ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment