দশ দিগন্তে

রাশেদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

গত শুক্রবার (৮ ফেব্রুয়ারি) বাসায় বসে টিভি দেখছিলাম। সন্ধ্যা বেলা। লন্ডনের মেঘলা আকাশ। হঠাৎ টেলিফোন এলো। এক বন্ধু জানালেন, রাশেদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু হয়েছে। খবরটা বিশ্বাস হলো না। আমার চাইতে বয়সে কয়েক বছরের ছোট, কিন্তু আমার মতো অসুখে-বিসুখে জর্জরিত নন। সুঠাম, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মানুষ। গত সোমবারেও টেলিফোনে কথা হয়েছে। আগের দিন গিয়েছিলেন অক্সফোর্ডে এক সেমিনারে। যে সেমিনারে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভীও এসেছিলেন।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একমাত্র পুত্র। কৈশোর থেকেই লন্ডনে আছেন। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন অভিনয়কে। সেক্সপিরিয়ান থিয়েটার গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পিতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মাঝে মাঝে লন্ডনে পুত্রের কাছে এসে থাকতেন। আইয়ুবের আমলে পাকিস্তানের কারাগার থেকে পুত্রকে দীর্ঘ চিঠি লিখতেন। এই রাশেদ সোহরাওয়ার্দী— যাকে কয়েকদিন আগেও তরতাজা অবস্থায় দেখেছি, তার এমন আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ কিভাবে বিশ্বাস করি?

পরে এই মৃত্যু সংবাদ নিশ্চিত করলেন আরেক বন্ধু। রাশেদ ব্যাচেলর ছিলেন। একা এক বাসায় থাকতেন। রাতে হার্টঅ্যাটাক হয় এবং নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যু। পিতার মতোই পুত্রের মৃত্যু হলো। দেশবরেণ্য নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী লেবাননের রাজধানী বৈরুতে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন। এক রাতে এক হোটেল কক্ষে হার্ট অ্যাটাকে নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যান। তার মৃত্যুর তারিখ ছিল ৫ ডিসেম্বর। রাশেদ মারা গেলেন সাত কিম্বা আট ফেব্রুয়ারি।

গত ডিসেম্বর মাসেও রাশেদ আমার কাছে দুঃখ করেছিলেন, বলেছিলেন ‘আমার বাবা ছিলেন আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবেরও রাজনৈতিক গুরু। এখন তাকে মৃত্যু দিবসেও কেউ স্মরণ করে না।’ আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছি, লন্ডনে হয়ত তার মৃত্যু দিবস পালিত হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ তার মৃত্যু দিবস পালন করে। রমনা গেটে তার সমাধিতে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এই সমাধি সংলগ্ন সাবেক রেসকোর্স ময়দানের নামও বঙ্গবন্ধু সরকার রেখেছেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। তার নামে হাসপাতাল এবং কলেজও আছে। আমার কথায় রাশেদ কতোটা সান্ত্বনা পেতেন জানি না। লন্ডনের বাংলাদেশিরা যে তার পিতার মৃত্যু দিবসে তাকে স্মরণ করে না, এজন্যে তিনি দুঃখ পেতেন।

তার এই দুঃখ পাওয়ার কারণও ছিল। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কোনোটাতেই সোহরাওয়ার্দী কন্যা, রাশেদের বোন বেগম আখতার সোলায়মান সমর্থন দেননি। তিনি স্বামী ও কন্যাসহ স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন করাচিতে। আর রাশেদ পড়াশোনার জন্য থাকতেন লন্ডনে। তিনি যেমন ছয় দফার আন্দোলনে জোরালো সমর্থন দিয়েছেন, তেমনই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দানে তার ছিল সক্রিয় ভূমিকা। রাশেদ রাজনীতিক ছিলেন না, কিন্তু আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে তার ছিল আজীবনের সম্পর্ক। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কয়েক দফা ঢাকায় গেছেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে তার ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। তাই আশা করতেন, লন্ডনের বাঙালিরা তার পিতাকে স্মরণ করবে।

রাশেদ সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে লিখতে বসেছি তার কারণ তিনি আমার বন্ধু ছিলেন তা নয়, কারণ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনে বিশেষ করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তার একটা ছোট অথচ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। সে কথা আজ নম্রচিত্তে স্মরণ করি। তার সঙ্গে আমার পরিচয় এবং প্রথম দেখা ষাটের দশকের মধ্যভাগে ঢাকায় ইত্তেফাক অফিসে। তখন আমি ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করি। সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন, আমাদের মানিক ভাই তখন বেঁচে আছেন।

একদিন রামকৃষ্ণ মিশন রোডে ইত্তেফাকের সাবেক অফিসে ঢুকে দেখি মানিক ভাইয়ের রুমে তার ইজি চেয়ারে শুয়ে পা দোলাচ্ছেন এক সুদর্শন স্মার্ট যুবক। মানিক ভাই তখনো অফিসে আসেননি। কৌতূহলি হলাম, এই সাহেব-সুবোর মতো দেখতে যুবক কে? একেবারে মানিক ভাইয়ের চেয়ারে গিয়ে বসেছেন! নিজেই যেচে পরিচিত হলাম। ইনি শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একমাত্র পুত্র রাশেদ সোহরাওয়ার্দী। লন্ডনে থাকেন। ঢাকায় এসেছেন এবং আওয়ামী লীগের পল্টনের জনসভায় যোগ দেবেন এবং তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করবেন।

বঙ্গবন্ধু তখন জেলে। পল্টনের সভায় সভাপতি শেখ মুজিবের চেয়ারটি শূন্য রাখা হলো। যুবক রাশেদ সভায় প্রধান অতিথি। তিনি ইংরেজিতে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি দাবি করে এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে জোরালো বক্তৃতা দিয়েছিলেন। রাতে মানিক ভাই রাশেদকে এক চায়নিজ রেস্টুরেন্টে খাওয়ালেন। তখন ঢাকায় সেটাই সেরা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। নাম সম্ভবত চুংকিং। গুলিস্তানের একটা বিল্ডিংয়ের তেতলায় ছিল রেস্টুরেন্টটি। এখন আছে কি না জানি না। এই ভোজে মানিক ভাই আমাকেও সঙ্গে রেখেছিলেন। ফলে খাবার টেবিলে রাশেদের সঙ্গে পরিচয়টা ঘনিষ্ঠ হলো। তার মা যে রাশিয়ান এবং তখনো বেঁচে আছেন, তা জানতে পারি।

তারপর দীর্ঘকাল চলে গেছে। আমি ঢাকায়। রাশেদ লন্ডনে। কোনো যোগাযোগ ছিল না, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাশেদ আবার এলেন ঢাকায়। তখন তিনি পরিপূর্ণ যুবক। পেশায় প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা। সেক্সপিয়ারের বেশ কটি নাটকে অভিনয় করে নাম করেছেন। আমি তাকে ঠাট্টা করে বলেছিলাম, বাবা ছিলেন নেতা, আর ছেলে হলো অভিনেতা। এটা কেমন হলো? রাশেদ হেসে বলেছেন, নেতা আর অভিনেতার মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি?

১৯৭৪ সালে অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে লন্ডনে আসি। রাশেদের সঙ্গে আবার যোগাযোগ হয়। রাশেদ মাঝে মাঝেই আমার বাসায় আসতেন। বাঙালি খাবার পছন্দ করতেন। আমার স্ত্রীকে মাঝে মাঝে বলতেন, সিসটার, আমাকে একটু সফট রাইস, মাস পটেটো এবং লেন্টিস দিবেন, তাহলেই হবে। রাশেদের সঙ্গে কোনো সভা বা অনুষ্ঠানে গেলে তার গাড়িতে লিফট পেতাম।

লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে গবেষণামূলক কাজের জন্য আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে বঙ্গবন্ধু রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করি। রাশেদকে বলতেই তিনি তাতে যোগ দিতে সানন্দে সম্মতি জানান। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের ওপর একটি চলচ্চিত্র তৈরির জন্য তিনি আমাকে প্রথম আইডিয়া জোগান। তার নিজেরও ইচ্ছা ছিল বঙ্গবন্ধুর ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র তৈরির। এজন্য বহু রাত জেগে স্ক্রিপ্ট তৈরি করেছেন। কিন্তু এই ছবি নির্মাণে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে কোনো উৎসাহ পাননি বলে এগুতে পারেননি। এজন্যে বহুদিন দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

এটা আমার শোনা কথা। একসময় হাসিনা সরকার তাকে জর্ডানে রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন ইউরোপের কোনো ছোট দেশে। তা না পেয়ে তিনি আর রাষ্ট্রদূতের পদ নেননি। এই ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসা করে কোনো সদুত্তর পাইনি। জিজ্ঞাসা করলেই বলতেন, হাসিনার কাছ থেকে আমি যথেষ্ট পেয়েছি। এর বেশি কিছু চাই না।

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নার ওপর যখন বিপুল অর্থব্যয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়— তখন রাশেদকে নেহেরুর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ করা হয়। আমি ভাবতেই পারিনি, সামান্য মেকআপ নিয়ে রাশেদের চেহারা অবিকল নেহেরু হয়ে যাবে। তার অভিনয় দেখেও মনে হয়নি ইনি আসল নেহেরু নন। তিনি যে একজন জাত অভিনেতা এটা বুঝতে কারো অসুবিধা হয়নি। লন্ডনের বিখ্যাত ‘স্টেজ’ কাগজে নেহেরু চরিত্রে রাশেদের অভিনয় দেখে মন্তব্য করা হয়েছিল, ‘মনে হচ্ছিল, আসল নেহেরুই জীবিত হয়ে ছবির পর্দায় উঠে এসেছেন।’

রাশেদ পরিহাস-প্রিয় ছিলেন। তিনি কেন বিয়ে করছেন না জিজ্ঞেস করলেই মুচকি হেসে বলতেন, ‘ওয়াটার ওয়াটার এভরি হোয়েয়ার, নট এ ড্রপ ফর মি।’ লন্ডনে তার নিঃসঙ্গ বসবাসকে তার অজ্ঞাত বাসই বলা চলে। সেই মানুষটি আবার সকলের অজ্ঞাতসারেই চলে গেলেন। দু’দিন আগেও যার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছি, দু’দিন পরই তিনি চলে গেলেন। আর তার দেখা পাব না, কণ্ঠ শুনব না। এ দুঃখ, শোক কোথায় রাখি?

[ লন্ডন, ফেব্রুয়ারি, শনিবার, ২০১৯ ]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment