তৃতীয় মত

প্রধানমন্ত্রীকে সবিনয়ে একটি বিষয়ে সতর্কীকরণ

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

ঢাকায় ক্ষমতায় বহাল পুনরায় নির্বাচিত সরকারের সম্পূর্ণ গঠনপর্ব শেষ হয়েছে। জাতীয় সংসদেও সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনীত মহিলাদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের মতো এখানেও নতুন মুখের ছড়াছড়ি।

সুতরাং পুরনো সরকারই আবার ক্ষমতায় এসেছে তা সম্ভবত বলা ঠিক হবে না। বলা উচিত পুরনো সরকার ক্ষমতায় এসেছে বটে, তবে নতুন চেহারা নিয়ে। বেশিরভাগ অপরীক্ষিত নতুন মন্ত্রী-উপমন্ত্রী বিভিন্ন দফতরের দায়িত্ব পেয়েছেন। সংরক্ষিত মহিলা এমপি আসনে মাত্র দু’জন ছাড়া বাকি সবাই নতুন মুখ।

দেশের অধিকাংশ মানুষ তাতে খুশি, আমিও খুশি। অবশ্য আমার খুশি না বেজার হওয়াতে কারও কিছু যায় আসে না। তবে পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে এই কলম চালাচালি করছি। তাই মন্ত্রিসভায় এবং সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে এই মহাপরিবর্তন দেখে অভিভূত হয়েছি।

কেবল পরিবর্তন হয়নি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টামণ্ডলীতে। এই টেকনোক্র্যাট এবং ব্যুরোক্র্যাটরা সবাই স্ব স্ব পদে বহাল রয়েছেন। পরিবর্তনের জোয়ারে এই ব্যতিক্রমটা হয়তো দেশবাসীর অনেকের চোখে পড়েছে। আমারও পড়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টির এবং উদ্ভাবনী শক্তির আমি সবসময় তারিফ করি। নতুন মন্ত্রিসভায় অসংখ্য নতুন মুখ আনায় তার সাহসেরও প্রশংসা না করে পারছি না। তার দলে ও সরকারে নতুন রক্ত সঞ্চালিত হোক, নতুন যুগের নতুন মন-মানসিকতা যুক্ত হোক এটা ছিল আমাদেরও অনেকেরই দাবি। ফলে আমরা সবাই খুশি। কিন্তু একটা ব্যাপারে অনেকের মতো আমার মনেও কিছু খটকা আছে।

জাতীয় সংসদের অধিকাংশ সদস্য, বলতে গেলে সব সদস্যই, এমনকি যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে তারা পরিবর্তনের ধাক্কায় পড়েননি। মনোনয়ন পেয়েছেন। হাসিনার জনপ্রিয়তায় জোয়ারে পুনর্নির্বাচিতও হয়েছেন।

কিন্তু মহিলা সদস্যদের আটানব্বই ভাগই বিদায় নিয়েছেন। মন্ত্রিসভায় বিরাট পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। দক্ষ ও প্রবীণ মন্ত্রীদের প্রায় সবাই আবার সংসদে নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ পড়েছেন। কিন্তু উপদেষ্টা পরিষদের সবাই স্ব স্ব পদে বহাল আছেন।

এর কারণটা কী? অবশ্যই আমাদের মতো বাইরের লোকের কাছে প্রধানমন্ত্রী কারণ ব্যাখ্যা করতে বাধ্য নন এবং আমি তা চাইও না। কিন্তু আমরা যারা এই সরকারের বিরাট শুভাকাঙ্ক্ষী এবং নির্বাচনের সময় কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করেছি এই সরকারের যাতে বিরাট জয় হয়, তারা কেউ কেউ বিশেষ করে আমি মনে করি নির্বাচনের পরেও সরকারকে সমর্থন জানানো এবং পরামর্শ দেয়া আমাদের একান্ত কর্তব্য।

নির্বাচনের সময় শেখ হাসিনার মহাজোটকে সমর্থন জানিয়ে যারা জয়ী হতে সাহায্য করেছেন, তাদের উচিত নির্বাচনে জয়ী সরকারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখে সাহায্য ও পরামর্শ দিয়ে ক্ষমতায় আবারও পুনর্মেয়াদে টিকে থাকতে সহযোগিতা করা।

এই সরকারের শত্রু অনেক। নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় বহাল থাকাতেই শত্রুপক্ষ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকানো থেকে বিরত থাকবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং ষড়যন্ত্র করবে। গত মেয়াদে হাসিনা দেশকে অভাব ও অনাহার থেকে মুক্ত করেছেন।

অচিন্তনীয় অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটিয়েছেন। এবারের মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ হাসিনার শপথ, দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অভিযান চালানো হবে, দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করে তবে সরকার ক্ষান্ত হবে।

এটা আরও শক্ত লড়াই। দেশে অসৎ নব্যধনী, অসাধু ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ সিভিল ও মিলিটারি ব্যুরোক্র্যাট ও টেকনোক্র্যাট এবং দেশপ্রেম বর্জিত রাজনীতিক ও স্বাধীনতা বিরোধীদের একটা সম্মিলিত শক্তিশালী চক্র আছে। তারা এবারের নির্বাচনে পিছু হটেছে। কিন্তু ষড়যন্ত্রে পিছু হটেনি। তারা যতটা শক্তিশালী তার চেয়ে বেশি শক্তি ও দক্ষতা নিয়ে তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করতে হবে এই সরকারকে।

এজন্যই আমার ভয় হয়। সম্পূর্ণ নতুন মুখ নিয়ে গঠিত মন্ত্রিসভা এই ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় কতটা দক্ষতা দেখাবে? শেখ হাসিনা যত দক্ষ ও অভিজ্ঞ হোন, তার পক্ষে কি দল এবং সরকারের সবদিক একা সামলানো সম্ভব? সব নতুন মন্ত্রীকে যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়, তাহলে তো এই সরকারের কেবিনেট পদ্ধতির সরকারের চরিত্র থাকবে না।

কেবিনেট পদ্ধতিতে ক্ষমতা এক হাতে কেন্দ্রীভূত নয়, প্রত্যেক মন্ত্রীকে নিজ দফতর পরিচালনায় অভিজ্ঞ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারঙ্গম হতে হয়, নইলে আমলাতন্ত্র তার মাথায় চেপে বসে। জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছা এক্ষেত্রে উপেক্ষিত হয়।

চার্লস হার্বাট নামের এক রাজনৈতিক দার্শনিক বলেছেন, ‘প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক সরকারে নতুন মুখের জন্য দরজা খোলা রাখতে হবে। প্রথম দফায় মন্ত্রী হয়ে তারা অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন। দ্বিতীয় দফায় মন্ত্রী হয়ে তারা সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাবেন।’

বাংলাদেশের জন্য চার্লস হার্বাটের কথাটি অতি প্রযোজ্য। শেখ হাসিনা নতুন প্রতিভার সন্ধান এবং তরুণ রাজনীতিকদের ক্ষমতায় তুলে আনার ব্যাপারে তার দূরদর্শিতা দেখিয়েছেন। গত মন্ত্রিসভায় তিনি যাদের রিক্রুট করেছেন, তাদের অনেকে দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং তার প্রমাণ দেখিয়েছেন।

এবারের মন্ত্রিসভায় নবীন-প্রবীণ নির্বিশেষে তাদের সিংহভাগ বাদ পড়ায় তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দেশের কোনো কাজেই লাগবে না।

নতুন অনভিজ্ঞ মন্ত্রীদের অনেকেরই অভিজ্ঞতা অর্জনে বেশ সময় লাগবে। এই দীর্ঘ সময় তাদের হয় মন্ত্রণালয়ের সচিবের (অর্থাৎ আমলা) ওপর সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য নির্ভর করতে হবে; অথবা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সিদ্ধান্ত লাভের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এটা যে ঘটবেই এমন কথা আমি বলি না। কিন্তু ঘটার সম্ভাবনাই বেশি।

জন প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের অনভিজ্ঞ মন্ত্রীর সংখ্যা বেশি হলে ক্ষমতা চলে যায় আমলাদের হাতে। তারা ফাইলে যে ডিসিশন দেন, মন্ত্রী তাতে সই করেন মাত্র। পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানে নূরুল আমিনের মন্ত্রিসভায় আফজাল মোক্তার নামে এক মন্ত্রী ছিলেন, মন্ত্রী হিসেবে তার দক্ষতা কম ছিল, তিনি তার পাঞ্জাবি সেক্রেটারির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।

একদিন তার সেক্রেটারি তার মুখের ওপর ফাইল ছুড়ে মেরে বলেছেন, ‘মিস্টার মুখটিয়ার, প্লিজ লার্ন হাউ টু টেক এ ডিসিশন।’ খবরটা সংবাদপত্রে সে সময় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল।

পাকিস্তান আমলের আরেকটি উদাহরণ দেই। জেনারেল আইয়ুব ১৯৫৮ সালে ক্ষমতা দখলের পর পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিচারপতি ইব্রাহিমকে আইনমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন। কিন্তু আইনমন্ত্রী হিসেবে তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না।

আর নিলেও তা কার্যকর হতো না। সিদ্ধান্ত নিতেন আইয়ুবের সচিব ফিদা হোসেন এবং আইনমন্ত্রীর নামে তার সিদ্ধান্তই কার্যকর হতো। লজ্জা ও ক্ষোভে বিচারপতি ইব্রাহিম আইনমন্ত্রী পদে ইস্তফা দেন। বর্তমান বাংলাদেশে অনেক মন্ত্রীর কাছে অভিযোগ শুনেছি তাদেরও একই অবস্থা।

শেখ হাসিনা তার মন্ত্রিসভায় অভাবনীয় পরিবর্তন এনেছেন, নতুন মুখ বেশি এনেছেন, তাতে দেশের মানুষ খুশি এবং আমিও খুশি। কিন্তু তাতে মনের ভয়টি দূর হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদ সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত।

কোনো নতুন মুখ আসেনি। এই উপদেষ্টাদের সবাই দক্ষ, অভিজ্ঞ, দূরদর্শী। কিন্তু সবাই সাবেক ব্যুরোক্র্যাট অথবা টেকনোক্র্যাট। তাদের পাণ্ডিত্য আছে, কিন্তু জনগণের মনের কথা জানা নেই।

দেশ পরিচালনায় বা কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা যদি নির্বাচিত জন প্রতিনিধিদের মাথায় ছড়ি ঘোরান, তাহলে বিপদ হবে। পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বিরোধের সময় আমরা এই ব্যুরোক্র্যাট ও টেকনোক্র্যাট উপদেষ্টাদের কয়েকজনের এবং একজন সাবেক ব্যুরোক্র্যাট মন্ত্রীর ভূমিকা দেখেছি। শেখ হাসিনা কঠোর এবং সাহসী ভূমিকা না নিলে বিশ্বব্যাংকের চক্রান্তের কাছে আমাদের মাথানত করতে হতো।

তাই ভয় হয়। এবারের মন্ত্রিসভায় জন প্রতিনিধিদের বেশিরভাগ নতুন এবং অনভিজ্ঞ। আমলারা তাদের মাথার ওপর ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করবে। দেশে এমনিতেই আমলাতন্ত্র শক্তিশালী হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদও ব্যুরোক্র্যাট ও টেকনোক্র্যাট দ্বারা ভর্তি। যতই ভালো ও অভিজ্ঞ হোন, তারা রাজনীতিকদের চেয়ে শক্তিশালী হলে জন প্রতিধিত্বমূলক শাসন শক্তিশালী ও কার্যকর হবে না। আর তা না হলে দেশে গণতন্ত্রের বিকাশও বাধামুক্ত হবে না। প্রধানমন্ত্রীকে শুধু এই কথাটা সবিনয়ে জানিয়ে রাখছি। – যুগান্তর

লন্ডন, ১০ ফেব্রুয়ারি, রবিবার, ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment