তৃতীয় মত

হাসিনার পর কে?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

বয়স হয়েছে। নিজের স্মৃতিশক্তির ওপর আর নির্ভর করতে পারি না। তবু যতদূর মনে পড়ে ভারতের দীর্ঘ কয়েক মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু ১৯৬২ সালে কংগ্রেসের সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলেন, সম্ভবত ভুবনেশ্বরে। বিমানবন্দরে সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে ধরেন।

তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, “নেহেরুর পর কে? নেহেরুর পর ভারতের শাসন দণ্ড কে ধরবেন? নেহেরু হেসে জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমার জীবন সায়াহ্ন এখনও ঘনিয়ে আসেনি।” কিন্তু তার কয়েকদিন পরই বাথরুমে পড়ে গিয়ে তিনি যে জ্ঞান হারান, সেই জ্ঞান আর ফিরে আসেনি।

আবার নেহেরুর চাইতেও পরিণত বয়সে অনেকে রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণের পরও রাজনীতিতে, রাজনীতি কেন, ক্ষমতায় ফিরে এসেছিলেন জনগণের ইচ্ছায়। যেমন- ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট দ্য গলে এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। মাহাথির জনগণের ইচ্ছায় যখন ক্ষমতায় ফিরেছিলেন, তখন তার বয়স নব্বইঊর্ধ্ব। ফজলুল হক দীর্ঘকাল রাজনৈতিক বনবাসে থাকার পর যখন ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হন, তখন তিনি অশীতিপর বৃদ্ধ।

সে তুলনায় বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বয়স তো মাত্র ৭২ বছর। এ বয়সেই হাসিনার পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, হাসিনার পর কে, এই প্রশ্নটি দেশের রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে কেন? তিনি চারবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর অনেকের মনে এ প্রশ্নটি হয়তো ছিল। কিন্তু মুখে উচ্চারিত হয়নি। এখন অনেকের মুখে উচ্চারিতও হচ্ছে শেখ হাসিনার নিজের মুখে উচ্চারিত হওয়ার পর।

সম্প্রতি জার্মানি সফরে গিয়ে ১৩ ফেব্রুয়ারি বুধবার জার্মান বেতার ডয়েচে ভেলেকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এবারই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার শেষ মেয়াদ। তিনি আর প্রধানমন্ত্রী হবেন না। নতুনদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিয়ে যেতে চান তিনি।’ এ ঘোষণায় আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী এবং দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ খুশি হতে পারেননি।

কিন্তু বিএনপি, জামায়াত ও তথাকথিত সুশীল সমাজের যেসব নেতা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশল ও জনপ্রিয়তার কাছে বারবার পরাজিত হয়েছেন, তারা হয়তো খুশি হয়ে ভাবছেন হাসিনা যতদিন ক্ষমতায় আছেন, ততদিন তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার আশা নেই। তাই হাসিনা ক্ষমতা থেকে স্বেচ্ছায় চলে গেলে তাদের ভাগ্য খুলবে। তারা খোলা মাঠে সহজেই গোল দিতে পারবেন। বিএনপি নেতা রিজভী সাহেবের বক্তব্যে তা-ই বোঝা যায়।

শেখ হাসিনার এ শেষ মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্বের ঘোষণাটি সময়োচিত হয়েছে বলে আমি মনে করি না। তার এ আগাম সিদ্ধান্ত ঘোষণায় দেশের মানুষ খুশি হবে না। তারা দেশ শাসনে শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা, কৌশল ও প্রজ্ঞার পরিচয় পেয়েছেন। তারা এবং শেখ হাসিনার অনেক রাজনৈতিক শত্রুও মনে করেন শুধু আওয়ামী লীগ-রাজনীতিতে নয়, দেশের রাজনীতিতেই শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই। তিনি দেশকে বড় বড় সমস্যামুক্ত করার ব্যাপারে যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশকে সমস্যামুক্ত করার ব্যাপারে আরও দীর্ঘপথ অতিক্রম করতে হবে। এ সময় হাসিনার দক্ষ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব না থাকলে দেশ আবার পিছিয়ে যাবে। হাসিনার অর্জিত সাফল্যগুলো নষ্ট হবে।

আগেই বলেছি, জার্মান বেতারকে দেয়া শেখ হাসিনার ঘোষণায় দেশের মানুষ খুশি হননি। খুশি হয়েছে গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রদর্শনের বিরোধী পক্ষ, একাত্তরের পরাজিত শত্রুপক্ষ এবং ড. কামাল হোসেনের মতো শেখ হাসিনার এককালের বিগ আঙ্কেলের দল। শেখ হাসিনার দেশব্যাপী প্রভাব, কৌশল ও জনপ্রিয়তার কাছে বারবার মার খেয়ে এদের যখন হাঁটুভাঙা দলের মতো অবস্থা, তখন ডয়েচে ভেলেতে শেখ হাসিনার ঘোষণা তাদের মৃতদেহে প্রাণসঞ্চার করবে। তারা পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনকে টার্গেট করে আবার নতুন ষড়যন্ত্র পাতাতে উৎসাহিত হবে।

ঢাকার বাজারে এমনিতেই গুজব রটেছে, গত ৩০ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে গো-হারায় লজ্জা ঢাকা দেয়ার জন্য ড. কামাল হোসেন নিজেই অভিযোগকারী এবং নিজেই বিচারপতি সেজে যে তথাকথিত গণশুনানির ব্যবস্থা করেছিলেন, তা শেষ করে এবার তিনি সত্য সত্যই রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণের কথা চিন্তা করছিলেন। কিন্তু এ গণশুনানিতে তার নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট গঠনের ব্যর্থতা এবং নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে তার ভুলভ্রান্তি নিয়ে অভিযোগ ওঠায় তিনি মুষড়ে পড়েছিলেন।

এ মুহূর্তে শেখ হাসিনার ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী না থাকার ঘোষণা তার এবং হতাশ ও পরাজিত ষড়যন্ত্রকারীদের মনে নতুন আশার বীজ বপন করেছে। তারা আবার সক্রিয় হবে। শেখ হাসিনার মনে যদি এ ইচ্ছাটা থাকেও যে তিনি আরেক দফা প্রধানমন্ত্রী হবেন না, তাহলেও এ কথাটা তার এখন প্রকাশ করা উচিত হয়নি।

২০০৮ সালে বিশাল নির্বাচন জয় নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমি বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে জেনেভায় গিয়েছিলাম। সেখানে তার এক নাগরিক সংবর্ধনা সভায় বলেছিলাম, শেখ হাসিনা দেশ পুনর্গঠনের যে কর্মসূচি নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন, তাতে এক টার্মে তা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাকে অন্তত তিন টার্ম ক্ষমতায় থাকার সুযোগ দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আমার পাশেই বসা ছিলেন। তিনি আমার বক্তব্য শুনে মাথা নেড়ে বলেছিলেন, না, না, অতদিন এ ভার বহন আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

সময় প্রমাণ করেছে, আমার কথা সত্য হয়েছে। গত দুই টার্ম ক্ষমতায় টানা থাকার ফলে তিনি দেশের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছেন। জাতির পিতার হত্যাকারী এবং ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী ও মানবতার শত্রুদের বিচার ও শাস্তি দিয়েছেন, যা ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার। একটি মঙ্গা দুর্ভিক্ষের দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে চলেছেন। এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্যই এবারও তার ক্ষমতায় থাকা দরকার ছিল। কামাল হোসেনরা শোচনীয় পরাজয়ের বেদনায় যতই অভিযোগ তুলুন, জাতি তাকে এবারও দেশ শাসনের ম্যান্ডেট দিয়েছে।

এ ম্যান্ডেট দেয়ার কারণ, দেশের মানুষ এবং বিদেশিরাও স্বীকার করছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। তার সরকারের অনেক ত্রুটিবিচ্যুতি আছে। কিন্তু এ সরকারের বিকল্প কী? দেশদ্রোহী ও রাজাকার এবং ’৭১-এর পরাজিত শত্রুপক্ষ কী? ড. কামাল হোসেন তার বিকল্প হতে চান। এটা অনেকটা কুঁজোর চাঁদ দেখার ইচ্ছার মতো। এবারের সাধারণ নির্বাচনে তার দলের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টুও তাদের নির্বাচনী পোস্টারে ঐক্যফ্রন্ট নেতা কামাল হোসেনের ছবি ব্যবহার করেননি। করেছেন খালেদা জিয়ার ছবি ব্যবহার। তারপরও তারা পরাজিত হয়েছেন।

বিদেশি পত্রপত্রিকাতেও এখন বলা হচ্ছে, সারা উপমহাদেশেই রাজনীতির উন্নয়নমূলক ভারসাম্য রক্ষা এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য হাসিনা-নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। হাসিনা চারবার ক্ষমতায় এসে অনেক বাধা দুর্বিপাক সত্ত্বেও জাতিকে দেয়া তার অঙ্গীকারের ৮০ ভাগ পূরণ করেছেন। দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করেছেন। সন্ত্রাস দমন করেছেন। কিন্তু দুটি অঙ্গীকার এখনও পূর্ণ হতে বাকি আছে। এ দুটি হল- দুর্নীতির রাক্ষস-বধ এবং তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা তুলে দেয়া।

এবার মন্ত্রিসভায় বিরাটভাবে নতুন মুখের আগমন দেখে মনে হয় তিনি তার সরকারে নতুন রক্ত সঞ্চালন করতে চান। আওয়ামী লীগের আসন্ন জাতীয় সম্মেলনেও হয়তো দেখা যাবে নতুন নেতৃত্বের আগমন। দেশে নতুন নেতৃত্ব তৈরিতে শেখ হাসিনার উদ্যোগ ও সাফল্য লক্ষণীয়। এবারের টার্মে তার সরকার যে দুর্নীতি উচ্ছেদ ও দেশের তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়ার ব্যাপারে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে তাতে আমার সন্দেহ নেই। আর এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে হাসিনা-নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই।

মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরকে উন্নত দেশে পরিণত করার জন্য লি কুয়ান ও মাহাথিরকে দরকার পড়েছিল। আমেরিকাকে ত্রিশের মন্দা থেকে রক্ষা করার জন্য রুজভেল্টের নিউডিল কর্মসূচির প্রয়োজন ছিল। আমেরিকার জনগণ তাই সংবিধান সংশোধন করে তাকে তৃতীয়বারের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছিল। বাংলাদেশেও পঞ্চমবারের জন্য হাসিনা-নেতৃত্ব ক্ষমতায় রাখার প্রয়োজন হতে পারে।

এ প্রয়োজন দেখা দিলে শেখ হাসিনাকে দেশের মানুষের সেই দাবি মেনে নিতে হবে। অন্যথায় তিনি যদি পঞ্চম মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে না চান, তাহলে নতুন নেতাকে গ্রুম করার ব্যাপারে তাকে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।

আমার ছোট মুখে একটা বড় দাবি, আগামী নির্বাচনেও যদি আওয়ামী লীগ জয়ী হয় এবং শেখ হাসিনা যদি চান, তার কোনো উত্তরাধিকারী প্রধানমন্ত্রী হোন, তাহলেও তার উচিত হবে রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করে দেশকে এগিয়ে নেয়ার কাজে অভিভাবকত্ব দেয়া। নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা নেই, প্রভাব আছে। হাসিনা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি হলে পদের প্রভাব ও তার ব্যক্তিত্ব মিলিয়ে তিনি দেশের প্রকৃত অভিভাবক হবেন।

লন্ডন, ২৪ ফেব্রুয়ারি, রোববার, ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment