ত্রিদেশীয় রাজনীতির একটি পর্যালোচনা

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

বাংলাদেশে হাসিনা সরকার আবার নির্বাচিত হওয়ার পর দিল্লির একটি ইংরেজি দৈনিকে ভারতের আসন্ন নির্বাচন সম্পর্কে বলা হয়েছে, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী কংগ্রেসের নেত্রীপদে (সাধারণ সম্পাদক) আসায় কংগ্রেস অনেক শক্তিশালী হয়েছে এবং অন্যান্য বিরোধী দলও মোদী হটাও আন্দোলনে অনেক বেশি পরস্পরের কাছাকাছি হয়েছে। মোদীর সেই আগের ক্যারিশমাও আর নেই। তথাপি আসন্ন নির্বাচনে মোদী হয়ত আবারো জিতে যাবেন।

একই সঙ্গে এক মার্কিন সাংবাদিক ও লেখকের একটি লেখা লন্ডনের গার্ডিয়ান ছেপেছেন, যার হেডিং হলো ‘সিমপ্যাথি ফর দা ডেভিল’ (শয়তানের জন্য সহানুভূতি)। এটা আমেরিকার আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সম্পর্কে লেখা। লেখকের অভিমত, সারা বিশ্বময় ডোনাল্ড ট্রাম্প যতই নিন্দিত হন, আগামী নির্বাচনেও তিনি জয়ী হবেন, এই জয়ের ব্যাপারে তিনি কয়েকটি কারণ দর্শিয়েছেন। তিনি ট্রাম্পের এক র‍্যালিতে যে অদ্ভুত কাণ্ডটি ঘটেছে, তার বিবরণও দিয়েছেন।

ট্রাম্প সম্প্রতি এল পাসোতে এক বিশাল জনসভা করেছেন, এল পাসো ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী হিস্পানিক এবং তাদের নেতা বেটো ও রুরকো (Beto O Rourke) অত্যন্ত জনপ্রিয়। তিনি বয়সে তরুণ, ক্যারিশম্যাটিক নেতা এবং প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াতে পারেন। তিনি ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে একই দিনে এল পাসো শহরে পাল্টা র‍্যালি ডেকেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের সভায় হয়েছে ১৫ হাজার দর্শক আর রুরকোর সভায় হয়েছে ৪ হাজার লোক।

আরো মজার কাণ্ড হয়েছে। ট্রাম্পের সভায় দুই কম্যুনিস্ট যুবক সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়নের পতাকা হাতে উপস্থিত হয়। ট্রাম্প সমর্থক কাউবয়ের দল তাদের তাড়া করে। তারা পালিয়ে বাঁচে। ট্রাম্পের কণ্ঠে কোনো নতুন কথা ছিল না। যে মেক্সিকান ওয়াল তৈরি তিনি এখনো শুরু করতে পারেননি, তার গুণগান এবং আমেরিকা হবে কেবল আমেরিকানদের, বহিরাগত ইমিগ্রান্টদের তিনি তাড়াবেন এই জনপ্রিয় আপ্তবাক্যটি উচ্চারণ করে তিনি তার পক্ষে এক বিরাট ভোট ব্যাংক তৈরি করেছেন। তাতে এখন ভাঙন ধরলেও সে ভাঙন এখনো বিপজ্জনক নয়।

মার্কিন জনগণ এখন ইমিগ্রেশন বিরোধী। অন্যদিকে যুদ্ধ তারা চায় না। (মার্কিন এস্টাবলিসমেন্ট যুদ্ধবাদী) ট্রাম্প এই দুটি ইস্যুকেই টার্গেট করেছেন। তিনি সীমান্তে দেয়াল তৈরি করে বহিরাগত সমস্যা ঠেকাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আণবিক চুক্তি করে দেশকে আণবিক হামলা থেকে বাঁচাবেন বলছেন। এজন্য তিনি ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় পর্যন্ত দৌড়ে গেছেন। আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। তথাপি তিনি উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে তার স্বভাবজাত কোনো হুমকি দেননি। উষ্মা প্রকাশ করেননি। বরং আলোচনার দরোজা খোলা রেখেছেন।

মার্কিন ধনতন্ত্রী প্রশাসন যতটা যুদ্ধবাদী, জনগণ ততটা নয়। কোরিয়া যুদ্ধ অবসান ও মার্কিন তরুণদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আইসেন হাওয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের অবসানের দাবিতে মার্কিন তরুণেরা দেশে এবং বিদেশে বিরাট আন্দোলন করেছে। তাতে শামিল হয়েছিলেন ছাত্র ক্লিনটন। পরবর্তীকালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য তথা সিরিয়া থেকে মার্কিন সৈন্য সরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত তার এস্টাবলিসমেন্ট ও মিত্র দেশের সরকারগুলোকে বিরক্ত করলেও তার দেশে সমর্থক সংখ্যা বাড়িয়েছে। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র সম্পর্কিত চুক্তি করতে পারলে ট্রাম্প একেবারে নিকট প্রতিবেশীর হামলার আশঙ্কা থেকে মার্কিন জনগণকে মুক্ত করার বাহ্বা নিতে পারতেন। এটা তিনি পারবেন বলে এখনো আশা করছেন। এজন্য উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম সম্পর্কে তিনি এখন সংযত বাক এবং কীমের সঙ্গে তার আলোচনা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে বলে স্বীকার করছেন না।

ভারতে নরেন্দ্রনাথ মোদীর অবস্থা ট্রাম্পের চাইতে ভালো। ট্রাম্পকে যেভাবে প্রকাশ্যে রেসিস্ট, লায়ার, কনম্যান ইত্যাদি গালি দেওয়া হচ্ছে এবং তা সংবাদপত্রে খবরের শিরোনাম হয়ে দাঁড়াচ্ছে, মোদীর ব্যাপারে তা হয়নি। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এবং তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জী তাকে দেশ শাসনে ব্যর্থতা ও দুর্নীতির জন্য যত কঠোর ভাষাতেই সমালোচনা করুন, ভারতের বিরোধী দলগুলো একক বা মিলিতভাবে মোদীর সর্বভারতীয় নেতৃত্বের পাল্টা কোনো নেতৃত্ব দাঁড় করাতে পারেনি। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী গত কয়েক বছরে তার অনেক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠেছেন, কিন্তু মোদীর নেতৃত্বগত উচ্চতায় এখনো পৌঁছতে পারেননি। ফলে বোন প্রিয়াংকাকে দলের নেতৃত্বে টেনে আনতে হয়েছে। প্রিয়াংকার মধ্যে অনেকেই তার মাতামহী ইন্দিরার চেহারা ও চরিত্রের প্রতিফলন দেখেন। তথাপি রাজনীতিতে এসে প্রিয়াংকা ইন্দিরার ভাবমূর্তির সাহায্যে কতোটা সাফল্য অর্জন করেন তা এখন দেখার রইলো।

নরেন্দ্রনাথ মোদীর সমস্যা হলো, গত সাধারণ নির্বাচনে জনগণকে যত প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন তার বারো আনাই তার সরকার বাস্তবায়ন করতে পারেননি। বিজেপির সহযোগী দল আর এস এস, শিবসেনা প্রভৃতির কট্টর সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপের জন্য আগের বিজেপি দলীয় প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর মতো তিনিও সর্বক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ভারতে ঐতিহ্য অনুসরণ করে দেশ শাসনে সক্ষম হননি। এই ব্যাপারে বিরোধী দলগুলো তার জন্য কোনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারেনি। এখানেই অনেকের ধারণা মোদী আগামী নির্বাচনে পার পেয়ে যাবেন।

সম্প্রতি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে জঙ্গিদের হামলায় চল্লিশের উপর ভারতীয় সৈন্যের মৃত্যু মোদী সরকারের জন্য যতই বিব্রতকর হোক, সারা দেশের জন্য যত শোকের কারণ হোক, এই হামলায় রাজনৈতিকভাবে একটা নতুন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি হলো জঙ্গিদের এই হামলার দায় বর্তেছে পাকিস্তানের ঘাড়ে এবং পাকিস্তান বিরোধী একটা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে ভারতে। তাতে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ বাধবে বলি না। কিন্তু এই উত্তেজনার মুনাফা যাবে মোদী সরকারের ঘরে। তারা এই উত্তেজনার আড়ালে তাদের অনেক ব্যর্থতা লুকাতে পারবেন।

বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের চতুর্থ দফা নির্বাচন জয়ের পেছনে কোনো অতি জাতীয়তা বা ধর্মীয় উগ্রতা কাজ করেনি। কাজ করেছে উন্নয়ন ও সন্ত্রাস দমনের প্রতিশ্রুতি পালন এবং দেশের অধিকতর উন্নয়নের ব্যাপারে সরকারি প্রতিশ্রুতিতে জনগণের আস্থা। যে ভারতীয় পত্রিকাটি বলেছেন, “বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনেও কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটেছে। কিন্তু এই ত্রুটি-বিচ্যুতি না ঘটলেও হাসিনা সরকার নিশ্চিত ভাবেই নির্বাচনে জয়ী হতেন।” এই মন্তব্যটি সঠিক।

শুধু দেশের অভাবনীয় উন্নয়নই এই জয়লাভের কারণ নয়। এই জয়লাভের একটা বড় কারণ, শেখ হাসিনা এখন তার নিজ দেশে যেমন, তেমনই উপমহাদেশেও এমন একজন নেতা হয়েছেন, যার বিকল্প খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। তার নেতৃত্বকে এই মুহূর্তে চ্যালেঞ্জ জানাবার কেউ নেই।

সারা বিশ্বেই এখন নেতৃত্ব সংকট চলছে। আমেরিকায় ট্রাম্পকে এবং ভারতে মোদীকে চ্যালেঞ্জ জানাবার মতো সর্বভারতীয় কোনো নেতাকে পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আমেরিকা বা ভারত কারো জন্যই মঙ্গলজনক নয়। পাকিস্তানে তো এক ক্রিকেট খেলোয়াড়কে এসে রাষ্ট্রতরণীর হাল ধরতে হয়েছে। এদিক থেকে বাংলার মানুষ সৌভাগ্যবান। অন্তত রাজনীতিতে ত্রিশ বছরের বেশি পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ এক নেতাকে পাওয়া গেছে, যাকে রাষ্ট্রতরণীর হাল ধরতে দিয়ে মানুষ নিশ্চিন্ত থাকতে পারে।

ট্রাম্পের হাতে আমেরিকা নিরাপদ নয়। তার ধাপ্পাবাজি তাকে প্রেসিডেন্ট পদে আরেকবার জয়ী করলেও আমেরিকার ভবিষ্যতের জন্য তা মঙ্গলজনক হবে না। ভারতে মোদী আবার নির্বাচিত হলে তাকে শিবসেনা, আরএসএস তথা সংঘ পরিবারের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে হবে। বাংলাদেশে হাসিনা সরকারকে জনগণের নিরঙ্কুশ আস্থার মর্যাদা রাখতে হলে অবশ্যই এবার দুর্নীতির রাক্ষসের বিরুদ্ধে মহা সমরে নামতে হবে। এটা শুধু আমার নয়, অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরও ধারণা। – ইত্তেফাক

লন্ডন ২ মার্চ, শনিবার, ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment