আমাদের সিঙ্গাপুরে যেতে হয় কেন?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়েদুল কাদের গুরুতর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসিত হচ্ছেন। আমরা সকলে তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসুন এটাই দেশবাসীর কামনা। সিঙ্গাপুর ও ব্যাঙ্কক এখন সারা এশিয়ারই নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। আমাদের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানও চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর গিয়েছিলেন।

আজকাল অধিকাংশ বড় নেতা এবং সচ্ছল ব্যক্তিরাই ‘গুরুতর’ রোগে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যান। অনেকে লন্ডনেও ছোটেন। তবে এখন সিঙ্গাপুরের চিকিৎসা লন্ডনের মতো উন্নত ও সহজলভ্য হওয়াতে গুরুতর অসুস্থতায় মানুষ সিঙ্গাপুরে, ব্যাঙ্ককেই ছোটে। এখানেই প্রশ্ন, আমাদের দেশে কি সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত চিকিৎসক ও চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই? এই সম্পর্কে আলোচনার জন্যই আমার আজকে কলাম ধরা।

আমার কৈশোর ও যৌবনেও দেখেছি, গুরুতর রোগে চিকিৎসার জন্য সচ্ছল ব্যক্তিরা কলকাতায় যান। সিঙ্গাপুর তখনও সেরা চিকিৎসা কেন্দ্র হয়ে ওঠেনি। মৃত্যুর আগে শেরে বাংলা ফজলুল হক যখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন তখন কলকাতা থেকে নামকরা চিকিৎসক এসেছিলেন ঢাকায় তার চিকিৎসার জন্য। পাকিস্তানের বিখ্যাত সাবেক চীফ জাস্টিস কায়ানী চট্টগ্রাম এসে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঢাকা থেকে ডাঃ নুরুল ইসলাম এমআরসিপি চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন তার চিকিৎসার জন্য।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। চিকিৎসার উন্নত যন্ত্রপাতি এসেছে। বিদেশে শিক্ষাপ্রাপ্ত দক্ষ চিকিৎসকের সংখ্যা অগুনতি। চিকিৎসা পদ্ধতিও উন্নত দেশের সঙ্গে টেক্কা দেয়ার মতো। গোড়ার দিকে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, নেপাল থেকেই অসংখ্য ছাত্র আসত ঢাকায় মেডিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উন্নত শিক্ষার জন্য।

গত দুই দশকে এই অবস্থাটা একেবারে পাল্টে গেছে। এখন বাংলাদেশের মানুষকে সিঙ্গাপুর, ব্যাঙ্কক, ভেলোর (ভারত) বা লন্ডনে ছুটতে হয় উন্নত চিকিৎসার জন্য। তাহলে বাংলাদেশে কি চিকিৎসকের অভাব এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার অবনতি ঘটেছে? আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, দেশে যোগ্য চিকিৎসকের অভাব নেই। কিন্তু চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থা চরম দুর্নীতিগ্রস্ত। সরকারি হাসপাতালগুলো দুর্নীতির আখড়া। রোগীর ওষুধ, পথ্য সবকিছু নিয়ে চলে দুর্নীতি।

আমার স্ত্রী যখন গুরুতর অসুস্থ হন তখন ঢাকার ডাক্তারেরাই তার রোগের সঠিক ডায়োগনাইসিস করেছিলেন। কিন্তু তাকে অপারেশন করার উন্নত যন্ত্রপাতি ঢাকায় তখন ছিল না, এমনকি কলকাতাতেও ছিল না। তাকে লন্ডনে নিয়ে আসার পর জানা গেল ঢাকার ডাক্তারদের ডায়োগনাইসিস সঠিক। কিন্তু তারা চিকিৎসা করতে পারতেন না প্রয়োজনীয় ওষুধ ও যন্ত্রপাতির জন্য। ঢাকায় এখন উন্নত যন্ত্রপাতির অভাব নেই। কিন্তু অধিকাংশ যন্ত্রপাতিরই সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ নেই। ঠিকমতো তা ব্যবহারের আগে দূষণমুক্ত করা হয় না। ফলে ডাক্তারেরা সাফল্যজনক অপারেশন করেন, কিন্তু পোস্ট অপারেশন বা অপারেশন পরবর্তী ইনফেকশনে রোগী মারা যায়।

আমার চোখে ক্যাটারাক্ট ধরা পড়ায় ঢাকার এক বন্ধু চক্ষু চিকিৎসক আমাকে বলেছিলেন ‘তুমি রাজি হলে আমি অপারেশন করতে পারি। কোন অসুবিধা হবে না।’ আমি ভয়ে রাজি হইনি। লন্ডনে এসে অপারেশন করিয়েছি। অপারেশন টেবিলে শুয়ে দেখি ক্যাটারাক্ট অপারেশনের জন্য এক তরুণী পাকিস্তানী ডাক্তার অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে। আমি ভীত হয়ে ভাবলাম, যদি দেশী ডাক্তার দিয়েই চোখ অপারেশন করাব তাহলে ঢাকায় করালাম না কেন?

এখন ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস সাদা ডাক্তার নার্সের চাইতে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও আফ্রিকান ডাক্তার/নার্সে ভর্তি। কিছুদিন আগে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে লন্ডনের হ্যায়োয় এক হাসপাতালে মাসখানেক থাকার সময় আমার চিকিৎসক মণ্ডলীতে একজন নোয়াখালীর ডাক্তার দেখেছি। সিলেটি ডাক্তার দ্বারাও চিকিৎসিত হয়েছি।

আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, বিদেশ আমাদের দেশের ডাক্তারেরা যদি বিদেশী ডাক্তার দেয় সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চিকিৎসা করতে পারেন, তাহলে দেশে আমরা তাদের ওপর নির্ভর করতে পারি না কেন? ব্রিটেনে ন্যাশনাল সার্ভিসে কাজ করেন এমন এক ডাক্তারকে প্রশ্ন করতেই তিনি বললেন, চিকিৎসক হিসেবে আমাদের মধ্যে কোয়ালিটির অভাব নেই। অভাব ফেসিলিটির এবং অনেক ডাক্তারের মধ্যে অনেস্টির।

তিনি তার কথাটার ব্যাখ্যাও করেছেন। সরকারি হাসপাতালে উন্নত যন্ত্রপাতি কেনা ও মেনটেনেন্স নিয়েও চলে দুর্নীতি। উন্নত মানের যন্ত্রপাতি কেনার অর্থে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি কেনা এবং ব্যবহারের সময় সেগুলো দূষণমুক্ত করাও হয় না। যদিও সেজন্য ব্যয় বরাদ্দ আছে। সেই অর্থ দুর্নীতিবাজদের পকেটে যায়। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও যোগ্য চিকিৎসক আছেন এবং উন্নত যন্ত্রপাতি ও ওষুধপত্রও আছে। কিন্তু দেশে এখন একশ্রেণীর দুর্নীতিপরায়ণ বড় ডাক্তারের সিন্ডিকেট আছে। এরা চিকিৎসার নামে রোগীদের রক্ত শোষণ করে।

বাংলাদেশে সামান্য মাথা ধরার অসুখেও ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি সিন্ডিকেটের মেম্বার হলে বলবেন, আপনার রক্ত পরীক্ষা, কাশি পরীক্ষা, মলমূত্র পরীক্ষা ইত্যাদি দরকার। আগে এগুলো পরীক্ষা করিয়ে রিপোর্ট নিয়ে আসুন। তারপর চিকিৎসা। বলেই এই পরীক্ষার জন্য কাদের পরীক্ষাগারে যেতে হবে তার নাম লিখে দেন। এভাবে চিকিৎসক সিন্ডিকেট গরিব রোগীদেরও রক্ত শোষণ করে।

গত জুলাই মাসে আমি যখন ঢাকায় তখন আমার সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের এক আত্মীয়া, যিনি সন্তানসম্ভবা ছিলেন আমাকে বলেছেন, ভাই, আমি কি চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যেতে পারি? একটা ব্যবস্থা করে দেবেন? আমি বলেছি, ঢাকায় এত ভাল ভাল গাইনোলজিস্ট এবং গাইনো সার্জন থাকতে তোমার কলকাতায় যাওয়ার দরকার কি? আত্মীয়া বললেন, ভাল গাইনী অনেক আছেন, কিন্তু তাদের মধ্যে ডাকাতও আছেন। যদি তাদের হাতে পড়ি?

জিজ্ঞাসা করেছি, ডাকাত গাইনী কারা? তিনি জবাব দিয়েছেন অসংখ্য। কোন প্রেগনেস্ট মহিলা তাদের কাছে গেলে যার গর্ভের সন্তানের অবস্থান স্বাভাবিক তাকেও বলা হবে, আপনার কেস জটিল। আপনার সিজারিয়ান অপারেশন লাগবে। এভাবে এই অসাধু সিন্ডিকেট অনাবশ্যক অপারেশনের নামে হাজার হাজার টাকা কামায় এবং অসহায় নারীকে কষ্ট দেয়।

এই অভিযোগ একজনের নয়, বহুজনের। সামান্য প্রেগনেন্সির কেসেও বেশির ভাগ নারী এখন কলকাতায় বা সিঙ্গাপুরে দৌড়াতে চায়।

আমাদের দেশে ধনীদের সুচিকিৎসায় ব্যবস্থা আছে। তবু তারা বিদেশে যান। কারণ, দেশে দক্ষ চিকিৎসক আছেন, কিন্তু উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। বেসরকারি হাসপাতালগুলোও উন্নত যন্ত্রপাতি দ্বারা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। উন্নত যন্ত্রপাতি আমদানি হয়, তার রক্ষণাবেক্ষণ নিম্নমানের। একজন ডাক্তার তার রোগীকে বলেছেন, আমি সফল অপারেশন করব। কিন্তু অপারেশনের যন্ত্রপাতিগুলো নিয়মিত দোষণমুক্ত রাখা হয় কিনা জানি না। যে ওষুধ আপনাকে দেব তা নকল নয় তার নিশ্চয়তা আমি দিতে পারব না।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে এই ধরনের দুর্নীতি ও অব্যবস্থায় কথা জেনে সচ্ছল রোগীরা সিঙ্গাপুরে বা ব্যাঙ্ককে পালায়। দেশে চিকিৎসা করাতে চায় না। আর অধিকাংশ হাসপাতাল এত অপরিচ্ছন্ন যে তাতে রোগীর সুস্থতার বদলে অসুস্থতা বাড়ে। গরিব রোগীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। মানবেতর ব্যবহার পায়।

গত চার দশকে দেশের সব সেক্টরেই উন্নতি হয়েছে। চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে হয়েছে কি? মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সংখ্যা হু হু করে বেড়েছে, কিন্তু এর চিকিৎসা ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনার, সিঙ্গাপুর ও ব্যাঙ্ককের মতো উন্নত করার কোন ব্যবস্থা করা হয়েছে কি? একজনের পর একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসেছেন। কিন্তু চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে অবস্থাটা কি? সিঙ্গাপুর ও ব্যাঙ্ককে যদি পশ্চিমা দেশগুলোর মতো উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তাহলে উন্নয়নের এই জোয়ারের যুগে তা ঢাকায় করা সম্ভব নয় কেন?

লন্ডন, ৫ মার্চ, মঙ্গলবার, ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment