দশ দিগন্তে

এশিয়ায় গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

এক মার্কিন সাংবাদিক দীর্ঘকাল চীনে ছিলেন। চীনে কেন এক দলীয় শাসন বা কম্যুনিস্ট সরকার দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে, তার কারণ সম্পর্কে একটি বই লিখেছেন। তার বইটি খুবই আগ্রহ উদ্দীপক। তিনি লিখেছেন, চীনের সমাজ ব্যবস্থা অভিভাবক-তান্ত্রিক এবং কর্তৃত্ববাদী। পরিবারও চলে সেভাবে। পিতা যতদিন বেঁচে থাকেন তার কথাতেই পরিবার চলে। তার কথার উপরে কথা বলার কেউ নেই। তিনি মারা গেলে বড় ছেলে তার স্থান গ্রহণ করেন। কখনো কখনো মা সর্বময় কর্তৃত্ব গ্রহণ করেন।

মার্কিন সাংবাদিক লিখেছেন, যে-দেশে সমাজ ও পরিবার এক ব্যক্তির কর্তৃত্বে চলে, সে দেশে সরকারও কর্তৃত্ববাদী না হয়ে পারে না এবং জনগণ সেটাই মেনে নিতে অভ্যস্ত। তাই পশ্চিমাদের প্ররোচনায় সমাজের তরুণ অংশ যারা পশ্চিমা শিক্ষা বা প্রোপাগান্ডা দ্বারা প্রভাবিত, তারা কখনো কখনো তিয়েনমিনের মতো একদলীয় বা কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে ঘটনা ঘটাতে চায়। কিন্তু জনগণের সমর্থন পায় না। সফল হয় না।

লেখক উত্তর কোরিয়ার উদাহরণ টেনেছেন। পিয়ংইয়ং যদিও এখন পরমাণু শক্তির অধিকারী, কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অর্থনৈতিক উন্নতি তার ঘটেনি। তদুপরি উত্তর কোরিয়া ডিকটেটর-শাসিত। এতদসত্ত্বেও, এবং মার্কিন প্রচার প্রোপাগান্ডা সত্ত্বেও, উত্তর সম্পর্কে দক্ষিণ বিরূপ নয়। এটা দেখা গেছে উত্তর কোরিয়ার একনায়ক কিমের দক্ষিণ কোরিয়া সফরের সময়। উদ্বেল মানুষ কিমকে স্বাগত জানিয়েছে। তার গালে চুমু খেয়েছে। অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের ধারণা, দক্ষিণ কোরিয়াকে রক্ষার নামে মার্কিন সৈন্য দেশটিতে জাঁকিয়ে না বসলে দক্ষিণ কোরিয়া বহু আগে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে অভিন্ন হয়ে যেত।

মার্কিন সাংবাদিকের এই বইটি পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে চীন সম্পর্কে তার প্রতিপাদ্য বিষয়টি সারা এশিয়া সম্পর্কেই সত্য। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ এশিয়ার অধিকাংশ দেশের (ব্যতিক্রম জাপান, কিন্তু সেখানেও রাজতন্ত্র রয়েছে) পারিবারিক ও সামাজিক জীবনই কর্তৃত্ববাদী। পরিবারেও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী একজন কর্তা থাকেন, সমাজেও তাই। আফ্রিকায় যেমন গোষ্ঠীপ্রধান, এশিয়ায় তেমনই মোড়ল বা মুরুব্বি। এশিয়ায় যেসব দেশ পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর শাসকদের সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুসরণ করতে চেয়েছে, তারা অল্পদিনের মধ্যে সংসদীয় ব্যবস্থা নামেমাত্র রেখে হয় নিজেরা ডিকটেটর হয়ে বসেছেন, নয় সংসদীয় ব্যবস্থা বাতিল করে একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন।

মার্কিন সাংবাদিক ঠিকই বলেছেন, চীনে সরাসরি কম্যুনিস্ট ডিকটেটরশিপ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, অন্যান্য অনেক এশীয় দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গণতন্ত্রের নামে ইলেকটিভ ডিকটেটরশিপ বা নির্বাচিত একনায়কত্ব। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ দুই রাষ্ট্রে ভাগ হয়। কিন্তু দুই রাষ্ট্রেরই পার্লামেন্টে শক্তিশালী বিরোধী দল ছিল না। ভারতে প্রথমদিকে দু’চারজন ছিলেন, পাকিস্তানে মোটেই ছিল না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে নেহেরু একটানা ১৪ বছর ছিলেন। তিনি চরিত্রে গণতান্ত্রিক হলেও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিই তাকে দেশটির একনায়কে পরিণত করেছিল।

তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধীর বেলাতেও একথা সত্য। তার আমলেও লোকসভায় সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানাবার মতো বিরোধী দল ছিল না। এমনকি কংগ্রেস ভাগ হয়ে যাওয়ার পরেও বিভক্ত দলে এবং সরকারে ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন সর্বেসর্বা। বিরোধী দলগুলো এক হয়ে একবার তাকে ক্ষমতা থেকে সরালেও বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। ইন্দিরা ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন।

রাজীব হত্যার পরেও কিছুকাল কংগ্রেস এবং পরবর্তী পর্যায়ে বিরোধী দলগুলো সরকার গঠন করেছে। কোয়ালিশন করেও তারা বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। দীর্ঘকাল পর বিজেপি সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের পর নরেন্দ্র মোদীর ব্যক্তিত্ব ও কারিশমাকে মূলধন করে সরকার গঠন করেছে। ভারতের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা এসেছে। কিন্তু এই স্থিতিশীলতা ভারতের গণতন্ত্রের জন্য হিতকর হয়নি। যেহেতু বিজেপি হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাসী। এই হিন্দুত্ববাদ ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক নয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

পাকিস্তানের ইতিহাস আরও খারাপ। দেশটির প্রতিষ্ঠাতা মোহম্মদ আলী জিন্নাহ মুখে গণতন্ত্রের কথা বলতেন, কিন্তু চরিত্রে ছিলেন ডিকটেটর। সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তার প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর পদ নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তিনি গভর্নর জেনারেলের (বাস্তবে প্রেসিডেন্টের) পদ নেন। তার হাতেই ছিল সর্বময় কর্তৃত্ব। পাকিস্তান গণপরিষদে হাতেগোনা বিরোধী দলীয় সদস্য ছিল। তাদের কথা বলতে দেওয়া হতো না। বিরোধী সদস্য হিন্দু হলে তাকে বলা হতো ভারতের দালাল, পাকিস্তানের ও ইসলামের শত্রু।

জিন্নার পর প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী হন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। দেশটিতে কোনো বিরোধী দল গড়ে উঠতে দেওয়া হয়নি। শহীদ সোহরাওয়ার্দী বিরোধী দল গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। তাকে ‘রাষ্ট্রের শত্রু’, ‘ভারতের লেলিয়ে দেওয়া কুকুর’ আখ্যা দিয়ে পাকিস্তানের গণপরিষদে তার আসন বাতিল করা হয়।

লিয়াকত আলীর পর গণতন্ত্র কিছুদিন খোঁড়া পায়ে চলার পর সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। দীর্ঘকাল সামরিক শাসনের পর পাকিস্তানে আমেরিকান ছাতা এবং সামরিক বাহিনীর প্রযত্নে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে বটে, তাকে এক পাকিস্তানি সাংবাদিকই আখ্যা দিয়েছেন, গণতন্ত্র নয়, গণতন্ত্রের প্রেতাত্মা।

বাংলাদেশ যে একটি সশস্ত্র গণযুদ্ধ এবং একটি গণতান্ত্রিক দলের নেতৃত্বে জয়ী হয়ে দেশ স্বাধীন করার পরেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তাকে দীর্ঘকাল যুদ্ধ করতে হয়েছে তার কারণ ২৪ বছর পাকিস্তানের পূর্বাংশ হয়ে থাকার ফলে তার রাজনীতিতেও পাকিস্তানের গণতন্ত্রের প্রেতাত্মা এবং তার ফ্যাসিবাদী সামরিক শাসনের প্রভাব। এই দুই প্রেতাত্মাকে কাঁধ থেকে নামাতে স্বাধীনতার পরেও বাংলাদেশের মানুষকে ২১ বছর যুদ্ধ করতে হয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করলে কী হবে, মার্কিন সাংবাদিকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোও একক কর্তৃত্ববাদী। পরিবারে পিতা, সমাজে মোড়ল একনায়ক। রাষ্ট্রের কাঠামোতেও তাই এই কর্তৃত্ববাদেরই ছাপ পড়ে। মুখে আমরা সকলেই গণতন্ত্র চাই। কিন্তু মনে মনে রাষ্ট্র পরিচালনায় একজন লৌহমানব চাই, এই লৌহমানব বা মানবী যদি নির্ধারিত সময়ে একবার নির্বাচিত হন, তাহলেই সকলে খুশি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং একজন গণতান্ত্রিক সুশাসক ছিলেন। কিন্তু নরম মনের মানুষ ছিলেন। তাই ভারতের জনমনে তেমন দাগ কাটতে পারেননি। কিন্তু বিজেপির নরেন্দ্র মোদী, যার গুজরাটের শাসন-আমল কলঙ্কমুক্ত নয়, ব্যক্তিত্ব ও ক্যারিশমার জোটে তিনিও ভারতে প্রায় একনায়ক হয়ে উঠেছেন। জনগণ এখন পর্যন্ত তাকে পছন্দ করছে।

বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু তার দেশের নয়, সারা এশিয়ার একজন অসাধারণ নেতা, তিনি জাতি-রাষ্ট্রের স্থপতি হিসেবে জাতির পিতা, স্বাভাবিকভাবেই জাতি তার মধ্যে অভিভাবকত্ব ও পিতৃত্ব দেখতে চেয়েছে। এক্ষেত্রে নেহেরুর মতোই বঙ্গবন্ধু চরিত্রে গণতান্ত্রিক হয়েও রাজনীতিতে এবং সংসদেও একক কর্তৃত্ব লাভ করেছিলেন। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও সংসদে কোনো বিরোধী দল ছিল না। স্বাধীনতা যুদ্ধের সহযোগী ন্যাশনাল আওয়ামী (মুজাফফর) পার্টিরও একজন সদস্য নির্বাচিত হয়নি। এখানেও সামন্তবাদী ও কর্তৃত্ববাদী সামাজিক চেহারার পরিচয় পাওয়া গেছে। স্বাধীনতা লাভের পর সমাজ চেতনা যে রাতারাতি গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠেনি তার পরিচয় মেলে, বঙ্গবন্ধু এটা বুঝেছিলেন কিন্তু দ্রুত সমাজ বদলাতে গিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক বিরোধিতার শূন্যতার সুযোগ গ্রহণ করেছে একাত্তরের অগণতান্ত্রিক সাম্প্রদায়িক শক্তি এবং তাদের সহযোগী পাকিস্তান দ্বারা প্রভাবিত একদল সেনা অফিসার।

মার্কিন সাংবাদিকের মতে, পুরনো ও নতুন কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেই, বিশেষ করে যেসব এশিয়ান দেশে শিল্পবিপ্লব ঘটেনি, পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধার করা হয়েছে তাদের উচিত হবে না গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক বিরোধিতায় শূন্যাবস্থা বিরাজ করতে দেওয়া। এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের হাসিনা সরকার যদিও একটি গণতান্ত্রিক সরকার, কিন্তু সংসদে অথবা রাজনীতির মাঠে গণতান্ত্রিক বিরোধিতায় শূন্যাবস্থা বিরাজ করতে দেওয়া উচিত হবে না। সরকারের উচিত হবে এমন সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করা যাতে সমাজের বাইরের চেহারা যতই পাশ্চাত্যের অনুকরণে তথাকথিত আধুনিক হয়ে উঠুক, তার ভেতরের সামন্তবাদী ধর্মান্ধ এবং কর্তৃত্ববাদ পছন্দ করা কঠিন মনোভাব পরিবর্তন করার জন্য আর্থ-সামাজিক আন্দোলন শুরু করা। তার মতে, এশিয়ার অধিকাংশ দেশেই সমাজ বিপ্লব ছাড়া স্লোগাননির্ভর গণতন্ত্র সফল করা যাবে না। – ইত্তেফাক

[ লন্ডন, মার্চ শনিবার ২০১৯ ]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment