তৃতীয় মত

দেশটা বেদখল হয়ে থাকলে কারা দখল করেছে?

 আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

মনে হয় ড. কামাল হোসেন ইউরোপের শতাধিক বছর আগের মায়াবাদে দীক্ষা নিয়েছেন। গভীর হতাশায় ও মনের কষ্টে ভুগলে মানুষ এককালে মায়াবাদে দীক্ষা নিতো। ড. কামাল হোসেনের সাম্প্রতিক কথাবার্তা শুনলে মনে হয় গভীর রাজনৈতিক হতাশা ও মনের কষ্টে তিনি ইউরোপের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া মায়াবাদে দীক্ষা নিয়েছেন।

সম্ভবত আঠারো শতকের গোড়ায় একটা দর্শন জন্ম নিয়েছিল। তার নাম ছিল মায়াবাদ। সাধারণত জীবনযুদ্ধে গভীর হতাশ, মনোকষ্টের রোগী এবং সংসার-বিরাগীরাই এই মায়াবাদী দর্শনের আশ্রয় নিতেন।

মায়াবাদী দর্শনের মূল কথা ছিল, আমরা চোখের সামনে যা দেখছি তা বাস্তব নয়। এই যে চোখের সামনে দেখছি- পথের লোক হাঁটছে, কাঁদছে- এর কোনোকিছুই সত্য নয়, বাস্তব নয়। সবই মায়া, সবই দৃষ্টিবিভ্রম। এই অলীক মায়াবাদে ইংল্যান্ডের অনেক মানুষ দীক্ষা নিয়েছিল এবং সর্বত্র প্রচার করেছিল। ড. কামাল হোসেনের মতো তৎকালীন ইংল্যান্ডের অনেক জ্ঞানী-গুণী এই মায়াবাদে বিশ্বাসী হয়ে তার প্রচারে রত হয়েছিলেন।

এই যখন ইংল্যান্ডের অবস্থা, মানুষ মায়াবাদে বিশ্বাস হয়ে কর্মবিমুখ হয়ে উঠছে, তখন সচেতন জনগণের টনক নড়ল। তারা দেখল মায়াবাদীদের প্রভাবে দেশ অচল হয়ে যাচ্ছে। সামনে অন্ধকার ভবিষ্যৎ। তখন মায়াবাদ বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটা প্রতিকার পন্থা বের করল। পন্থাটা হল- মায়াবদ বিরোধীরা দলবেঁধে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতেন এবং যেখানে মায়াবাদীদের দেখতেন তাদের নির্মমভাবে পেটাতেন। আহত মায়াবাদীরা জিজ্ঞাসা করত- আপনারা আমাদের অকারণে পেটাচ্ছেন কেন? প্রহারকারীরা বলতেন- কই, আপনাদের পেটাচ্ছি? আপনারা যা দেখছেন, তা মায়া, চোখের বিভ্রম। এভাবে সারা দেশে মার খাওয়ার পর মায়াবাদীরা আর প্রচার চালাতে বেরোত না। মায়াবাদের অকাল মৃত্যু হল।

হঠাৎ এতকাল পর বাংলাদেশে কেন এই দর্শনের আবির্ভাব হল এবং ড. কামাল হোসেনের মতো বিজ্ঞ ব্যক্তি এই দর্শনে দীক্ষা নিলেন, তা আমি বুঝতে পারছি না। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তার জোটের শোচনীয় পরাজয়, তার দলের নির্বাহী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ভরাডুবি- দলের যে দু’জন জিতেছেন, তাদেরও একজনের দলীয় নেতা ও নির্দেশনা না মেনে সংসদে শপথ গ্রহণ তাকে হতাশার মহাসাগরে ডুবিয়েছে, একথা সত্য। জনগণের রাজনীতি না করে ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে ডুবে থাকলে জনগণের ম্যান্ডেট সাহসের সঙ্গে মানার সততা অনেকেরই থাকে না। ড. কামালের ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে এবং তার ফলেই তিনি মায়াবাদে দীক্ষা নিতে বাধ্য হয়েছেন কিনা জানিনা।

স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন দিবস পালনের নামে জাসদ (রব) কর্তৃক জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘এই দেশটা আমাদের সবার দখলে ছিল। সেটা এখন বেদখল হয়ে গেছে। আসুন আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের যে দেশটা বেদখল হয়ে গেছে সেটা আবার দখলে নেব। সংবিধানের মধ্যে দেশ শাসন করব। যে ঐক্যের ভিত্তিতে ১৯৭১ সালে দেশটা স্বাধীন হয়েছিল সেই ঐক্যের ভিত্তিতে দেশ শাসন করব।’

ইংল্যান্ডের এককালের মায়াবাদী দর্শনে দীক্ষা না নিলে কোনো ব্যক্তির পক্ষে, তিনি যতই জ্ঞানী হন এ ধরনের কথা বলা সম্ভব নয়। সবাই দেখছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে দেশের মানুষ দেশটার দখল ফিরে পেয়েছে; কিন্তু সেই দখল তারা ধরে রাখতে পারেনি। ১৯৭৫ সালে চক্রান্ত ও নির্মম হত্যাকাণ্ড দ্বারা একাত্তরের হানাদারদের দেশি অনুচরেরা দেশটি আবার দখল করে নেয়। এই সময় মস্কোর এক সেমিনারে ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, ‘একাত্তরের পরাজিত শত্রুরা দেশটা দখল করে নিয়েছে।’

তারপর দেশের জনতা শত্রুদের এই জবরদখল থেকে দেশকে উদ্ধারের জন্য আবার সংগ্রাম শুরু করেন। একাত্তরের সংগ্রামের মতো এই সংগ্রামেও তিনি ছিলেন না। একাত্তরে লাহোরে শ্বশুর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন (যদিও তিনি এখন নিজেকে একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী বলে দাবি করেন) এবং পঁচাত্তর-পরবর্তী জবর দখলকারীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় অক্সফোর্ডে নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ জীবন যাপন করেছেন। এখন দেশ যখন দেশের জনগণের মালিকানায় রয়েছে, তখন তিনি বলছেন, দেশটা বেদখল হয়ে গেছে। এটা কি মায়াবাদী দর্শনের প্রভাবের ফল? যা বাস্তব, তাকে ড. কামাল বলছেন অবান্তর, চোখের বিভ্রম।

দেশটা ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতার শত্রুরা দখল করে নেয়ার পর যে ড. কামাল অকপটে বলেছিলেন, দেশটা স্বাধীতার শত্রুরা দখল করে নিয়েছে, সেই দেশটা দীর্ঘ ২১ বছরের লড়াইয়ের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শত্রুর দখলমুক্ত হওয়ার পর এবং তিন তিনটি নির্বাচনে সেই দখলমুক্ত থাকার পর ড. কামাল প্রকাশ্যে বলছেন, দেশটা বেদখল হয়ে গেছে। তাহলে যে দলটি স্বাধীনতার যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং বর্তমানে ক্ষমতায় আছে সেই দলটি হচ্ছে দেশের শত্রু, আর যেসব দল ও নেতা স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, ত্রিশ লাখ নরনারীকে হত্যায় কোলাবরেটর হয়েছে, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় নেতাদের হত্যা করেছে, সংবিধান অপবিত্র করেছে, মুক্তিযুদ্ধের সব আদর্শ মুছে ফেলতে চেয়েছে, তারা হচ্ছে দেশের ও জনগণের মিত্র! তারা ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসতে পারলে জনগণ দেশের মালিকানা ফিরে পেত এটা বলছেন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী! তিনি তার প্রথম রাজনৈতিক জীবনে যে শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়েছেন, এখন তাদের দলে যোগ দিয়ে তাদের পাশে ওকালতি শুরু করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর চাইতে বড় ট্রাজিক ঘটনা আর কী হতে পারে?

দেশটা সত্যই বেদখল হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা ও জাতীয় নেতাদের হত্যার পর দেশটা সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানি চর, সাম্রাজবাদী অনুচর ও অশুভ সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে চলে যায়। কর্নেল তাহেরসহ মুক্তিযুদ্ধের ১৭শ’ অফিসার ও সেনাকে জেলের ভেতরে হত্যা করা হয়। ড. কামাল এ সময় ভাগ্যক্রমে বিদেশে ছিলেন। নইলে চার জাতীয় নেতার মতো তিনি এই পৈশাচিক শক্তির হাতে প্রাণ হারাতেন। এদের ভয়ে তিনি দীর্ঘকাল দেশে ফিরতে পারেননি। তার তিন বন্ধু অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহান, ড. নুরুল ইসলাম এবং ড. মোশাররফ হোসেনকেও দেশ ছাড়তে হয়েছিল। আজ সেই ঘাতক চক্রের তিনি প্রতিনিধি! যে ঘাতক জামায়াতের উঠতে-বসতে নিন্দা করেন, তাদের তিনি নেপথ্যের বন্ধু!

এই ঘাতক চক্রকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করায় এবং ক্ষমতা দখল করতে না দেয়ায় ড. কামাল এখন বলছেন, দেশ বেদখল হয়ে গেছে। তিনি যাদের একসময় ‘একাত্তরের পরাজিত শক্তি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন, তাদের শাসনামলে ‘বাংলাভাই’সহ অসংখ্য সন্ত্রাসী দলের উত্থান, কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টার, হুমায়ুন আজাদসহ অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবী হত্যা, শেখ হাসিনার ওপর ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে যারা তাদের শাসনামলে কলুষিত করেছে, যারা প্রকৃতই গণশত্রু, তারা ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জিতলে কী ভয়াবহ অবস্থা ঘটত, তা কি ড. কামাল হোসেন একবারও উপলব্ধি করেন না?

জনগণের প্রতিনিধি স্থানীয় একটি গণতান্ত্রিক দল এবং সরকারেরও ভুলভ্রান্তি হয়। আওয়ামী লীগ দেশ শাসনে অনেক ভুল করে থাকতে পারে, অন্যায় ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু বিএনপি ও জামায়াতের মতো কখনও স্বাধীনতার আদর্শ বিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করেনি, জাতির পিতাকে হত্যা করে তার মর্মান্তিক মৃত্যু দিবসকে উৎসবের দিন বানায়নি। ড. কামাল যে সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা, তার পবিত্রতা নষ্ট করেনি। কামাল হোসেন প্রেস ক্লাবের সভায় সংবিধান মতো দেশ শাসন করবেন বলে অসার দম্ভ প্রকাশ করেছেন। তিনি কোন্ সংবিধান মেনে দেশ শাসন করবেন? তার ঐক্যফ্রন্টের একটি শরিক দলের দ্বারা কর্তিত ও পরিবর্তিত সংবিধানের ধারা মেনে?

এই সংবিধানের পবিত্রতা উদ্ধার, পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব উদ্ধার এবং শাসন ব্যবস্থায় জনগণের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনার জন্য যারা ২১ বছর জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছে, তাদের সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের সংশ্লিষ্টতা ছিল খুব কম। তাই অনায়াসে বলতে পেরেছেন, আওয়ামী লীগ ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আবার জয়ী হওয়ার ফলে দেশটা বেদখল হয়ে গেছে।

দেশটা যে জনশত্রুদের জবর দখল থেকে মুক্ত হয়েছে এবং মুক্ত রয়েছে এই সত্যটা হয়তো মায়াবাদী দর্শনের প্রভাব অথবা নিজের বার্ধক্যজনিত বিভ্রান্তির জন্য তিনি বুঝতে পারছেন না। অতীতে যারা দেশটিকে অর্ধ তালেবানি রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তারা জয়ী হলে বাংলাদেশে কী ভয়াবহ অবস্থা ঘটত তা এখন কল্পনা করাও যায় না। সিরিয়ায় তথাকথিত ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর (এখন তা পতনের মুখে) যেভাবে লাখ লাখ নরনারীকে এক বস্ত্রে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল, বাংলাদেশে সেই অবস্থার পুনরাবৃত্তি হতো। ড. কামালকেও ইরানের বনিসদরের মতো দেশ ছেড়ে পালাতে হতো।

হাসব, না কাঁদব? যে দেশটা জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের ফলে শত্রুর কবল মুক্ত হয়েছে, সেই দেশটায় জনগণের দখল প্রতিষ্ঠার নামে আবার জনশত্রুদের দখল ফিরিয়ে আনার জন্য ড. কামাল হোসেন এখনও চক্রান্ত করছেন। তার সহচর হলেন আসম আবদুর রব এবং ডা. জাফরুল্লার মতো বারবার ভোল পাল্টানো ব্যক্তিরা।

ইতিহাসের আদালতে এদের জন্য নিশ্চয়ই চরম দণ্ড অপেক্ষা করছে। – যুগান্তর

লন্ডন, ৯ মার্চ, শনিবার, ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment