দশ দিগন্তে

নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির প্রোপাগান্ডা প্রসঙ্গে

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী-

বাংলাদেশের একটি সুশীল সমাজ এবং সুশীল কলামিস্টদের মুখে এবং কলমে এখন একটিই ধুয়া, সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে জাল ভোটের ছড়াছড়ি হয়েছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে শুধু রাতভর জাল ভোটপত্রে ছাপমারা চলেছে। এই অভিযোগ তুলে পরাজিত বিএনপি-জামায়াত চক্র এবং তাদের পোষা ঐক্যফ্রন্ট নিজেদের পরাজয়ের লজ্জা ঢাকতে চাইছেন এবং তাদের সুশীল কলমিস্টরা গোয়েবলসের মতো একটি মিথ্যাকে শতবার বলে সত্য প্রমাণের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

কথায় বলে চোরের সাক্ষী মাতাল। বাংলাদেশের সুশীলদের প্রচারণার সাক্ষী একমাত্র আমেরিকা, তাও পুরো প্রশাসন নয়, হিলারি সমর্থক অংশটি। যে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন গত দুই দফা ধরে বিতর্কিত, তারা বলছেন বাংলাদেশের নির্বাচন সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক হয়নি। এ যেন সুচ বলছে চালুনিকে তোর কেন এতো ফুটো? জর্জ বুশ জুনিয়র ও আল গোরের মধ্যে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের সময় জর্জের পিতা কর্তৃক নিযুক্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের পক্ষপাতিত্ব এবং ফ্লোরিডায় যান্ত্রিক ভোটদান পদ্ধতিতে বিরাট কারসাজির অভিযোগ কি ওঠেনি?

বুশ ও আলগোরের ভোটের ব্যবধান এতোই সামান্য ছিলো যে, কে জয়ী হয়েছেন তা বলা যাচ্ছিল না। ফলে কে বিজয়ী হয়েছেন তা ঘোষণা করা স্থগিত রাখা হয়। আল গোরকে এই নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করার জন্য তার আইনজীবীরা পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি মার্কিন রাজনীতিকে বিতর্কমুক্ত রাখার বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে তাতে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায় এবং জর্জ বুশের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখাচ্ছিলেন যে বিচারকেরা, তাদের সিদ্ধান্তে বুশ জুনিয়র প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এবারের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও হিলারি ক্লিনটনের জয় অবধারিত ধরে নেওয়া হয়েছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো এক লুনাটিক চরিত্রের লোক আমেরিকার মতো সুপার পাওয়ারের প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াতে পারেন এটাই ছিলো অনেকের বিস্ময়। সেই ট্রাম্প যখন সত্য সত্যই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, তখন সারা বিশ্ব হতবাক হয়েছে; কিন্তু টাম্প হোয়াইট হাউসে ঢোকার পর নির্বাচনী প্রচারণায় তার দুর্নীতি, ব্যাপক অনিয়ম, কারসাজি ও রাশিয়ান কানেকশনের যে গুরুতর অভিযোগ ওঠে তাতে ট্রাম্পকে ইমপিচ করার দাবি উঠেছিল। তার ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত চলছে এবং এখন শোনা যাচ্ছে, তাকে এখনই ইমপিচ করা না হলেও তার প্রেসিডেন্সির মেয়াদ শেষ হলে বিচারে সোপর্দ করা হবে। এই আমেরিকা যদি বলে বাংলাদেশের নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে, তাহলে তাদের মুখের উপর বলে দেওয়া উচিত, আগে আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখুন।

বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনে অনিয়ম হয়নি তা নয়। হয়েছে, তবে তা বিএনপি আমলের ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচন এবং মাগুরা-২ এর উপ-নির্বাচনের মতো অতো ব্যাপক নয়। মাগুরায় ভোটের দিন তো প্রাণভয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকেই মাগুড়া ছেড়ে পালাতে হয়েছিল। আওয়ামী লীগকে বিএনপি আমলে অনুসৃত নির্বাচনকালীন অনিয়মের লেগাসি কিছুটা বহন করতে হয়, তবে অতোটা ব্যাপকভাবে নয়। নির্বাচনে সেই বিএনপি আমলে প্রবর্তিত ও অনুসৃত ভোট জালিয়াতি সম্পূর্ণ দূর হবে, ক্ষমতাসীন দল বা দলগুলোর অধীনে পর পর কয়েক দফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে। ঘোলা পানি একদিনে পরিষ্কার করা যাবে না। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করেও নয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিটি আওয়ামী লীগই দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে প্রবর্তন করেছিল। তারপর বিএনপি’র রাজাকার রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস, অধ্যাপক ইয়াজ উদ্দীনের হাতে পড়ে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির কী হাল হয়েছিল তা এখন সকলের জানা। যে আকবর আলী, সুলতানা কামাল প্রমুখ এখন আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গুণাগুণ করছেন, তারা ইয়াজ উদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে ত্রাহি মধুসূদন ডাক ছেড়ে পলায়ন করেছিলেন।

সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে অবশ্যই কিছু অনিয়ম হয়েছে। জাল ভোটও পড়েছে। কিন্তু তা এমন পর্যায়ের নয় যে, তাতে ইলেকশন রেজাল্টের কোনো হেরফের হয়েছে। পৃথিবী এখন গ্লোবাল ভিলেজ। লন্ডনে বসে আমার গ্রাম সুদূর উলানিয়া থেকে খবর পাই দু’মিনেটে। এবারের নির্বাচনের পরে দেশের অধিকাংশ জেলায় দল নিরপেক্ষ বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, এমন কি ঢাকা ঘুরে আসা দু’চারজন বিদেশি পর্যবেক্ষকের সঙ্গে আলাপ করেছি। তাদের এক কণ্ঠ, এক মত, এবারের নির্বাচনে কেন্দ্রবিশেষে ভোট জালিয়াতি হয়েছে। এটা সরকারের নির্দেশে হয়নি, ক্ষমতাসীন দলের কোনো কোনো অতি উত্সাহী অংশের দ্বারা হয়েছে। তাতে নির্বাচনে ইতরবিশেষ কিছু ঘটেনি। যদি এই অনিয়ম না ঘটতো তা হলেও আওয়ামী লীগ কমফোর্টেবল মেজরিটি পেতো। বিএনপির সদস্য সংখ্যা হয়তো পাঁচ থেকে কুড়ি পর্যন্ত বাড়তো। জাতীয় পার্টির সদস্য সংখ্যা কমতো। এটা হলে ভালো হতো। ড. কামাল হোসেন এবং তার সুশীল কলামিস্ট ও বুদ্ধিজীবীরা গোয়েবলসের মতো গলা ফাটিয়ে বলতে পারতেন না, সব ঝুটা হায়।

আমি জানি না, ব্যক্তিগতভাবে বার বার নির্বাচনে পরাজয় এবং দলীয়ভাবেও নির্বাচনে ভরাডুবির পর ড. কামাল হোসেন জনসমক্ষে কিভাবে মুখ দেখান এবং দাবি করেন, সাম্প্রতিক নির্বাচনে তাদের খিচুরি ফ্রন্টের জয়লাভের সম্ভাবনা ছিল? মাঠে আওয়ামী লীগের কোনো শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ ছিল না। মানুষ ভোট দেবে কাকে? বিএনপি ছিল বিপর্যস্ত এবং নেতৃত্বহীন। ৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের পর জামায়াত কোমরভাঙা। নির্বাচনে অংশ গ্রহণের জন্য ড. কামাল হোসেন ও তার মতো জনগণের দ্বারা বার বার প্রত্যাখ্যাত কয়েকজনকে নেতা হিসেবে হায়ার করতে হয়েছে বিএনপিকে।

এই হায়ার করা নেতাও নির্বাচনে চতুর্থ দফা হারের ভয়ে নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে রাজি হননি। সেনাপতিবিহীন সৈন্যবাহিনী যুদ্ধ করতে পারে কি? এশিয়া আফ্রিকার দেশগুলোতে মানুষ এখনো ভোট দেয় শক্তিশালী নেতা এবং শক্তিশালী দলকে। ভারতের গত নির্বাচনে বিজেপি নরেন্দ্র মোদীর নামে ভোট পেয়েছে। বাংলাদেশের গত নির্বাচনে বিএনপি ছিল ভগ্নশিবির, তার হায়ার করা নেতাও যুদ্ধে স্বয়ং নামতে সাহসী নন। তা হলে দেশের মানুষের ইচ্ছা থাকলেও শেখ হাসিনার মতো ক্যারিশম্যাটিক শক্তিশালী নেতৃত্বের বদলে কোন্ নেতা বা কোন্ দলকে ভোট দেবে? বিএনপির ঐক্যফ্রন্টকে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ভেবে আওয়ামী লীগ কিছুটা ভয় পেলেও বাস্তবে আওয়ামী লীগের জন্য ঐক্যফ্রন্ট ছিল গোঁদা পায়ের লাথি।

বিএনপি যে এখন নির্বাচনে জালিয়াতি তাদের পরাজয়ের কারণ বলে প্রোপাগান্ডা চালাতে চাচ্ছে তারা কি নির্বাচনের আগেই জানতেন না, নেতৃত্বহীন দুর্বল সংগঠনটির পক্ষে আওয়ামী লীগের মহাজোটের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তারা জয়ী হবেন না? হায়ার করা নেতারা তাদের জন্য লায়াবিলিটি, অ্যাসেট নয়? অনেকে বলেন, বিএনপির ভাঙা হাটের বহু নেতাই এটা জানতেন, সেজন্য তাদের নির্বাচন প্রোপাগান্ডায় এবং নির্বাচনের দিনেও ভোটারদের মধ্যে সক্রিয় থাকতে দেখা যায়নি। মনে হচ্ছিল, বিএনপির গোলরক্ষকেরাও গোল রক্ষায় উৎসাহী নন।

ভোট জালিয়াতির জন্য যদি ঐক্যফ্রন্টের পরাজয় ঘটতো, তাহলে দেখা যেতো পরাজয়ের পর তারা জালিয়াতির প্রতিবাদে আরো ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। ঐক্য ভেঙে পরাজয়ের জন্য পরস্পরকে তারা দোষারোপ করতো না। ড. কামাল হোসেন ফ্রন্টের ঐক্য রক্ষা করবেন কী, নিজের ভাঙা ফোরামের ঐক্য রক্ষা করতে পারছেন না। তার গণফোরাম থেকে নির্বাচিত সবেধন দুই নীলমনির একজন দলের নির্দেশ অমান্য করে সংসদে শপথ নিয়েছেন। তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি হয়তো মনে মনে হাসছেন, যাক বাবা, সিন্দাবাদের দৈত্যের কবল থেকে বাঁচলাম।

গণফোরামের অন্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোকাররম খান আমার তরুণ বন্ধু। তার সঙ্গে আমার টেলিফোনে যে কথা হয় তাতে বুঝতে বাকি থাকে না, তিনিও বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে চান। এই মুহূর্তে জাতীয় সংসদে শপথ নিতে চান। কেবল ড. কামাল হোসেনের প্রতি দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত আনুগত্যের জন্য পারছেন না। আমার ধারণা তিনি সুযোগ পেলেই শপথ গ্রহণ করবেন। তখন গণফোরামের নিঃসঙ্গ নেতার অবস্থা কী দাঁড়াবে?

‘হারাধনের একটি ছেলে

কাঁদে ভেউ ভেউ

মনের দুঃখে বনে গেল

রইলো না আর কেউ।’ – ইত্তেফাক

লন্ডন, ২৩ মার্চ, শনিবার, ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment