মহান মে দিবস আজ

অনলাইন ডেস্ক –

মহান মে দিবস আজ। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের রাজপথে যে আন্দোলন হয়েছিল তারই ১৩৩তম বার্ষিকী আজ। আজকের এই দিন এলেই শ্রমিকের অতীত ইতিহাসের কথা সামনে চলে আসে। চলে আসে অমানবিক অত্যাচার আর নির্যাতনের ইতিহাস। কিন্তু সেই অত্যাচারের দিন আর নেই। এই আন্দোলনের ফলেই শ্রমিক আজ পেয়েছে তাদের ৮ ঘণ্টা শ্রমের অধিকার। তাই আজ যথাযথ মর্যাদায় বিশ্বে পালিত হবে বিশ্ব শ্রমিক দিবস।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হবে মহান মে দিবস। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচী নেয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে শ্রমিক অধিকার ও দায়িত্ব কর্তব্য নিয়ে আলোচনা সভা, র‌্যালি ও শোভাযাত্রা। এছাড়া দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা এইচ এম এরশাদ পৃথক বাণী দিয়েছেন। আজ সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

আজ মে দিবস উপলক্ষে অবিচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে জোর সংগ্রামের শপথ নেবে শ্রমিকরা। শুধু অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন নয়, তাদের আন্দোলন সংগ্রামের অনুপ্রেরণার উৎস এই দিন। যাদের ঘামের বিনিময়ে সচল রয়েছে অর্থনীতির চাকা সেই শ্রমিকদের শোষণ বঞ্চনার অবসান ঘটার স্বপ্ন দেখার দিনও বটে। কিন্তু শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই দিন এমনি আসেনি। দিনটি প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে রক্তঝরা ইতিহাস। তাই ইতিহাসের পাতায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৮৯০ সাল থেকে ১ মে বিশ্বব্যাপী পালন হয়ে আসছে ‘মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন মে দিবস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভের মাধ্যমে সারা বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণীর মাঝে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের ওপর এ দিবসের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এর প্রভাবে শ্রমিকদের দৈনিক কাজের সময় ১৬ থেকে নেমে আসে ৮ ঘণ্টায়। বিশ্বের সব দেশের শ্রমিকরা এর মাধ্যমে তাদের শ্রমের উপযুক্ত মর্যাদা পেতে শুরু করে। নিজেদের অধিকার আদায়ে তারা এগিয়ে যায় সামনে। মেহনতি মানুষ মুক্তি পেতে শুরু করে তাদের শৃঙ্খলিত জীবন থেকে। বিশ্বের ইতিহাসে সংযোজিত হয় সামাজিক পরিবর্তনের আরেকটি নতুন অধ্যায়।

মে দিবস গোটা পৃথিবীর শ্রমজীবী সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচনা করার দিন। শ্রেণী-বৈষম্যের বেড়াজালে যখন তাদের জীবন বন্দী ছিল তখন মে দিবসের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খুলে যায় তাদের শৃঙ্খল। এ ফলে আস্তে আস্তে লোপ পেতে শুরুর করে সমাজের শ্রেণী-বৈষম্য। বৈষম্য ও শোষণমুক্ত একটি সমাজ গোটা বিশ্বকে উপহার দিল এই মে দিবস। মালিকপক্ষের সঙ্গে শ্রমিকের যে উঁচু-নিচু সম্পর্ক ছিল তা এক সময় সমতলে চলে এলো শুধু মে দিবসের স্বীকৃতির ফলেই। তারা বলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ। এই দেশে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা অনেক। মে দিবসের সম্মানার্থে বাংলাদেশেও ১ মে সরকারী ছুটির দিন। এদিন শ্রমিকরা মহা উৎসাহ ও উদ্দীপনায় পালন করে মে দিবস। তারা তাদের পূর্বসূরিদের স্মরণে আয়োজন করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের। শ্রমিক সংগঠনগুলো মে দিবসে আয়োজন করে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ও কল্যাণমুখী কর্মসূচীর। বাংলাদেশের শ্রমিকরা এদিন আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপন করে মহান মে দিবস। ঐতিহাসিক মে দিবসের তাৎপর্যপূর্ণ অবদান শ্রমিক শ্রেণীকে আগলে রেখেছে। যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামী চেতনা এখন শ্রমজীবীদের ভূষণ। ১৮৮৬ সালের রক্তঝরা সেই ১ মে এখন সবার কাছে অবিচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে জোর সংগ্রামের শপথ গ্রহণের দিন। সামনে এগিয়ে যাওয়ার মূলমন্ত্র। তারা বলেন, প্রতি বছর মে দিবস এলেই মেহনতি শ্রমজীবী মানুষের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ন্যায়সঙ্গত দাবির কাছে মাথা নোয়াতে হয়। শ্রমিকের আন্দোলনের কারণে আজ ৮ ঘণ্টা কাজ করার স্বীকৃতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা আইএলও প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই শ্রমিকের এ দাবিকে আইনে পরিণত করেছে। তবে দুঃখের বিষয় যাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন আজ বাংলাদেশের সেইসব শ্রমজীবী মানুষের কাছে দিনটির তাৎপর্য আজও ভালভাবে পৌঁছায়নি। অনেক দিনমজুর, গৃহশ্রমিক জানে না মে দিবস কি।

মে মাসের প্রথম দিনটিকে পৃথিবীর অনেক দেশে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হয়। এই দিনটি মে দিবস নামেও পরিচিত। বেশকিছু দেশে মে দিবসকে ‘লেবার ডে’ হিসেবে পালন করা হয়। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আজ বুধবার পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা উপযুক্ত মজুরি আর দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।

মে দিবস প্রতিষ্ঠার আগে কল-কারখানায় অসহনীয় পরিবেশে প্রতিদিন ১৬ ঘণ্টা কাজ করতে হতো শ্রমিকদের। বিপরীতে মজুরি মিলত নগণ্য, শ্রমিকরা খুবই মানবেতর জীবনযাপন করত। ক্ষেত্রবিশেষে তা দাসবৃত্তির পর্যায়েও পড়ত। ১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের একদল শ্রমিক দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। তাদের এ দাবি কার্যকর করার জন্য তারা সময় বেঁধে দেয় ১৮৮৬ সালের ১ মে। কিন্তু কারখানা মালিকরা এ দাবি মেনে নেয়নি। ৪ মে ১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা হাল্কা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর হে-মার্কেট নামক এক বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকরা মিছিলের উদ্দেশে একত্রে জড়ো হয়। ১৮৭২ সালে কানাডায় অনুষ্ঠিত এক বিশাল শ্রমিক শোভাযাত্রার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়েই এটি করা হয়েছিল। আগস্ট স্পিজ নামে এক নেতা জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশে কিছু কথা বলছিলেন। হঠাৎ দূরে দাঁড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরণ ঘটে।

এতে এক পুলিশ নিহত হয়। পুলিশবাহিনী তৎক্ষণাৎ শ্রমিকদের ওপর অতর্কিতে হামলা শুরু করে যা সংঘাতের রূপ নেয়। ১১ জন শ্রমিক এতে শহীদ হয়। পুলিশ হত্যা মামলায় আগস্ট স্পিজসহ আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ নবেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লুইস লিং নামে একজন একদিন পূর্বেই কারাভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন। অন্য একজনের পনেরো বছরের কারাদণ্ড হয়। ফাঁসির মঞ্চে আরোহণের পূর্বে আগস্ট স্পিজ বলেছিলেন, আজ আমাদের এই নিঃশব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে। ২৬ জুন, ১৮৯৩ ইলিনয়ের গবর্নর অভিযুক্ত আটজনকেই নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেন। এ আন্দোলনের ফলেই শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করার দাবি স্বীকৃতি পায়। এরপর থেকেই মে দিবস প্রতিষ্ঠা পায় শ্রমিকদের দাবি আদায়ের দিন হিসেবে। পরবর্তীতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার।

দিনটিকে উদযাপন করার জন্য রাঙ্গামাটি জেলা শ্রমিক লীগের উদ্যোগে আজ বিকাল সাড়ে তিনটায় বিশাল র‍্যালির আয়োজন করা হয়েছে। র‍্যালির শেষে আওয়ামী লীগের জেলা কার্যালয়ে এ উপলক্ষে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার এমপি।

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment