কালের আয়নায়

আমার এবারের স্বদেশ সফর

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

স্বদেশ ঘুরে এলাম। ১২ থেকে ২৭ এপ্রিল। কিন্তু দুই সপ্তাহের এই স্বদেশ সফরটা এবার তেমন সুখের হয়নি। ঢাকার মাটিতে পা দেওয়ার আগেই শুনলাম শ্রীলংকায় ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনা। প্রায় তিনশ’র মতো নিরীহ নারী-পুরুষ ও শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। তার মধ্যে বাংলাদেশের শিশু জায়ানও আছে। তার বাবাও গুরুতর আহত। মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে হচ্ছে।

শিশু জায়ান বঙ্গবন্ধুর পরিবারের শেখ সেলিমের আদরের নাতি। ফুটফুটে ছেলে। হাসি-খুশিতে নানার বাড়ি মুখর রাখত। শ্রীলংকায় বাবা-মায়ের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে লাশ হয়ে ঢাকায় ফিরে এসেছে। আমি ঢাকায় পৌঁছে শোকার্ত পরিবারকে সান্ত্বনা জানাতে গিয়েছিলাম। দেখি, শেখ সেলিমের চোখে পানি। মনে মনে শ্রীলংকার এই শিশুঘাতী, নারীঘাতী বর্বরতার নিন্দা জানিয়েছি। কিন্তু কাকে অভিশাপ দেব? তথাকথিত ইসলামী জঙ্গিদের? না, কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের?

নিজে অসুস্থ ছিলাম। শরীরের অসুস্থতার সঙ্গে মানসিক আঘাত জড়িত হয়ে ঢাকায় আমার দুই সপ্তাহের দিনগুলোকে সোনার খাঁচায় রাখেনি। রোজ খবরের কাগজে ছাপা হচ্ছিল কিশোরী মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতের ছবি। তাকে যৌন হয়রানি ও আগুনে পুড়িয়ে মারার বীভৎস কাহিনী। এই ছবি দেখে, এই কাহিনী পাঠ করে যে কোনো পিতার বুক ভেঙে যাওয়ার কথা। আমারও ভেঙেছে। আমি এই নিষ্পাপ কিশোরী মেয়েটির ছবির দিকে তাকাতে পারিনি। কিন্তু যে ক’দিন ঢাকায় ছিলাম, রোজই কাগজ খুললেই এই কিশোরীর ছবি এবং তাকে পুড়িয়ে মারার নৃশংস কাহিনী দেখতে ও পড়তে হয়েছে।

রাগে, ক্ষোভে, শোকে অন্ধ হয়ে ভেবেছি, ‘আদিম হিংস্র মানবিকতার আমি যদি কেউ হই।’ পরক্ষণেই বাস্তবতায় ফিরে এসেছি। ভেবেছি, শুধু আমি নই, দেশের মানুষ কত অসহায়। দিনের পর দিন নারী নির্যাতনের সংখ্যা বাড়ছে। নরপশুদের আইন নাগালে পায় না। আইনের ঊর্ধ্বে যে শাসক, যে আইনের রক্ষক এবং ধর্মের রক্ষক, তারা অপরাধীকে আশ্রয় দেয়। লাখ লাখ টাকার নেপথ্যে খেলা চলে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী যে খেলা চলেছে নুসরাত জাহান রাফির হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারেও।

এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা সোনাগাজী (ফেনী) মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল সিরাজ-উদ-দৌলা। তিনি জামায়াতি এবং বহু অপরাধের একজন দাগি আসামি। তার যৌন হয়রানির শিকার নুসরাতসহ আরও অনেক মাদ্রাসাছাত্রী। এই প্রিন্সিপালের অভিভাবক এবং হত্যা চক্রান্তের সাহায্যকারী হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছেন স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা। নুসরাতকে হয়রানির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন স্থানীয় থানার এক পুলিশ অফিসারও। অর্থাৎ এক অসহায় তরুণীর বিরুদ্ধে ধর্মের রক্ষক, সমাজ রক্ষক ও আইনের রক্ষকদের কী অভূতপূর্ব জোট।

বাংলাদেশের সর্বত্র এ ধরনের জোট গড়ে ওঠার ফলেই নারী ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বাড়ছে। বহু ক্ষেত্রে ধর্ষকরা ধরা পড়ছে। তারা নব্য ধনীদের অথবা ক্ষমতাশালীদের বখাটে সন্তান হলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। শাস্তি হয় না। মামলা ধামাচাপা পড়ে। আর ধর্ষিতা গরিব ঘরের নারী হলে, তার বিচার নীরবে-নিভৃতে কাঁদে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতসহ এশিয়ার সব দেশেই নারী নির্যাতন ও নারী ধর্ষণ, গণধর্ষণ এখন ব্যাপকভাবে বেড়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোতেও বেড়েছে। ভারতে নার্সিংয়ের এক অল্প বয়সের ছাত্রী বয়ফ্রেন্ডসহ রাতে বাসে চেপে বাড়ি ফিরতে গিয়ে নিষ্ঠুরভাবে ধর্ষিত হয়। দৈহিক নির্যাতনেরও শিকার হয়। হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। ফলে সারা ভারতে তোলপাড় ওঠে। জনক্রোধের মুখে সরকারকে ধর্ষণের দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রবর্তন করতে হয়।

আমার ধারণা, বাংলাদেশে নুসরাত হত্যার প্রতিক্রিয়ায় সারাদেশে যে তোলপাড় শুরু হয়েছে, তাতে বর্বর হত্যাকারীরা শাস্তি এড়াতে পারবে না। মামলা ঝুলিয়ে রেখে জনক্রোধ স্তিমিত হলেই অপরাধীদের বাঁচানোর যে ব্যবস্থা করা হয়, এবার সম্ভবত তা করা যাবে না। কারণ, নুসরাত হত্যাকাণ্ডের বর্বরতার কোনো তুলনা নেই। লন্ডনে সিরিয়াল কিলার বা রেপিস্টের কাহিনী পড়েছি। ধর্ষণের পর হত্যা এবং লাশ ফ্রিজারে লুকিয়ে রাখার খবরও পড়েছি। এগুলো একক হত্যাকাণ্ড।

কিন্তু নুসরাত হত্যাকাণ্ড দিনদুপুরে ঠাণ্ডা মাথায় সংঘবদ্ধ হত্যাকাণ্ড। প্রথমে মাদ্রাসা প্রিন্সিপালের হাতে নুসরাতের যৌন নির্যাতন। তাতে নুসরাতের অভিযোগে প্রিন্সিপালের জেল হলে তার নির্দেশে ওই মাদ্রাসার কিছু ছাত্রছাত্রী মিলেই তাকে পরিকল্পিতভাবে গায়ে আগুন লাগিয়ে হত্যা করে। নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে এ ধরনের বর্বরতার ঘটনা বিরল। এই নরপশুদের প্রকৃত বিচার ও চরম দণ্ড দিতে হলে শুধু মানব বন্ধন নয়, জনক্রোধকে আরও সংঘবদ্ধ হতে হবে।

দেশে ধর্মান্ধতা যখন বেড়েছে, তাবলিগ, হেফাজত প্রভৃতি ধর্মভিত্তিক সংগঠন ও দলের শুধু সামাজিক নয়, রাজনৈতিক শক্তি বেড়েছে, তখন সমাজে নৈতিক শক্তি ও মূল্যবোধের এত অধঃপতন কেন, তা আজ গবেষকদের চিন্তা করে দেখা দরকার। অন্যান্য কারণের মধ্যে একটি কারণ আমার কাছে বড় হয়ে দেখ দিয়েছে। বাংলাদেশে নারী ধর্ষণের খবর পাঠ করলেই দেখা যায়, অধিকাংশ ধর্ষিত মাদ্রাসাছাত্রী এবং অধিকাংশ ধর্ষক মাদ্রাসার শিক্ষক অথবা ছাত্র। গার্মেন্টসের নারী কর্মীরাও ধর্ষিতদের একটা বড় অংশ।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর গার্লস মাদ্রাসা ও গার্লস মাদ্রাসা-কলেজের সংখ্যা হুহু করে বেড়েছে। গার্মেন্টস কারখানার সম্প্রসারণও হয়েছে বিশালভাবে। এর ফলে বিশাল নারী বাহিনী ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়েছে। শিক্ষা লাভ ও কর্মসংস্থানের জন্য এই যে বিশাল নারী বাহিনী ঘর ছেড়ে বেড়িয়েছে, না সামাজিক, না সরকারিভাবে তাদের কোনো রক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে। মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতা এখনও সমাজকে এতটা প্রভাবিত করে রেখেছে যে, নারীমুক্তি ও নারীর সম্মান এখনও সেখানে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং নারীকে ‘তেঁতুলের মতো রসাত্মক’ আখ্যা দেওয়ার মতো ধর্মীয় নেতা বাংলাদেশে এখনও আছেন, যারা নারী শিক্ষার ও নারী স্বাধীনতারও বিরোধী। বাংলাদেশে অবাধ নারী নিগ্রহের পরিস্থিতি বিরাজ করার এটাও একটা কারণ বলে আমার মনে হয়। এবারের স্বদেশ সফরে এই অভিজ্ঞতাটা আমি অর্জন করেছি।

লন্ডন, ৩ মে শুক্রবার, ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment