দশ দিগন্তে

বাংলাদেশের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়েছে হরতাল

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

সম্ভবত ‘সাত দশকের হরতাল ও বাংলাদেশের রাজনীতি’ এই দশকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ। বাংলাদেশের ভূখ্লের রাজনীতিতে হরতাল সবসময়েই উল্লেখযোগ্য প্রকরণ ছিল। হরতালকে জনপ্রিয় ও সফল রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। তিনি এ ধরনের কর্মসূচির নাম দিয়েছিলেন ধর্মঘট। ১৯১৯ সালের ৬ এপ্রিল ব্রিটিশ শাসকদের প্রবর্তিত কুখ্যাত নিপীড়নমূলক রাওলাট অ্যাক্ট বাতিলের দাবিতে তিনি প্রথম হরতাল ডাকেন। সমগ্র ভারতবর্ষ এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত, শহর ও গ্রাম হরতাল পালন করল। হিন্দু ও মুসলিমরা একাত্ম হয়ে গিয়েছিল। গান্ধীজী নিজেই লিখেছেন, ‘এটা ছিল অভূতপূর্ব দৃশ্য’।

হরতালের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক নেই; কিন্তু গান্ধী হরতালকে জনগণের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য করার জন্য এর সঙ্গে ধর্মের রসায়ন ঘটিয়েছেন। রাজনীতিতেও তার এ রসায়ন আমরা দেখতে পাই। এর ভালো-মন্দ যাই হোক, হরতাল ব্রিটিশ ভারতে সর্বাধিক শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। এই নিরস্ত্র হরতালের মুখে ব্রিটিশ রাজের প্রবল সামরিক শক্তিকে অনেক সময় অসহায় মনে হয়েছে। ভারত বিভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের সামরিক শক্তি দ্বারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে দমিয়ে রাখার বিরুদ্ধে জনগণের সফল প্রতিরোধের একমাত্র অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায় মহাত্মা গান্ধীর সেই হরতাল।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এই হরতাল অস্ত্র প্রয়োগ করে মুসলিম লীগের শাসনের গদি টলিয়ে দেন। পরবর্তীকালে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর বিপ্লবী রাজনীতির অনুসারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হরতালকে নতুন চরিত্র দান করেন। হরতাল শুধু নিষ্ক্রিয় প্রতিবাদ নয়, সক্রিয় ও সশস্ত্র প্রতিবাদের হাতিয়ারে পরিণত হয় তার জাদুকরী স্পর্শে। মওলানা ভাসানী রাজনৈতিক আদর্শে গান্ধীর অনুসারী না হলেও তার কর্মপন্থার নিষ্ঠাবান সমর্থক ছিলেন। গান্ধী অনশন ধর্মঘটকেও রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যা আমরা পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুকে গ্রহণ করতে দেখি। তিনি কারাগারে অবস্থানকালে একবার আমরণ অনশনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন।

বলা বাহুল্য, অবিভক্ত ভারতের আর কোনো এলাকায় নয়, কেবল পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও বর্তমান বাংলাদেশে হরতালের নিজস্ব সাফল্য ও ইতিহাস রয়েছে। বাংলাদেশে এ ইতিহাস অনেক বেশি দীর্ঘ ও তাৎপর্যময়। এই হরতাল ধারাবাহিকভাবে জনগণের সংগ্রামকে বিভিন্ন পর্যায়ে এগিয়ে নিয়ে শেষ পর্যন্ত নিরস্ত্র অসহযোগ আন্দোলন, সশস্ত্র প্রতিরোধ ও সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধে পরিণত করার কাজে সহায়ক হয়। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে হরতাল তাই অন্যান্য দেশের চেয়ে চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যে ভিন্ন। এ দেশে হরতালকে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য— এমনকি সামাজিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। তবে অতি ব্যবহারে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর আমলে হরতাল জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। এ গ্রন্থ থেকেই আমরা জানতে পারি, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিএনপি ও তাদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামী ২৪৩টি জাতীয় ও ৪১১টি স্থানীয় এবং আঞ্চলিক হরতাল আহ্বান করেছিল। আর সবচেয়ে বেশি হরতাল ডেকেছিল জামায়াতে ইসলামী, যারা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা-ধর্ষণ-লুটপাটে সক্রিয় সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছিল।

তবে হরতাল জনপ্রিয়তা হারালেও এর কার্যকারিতা এখনো বলবৎ রয়েছে। আমরা এটা দেখেছি নিরাপদ সড়ক আন্দোলনসহ আরো অনেক আন্দোলনে। গত বছরের আগস্ট মাসে স্কুলের কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা আনুষ্ঠানিকভাবে হরতাল আহ্বান না করলেও সব বয়সের এবং শ্রেণি-পেশার মানুষের সর্বাত্মক-স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ছিল তাদের রাজপথের কর্মসূচির প্রতি। ঢাকার রাজপথ তিন-চারদিনের জন্য তারা কার্যত অচল করে দিয়েছিল।

এই যে সুদীর্ঘ সাত দশকের হরতালের ইতিহাস, যার বেশিরভাগই রাজনৈতিক চরিত্রের, তা ৫৫২ পৃষ্ঠার গ্রন্থে অত্যন্ত পারদর্শিতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। এই গবেষণা কার্যটি বাংলাদেশের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের অসম্পূর্ণ ইতিহাসকে এক ধরনের সম্পূর্ণতা দান করেছে, সেটা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি। এই গবেষণা গ্রন্থে মিলবে ১৯৪৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়ের প্রতিটি জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ের হরতাল ও হরতালতুল্য অবরোধের বিবরণ। দিন, মাস ও বছর ভিত্তিতে হরতালের বিবরণের পাশাপাশি রয়েছে প্রবণতা-প্রভাব বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন। জনজীবনে হরতালের নানা মাত্রার প্রভাব, হরতালের ইস্যুর উপযোগিতা, হরতালকেন্দ্রিক জন মনস্তত্ত্ব— এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার ঔৎসুক্যে লেখক ও গবেষক অজয় দাশগুপ্ত সাত দশকের প্রতিদিনের কোনো না কোনো দৈনিক পত্রিকা গভীর মনোনিবেশ সহকারে পাঠ করেছেন। এ থেকে বাড়তি পাওনা বাংলাদেশের রাজনীতির চড়াই-উতরাইয়ের বর্ণিল ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা। কয়েকটি দেশে এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি সম্পর্কেও জানা যাবে এ গ্রন্থ থেকে। আরো রয়েছে বিভিন্ন আমলের হরতালের সময়ের ছবি, যা থেকে হরতাল কীভাবে পালিত হয়েছে তার ধারণা মেলে।

আগেই বলেছি, সাত দশকের হরতাল ও বাংলাদেশের রাজনীতি গ্রন্থটি মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক ইতিহাসের পরিপূরক একটি গবেষণা কাজ। নিবিড় গবেষণা প্রসূত গ্রন্থটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অপপ্রয়াসকে ব্যর্থ করায় অবদান রাখবে। যারা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস রচনায় নিয়োজিত হবেন, তাদের এ গ্রন্থটি পথ দেখাবে। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ ধরনের গ্রন্থের অভাব ছিল। এটা পূরণ করে সাংবাদিক ও গবেষক জাতিকে চির ঋণে আবদ্ধ করে রাখলেন। যে বিশাল কর্মযজ্ঞ একাধিক গবেষকের দীর্ঘকালের গবেষণার ফল হতে পারত, একজন সক্রিয় সাংবাদিক হয়েও নিষ্ঠা ও পরিশ্রমে তিনি এককভাবে সেটা সম্পন্ন করেছেন। এজন্য কারো আর্থিক সহায়তাও গ্রহণ করেননি। জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি গ্রন্থটি প্রকাশ করে একটি চমতৎকার কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে, এজন্য তাদের ধন্যবাদ। প্রকাশনার মান খুবই ভালো। গ্রন্থটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে সঠিক রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে, তাতে সন্দেহ নেই। এর মাধ্যমে সঠিক ইতিহাস যেমন জানা যাবে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মও পরিচিত হতে পারবে দীর্ঘ সংগ্রামের নানা পর্যায়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে। এই অমূল্য গ্রন্থটি উপহার দেওয়ার জন্য লেখককে আমার আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। – ইত্তেফাক

[ লন্ডন, ৪ মে ২০১৯ ]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment