দশ দিগন্তে

একজন রিপভ্যান উইঙ্কলের চোখে স্বদেশ

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী-

আজকাল বাংলাদেশে গেলে নিজেকে রিপভ্যান উইঙ্কল মনে হয়। রিপভ্যান কুড়ি বছর একটানা ঘুমিয়ে থেকে জেগে উঠে দেখেন, তিনি তার স্বদেশ আমেরিকাকে চিনতে পারছেন না। মানুষজন রাস্তাঘাট সব কিছু তার কাছে অচেনা মনে হয়। পরে তিনি বুঝলেন, তার দীর্ঘ ঘুমের সময় আমেরিকা স্বাধীন হয়ে গেছে। রাস্তাঘাট মানুষজন বদলে গেছে। ১৯৭৪ সালে বিলাতে চলে এসে (বঙ্গবন্ধুর আমলে) দীর্ঘ ১৮ বছর পর যখন ঢাকার মাটিতে পা রাখি (বিএনপির আমলে) তখনো ঢাকা শহরকে খুব একটা অপরিচিত মনে হয়নি। মানুষজনকেও নয়।

এরপর শেখ হাসিনার আমলে যখন স্বদেশে নিয়মিত যাওয়া শুরু করেছি, তখন আমার অবস্থা রিপভ্যান উইঙ্কলের মতো হয়ে দাঁড়ায়। ঢাকা শহরকে, ঢাকার মানুষজনকে চিনি না। ১৯৭৪ সালে একটা বিগ ভিলেজের মতো যে ঢাকা শহরটাকে রেখে গেছি, তা এখন অসংখ্য ফ্লাইওভার বেষ্টিত ইন্টারন্যাশনাল সিটি। যে রমনা অঞ্চল ছিল প্রায় জনশূন্য, বিকেলে হাওয়া খাওয়ার জায়গা, তা এখন জনাকীর্ণ। স্কাই হাই শপিংমলে পূর্ণ। হাই রাইজ বিল্ডিং আর ফ্ল্যাট হাউসে ঢাকা শহর (অনেক মফস্বল শহরও) ভরে গেছে। কোথাও সবুজ-শ্যামলিমার দিশা মাত্র নেই।

কোথায় গেল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ফুলার রোড, স্যাভেজ রোডের বিশাল গাছগুলো। যাতে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে লাল আগুনের মতো কৃষ্ণচূড়া ফুটতো। এক বন্ধু বললেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে শুধু মুক্তিযোদ্ধা হত্যা করেনি, রমনার এই পরিবেশ বান্ধব গাছগুলোও হত্যা করে গেছে। তার ভয় ছিল, এই গাছগুলোর আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে তার বিরুদ্ধে গেরিলা-যুদ্ধ শুরু হতে পারে।

ঢাকার মানুষজনও এখন ভালো করে চিনি না। আগে দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, মন্ত্রী, আমলা, সরকারি চাকুরে, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, সকলকেই চিনতাম। তারা ছিলেন আমার প্রজন্মের লোক। এখন যারা দেশের বা ঢাকার শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ, তাদের বারো আনাকেই চিনি না। ঢাকায় এখন কতো প্রতিভাবান শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক। আগে সকলকেই চিনতাম, তাদের সঙ্গে আড্ডা দিতাম। এখন অধিকাংশকেই চিনি না। এজন্যে কাউকে দোষ দেই না। এটা কালের ধর্ম। আমি যে প্রজন্মের লোক, তা অতীতের প্রজন্ম। তারপরও আরেক প্রজন্ম। তারপর বর্তমান প্রজন্ম। আমরা তো এখন স্মৃতি। বিস্মৃতিতে যে চলে যাইনি, তা আমাদের ভাগ্য।

আমার মন্দ কপালের কথা আর কি বলবো! আমি ঢাকায় গেলে নিজের স্বদেশকে আর খুঁজে পাই না। পোশাকে না, খাদ্যে না, আচরণেও না। বড়লোকদের বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলে মনে হয় মুম্বাইয়ের কোনো নিম্নমানের অনুষ্ঠানে এসেছি। এমনকি গণভবনের এক অনুষ্ঠানে (রেহানা-কন্যা টিউলিপের সংবর্ধনা) গিয়ে দেখেছি, অনুষ্ঠানটি শুরু হয়েছে ‘সাধের লাউ’ গান দিয়ে। বাঙালির হাজার বছরের কৃষ্টি, সামাজিক মূল্যবোধে অবক্ষয়ের চিহ্ন। শেখ হাসিনার আমলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিস্ময়কর। কিন্তু সে উন্নয়নও মাথাভারী উন্নয়ন। আমরা গর্ব করে বলি, বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ। কিন্তু আমাদের সমাজ এবং সকল দলমতের রাজনীতিও ধর্মীয় কালচার দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত।

তবু একটা কথা সত্য, হাসিনা সরকার দেশটাকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। দারিদ্র্য ও মঙ্গামুক্ত করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে একটি আত্মনির্ভর উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করেছেন। পুঁজিবাদী উন্নয়নের যেসব ক্ষত সবদেশেই থাকে, যেমন দুর্নীতি, কালো টাকার স্ফীতি, নব্য ধনীদের প্রভাব তার সবই বাংলাদেশে এখনো আছে; কিন্তু বর্তমান সরকারের নীতি ও নেতৃত্ব আরো কিছুকাল টিকে থাকলে আশা করা যায় বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ধীরে ধীরে অবক্ষয়মুক্ত হবে।

বাংলাদেশে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে একজন ছিলেন আমিনুল হক বাদশা। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ছাত্রনেতাদের একজন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এবং পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে বেছে নিয়েছিলেন। তার ছাত্রজীবন থেকে তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা। ছিলেন আমার ছোট ভাইয়ের মতো। কয়েক বছর হয় মৃত্যুবরণ করেছেন। তার সঙ্গে আমি সারা বিশ্ব ঘুরেছি। দেশে এলেও বাদশা আমার সঙ্গে। দেশেও তার উপরেই নির্ভরশীল থাকতাম।

তার অকাল মৃত্যুর পর একটু অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। দেশে আসতেও এই বোধটা কাজ করতো। কিন্তু এই অসহায়ত্ব থেকে দ্রুত আমাকে মুক্তি দেন বাদশার ছোট ভাই খোন্দকার রাশেদুল হক। সকলের কাছে যার পরিচয় নবা ভাই। সকলের আগে আমার পাশে এসে দাঁড়ান। ঢাকায় এলে এয়ারপোর্টে তাকেই প্রথম দেখি। আমি সাধারণত ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় আসি। ডিসেম্বর আমার জন্মের মাস। প্রতি ডিসেম্বর মাসেই নবা ঢাকা ক্লাবে আমার জন্ম দিবস পালনের ব্যবস্থা করেন। শিল্পী, সাহিত্যিক, মন্ত্রী, সাংবাদিক, ব্যুরোক্রাটসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ আসেন এই অনুষ্ঠানে। আমি জানি, সকলেই আমার জন্য আসেন না। আসেন নবার আমন্ত্রণে।

রাশিদুল হক পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনদফা ছিলেন অফিসার্স ক্লাবের ভাইস চেয়ারম্যান। দেশের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে তিনি উপদেষ্টা হিসেবে এখন কাজ করছেন। তার কথাটা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করলাম এজন্য যে, বাংলাদেশে বর্তমানে হাসিনা-সরকারের আমলে শিল্পোনয়নে যে দ্রুত ধারা সে সম্পর্কে একটা সুষ্ঠু ধারণা পেতে নবা আমাকে সাহায্য করেছেন কয়েকজন শিল্পপতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে।

বাংলাদেশ বহু প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি অর্থে-বিত্তে প্রভাবশালী হতে পারেন; কিন্তু সম্মানিত নন। নব্যধনী মাত্রকেই অসাধু ও দুর্নীতিপরায়ণ মনে করা হয়। এর মধ্যে যে ব্যতিক্রম দুই-একজন আছেন, তারা দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে আন্তরিক ও পরিশ্রমী ভূমিকা রাখেন। তারা কতোটা সাধু তা বলতে পারবো না; কিন্তু তারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সৃষ্টিশীল ভূমিকা রাখছেন এটা নিঃসংশয়ে বলতে পারি।

বিকন (Beacon) ইন্ডাস্ট্রির এবাদুল করিম সাহেবকে যখন প্রথম দেখি তখন এক গাল দাড়িসহ এই মধ্যবয়স্ক মানুষকে নিয়ে খুব একটা উৎসাহ বোধ করিনি। ভেবেছি তিনি আধুনিক মানুষ নন এবং দেশের আধুনিক শিল্পায়নে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না; কিন্তু দুই দুইবার তার শিল্প প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বিস্মিত হয়েছি, তার প্রতিষ্ঠান ওষুধ শিল্পের এবং তা অত্যাধুনিক এবং বিশাল। তার ক্যান্সারের ওষুধ আন্তর্জাতিক মানের এবং পশ্চিমা দেশগুলোতে তার বিরাট বাজার। চিকিত্সা ক্ষেত্রে তার এই অবদানের জন্য তিনি একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন।

শিল্পপতি হিসেবে তার এই জনসেবার জন্য তিনি তার দেশের মানুষের কাছেও বিরাটভাবে জনপ্রিয়। তার প্রমাণ সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকা থেকে জাতীয় সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়ন পান এবং তিনি বিরাট ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিয়েছেন। ভবিষ্যতে তিনি শিল্প বাণিজ্য সংক্রান্ত কোনো মন্ত্রী দপ্তরের দায়িত্ব পেলে বিস্মিত হবো না।

এবার ঢাকায় অবস্থানের সময় বন্ধু-বান্ধবদের অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, আপনি তো আওয়ামী লীগের ঊর্ধ্ব মহলের সঙ্গে পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ। বলতে পারেন এবার মন্ত্রিসভা গঠনে শেখ হাসিনা সব পুরনো মুখ বাদ দিলেন কেন? আমি বলেছি, আওয়ামী লীগের নতুন প্রজন্মের ঊর্ধ্ব মহলের সঙ্গে আমি তেমন ঘনিষ্ঠ নই। শেখ হাসিনার মনের খবরও আমি রাখি না। সুতরাং বলতে পারবো না, সব প্রবীণ ও পুরনো মুখগুলো বাদ দেওয়া হলো কেন?

নতুন সরকারে নতুন রক্ত সঞ্চালন ভালো। এদিক থেকে শেখ হাসিনা ভালো কাজ করেছেন। কিন্তু সরকারে যাতে সব মুখই নতুন এবং অনভিজ্ঞ না হয়, সেজন্য অন্তত রাশেদ খান মেনন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, নাহিদ ইসলামের মতো দু-একজনকে রাখা হলে ভালো হতো। সরকার কোনো সংকটে পড়লে অভিজ্ঞ ও পুরনোদের ডাকা হয় পরামর্শের জন্য। ইরাক যুদ্ধের সময় টনি ব্লেয়ার ছুটে গিয়েছিলেন তার প্রতিপক্ষ দলের মার্গারেট থ্যাচারের কাছে। ভারতে কৃষ্ণ মেননকে দেশরক্ষা মন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরও দেশরক্ষার ব্যাপারে নেহেরু ডেকে পাঠাতেন কৃষ্ণ মেননকে।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলো নিজের ভাণ্ডারিয়া কেন্দ্রে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু খুবই জনপ্রিয়। মন্ত্রী হিসেবেও তার বিভিন্ন দপ্তরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ভবিষ্যতে এদের মতো অভিজ্ঞ মানুষকে যদি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবার দেশের সেবায় কাজে লাগান তাহলে ভালো করবেন।

বাংলাদেশে আমি এখন রিপভ্যান উইঙ্কলের মতো। সুতরাং আমার এই পর্যবেক্ষণ কতোটা বাস্তবতা সম্মত তা বলতে পারবো না। যদি বাস্তবতা সম্মত হয় তাহলে বলবো বিদেশে থাকতে পারি, কিন্তু দেশের সঙ্গে আমার নাড়ির যোগ এখনো ছিন্ন হয়নি। – ইত্তেফাক

[ লন্ডন, ১৮ মে শনিবার, ২০১৯ ]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment