কালের আয়নায়

বিজেপির আবার নির্বাচন বিজয় এবং আমাদের প্রত্যাশা

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

ভারতের সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষিত হয়েছে। অধিকাংশ পর্যবেক্ষক যা ধারণা করেছিলেন, তা হয়নি। মোদি জিতবেন, এটা অনেকেই বলেছিলেন। কিন্তু অনেক কম ভোটে জিতবেন এবং কোয়ালিশন সরকার গঠন করবেন- এটাই ছিল বেশিরভাগ পর্যবেক্ষকের ধারণা। এমনকি আমারও ধারণা। কিন্তু আমাদের এ ধারণা যে সঠিক ছিল না, তা প্রমাণ করে নরেন্দ্র মোদি আগের বারের চেয়েও বেশি ভোটে জিতেছেন। লোকসভায় দলগতভাবে ৩০২ এবং জোটগতভাবে ৩৫০ আসনে মোদি জয়ী হয়েছেন। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এবারও লোকসভায় বিরোধী দল গঠনের মতো আবশ্যক আসন সংখ্যা পায়নি। রাহুল গান্ধী জিতেছেন কেরালা থেকে। তার পারিবারিক কেন্দ্র উত্তর প্রদেশের আমেথি কেন্দ্র থেকে জয়ী হতে পারেননি।

নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদিকে যখন কেদার বদ্রীনাথ মন্দিরে এবং বিজেপির সভাপতি অমিত শাহকে সোমনাথ মন্দিরে ধর্ণা দিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে তখন মনে হয়েছিল, ভারতের গণদেবতার সমর্থন লাভে সন্দেহ থাকার দরুনই মোদি ও শাহ স্বর্গের দেবতাদের কাছে গিয়ে ধর্ণা দিয়ে পড়ে আছেন। বাস্তবে দেখা গেল, বিজেপি দেবতা এবং গণদেবতা দুয়েরই সমর্থন ও আশীর্বাদ লাভ করেছে। দেশ শাসনে গত পাঁচ বছরে বিজেপির এত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং ব্যর্থতা সত্ত্বেও ভারতের গণদেবতা তাদের প্রতি মুখ ফেরাননি।

অন্যদিকে ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের নায়ক-দল, গান্ধী-নেহরু-ইন্দিরার সেক্যুলার রাজনীতির লেগাসি বহনকারী কংগ্রেস মনে হয় মুখ থুবড়ে পড়েছে। শিগগিরই তার মাথা তোলার সম্ভাবনা কম। কেরালা ও পাঞ্জাব ছাড়া কোথাও তারা সুবিধা করেনি। বামদের তো বামদশা সর্বত্র। এমনকি পশ্চিমবঙ্গেও। এমন যে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এবারের নির্বাচনে যার হাঁকডাকই ছিল বেশি, তার রাজ্য থেকে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির সাফল্য বিস্ময়কর। তাদের সদস্য সংখ্যা ১৮-তে উঠে এসেছে। কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র দুটি। আর যে পশ্চিমবঙ্গে বামেরা ৩০ বছরের বেশি রাজত্ব করেছে, লোকসভা নির্বাচনে তারা একেবারেই নেই।

ভারতের এবারের নির্বাচনের ফলাফল থেকে সম্ভবত একটা ধারণা নেওয়া যায় যে, দেশ শাসনে বিজেপির যত ব্যর্থতা থাক, হিন্দুত্ববাদ যত প্রকট হোক, নির্বাচকমণ্ডলী দেশের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থায় শক্তিশালী নেতৃত্ব, কনটিনিউটি ও স্থিতিশীলতা দেখতে চেয়েছে। ভারতে কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়া, আঞ্চলিক দলগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠায় রাজ্যে রাজ্যে বিরোধ বৃদ্ধি, কেন্দ্রে জোট বা কোয়ালিশন সরকার স্থিতিশীল বা শক্তিশালী কোনোটাই না হওয়ায় ভারতে জাতীয় ঐক্য ও সমন্বিত রাষ্ট্রনীতির অনুপস্থিতি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে উদ্বিগ্ন করেছে। এদিক থেকে নরেন্দ্র মোদির একক ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব এবং বিজেপির ঐক্য ও শক্তি তাদের উদ্বেগ অনেকটা দূর করে মোদির প্রতি আস্থা বাড়িয়েছে।

কংগ্রেসে ইন্দিরা গান্ধীর পর আর কোনো ক্যারিশম্যাটিক নেতার আবির্ভাব হয়নি। ইন্দিরা শুধু পরিবারতন্ত্রের গুণে নেতা হননি। নেহরুকন্যা হিসেবে রাজনীতিতে তার অবস্থান ভালো ছিল। কিন্তু সেই সঙ্গে তার ছিল ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতা। ফলে দীর্ঘকাল প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পেরেছেন। বাংলাদেশে অনেকে বলেন, শেখ হাসিনা পরিবারতন্ত্রের সুযোগে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন এবং দীর্ঘকাল আছেন। এটা ঠিক মন্তব্য নয়। শেখ হাসিনা পরিবারতন্ত্রের সুযোগ পেয়েছেন অবশ্যই। কিন্তু দলের নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তার রাজনৈতিক দক্ষতা ও ব্যক্তিত্বের জোরে। তা নইলে ড. কামাল হোসেন, ড. ইউনূসের মতো ব্যক্তিরা তার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কুলিয়ে উঠতে পারলেন না কেন?

ভারতে ইন্দিরার পর যেমন পরিবারতন্ত্র কাজ দিচ্ছে না, তেমনি বাংলাদেশেও হাসিনার পর তার পরিবার থেকে যোগ্য ও ব্যক্তিত্বের অধিকারী কোনো সদস্য বের হয়ে না এলে পরিবারতন্ত্র কোনো কাজ দেবে না। অল্প বয়স ও রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতা রাহুলকে মোদির যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে পাল্লা দিতে দেয়নি। পরিবারতন্ত্র তাকে কোনো সাফল্য দেয়নি। ইন্দিরার মৃত্যুর পর পরিবারতন্ত্রের সেই তেল ফুরিয়ে গেছে। শেখ হাসিনাও একই ভুল করবেন, যদি তিনি তার উত্তরাধিকারী হিসেবে দক্ষতা ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে পরিবারের ভেতরে  উত্তরসূরি খোঁজেন।

ভারতের এবারের নির্বাচনে কংগ্রেস জোটের সুবিধা করতে না পারার একটা বড় কারণ হিসেবে আমার নিজের ধারণা, কংগ্রেসের যে শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান সেক্যুলারিজম, তা থেকে কংগ্রেস ও রাহুল-প্রিয়াঙ্কার সরে আসা এবং মোদিকে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ না জানিয়ে ব্যক্তিগতভাবে চ্যালেঞ্জ জানানো। ভারত আগামীতে শাসন করবে কে- গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলারিস্ট কংগ্রেস জোট, না কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি জোট? সংখ্যালঘু মুসলিম, খ্রিষ্টান, দলিত এবং পার্বত্য উপজাতিগুলোকে নির্যাতনমুক্ত করা এবং অর্থনীতিকে অসাধু বিগ বিজনেসের দৌরাত্ম্যমুক্ত করা- এসব বিষয়কে ভালোভাবে সামনে না এনে মোদিকে আক্রমণের টার্গেট করা নির্বাচনে সাধারণ মানুষের মনে তেমন নাড়া দেয়নি।

মানুষ দেখেছে, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা হিন্দুত্ববাদের নরম সমালোচনা করলেও নিজেরাও শিবমন্দিরে দৌড়াচ্ছেন। কপালে চন্দনের টিপ, জোড়হাতে দেবীপূজা করছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি কালীঘাটে। তিনিও কালীমন্দিরে নিত্য প্রার্থনা করছেন। নামকরা বাম নেতারা শুধু দুর্গাপূজা নয়, কালীপূজাও করছেন।

মোদির বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারণায় কংগ্রেস যুদ্ধবিমান তথা রাফায়েল কেলেঙ্কারির ওপর জোর দিয়েছিল। মোদি জোর দিয়েছিলেন রাজীব গান্ধীর আমলের বোফর্স কেলেঙ্কারির ওপর। নেহরু-ইন্দিরার নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি থেকে মোদির সরে আসা, মধ্যপ্রাচ্যে নির্যাতিত আরব-প্যালেস্টাইনিদের সমর্থন করা থেকে সরে এসে ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতির সমর্থনে জোর ভূমিকা গ্রহণ, ভারতের ট্র্যাডিশনাল মিত্র ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অন্যায় ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষে ভারতের সমর্থন ইত্যাদি পররাষ্ট্র বিষয়কে সামনে তুলে না আনা, কংগ্রেস জোট বা আঞ্চলিক জোটগুলোকে বিজেপির বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড় করায়নি। আঞ্চলিক জোটগুলোতে যেমন ছিল নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, তেমনি কংগ্রেসের ছিল শক্তিশালী কর্মসূচি গ্রহণে অক্ষমতা।

নির্বাচনের পর দ্বিতীয় দফা ক্ষমতায় এসে দেখা যাক মোদি এখন কী করেন? তিনি কি এখনও হিন্দুত্ববাদের সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকবেন, বজরং পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতা অব্যাহত রাখবেন, না অটল বিহারি বাজপেয়ির মতো প্রধানমন্ত্রী পদে বসে এবার উপলব্ধি করবেন, তিনি শুধু হিন্দু ভারতের নেতা নন, ভারতের সব সম্প্রদায়ের নেতা এবং প্রতিনিধি। বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ‘নেহরুয়ানা’ গ্রহণ করেছিলেন, শেরওয়ানি পরতে শুরু করেছিলেন, দু’হাত জুড়ে নমস্কার করা বাদ দিয়ে নেহরুর কায়দায় ডান হাত ঊর্ধ্বে তুলে জনতার অভিনন্দনের জবাব দেওয়া শুরু করেছিলেন। তার ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদভানি করাচিতে ছুটে গিয়েছিলেন জিন্নাহর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে।

বিজেপির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে সম্ভবত এতটা আশা করা যায় না। কিন্তু দ্বিতীয় দফা ক্ষমতায় বসা তাকে আরও উদার ও দায়িত্ববান করবে, আশা করা যায়। যদি তাই হয়, ভারত অতীতের মধ্যযুগের দিকে পিছিয়ে না গিয়ে উন্নত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার যাত্রা পুনরারম্ভ করবে। আমাদের সবচেয়ে বড় আশা, প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রথম দফা ক্ষমতায় এসেই বাংলাদেশ ও হাসিনা সরকারের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশও তা সাগ্রহে ধারণ করেছে। এই পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা এবং মৈত্রী ভবিষ্যতে আরও বাড়বে ও শক্ত হবে। – সমকাল

লন্ডন, ২৪ মে শুক্রবার, ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment