দশ দিগন্তে

মহাজোটকে ভেঙে দেওয়ার বা নিষ্ক্রিয় রাখার সময় এখনো হয়নি

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী-

বাংলাদেশে এবং ভারতে জোট রাজনীতির ভবিষ্যৎ কি? দুটি দেশেই সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের পর প্রশ্নটি উঠেছে। বাংলাদেশে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভের পর একক মন্ত্রিসভা গঠন করেছে। এটাকে এখন আর মহাজোট সরকার বলা চলে না। বলা উচিত আওয়ামী লীগ সরকার। ভারতেও বিজেপি ও কংগ্রেস এই নির্বাচনেও জোট গঠন করে লড়াই করেছে। বিজেপির জয় বিশাল। তারাও এককভাবে বিজেপি সরকার গঠন করতে পারেন। তবে নরেন্দ্র মোদি তা করবেন মনে হয় না। তিনি বিশাল জয় সত্ত্বেও জোটের সঙ্গীদের নয়া মন্ত্রিসভায় স্থান দেবেন বলেই পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা।

বাংলাদেশ এবং ভারতে প্রধান রাজনৈতিক দল দুটির উপর জনগণের আস্থা কমতেই নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে নিশ্চয়তা না থাকাতে সমমনা দল নিয়ে তারা জোট গঠন করে। বিরোধী দলগুলোর ব্যাপারেও তাই ঘটেছে। এককভাবে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে লড়তে পারবে না বুঝতে পেরে তারা বিরোধী দলীয় জোট গঠন করেছে। এই জোট শাসন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে পারলেও তাকে স্থিতিশীলতা দিতে পারেনি। বহুদল, বহুমতের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা অনেক সময় অসম্ভব হলে আভ্যন্তরীণ অনৈক্যের দরুন জোট শাসন অনেক সময়েই দেশকে গুড গভর্নেন্স দিতে পারে না। ভারতে কংগ্রেসের একক জনপ্রিয়তার অবসানের পর দীর্ঘকাল তা জোট গঠন করে অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়েছে, ক্ষমতায় যেতে হয়েছে, বিজেপিকেও তেমনি দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে উঠে আসা এবং ক্ষমতায় আসার জন্য জোট রাজনীতি করতে হয়েছে। বাংলাদেশেও সামরিক ও আধা সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য আওয়ামী লীগকে বাম গণতান্ত্রিক দলগুলো নিয়ে জোট বেঁধে আন্দোলন করতে হয়েছে এবং জোটবদ্ধ ভাবে নির্বাচন করে ক্ষমতায় আসতে হয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে জোট সঙ্গীদের নিয়ে।

বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনীতি সম্পর্কে অনেকের ধারণা ছিল দুটি দেশেই জোট সরকারের শাসন-ব্যবস্থা দীর্ঘকাল চলবে। কোনো দলের একক সংখ্যা গরিষ্ঠতার যুগ শেষ হয়ে গেছে। এবারের নির্বাচনে এই মিথটি দুটি দেশেই ভেঙে গেছে। বাংলাদেশে ও ভারতে আওয়ামী লীগ ও বিজেপি নির্বাচনে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করেছে এবং এককভাবে সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী জোটভুক্ত দলগুলোর যে সব নেতা আগের মন্ত্রিসভায় সদস্য ছিলেন তারা এবারেও নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। কিন্তু মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। এমনকি কয়েকজন সাবেক বাম নেতা, যারা আওয়ামী লীগেই যোগ দিয়েছেন এবং নির্বাচন জিতে মন্ত্রী হয়েছিলেন, যেমন—নূরুল ইসলাম নাহিদ, মতিয়া চৌধুরী তারা এবারেও নির্বাচনে জিতেছেন, কিন্তু মন্ত্রী হতে পারেননি।

এজন্যে আওয়ামী শিবির থেকে দুটি কারণ জানা যায়, পরিত্যক্ত নেতারা পরিচিত নেতা হলেও জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেননি। নির্বাচনেও জিতেছেন নৌকা প্রতীকের জোরে, জোটের বাম দলীয় মন্ত্রীদের সম্পর্কেও একথা সত্য। দু একজন ছাড়া সকলেই নৌকা প্রতীকের জোরে জিতেছেন। সুতরাং এদের মন্ত্রিসভায় রেখে লাভ নেই। বরং তার বদলে মন্ত্রিসভায় নতুন রক্ত সঞ্চালন, নতুন মুখ আনলে প্রশাসনের স্থবিরতার বদলে উৎসাহ উদ্দীপনা বাড়বে। সরকারের কাজকর্মে গতিবেগ আসবে।

দ্বিতীয় কারণটি জোরেশোরে বলা না হলেও অপ্রকাশ্যে মুখে মুখে চালু হয়ে গেছে। আওয়ামী নেতৃত্বের সংখ্যা গরিষ্ঠ অংশ মনে করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শক্তি ও জনপ্রিয়তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো নেতা ও দল এখন বাংলাদেশে নেই। প্রকাশ্য রাজনীতিতে জামায়াত এখন অর্ধমৃত এবং বিএনপি নির্বিষ সাপ। তথাকথিত সুশীল সমাজ এখন রাজনৈতিক এতিম। শেখ হাসিনার ব্যক্তিত্ব ও জনপ্রিয়তার সঙ্গে টেক্কা দেবেন এমন ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব বর্তমানে দেশে নেই। জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যা গরিষ্ঠ দল। এই দলকে চ্যালেঞ্জ জানাবার নেতা ও দল দেশে নেই। এই সময় কোনো বাম দল বা বাম নেতা বা অন্য কাউকে আওয়ামী লীগের জন্য প্রয়োজন নেই। বরং তারা বোঝা। সময় থাকতে এই বোঝা জোট থেকে নামিয়ে দেওয়াই ভালো।

এই দুটি কারণই একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো তা বলা চলে না। কিন্তু দুই দেশেই যে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কারণ দুটি সঠিক মনে হয়, সেই পরিস্থিতি সহসা বদলে যেতে পারে। ভারতে কংগ্রেস নির্বাচনে পরাজিত হতে পারে, কিন্তু মৃত ঘোড়া নয়। সাম্প্রতিক নির্বাচনে দুটি গণতান্ত্রিক শিবিরের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছে একথা বলা যাবে না। যুদ্ধ হয়েছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী শিবির এবং গণতান্ত্রিক শিবিরের মধ্যে। দ্বিতীয় শিবিরের পরাজয় হয়েছে নীতিহীনতা, যোগ্য নেতৃত্বের অভাব, নিজেদের মধ্যে অনৈক্য এবং হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে আপসের দরুন।

এই অবস্থা বেশিদিন থাকবে না। নরেন্দ্র মোদি যদি এবার কম ভোট পেতেন, তার সরকার গঠন একটু উদারপন্থি জোট সঙ্গীদের সমর্থনের উপর নির্ভর করতো তাহলে তিনি বাজপেয়ীর মতো শিবসেনা ও আরএসএসের বজ্রমুষ্টি থেকে একটু রেহাই পেতেন। হয়তো বা বাজপেয়ীর মতো একটু উদারপন্থি হতে পারতেন। কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা তাকে আরো অনুদার হিন্দুত্ববাদী করে তুলবে। তিনি গণতান্ত্রিক ভারতকে হিন্দুত্ববাদী ভারতে পরিণত করার জন্য আরো কঠোর নীতি গ্রহণ করতে পারেন।

এই সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে ভারতের কংগ্রেসসহ গণতান্ত্রিক দলগুলোকে এক ভয়ংকর চ্যালেঞ্জের মুখে নিজেদের মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও ঝগড়া-বিবাদ মেটাতেই হবে। মমতা ব্যানার্জিকে তার অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষার লাগাম টানতেই হবে। কম্যুনিস্ট দল উপদলগুলোকে তাদের তত্ত্বের ও নেতৃত্বের লড়াই থামাতেই হবে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে, গণতন্ত্র টিকে থাকবে কিনা ভারতে এই প্রশ্নে বড় রকমের লড়াই এবার শুরু হবেই। নরেন্দ্র মোদি তার পররাষ্ট্র নীতির প্রশ্নে সকল প্রতিবেশীর সঙ্গে হার্ডলাইন নেবেন না। ফলে তার হিন্দুত্ববাদী থাবা থেকে বাংলাদেশ ও অনুরূপ দেশগুলো বেঁচে যাবে। কিন্তু ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিরতা ও লড়াই ঠেকিয়ে রাখা যাবে না।

বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে ভারতের পরিস্থিতির সঙ্গে আলাদা করে দেখা যাবে না। একটু আলাদা এই যে, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শক্তি ক্ষমতায় আছেন, অগণতান্ত্রিক সাম্প্রদায়িক জোট রয়েছে বিরোধী দল হিসেবে। বাংলাদেশে গত নির্বাচনও দুটি গণতান্ত্রিক শিবিরের মধ্যে হয়নি। হয়েছে ভারতের হিন্দুত্ববাদের মতো হিংস্র ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তি ও স্বাধীনতার পক্ষের গণতান্ত্রিক শিবিরের মধ্যে। এই লড়াই চলছে গত চল্লিশ বছর ধরে। দুটি শিবিরই জোট শিবির। গণতন্ত্র উদ্ধারে মাঠের যুদ্ধ, সংসদীয় যুদ্ধ সর্বক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগকে অন্য গণতান্ত্রিক দলগুলোর কখনো নৈতিক সমর্থন ও কখনো প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় লড়তে হয়েছে। অবশ্যই নেতৃত্ব বড়দল আওয়ামী লীগের। জনসমর্থনও বেশি আওয়ামী লীগের। কিন্তু ছোট দলগুলোর অবস্থান ছিল আওয়ামী লীগের নৈতিক শক্তির ভিত্তি। মনে রাখতে হবে ক্ষুদ্র মূষিক পরাক্রমশালী সিংহকে জালে বন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়েছিল।

বাংলাদেশে ধর্মান্ধতাবাদী শিবির গণতন্ত্রের মহাজোটের অনাঘাতে এবারো নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে শক্তি হারায়নি, উচ্ছেদ হয়নি। ১৯৭৫ সালে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তারা একটি সামরিক পরাজয়ের আঘাত এড়িয়ে পুনর্গঠিত হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করেছে। সেদিন যদি দলীয় সরকারের বদলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একটি জাতীয় সরকার ক্ষমতায় থাকতো তাহলে জাতীয় শত্রুদের পক্ষে ১৫ আগস্টের মতো ঘটনা ঘটানো সম্ভব হতো না।

২০১৯ সালের বাংলাদেশেও ১৯৭৫ সালের পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আওয়ামী লীগ সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। সংসদে বিরোধীদল নেই। বঙ্গবন্ধুর মতো অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা ক্ষমতার শীর্ষে। তারপরও ১৫ আগস্টের মতো ঘটনা ঘটতে পেরেছিল। বর্তমানেও সমুদ্রে কোনো ঢেউ নেই। মাঠেও তারা নেই। কিন্তু গণতন্ত্রের রাজনীতির হোতারা নয়, ষড়যন্ত্রের রাজনীতির হোতারা নিষ্ক্রিয় নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনো দুই গণতান্ত্রিক শক্তির লড়াই চলছে না। চলছে হিংস্র সাম্প্রদায়িকতা ও দুর্বল গণতন্ত্রের লড়াই। এই লড়াইয়ে আওয়ামী লীগের একা লড়াই করার সময় এখনো আসেনি। মিত্রেরা যতো দুর্বল হোক, তাদের সম্মিলিত শক্তি গণতান্ত্রিক শিবিরে অবশ্যই শক্তি বাড়াবে। স্বাধীনতা সংগ্রামের আদর্শ বাঁচিয়ে রাখতে তা হবে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।

সুতরাং আওয়ামী মহাজোট ভেঙে দেওয়ার বা নিষ্ক্রিয় করে রাখার সময় এখনো আসেনি। এখনই সামনে কোনো নির্বাচন নেই, আছে আরো জোর লড়াই। শেখ হাসিনা, মিত্রদের আরো কাছে টানুন। মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত করুন। – ইত্তেফাক

[ লন্ডন, ২৫ মে, শনিবার, ২০১৯ ]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment