গণতান্ত্রিক বিরোধিতার শূন্যস্থান দ্রুত পূর্ণ হওয়া দরকার

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় পর বঙ্গবন্ধু যখন প্রধানমন্ত্রী তখন পিটার হ্যাজেলহার্স্ট, এক ব্রিটিশ সাংবাদিক ঢাকা এসেছিলেন। তিনি আগেও ঢাকায় এসেছিলেন, তখন মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তী অসহযোগ আন্দোলনে সারাদেশ উত্তাল। পিটার হ্যাজেলহার্স্ট সে সময় লন্ডনের ‘ডেইলি টেলিগ্রাফের’ প্রতিনিধি ছিলেন। বিলাতের একটি রক্ষণশীল কাগজের সাংবাদিক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের খুব সমর্থক ছিলেন না। তিনি বাংলাদেশের উত্তাল গণ আন্দোলনের একটা বিকৃত চেহারা তার রিপোর্টে তুলে ধরে ছিলেন। খবরটির হেডিং দেয়া হয়েছিল, ‘টেন ডে’জ জাঙ্গল-রুল ইন ইস্ট পাকিস্তান।’ দশ দিনের জঙ্গল-রাজত্ব পূর্ব পাকিস্তানে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হ্যাজেলহার্স্ট আবার ঢাকায় এলেন। আমি তার সম্পর্কে খুব প্রীত ছিলাম না। প্রয়াত সাংবাদিক এবিএম মূসার তিনি বন্ধু ছিলেন। মূসা তখন সানডে টাইমস-এর সঙ্গে জড়িত। পিটার হেজেলহার্স্টও সম্ভবত তখন ডেইলি টেলিগ্রাফ ছেড়ে টাইমস পত্রিকায় যোগ দিয়েছেন। হয়ত মূসার মাধ্যমেই তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাত করতে পেরেছিলেন।

তিনি বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘সংসদে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা বিরোধী দল বলতে কিছু নেই। আপনি একজন গণতান্ত্রিক নেতা। কিন্তু সংসদে বিরোধী দল নেই। এই অবস্থায় গণতান্ত্রিকভাবে দেশ চালাবেন কিভাবে?’

বঙ্গবন্ধু তখন জবাব দিয়েছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে ১৯৭০ সালে পাকিস্তান ভিত্তিক যে নির্বাচন হয়ছিল বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের বর্তমান সদস্যরা তখন নির্বাচিত হয়েছিলেন। তারা এখন অন্তর্বর্তীকালীন কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলির সদ্স্য হিসেবে কাজ করছেন। শীঘ্রই সাধারণ নির্বাচন দেব। আশা করা যায়, তাতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করছেন এমন অপর দল থেকেও সংসদে সদস্য নির্বাচিত হবেন। তারা গণতান্ত্রিক বিরোধী দল গঠন করতে পারবেন।

বঙ্গবন্ধু তার এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার দু’বছর না পেরুতেই সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছিলেন। যত দূর মনে পড়ে আতাউর রহমান খান ছাড়া বিরোধী দলের বিশিষ্ট কেউ নির্বাচিত হননি। মুজাফফর ন্যাপের কুঁড়েঘর প্রতীকের একজনও নন। আতাউর রহমান খানও পরে বাকশাল হলে তাতে যোগ দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগই ছিল নতুন সংসদে সর্বেসর্বা দল।

যা হোক, সেদিন পিটার হ্যাজেলহার্স্টের সঙ্গে আলোচনায় বঙ্গবন্ধু ভারতের কথা তুলেছিলেন। স্বাধীনতার পর ভারতের লোকসভায় কংগ্রেসের ছিল একচেটিয়া আধিপত্য। বিরোধী দল ছিল নামে মাত্র, দীর্ঘ বারো বছর নেহরু ছিলেন ডিক্টেটরের মতো। তাকে কেউ কেউ বলতেন ইলেকটিভ ডিক্টেটর। তাতে গণতন্ত্রের হানি হয়েছে বলে কেউ অভিযোগ তোলেননি।

দূর অতীতের এই ইতিহাস টানলাম এ জন্য যে- বাংলাদেশে গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর যে একাদশ সংসদ গঠিত হয়েছে তাতে আওয়ামী লীগের সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিরঙ্কুশ। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ড. কামাল হোসেনকে নেতৃত্বে টেনে এনে একটা ঐক্যফ্রন্ট গঠন করার পরও হাতে গোনা কয়েকজন সদস্যপদ পেয়েছেন নতুন সংসদে। তারা দল এবং ফ্রন্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। জাতীয় পার্টি (এরশাদ) গত সংসদে বিএনপির অনুপস্থিতিতে ছিল মাকাল বিরোধী দল। এবার এরশাদ সাহেবের গুরুতর অসুস্থতার দরুন দলে চলছে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব। বর্তমান সংসদে এই দলের সদস্যদের কী ভূমিকা হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।

অর্থাৎ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এখন একটা নতুন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আগে প্রধান বিরোধী দল সংসদে নির্বাচিত হয়েও স্বেচ্ছায় গরহাজির ছিল। কিন্তু সংসদের বাইরে তারা সক্রিয় ছিল। এবার তারা সংসদে এসেছে বটে, কিন্তু সংখ্যায় এতই কম যে, তারা আর গণনার মধ্যে পড়ে না। সংসদের বাইরের রাজনীতিতেও মাঝে মাঝে ব্যর্থ হুঙ্কার ছাড়া আর কোন তৎপরতা নেই। আন্দালিব পার্থ তো আগেই ঐক্যফ্রন্ট ছেড়েছেন। এখন অলি আহমদ ও কাদের সিদ্দিকীও এই ভাঙা শিবির ছাড়ার আভাস দিয়েছেন। মনে হয় শুধু ঐক্যফ্রন্ট ভাঙার পথে নয়, বিএনপিও মুসলিম লীগে পরিণত হওয়ার পথে।

বিরোধিতা শূন্য রাজনীতি বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী হোক তা কারও কাম্য নয়। আওয়ামী লীগেরও কাম্য হতে পারে না। পরিণামে তা দেশ তো বটেই, আওয়ামী লীগের জন্যও কল্যাণকর হবে না। বঙ্গবন্ধুও তা চাননি। বাকশাল প্রতিষ্ঠার সময়েও তিনি তা বলেছিলেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, ‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের অর্জন এবং সেকুলার রাষ্ট্রের ভিত্তি আজ প্রতিবিপ্লবী ও প্রতিক্রিয়াশীলদের চক্রান্তে বিপন্ন। তাই তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তির সমন্বয়ে মোর্চা গঠন করে দেশের শত্রুদের মোকাবেলা করা ও তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের হাতে ক্ষমতা পৌঁছে দেয়ার জন্য নতুন ব্যবস্থার শাসন প্রবর্তন করেছেন। তার দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ সফল হলেই তিনি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাবেন।’

শেখ হাসিনা তার পিতার এই কমিটমেন্টের কথা জানেন। তিনিও বহুদলীয় গণতন্ত্র চান। কিন্তু স্বাধীনতার শত্রুরা এই গণতন্ত্রের আবরণে বারবার গণতন্ত্রের ভিত্তিমূলে আঘাত করেছে ও স্বাধীনতার যুদ্ধের মূল লক্ষ্যগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে এবং এখনও করছে। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বাধীনতার মূল আদর্শে বিশ্বাসী দুটি গণতান্ত্রিক পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে কখনও লড়াই হয়নি এবং নির্বাচনও হয়নি। বিএনপি-জামায়াত কখনও আওয়ামী লীগের ‘গণতান্ত্রিক প্রতিপক্ষ’ (Democratic opponent) ছিল না, এখনও নয়। জন্ম থেকেই এই জোট একদিকে ’৭১-রে পরাজিত শক্তি এবং স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের সম্মিলিত শিবির। অর্থাৎ স্বাধীনতার মিত্রপক্ষের তারা প্রতিপক্ষ নয়; শত্রুপক্ষ। এই শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধেই আওয়ামী লীগকে এবারও নির্বাচনে নামতে হয়েছে।

একাধিকবার ক্ষমতায় বসে এদের তৎপরতা ছিল শুধু আওয়ামী লীগের শত্রুতা করা নয়, স্বাধীনতার মূল আদর্শগুলো একেবারে উৎখাত করা। সেজন্য দেশপ্রেমিক মানুষের মতো আমিও কেবল নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের এবং তাদের মুখোশ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পরাজয় নয়, সম্পূর্ণ উচ্ছেদ চেয়েছি। কিন্তু একইসঙ্গে চেয়েছি দেশে স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে বিশ্বাসী একটি গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ে উঠুক। দেশে দ্বিদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হোক।

এটা স্বাধীনতা লাভের দীর্ঘদিন ধরেও হয়নি। এজন্য গণতান্ত্রিক রজানীতিতে যে শূন্যতা রয়ে গেছে বারবার সেই শূন্যতা পূরণ করেছে জনগণের শত্রু অপশক্তি। এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিশাল বিজয় অর্জন করেছে। গণতন্ত্রের ও অসাম্প্রদায়িকতার শত্রুপক্ষকে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে প্রায় উচ্ছেদ করেছে। কিন্তু সুস্থ বিরোধী রাজনীতির শূন্যস্থানটি পূর্ণ করতে পারেনি। এই শূন্যস্থানটি দ্রুত পূর্ণ হওয়া দরকার। বিএনপি, জামায়াত দ্বারা সেই শূন্যস্থান আবার পূর্ণ হলে তা গণতন্ত্রের জন্য আরও শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে, গণতন্ত্রের বিকাশে সহায়ক শক্তি হবে না।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনেও দেখা গেছে, ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ধ্বংস করার জন্য প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে। বলা হয়েছে চীনের সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্ক বাড়ানোর জন্য ভারতের মোদি সরকার হাসিনা সরকারের উপর বিরক্ত এবং ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে হাসিনা আবার জয়ী হোন তা তারা চাননি। বিএনপি জোট মোদির মন ভেজাতে সক্ষম হয়েছে এমন গুজবও ছড়ানো হয়েছে।

এই গুজব সঠিক প্রমাণিত হয়নি। মোদি সরকার হাসিনা সরকারের উপর ষোলো আনা খুশি না থাকতে পারে, কিন্তু তারা পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর দ্বারা প্রভাবিত এবং চীনের অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানের ভারত বিরোধী নীতির সহায়ক বিএনপি-জামায়াতের জোটের সঙ্গে প্রকাশ্য বা গোপন আঁতাত করবে এই ভাবা আহাম্মকি। আমেরিকা, ভারত প্রমুখ যে কোন দেশের সরকারই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে নিজ দেশের স্বার্থ ও সুবিধা দেখে। এ জন্য তারা বাংলাদেশের প্রধান দলগুলোর সঙ্গে অবশ্যই সুসম্পর্ক রাখতে চাইবে। কিন্তু কোন দলকে ক্ষমতায় রাখতে চাইবে এটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। দিল্লীতে যে দলের সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, ভারত প্রেমের উপকথায় মোদি মিত্র বাছতে ভুল করেছেন তার প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।

হাসিনা সরকারের বড় সাফল্য ভারত ও চীনের সঙ্গে মৈত্রী প্রতিষ্ঠায় সমন্বয় সাধন। বিএনপির মতো দীর্ঘকাল ভারতের সঙ্গে শত্রুতা তৈরি করে পরে পস্তানো নয়। আভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগ যদি স্বাধীনতার আদর্শে বিশ্বাসী একটি গণতান্ত্রিক বিরোধী দল গড়ে উঠতে সহায়তা দেয়, তাহলে কোন অপশক্তি বাংলাদেশে মাথা তুলতে পারবে না। – জনকন্ঠ

(লন্ডন, ২৮ মে, মঙ্গলবার ২০১৯)

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment