দশ দিগন্তে

রোহিঙ্গা সমস্যায় অতীতের মোহাজের সমস্যা পথ দেখাক

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গা সমস্যাটি এখনো ঝুলে আছে। বাংলাদেশের ওপর এই বিশাল শরণার্থী আগমনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ হাসিনা-সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আপাতত সামাল দিয়ে চলেছেন বটে এবং আঞ্চলিক শান্তিও বজায় রেখেছেন, কিন্তু এই সমস্যা দীর্ঘকাল ঝুলিয়ে রাখলে লাখ লাখ রোহিঙ্গার জীবনে অন্ধকার নেমে আসবে এবং শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে নয়, গোটা উপমহাদেশেই সেই সংকট ছড়াবে। বাংলাদেশের মানুষের আর্থিক, সামাজিক, এমনকি রাজনৈতিক জীবনেও জটিলতা বাড়বে।

সমস্যাটির শান্তিপূর্ণ সমাধানের একমাত্র পথ মিয়ানমারের সামরিক জান্তার অত্যাচারে যে লাখ লাখ রোহিঙ্গান দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, যাদের নাগরিকত্ব পর্যন্ত হরণ করা হয়েছে, তাদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। বাংলাদেশ যেহেতু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, তাই সুযোগ বুঝে মিয়ানমারের বৌদ্ধ শাসকেরা রোহিঙ্গান মুসলমানদের বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্ব জনমত এর তীব্র নিন্দা করেছে। বাংলাদেশ সাধ্যমতো এই নির্যাতিত রোহিঙ্গানদের সর্বপ্রকার সাহায্য দিয়ে সাময়িক আশ্রয় দানের ব্যবস্থা করেছে।

পারস্পরিক আলোচনা দ্বারা এই সমস্যার দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধান করা যায়। কিন্তু মিয়ানমার বিশ্ব জনমতের চাপে আলোচনায় বসেছে এবং তাদের ভাষায় ‘প্রকৃত’ রোহিঙ্গানদেরও ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলছে। কিন্তু প্রক্রিয়াটিকে দীর্ঘ ও জটিল করার জন্য নানা বাহানা ও চাতুরীর আশ্রয় নিচ্ছে। তাদের হয়তো আশা, যতই দিন যাবে ততই মানুষ রোহিঙ্গা সমস্যাটির কথা ভুলে যাবে। সমস্যাটি ধামাচাপা পড়ে যাবে। বাংলাদেশকে তার সাধ্যের বাইরে গিয়ে যে বিশাল সংখ্যক অবশিষ্ট রোহিঙ্গানকে ইয়াঙ্গুন ফেরত নেবে না, তাদের হজম করতে হবে। যেমন হজম করতে হয়েছিল প্রায় ১০ লাখের মতো বিহারি মুসলমানকে ভারত-ভাগের সময়।

রোহিঙ্গা সমস্যার শুরুতে আশা করা গিয়েছিল, মিয়ানমারে সামরিক শাসন উৎখাতের জন্য দীর্ঘকাল সংগ্রামে জয়ী, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের একজন নেত্রী মিয়ানমারে ক্ষমতায় বসায় দেশটিতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিরাপদ হবে। বাস্তবে হয়েছে উলটো। শহিদ অং সানের কন্যা অং সান সু চি দীর্ঘ সংগ্রামের শেষে ক্ষমতায় বসে স্বরূপ ধারণ করেছেন। তিনি এখন মিয়ানমারের সামরিক জান্তার ক্রীড়নক হিসেবে নিন্দিত এবং বিশ্বময় তাঁর আগের সব খ্যাতি ও সুনাম হারিয়েছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের হাসিনা-সরকার অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাতে যে একেবারে কোনো অগ্রগতি হয়নি, তা নয়। কিন্তু রোহিঙ্গানদের ফিরে যাওয়ার ব্যাপারটি গজ-কচ্ছপ গতিতে চলছে। বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের (বিহারি) ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে পাকিস্তানের বিভিন্ন মিলিটারি ও সিভিল সরকার যে টালবাহানার নীতি গ্রহণ করেছিল, মিয়ানমার সরকার সেই একই নীতি অনুসরণ করছে।

রোহিঙ্গানদের বর্তমান দুর্দশার জন্য মিয়ানমার সরকারের এথনিক ক্লিনসিং নীতি তো অবশ্যই দায়ী। কিন্তু তার সঙ্গে দায়ী সৌদি আরব ও পাকিস্তানের উসকানিতে আরাকান মুসলিম স্টেট প্রতিষ্ঠার নামে একদল রোহিঙ্গানের সন্ত্রাসী সংগঠন তৈরি এবং সন্ত্রাসী তত্পরতা শুরু করা। পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় বাংলাদেশের জামায়তিরা এই সন্ত্রাসের ঘাঁটি কক্সবাজার, চট্টগ্রাম পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। বর্তমান সমস্যারও শুরু মিয়ানমারের কয়েকটি পুলিশ ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের হামলার পর। এই হামলার সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাস দমনের নামে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী নিরীহ সাধারণ রোহিঙ্গানদের ওপর হিটলারের ইহুদি দলনের কায়দায় বর্বর হামলা শুরু করে। তারা প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালাতে শুরু করে এবং অন্যদের মিয়ানমারের পুলিশ ও সৈন্যবাহিনী বাংলাদেশে ঠেলে দেয়।

এই রোহিঙ্গা-শরণার্থীদের নিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট রাজনৈতিক সুবিধা লোটারও চেষ্টা করেছিল। জামায়াত ও জেহাদিস্ট গোষ্ঠী চেয়েছিল এদের ভেতর থেকে ক্যাডার সংগ্রহ করা এবং বিএনপি চেয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার উচ্ছেদের রাজনীতিতে এদের ব্যবহার করা। অবশ্য হাসিনা সরকারের সময়োচিত সতর্কতার জন্য এ দুটি চক্রান্তই ব্যর্থ হয়েছে। তবে সমস্যাটির পূর্ণ সমাধান না হয়ে যদি দীর্ঘকাল ঝুলে থাকে, তাহলে জাতীয় ও আন্তর্জাতীয় দুই ধরনের ষড়যন্ত্রই আবার দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, তাঁকে আগেও রোহিঙ্গা সমস্যার মতো সমস্যায় ভুগতে হয়েছে। সেই সমস্যাটিও তাঁর মাথায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং তার নেপথ্যে ছিল পাকিস্তান। ১৯৪৬ সালে ভারত ভাগের প্রাক্কালে বিহারে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় এবং লক্ষ লক্ষ বিহারি মুসলমান ঘরবাড়িসহ সর্বস্ব হারায়। নিখিল ভারত মুসলিম লীগের তত্কালীন সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্না দুর্গত ও নিরাশ্রয় বিহারিদের পুনর্বাসনের এক পরিকল্পনা করেন। অবিভক্ত ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ— বাংলা, পাঞ্জাব, আসাম, সিন্ধুতে তখন মুসলিম লীগ সরকার ক্ষমতায়। সীমান্ত প্রদেশে কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় ছিল। জিন্না চার প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীদের কাছে চিঠি পাঠালেন, উদ্বাস্তু বিহারি মুসলমানদের তাঁরা যেন সমহারে ভাগ করে নিজ নিজ প্রদেশে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন। বাংলা ছাড়া তিন প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীরাই জিন্নাকে চিঠি লিখে অক্ষমতা জানান। বলেন, এত বিপুলসংখ্যক শরণার্থী পুনর্বাসনের ক্ষমতা তাঁদের নেই। তাতে প্রদেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থার ওপর ভয়ানক চাপ পড়বে এবং তা ভেঙে পড়বে।

একমাত্র অবিভক্ত বাংলা গোটা বিহারি শরণার্থীকে পুনর্বাসনে সম্মত হয়। তখন প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি ঘোষণা করলেন, ‘কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং তুলে দিয়ে হলেও বিহারিদের পুনর্বাসন করা হবে।’ সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার তত্ত্বাবধানেই বঙ্গ প্রদেশের পূর্বাঞ্চলে ঈশ্বরদী, পাবনা, ঢাকার মোহাম্মদপুর এবং আরো কয়েকটি জায়গায় এদের পুনর্বাসনের জন্য বিহারি কলোনি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার পরিকল্পনা ছিল বিহারি শরণার্থীদের ধীরে ধীরে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের সঙ্গে ইনট্রেগ্রেটেড করা। কিন্তু এই মন্ত্রিসভাকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে খাজা নাজিমুদ্দীন সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর মুসলিম লীগ সরকার বিহারিদের দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার শুরু করে। তাদের নাম দেওয়া হয় মোহাজের। তাদের একটি আলাদা সংগঠন তৈরি করা হয়। তার নেতা নির্বাচন করা হয় মাওলানা রাগিব আহসানকে।

তিনি বিহারিদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের জন্য পাঠ্যসূচি প্রণয়ন ও সারা প্রদেশে উর্দু স্কুল প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সরকারি সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন। চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও শুরু হয় মুসলিম লীগ সরকারের বৈষম্যনীতি। রেলওয়ে, পোস্টাল সার্ভিসের গোটাটাই বিহারিদের দখলে চলে যায়, প্রশাসনিক উচ্চপদেরও অধিকাংশ। ব্যবসা-বাণিজ্যেও অবাঙালিদের কর্তৃত্ব শুরু হয়। খুবই সূক্ষ্মভাবে বাধানো হয় বাঙালি-বিহারি বিরোধ।

১৯৫৫ সালে হক মন্ত্রিসভাকে উত্খাতের কাজে আদমজি জুট মিলের বিহারি শ্রমিকদের ব্যবহার করা হয়। বাঙালি-বিহারি দাঙ্গায় ৪০০-এর মতো বাঙালি শ্রমিক নিহত হয়। এই দাঙ্গাকে অজুহাত করে হক মন্ত্রিসভা বরখাস্ত করা হয়। অতীতে ব্রিটিশ শাসকেরা যেমন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান কমিউনিটিকে আলাদাভাবে রেখে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করার কাজে ব্যবহার করত, তেমনি পাকিস্তানের উর্দুভাষী শাসকেরাও তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিহারিদের দ্বারা মোহাজের নামে এক আলাদা সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটিয়ে তাদের বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের বিরোধিতা করার কাজে ব্যবহার করত। ফলে বাঙালি-বিহারি বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। বিহারি সম্প্রদায় নিজেদের পাকিস্তানি মনে করত, ফলে বাঙালির ছয় দফা আন্দোলন ও ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দেয়নি। বরং তাদের একটা বড় অংশ পাকিস্তানিদের বর্বর গণহত্যায় অংশ নিয়েছে। বাঙালিরাও তার ভয়াবহ প্রতিশোধ নিয়েছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হলো, বিহারি সম্প্রদায় নিজেদের পাকিস্তানি দাবি করে পাকিস্তানে যেতে চাইলেও তথাকথিত মুসলিম হোমল্যান্ড পাকিস্তান তাদের নিতে চাইল না। বহু আলোচনা এবং জাতিসংঘের চাপে এই হতভাগ্য বিহারিদের একটা অংশকে পাকিস্তানে যেতে দেওয়া হয়েছে। বাকি অংশকে বাংলাদেশে জাতিসংঘের আশ্রয়শিবিরে মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়েছে দীর্ঘকাল। এখন অবশ্য বাংলাদেশ সরকারের উদার তত্পরতায় তাদের এই অভিশপ্ত জীবনের অবসান হয়েছে।

এই মোহাজের সমস্যার সঙ্গে রোহিঙ্গা সমস্যার চরিত্রে ও বৈশিষ্ট্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। তাই এই সমস্যার দ্রুত ও সুষ্ঠু সমাধানে হাসিনা সরকারকে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। নইলে অতীতে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক জীবনে, এমনকি রাজনীতিতেও মোহাজের সমস্যা যে জটিলতা ও সংকট সৃষ্টি করেছিল, রোহিঙ্গা সমস্যা তার চাইতেও বেশি জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। রোহিঙ্গা সমস্যার সঙ্গে আন্তর্জাতিক উদ্দেশ্য ও চক্রান্তের যোগাযোগ আরো বেশি। রোহিঙ্গাদের খনিজ সম্পদে পূর্ণ এলাকাটির দিকে ভারত, রাশিয়া, চীনেরও দৃষ্টি নিবদ্ধ। এখানে আন্তর্জাতিক স্বার্থ-দ্বন্দ্বও আছে।

এসবের দিকে দৃষ্টি রেখে হাসিনা সরকার ভালোভাবেই এ পর্যন্ত সমস্যাটি মোকাবিলা করছেন। এই ব্যাপারে অতীতের মোহাজের সমস্যা তাদের পথ দেখাবে— এটাই আশা করি। – ইত্তেফাক

[ লন্ডন, জুন শনিবার, ২০১৯ ]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment