ভীষ্ম কি শরশয্যা থেকে উঠে আসতে চান?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

ভারতের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি আগের বারের চাইতেও বেশি ভোটে আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় এক কংগ্রেস নেতা হতাশ কণ্ঠে বলেছেন, ‘গান্ধী-নেহরুর ভারতের মানুষ যে মোদির মতো এক ঘোর সাম্প্রদায়িক এবং দেশ শাসনে ব্যর্থ ব্যক্তিকে আবার ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসাতে পারে এটা বিশ্বাস করা যায় না।’ তার বক্তব্যের জবাবে দিল্লীর একটি ইংরেজী সাপ্তাহিকে এক সাংবাদিক লিখেছেন একটি মজার লেখা। সাংবাদিক হিসেবে তিনি আমার কাছে খুব পরিচিত নন। কিন্তু তার লেখাটি পড়ে মজা পেয়েছি।

নরেন্দ্র মোদিকে ভারতের জনগণ কেন আবার ভোট দিলো এই প্রশ্ন সম্পর্কে সাংবাদিক বলেছেন, ‘বিকল্পটা কি ছিল? নরেন্দ্র মোদি ঘোর সাম্প্রদায়িক হোন, জনগণকে দেয়া সব প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ হয়ে থাকুন, তার দল দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে থাকুক, কিন্তু পৃথিবীর সবচাইতে বড় গণতন্ত্রে তিনি নেহরুর পর আবার স্ট্রং লিডারশিপ বা শক্ত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন।’ জনগণ স্ট্রং লিডারশিপে বিশ্বাসী।

সাংবাদিক লিখেছেন, মোদির বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদী হওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। কিন্তু ভারতের কংগ্রেস দলও কি এখন অনেকটাই হিন্দুত্ববাদী নয়? এবারের নির্বাচনে দেখা গেছে রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী শিব মন্দিরে গিয়ে পড়ে আছেন। সোনিয়া গান্ধীও কপালে টিপ পরে পরিবারসহ পূজা করছেন। কলকাতায় বাঘা বাঘা বাম নেতারা কালী ঘাটে গিয়ে নির্বাচনের সময় ধর্ণা দিচ্ছেন।

বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে কংগ্রেস জোট কি বিকল্প সেকুলারিজমের স্লোগান জোরেশোরে তুলতে পেরেছিল? পারেনি। বরং স্যাডো হিন্দুত্ববাদী সেজেছে ভোটের লোভে। বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ? সে অভিযোগ রাজীব গান্ধী ও মনমোহন সিং সরকারের বিরুদ্ধে বেশি ছিল। দেশবাসীকে দেয়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পালন সেটা অতীতের কোন সরকার কতটা পেরেছে তাও একটা প্রশ্ন। দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে মোদির গত সরকার যেভাবেই হোক, তাদের এমন একটা ইমেজ ভারতের মানুষের কাছে তুলে ধরতে পেরেছিল (সঠিক হোক আর না হোক) যে, মোদি এ ক্ষেত্রে শক্ত ও সকল নীতি অনুসরণ করতে পেরেছেন।

ভারতীয় সাংবাদিক লিখেছেন, এর বিপরীতে রাহুলের কংগ্রেস জোট বা আঞ্চলিক জোটগুলো না পেরেছে নিজেদের আভ্যন্তরীণ ঐক্যের প্রমাণ দিতে, না পেরেছেন সর্বসম্মত একজন প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করতে, যিনি মোদির জনপ্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ দিতে পারেন। রাহুল গান্ধীর নামটিও ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্পষ্ট করে বলা হয়নি। ফলে মোদির বিরুদ্ধে বিরোধী জোটগুলোর যুদ্ধ ছিল মুণ্ডুবিহীন কণিষ্ক রাজার নেতৃত্বে মাঠে নামার মতো।

ভারতের ভোটদাতারা দেখেছে তাদের সামনে হিন্দুত্ববাদী হলেও একটি সঙ্ঘবদ্ধ দল এবং তাদের নেতৃত্বে রয়েছেন মোদির মতো ক্যারিশমাটিক নেতা। অন্যদিকে রয়েছে হিন্দুত্ববাদের বিরোধী এমন কংগ্রেস ও অন্যান্য জোট, যাদের ভেতরে ঐক্য নেই এবং নির্বাচনে জয়ী হলে তারা ঐক্য ধরে রাখতে পারবে কি-না, একজন সর্বসম্মত নেতা বেছে নিয়ে তাকে প্রধানমন্ত্রী পদে বসাতে পারবে কিনা তাও সন্দেহ। এই সংশয়ের মধ্যে ভারতের সংখ্যা গরিষ্ঠ ভোটদাতা মন্দের ভাল হিসেবে বিজেপিকে বেছে নিয়েছে। তাদের সামনে বিকল্প আর কি ছিল? পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জি? তিনি এখনও সর্বভারতীয় নেতৃত্বের পর্যায়ে উঠে আসতে পারেনি।

ভারতে বিজেপির দ্বিতীয় দফা বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার কারণ সম্পর্কে এক ভারতীয় সাংবাদিকের বিশ্লেষণ আমার কাছে অনেকটাই সঠিক মনে হয়েছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদের সঠিক বিকল্প সেকুলারিজমকে কংগ্রেস শক্তভাবে জনগণের কাছে তুলে না ধরে তাদের নিজেদেরও হিন্দুত্ববাদের ছায়ার আশ্রয় গ্রহণ করা এবং মোদির বিকল্প প্রধানমন্ত্রীকে সে সম্পর্কে ভোট দাতাদের অন্ধকারে রাখা গত নির্বাচনে কংগ্রেসের এমন শোচনীয় পরাজয়ের একটা বড় কারণ তাতে সন্দেহ নেই।

বাংলাদেশেও ভারতের বিরোধী দলগুলোর মতো ভুল করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। প্রথম ভুল, ড. কামাল হোসেনকে নেতৃত্বে বসানো। কামাল হোসেন বহুবার নির্বাচনে ব্যক্তিগতভাবে ও দলীয়ভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। আইনজীবী হিসেবে তার খ্যাতি আছে, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে কোন ইমেজ ও ক্যারিশমা নেই। তিনি বঙ্গবন্ধুর আলোকে আলোকিত ছিলেন। সেই আলো থেকে সরে যেতেই রাজনীতিতে তার ভরাডুবি হয়েছে।

তিনি লিবারেল ডেমোক্র্যাট এবং সেকুলারিজমে বিশ্বাসী নেতা বলে পরিচিত ছিলেন। তিনি হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক বিরোধী ঐক্যজোট গঠন করতে পারেন। কিন্তু কি করে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক জোটের সঙ্গে হাত মেলান? তার ওপর ঐক্য গড়ার নামে প্রথমেই অনৈক্যের ষড়যন্ত্রে যোগ দেন। বিএনপি ও জামায়াতের খপ্পরে পড়ে তিনি ডাঃ বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব থেকে সরাতে গোপন ষড়যন্ত্র করে নিজের মর্যাদা হারান, অন্যদিকে ঐক্যফ্রন্টের স্বরূপও ধরা পড়ে যায়।

তার ওপর নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট জয়ী হলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন তা ঘোষণা করতেও ঐক্যফ্রন্ট ব্যর্থ হয়। ড. কামাল হোসেন ঐক্যফ্রন্টের নেতা, অথচ নির্বাচন করবেন না, এটা কোন সুস্থ ভাবনা-চিন্তা হতে পারে? গত কয়েক বছরে শেখ হাসিনা দেশের রাজনীতিতে নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মানুষ মনে করে তার কোন বিকল্প নেই। এই অবস্থায় যে ঐক্যফ্রন্টের কোন ঐক্য নেই, বিকল্প কর্মসূচী নেই, বিকল্প নেতা নেই, সেই বিরোধী দলকে ভোট দেবে কারা? এবারের নির্বাচনে হয় তো সামান্য অনিয়ম হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, তা না হলেও আওয়ামী লীগের বিজয় ছিল অনিবার্য। মুণ্ডুহীন কণিষ্ক রাজার দলকে কেউ ভোট দেয়?

বারবার ভোটে হেরেও ড. কামাল হোসেনের চৈতন্যোদয় হয়নি। সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই আন্দোলন করে তিনি সরকার পরিবর্তন করতে পারবেন। আন্দোলন নেই, আন্দোলনের কর্মসূচী নেই, এমনকি ঐক্যফ্রন্টের ঐক্যও নেই, তিনি কীভাবে কোন জাদুমন্ত্রে ছয় মাসের মধ্যে সরকার পরিবর্তন করবেন, তা আমার জানা নেই। তার মতো প্রবীণ জ্ঞানী মানুষ এ কথা না বললে ভাবতাম এটা পাগলের প্রলাপ। আরও মজার কথা, যে ঐক্যফ্রন্ট এখন প্রায় মরা ঘোড়া তাকে শুধু জীবন সঞ্চার নয়, তাকে সম্প্রসারণ করবেন বলেও ঘোষণা দিয়েছেন।

বেলুনে বেশি ফুঁ দিয়ে বড় করতে চাইলে তা ফেটে যায়। ঐক্যফ্রন্টে নামসর্বস্ব দলগুলোর এত সমাহারের পর বাজারে আর দল আছে কি যে, তিনি ঐক্যফ্রন্টের আয়তন আরও বাড়াবেন? বেলুনের মতো তা আবার ফেটে না যায়। দেখার রইল আমাদের এই প্রবীণ ভীষ্ম শরশয্যা থেকে উঠে এসে দেশবাসীকে কি ম্যাজিক দেখান ছয় মাসে।

তার কাছে আমার একটাই নিবেদন- বৃদ্ধ বয়সে আর লোক হাসাবেন না। – জনকন্ঠ

লন্ডন, ১১ জুন মঙ্গলবার, ২০১৯।

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment