দশ দিগন্তে

‘আপনি আচরি ধর্ম অপরে শেখাবে’

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী-

ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের একটি উক্তি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরক্ত হয়েছেন। উক্তিটিও তিনি করেছেন বিদেশে গিয়ে। সম্প্রতি জার্মানিতে গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামে অংশ নিতে গিয়ে তিনি জার্মান বেতার ‘ডয়েচে ভেলে’কে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেন, ‘লিখছি না এমন অনেক ইস্যু রয়েছে। অনেক ইস্যুতেই লেখা উচিত, যেমন ধরেন গত সাধারণ নির্বাচন। এ ছাড়া আরো ছোট নির্বাচনগুলো নিয়ে লেখা উচিত, যা লিখছি না। বলা উচিত, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও লিখতে পারছি না।’

মোদ্দা কথায়, বাংলাদেশে কথা বলার স্বাধীনতা নেই— অভিযোগটা হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে। স্বাভাবিকভাবেই প্রধানমন্ত্রী বিরক্ত হয়েছেন। তিন দেশ সফর শেষে দেশে ফিরেই তিনি তাঁর এই সফর নিয়ে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। প্রসঙ্গক্রমে মাহফুজ আনামের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে জবাব দিয়েছেন।

ডেইলি স্টার সম্পাদকের বক্তব্যে যদি সম্পাদক মূলত নৈর্ব্যক্তিক সততা থাকত, তাহলে কথা ছিল না। কিন্তু মাহফুজ আনামের সম্পাদক-জীবনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, অপক্ষপাত স্বাধীন সাংবাদিকতা নয়। একদিকে তিনি একটি বিতর্কিত বড় ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপের মালিকানাধীন পত্রিকার সম্পাদক এবং অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ বিরোধী এবং ব্যক্তিগতভাবে হাসিনা বিদ্বেষী।

এক-এগারোর সরকারের আমলে তিনি এই সরকারের সমর্থক ছিলেন। এই সরকারের পতন হওয়ার পর তিনি স্বেচ্ছায় সেটা কবুল করেন। সেই আমলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই তাঁকে শেখ হাসিনার দুর্নীতি সম্পর্কে একটা মিথ্যা সংবাদ দিয়েছিল। সেটা তিনি যাচাই-বাছাই না করেই ছেপে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, এটা তাঁর সাংবাদিক-জীবনের বড় ভুল।

কিন্তু এরকম ভুল (ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত) তাঁর সাংবাদিক-জীবনে অনেক আছে। সে কথায় পরে আসছি। আগে প্রধানমন্ত্রী সংগতভাবেই তাঁর সম্পর্কে যে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন, সে কথায় আসছি।

শেখ হাসিনা বলেছেন, যিনি নিজেকে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন মতামতের পত্রিকার সম্পাদক বলে দাবি করেন, তিনি কী করে বলেন, আমাকে ডিজিএফআই যা বলেছে, সেটাই লিখে দিয়েছি। বর্তমানেও তার ওপর যদি এখনকার ডিজিএফআইয়ের কোনো বিষয়ে কথা না বলার চাপ থাকে, তাহলে বিদেশে গিয়ে কথা বলছেন কী করে? সাহস পাচ্ছেন কীভাবে?

এ কথার জবাব মাহফুজ আনাম দিতে পারবেন না। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনা সম্পর্কে মিথ্যা সংবাদ ছেপে তিনি ভুল করেছিলেন। কিন্তু এরকম ভুল একটি নয়, অসংখ্য করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন তিনি মানিক মিয়া, আব্দুস সালাম ও জহুর হোসেন চৌধুরীর মতো স্বাধীনচেতা সম্পাদকদের ঐতিহ্যপূর্ণ সাংবাদিকতার উত্তরাধিকার বহন করেন না। তিনি মালিকদের স্বার্থ ও ইচ্ছাপূরণের সম্পাদক।

মাহফুজ আনাম হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের বাধাদানের অভিযোগ তোলেন। কিন্তু তিনি নিজে কি তার পত্রিকায় স্টাফ কিংবা বাইরের কনট্রিবিউটরদের স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে লেখালেখির অধিকার দেন? একটা উদাহরণ দিই। আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী শহীদ শাহ মোহাম্মদ কিবরিয়া যখন বিদেশে জাতিসংঘের কর্মকর্তা, তখন মাহফুজ আনামও ইউনেস্কোর কম্যুনিকেশন দপ্তরে চাকরি করেন। একই শহরে থাকেন, দুজনের মধ্যে ছিল খুবই ঘনিষ্ঠতা।

প্রয়াত সাংবাদিক এস এম আলী যখন বিদেশ থেকে ঢাকায় ফিরে ডেইলি স্টার প্রকাশের ব্যবস্থা করেন, তখন শাহ মোহাম্মদ কিবরিয়ার অনুরোধেই এস এম আলী মাহফুজ আনামকে স্টারের সম্পাদকীয় বিভাগে গ্রহণ করেন। শাহ কিবরিয়াও ডেইলি স্টারে একটি সাপ্তাহিক কলাম লিখতে শুরু করেন, শাহ মোহাম্মদ কিবরিয়া ছিলেন মৃদুভাষী লেখক। প্রতিপক্ষের বক্তব্যের জবাব দিতেন যুক্তির ভাষায়, নিচু গলায়। তার এই ধরনের লেখাতে যেহেতু সামরিক শাসনের সমালোচনা করা হয়েছে (এটাই কিবরিয়া সাহেব অনুমান করেছিলেন), সেহেতু তা ছাপানো বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিবরিয়া সাহেব সজল চোখে আমাকে এ কথা বলেছিলেন।

উদাহরণ হিসেবে আমার নিজের কথাই টানি। মতিউর রহমানের সম্পাদনায় দৈনিক ‘প্রথম আলো’ বের হলে আমি তাতে নিয়মিত কলাম লেখা শুরু করি। কিছুদিন পর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার একই মালিকানাভুক্ত হয়। এই সময় মতিউর রহমান আমাকে চিঠি লিখে প্রস্তাব দেন, প্রথম আলোতে প্রকাশিত আমার কলামের বাংলা লেখা ‘স্টার’ ইংরেজিতে অনুবাদ করে ছাপতে চায়। আমি সানন্দে অনুমতি দিই। আমি ডাকযোগে বিনা মূল্যে ডেইলি স্টার পেতে শুরু করি।

ইতোমধ্যে একটি ঘটনা ঘটে। জিয়াউর রহমানের জন্ম অথবা মৃত্যু দিবসে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে একই দিনে স্টার ও প্রথম আলোতে জোড়া সম্পাদকীয় ছাপা হয়। ডেইলি স্টারে মাহফুজ আনাম সম্পাদকীয় কলামে লেখেন, ‘জিয়াউর রহমান শুধু দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনেননি, তিনি সামরিক বাহিনীতে ভেঙে পড়া কম্যান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।’

আমি এই লেখাটি পাঠ করে বিস্মিত হই। আমি জানি, আবুল মনসুর আহমদের ছেলে মাহফুজ আনাম উচ্চশিক্ষিত। তিনি কী করে আইয়ুবের অনুকরণে গঠিত জিয়ার পুতুল পার্লামেন্টকে বহুদলীয় সংসদ বলেন? তিনি কি বহুদলীয় গণতন্ত্রের সংজ্ঞা ও অর্থ জানেন না? নাকি জিয়াউর রহমান সামরিক বাহিনীতে কম্যান্ড ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন? তাঁর আমলে ৩৫টি সামরিক ক্যু হয় এবং নিজেও বিদ্রোহী সামরিক বাহিনীর হাতেই নির্মমভাবে নিহত হন।

আমি ‘স্টারের’ সম্পাদকীয়ের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাই আমার কলামে এবং তা ছাপা হয় প্রথম আলোতেই। মতিউর রহমান আমাকে জানান, মাহফুজ আনাম তাতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। আমি তাঁকে জানাই, আমি তো মাহফুজ আনামের কোনো নিন্দা করিনি। তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করেছি। একজন সম্পাদক তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করার অধিকার তাঁর পাঠককে দেবেন না, তাহলে তিনি নিজে কী করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চান?

মাহফুজ আনাম আমার বিরুদ্ধে তার ক্রোধ প্রকাশ করলেন, তাঁর পত্রিকাটি আমাকে পাঠানো বন্ধ করে দিয়ে এবং তার পত্রিকায় আমার লেখার ইংরেজি অনুবাদ ছাপানোর প্রস্তাব বাতিল করে। এরপর তো আমার লেখায় বারবার হস্তক্ষেপের দরুন প্রথম আলোতেও লেখা বন্ধ করতে হয়।

আরেকটি ঘটনা এক-এগারোর আমলের। হঠাৎ একদিন সুইডেনের স্টকহোম থেকে লন্ডনে একটা টেলিফোন পাই। এক তরুণ বাংলাদেশি সাংবাদিক। আমি তাকে চিনি না, তিনি আমাকে চেনেন। তাঁর নামটি আমার মনে নেই। তিনি সকাতরে জানালেন, তিনি এক-এগারোর সরকারের সমালোচনামূলক একটা রিপোর্ট ছেপেছিলেন স্টারে। তিনি ঐ কাগজের রিপোর্টার। তাঁকে সম্পাদক বরখাস্ত করেছেন এবং ডিজিএফআই-এর হাতে সমর্পণের ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি কোনোভাবে সুইডেনে পালিয়ে এসেছেন। এখন ব্রিটেনে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে চান। আমি কোনো সাহায্য করতে পারি কি না। আমি তাঁকে সাহায্য করেছিলাম। দীর্ঘকাল আগের ঘটনা, সব কথা মনে নেই।

ডেইলি স্টারের সহোদরা কাগজ প্রথম আলো। এই কাগজের সম্পাদক মতিউর রহমানের নিরপেক্ষ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ইতিহাস আরো উজ্জ্বল। প্রথম আলো-গ্রুপের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় একটি কার্টুন ছাপা হয়। তাতে ধর্ম অবমাননার উদ্দেশ্যমূলক অভিযোগ ওঠে। তাতেই ভয় পেয়ে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাপ্তাহিকটির সম্পাদকের চাকরি যায়। মতিউর রহমান বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতিবের কাছে গিয়ে তওবা পড়েন এবং born a gain mussalman বা নবদীক্ষিত মুসলমান হন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতা রক্ষায় এই যাঁদের ভূমিকা, তারা বিদেশে গিয়ে বলেন, দেশে তাঁদের কথা বলার স্বাধীনতা নেই।

মাহফুজ আনামকে সবিনয়ে বলি, ‘আপনি আচরি ধর্ম অপরে শেখাবে।’ – ইত্তেফাক

[ লন্ডন, ১৫ জুন, শনিবার, ২০১৯ ]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment