তৃতীয় মত

সংখ্যালঘু এক মন্ত্রীর প্রতি সহমর্মিতা

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

গত এপ্রিল মাসে আমি যখন ঢাকায়, তখন অনেক খবরের মধ্যে একটি খবর আমার নজরে পড়েছিল। খবরটি তখন আমার মনে কোনো গুরুত্ব বহন করেনি।

খবরটি ছিল ডা. রাজন কর্মকার এবং ডা. কৃষ্ণা মজুমদার দু’জনেই উচ্চ শিক্ষিত চিকিৎসক এবং স্বামী-স্ত্রী। নামকরা হাসপাতালে কাজ করেন। হঠাৎ ডা. রাজন কর্মকার মারা গেছেন। কোনো কোনো সংবাদ পত্রে বলা হয়েছে, এই মৃত্যু অস্বাভাবিক এবং এই ব্যাপারে তার স্ত্রী কৃষ্ণা মজুমদারের যোগসাজশ থাকতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছে।

খবরটি ভুলে যেতাম। কিন্তু খবরটি কোনো কোনো কাগজে পল্লবিত হচ্ছে দেখে বিস্মিত হলাম। পরে জানতে পারলাম, মৃত ডাক্তার রাজন কর্মকার আমাদের বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের জামাতা। রাজন কর্মকারের স্ত্রী ডা. কৃষ্ণা মজুমদার খাদ্যমন্ত্রীর কন্যা। সম্ভবত খাদ্যমন্ত্রীর জামাই হওয়াতেই তার আকস্মিক মৃত্যু সংবাদপত্রে এতটা গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু এটাকে অস্বাভাবিক মৃত্যু বলা এবং তার স্ত্রীকে এই মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ বিস্তার করার কারণ কী তা বুঝতে পারিনি। ভেবেছি, কোনো কারণ না থাকলে তা নিয়ে সংবাদপত্রে এত তোলপাড় হতো না।

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার অথবা তার পরিবারের কাউকে তখন আমি চিনি না। সুতরাং তার তরফ থেকে এ সম্পর্কে কোনো তথ্য জানার সুযোগ আমার ছিল না। একমাত্র খবরের কাগজ ছাড়া। ফলে ঢাকার সাংবাদিক বন্ধুদের কারও কারও শরণাপন্ন হলাম। তারাও এই ব্যাপারে খুব একটা ওয়াকিবহাল নন। কেবল একজন বললেন- তার সন্দেহ, এই খবরটি ফলাও করে প্রচার করার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে এবং এতে সাধন বাবুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাত আছে। তাদের সহায়তা করেছে মিডিয়ায় একটি স্বার্থসংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র সিন্ডিকেট। তিনি খাদ্যমন্ত্রী হওয়ার পর তাদের স্বার্থে আঘাত পড়াতেই তাকে মন্ত্রী পদ থেকে সরাবার জন্যই এই প্রোপাগান্ডা বলে আমার মনে হয়। এর বেশি কিছু আমার সাংবাদিক বন্ধু বলতে পারলেন না।

আমার কপাল ভালো। ঢাকার শিল্প সংস্থা বেকন গ্রুপের তরফ থেকে এপ্রিল মাসের শেষ দিকে আমার অনুজপ্রতিম খোন্দকার রাশেদুল হক (নবা) আমাকে সম্মাননা দেয়ার জন্য ঢাকা ক্লাবে একটা ভোজসভার আয়োজন করেছিলেন। সেখানে খাদ্যমন্ত্রী সাধন বাবু এসেছিলেন। তার সঙ্গে আলাপ হল। কথায় কথায় তাকে তার জামাতার মৃত্যু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, তার জামাতার হার্টের রোগে মৃত্যু হয়েছে। করোনারি রিপোর্টও তাই। একবার নয়, একাধিকবার এই পরীক্ষা করা হয়েছে। সব রিপোর্টেই বলা হয়েছে এই মৃত্যু স্বাভাবিক। কার্ডিয়াক অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়েছে। রাজন ও কৃষ্ণার দাম্পত্য জীবনও ভালো ছিল। আমার মেয়েকে কলঙ্কিত করে কেউ আমার ক্ষতি করতে চান কিনা, সে সম্পর্কে আমি কিছু বলতে পারি না।

মন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে এর বেশি কথা হয়নি। ঢাকায় থাকাকালেই তার সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নিতেই জানলাম, তিনি নব্য আওয়ামী লীগার নন। নওগাঁর নেয়ামতপুর উপজেলার এই মানুষটি ১৯৬৭ সাল থেকে ছাত্রলীগে ছিলেন এবং ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সব আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সাংগঠনিক পদ ছাড়াও উপজেলা চেয়ারম্যান থেকে কয়েক দফা এমপি এবং শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে পূর্ণ মন্ত্রী পদে আসীন হন।

জন প্রতিনিধি হিসেবে তিনি নিজের এলাকায় যথেষ্ট জনপ্রিয় এবং খাদ্যমন্ত্রী পদে যোগ দিয়েই তার দফতরের দুর্নীতির স্থায়ী ঘাঁটিগুলো ভাঙার কাজে হাত দিয়েছেন। কৃষকের কাছ থেকে চাল কেনা এবং অভাবী মানুষের হাতে কম দামে চাল পৌঁছে দেয়ার কাজে যে সিন্ডিকেটগুলো গড়ে উঠেছিল এবং কোটি কোটি টাকার কালো বাণিজ্যের পাহাড় গড়ে তুলেছিল, নতুন মন্ত্রীর কার্যকলাপে তাদের স্বার্থে আঘাত পড়েছে এবং তারা তার বিরুদ্ধে জোট বেঁধেছে। এই সিন্ডিকেটগুলোর সঙ্গে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও হাত মিলিয়েছে।

মন্ত্রীর কোনো বড় ধরনের অনিয়ম আবিষ্কার করতে না পেরে তার প্রতিপক্ষ অবশেষে তার জামাইয়ের আকস্মিক মৃত্যুকেই তাদের রাজনীতির হাতিয়ার করতে চেয়েছিল বলে নওগাঁর বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির ধারণা। একাধিক ময়না তদন্তে ডা. রাজনের মৃত্যু স্বাভাবিক হৃদরোগে হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তার সহকর্মী ডাক্তারদেরও দু’একজনের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তাদেরও দৃঢ় অভিমত ডা. রাজন কর্মকারের মৃত্যু হৃদরোগ ঘটিত। কিন্তু তার মৃত্যু সম্পর্কে গুজব রটিয়ে দুর্বৃত্তরা শুধু সাধন বাবুর একার নয়, তার পরিবারের সবার জীবনে বিড়ম্বনা সৃষ্টি করেছিল।

আমি সাধন বাবুর পরিবারকে কেন্দ্র করে এই রটনা সম্পর্কে একটু বেশি আগ্রহ দেখিয়েছি এই কারণে যে, তিনি বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার একজন সংখ্যালঘু সদস্য। অতীতে উপমহাদেশে সংখ্যালঘু অনেক মন্ত্রীর ভাগ্য বিড়ম্বনার কাহিনী আমি জানি। বিনা দোষে তারা নিগ্রহ ভোগ করেছেন। বন্দুক হাতে যুদ্ধ করেছেন। তার এলাকার মানুষ সেজন্য তাকে শ্রদ্ধা করে। তাকে তার জামাই হত্যার সাজানো অভিযোগে জড়িয়ে, গুজব ছড়িয়ে যারা রাজনৈতিক অভিসন্ধি পূর্ণ করতে চায়, তাদের মুখোশ অবশ্যই খুলে দেয়া উচিত।

অতীতেও পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে বেশকিছু ত্যাগী, দেশ প্রেমিক সংখ্যালঘু মন্ত্রী রাজনৈতিক চক্রান্তের ও অসত্য প্রচারণার শিকার হয়েছেন। তার দু’একটা ঘটনার উদাহরণ দেই। অবিভক্ত ভারতে যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল ছিলেন তফশিলী ফেডারেশনের (নিম্নবর্ণের হিন্দুদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান) নেতা। অখণ্ড স্বাধীন ভারতে বর্ণহিন্দুদের দ্বারা তফশিলী হিন্দুরা নিগৃহীত হবে এই ভেবে তিনি জিন্নার সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন এবং পাকিস্তান দাবিকে সমর্থন দিয়েছিলেন। ভারত ভাগের পর তিনি পাকিস্তানে থেকে গিয়েছিলেন এবং জিন্না তাকে পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের সভাপতি (স্পিকার) করেছিলেন। পরে তিনি পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী হন।

১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে মুসলিম লীগ সরকার সংখ্যালঘু বিতাড়নের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধায়। দাঙ্গা পীড়িত হিন্দু-বৌদ্ধদের রক্ষার জন্য যোগেন মন্ডল করাচি থেকে ঢাকায় ছুটে আসেন এবং দাঙ্গা দমনের জন্য প্রাদেশিক সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। যোগেন মন্ডল কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। কিন্তু পুলিশ তাকেই হয়রানি করা শুরু করে। এমনকি তার প্রাণনাশের চেষ্টা হয়। যোগেন মন্ডল প্রাণ রক্ষার জন্য ছদ্মবেশে সীমান্ত পেরিয়ে কলকাতায় পলায়ন করে রাজনৈতিক আশ্রয় চান এবং সেখান থেকে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের কাছে তার পদত্যাগ পত্র পাঠিয়ে দেন।

আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল অবিভক্ত ভারতের বিপ্লবী নেতা প্রভাষ চন্দ্র লাহিড়িকে নিয়ে। ভারত ভাগের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যান। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি দশ বছরের বেশি কারাভোগ করেছেন। নেহেরু পর্যন্ত তাকে দাদা ডাকতেন। পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগ সরকারের পতন হওয়ার পর যুক্তফ্রন্টের হক মন্ত্রিসভায় প্রভাষ চন্দ্র লাহিড়িকে মন্ত্রী করা হয়। তিনি খুবই অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। মন্ত্রী হিসেবেও ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণীতে যাতায়াত করতেন। কিন্তু তার সচিবরা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তার জন্য প্রথম শ্রেণীর ভাড়ার বিল করতেন। এটা প্রভাষ বাবু জানতেনও না।

হক মন্ত্রিসভার পতনের পর কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ শাসকরা যুক্তফ্রন্টের অন্যান্য মন্ত্রীর সঙ্গে প্রভাষ লাহিড়ির বিরুদ্ধেও দুর্নীতির মামলা এনে তাকে হয়রান করেন। অভিযোগ, তিনি ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণীতে সফর করে সরকারের কাছে প্রথম শ্রেণীর বিল করেছেন। এই হাস্যকর দুর্নীতির মামলা অবশ্য টেকেনি।

একই ঘটনা ঘটেছে বিখ্যাত কংগ্রেস নেতা মনোরঞ্জন ধরকে নিয়ে। তিনিও দেশ ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যান। আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা গঠিত হলে মনোরঞ্জন ধর তাতে মন্ত্রী হন। অমনি মুসলিম লীগ সমর্থক কাগজগুলোতে (দৈনিক আজাদসহ) শুরু হয় তার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার। ফলাও করে খবর ছাপা হয়, ‘আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভায় হিন্দু ভারতের এজেন্ট গ্রহণ।’ আজাদ পত্রিকা আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভাকে আখ্যা দেয় ‘আতা-ধর মন্ত্রিসভা’। অবিভক্ত বাংলায় ফজলুল হক তার মন্ত্রিসভায় শ্যামা প্রসাদ মুখার্জিকে গ্রহণ করায় এই আজাদ পত্রিকা তার নাম দিয়েছিল শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্ত্রীদের নানাভাবে নির্যাতনের আরও অনেক উদাহরণ আছে। ভারতেও আছে। প্রবন্ধ বড় হওয়ার ভয়ে তা লিখছি না। কেবল স্বাধীন এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশেও এই ধরনের ঘটনার দু’একটি উদাহরণ দেব। অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু স্বাভাবিকভাবেই একাধিক সংখ্যালঘু মন্ত্রী তার মন্ত্রিসভায় গ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে সৎ মানুষ বলে সর্বজনপ্রিয় ছিলেন ফণীভূষণ মজুমদার। আজকের খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার জেনে সান্ত্বনা পেতে পারেন যে, বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় ফণীভূষণ মজুমদারও ছিলেন খাদ্যমন্ত্রী। তিনিও মিথ্যা প্রচার থেকে রক্ষা পাননি।

তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। স্বাভাবিকভাবে খাদ্য ঘাটতি ছিল এবং খাদ্যমূল্য চড়া ছিল। মুজিব সরকার বাজারে স্থিতিশীলতা রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। এ সময় স্বাধীনতার শত্রুরা আন্ডার গ্রাউন্ডে বসে প্রচার শুরু করে বাংলাদেশ থেকে ধান, চাল ও পাট অবাধে ভারতে চোরাচালান হচ্ছে। তার পেছনে খাদ্যমন্ত্রী ফণীভূষণ মজুমদারের যোগসাজশ আছে।

হাসিনা-মন্ত্রিসভার আমলেও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে মন্ত্রিত্ব হারাতে হয় দুর্নীতির অভিযোগে। তিনি রেলমন্ত্রী ছিলেন। তার এপিএসের গাড়িতে বিপুল অর্থ পাওয়া গেছে, এজন্য সুরঞ্জিত বাবুর বিরুদ্ধেই বিরাট প্রচার অভিযান শুরু হয়। এই প্রচার কতটা সঠিক ছিল তা আমি জানি না। তবে সুরঞ্জিত বাবুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যে এই প্রচারের পেছনে ছিলেন এবং তিলকে তাল করেছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

তবে সাধন বাবুকে একটা সান্ত্বনা দেই, তিনি এই প্রচারণায় কান দেবেন না, বিব্রত হবেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানুষ চেনেন। চেনেন বলেই তাকে খাদ্যমন্ত্রী করেছেন। তিনি সৎভাবে এই দায়িত্ব পালনে অটল থাকুন, দেখবেন কালো প্যাঁচার দল রাত্রির আঁধার থেকে মুখ বের করতে পারবে না। তার কন্যা ডা. রাজন কর্মকারের বিধবা স্ত্রী ডা. কৃষ্ণা মজুমদারের প্রতি, যিনি অসত্য প্রচারণায় সর্বাধিক মর্মাহত হয়েছেন, তাকে আমার সহানুভূতি ও সহমর্মিতা জানাই। – যুগান্তর

লন্ডন, ১৫ জুন, শনিবার, ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment