অমর্ত্য সেনের রাগ এবং উপমহাদেশের রাজনীতির বাস্তবতা

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

ভারতের নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার দেশে বিজেপির মতো এমন কট্টর হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক দল দ্বিতীয়বার বিশাল সংখ্যা গরিষ্ঠতায় নির্বাচনজয়ী হলে তা নিয়ে বিস্ময় এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং সেজন্যে ভারতের মানুষকেও দোষারোপ করেছেন। অমর্ত্য সেনের মতো একজন অসাধারণ বিজ্ঞান মনস্ক ব্যক্তি ভারতে বিজেপির উত্থানের পেছনের আসল কারণ খতিয়ে না দেখে কেন বিস্মিত ও বিক্ষুব্ধ হলেন তা আমি জানি না।

বাংলাদেশে মুজিব হত্যা ও ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির উত্থান যখন ঘটেছিল, তখনও ভারতের একাধিক পণ্ডিত ও সাংবাদিক তাতে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। দিল্লীর একটি কাগজে এক বিখ্যাত সাংবাদিক লিখেছিলেন, ‘যে বাংলাদেশ গোটা পাকিস্তান আমল জুড়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদে দীক্ষা নিয়েছে, শেখ মুজিবের ধর্ম নিরপেক্ষ স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার ডাকে ত্রিশ লাখ নর-নারী আত্মাহুতি দিয়েছে, সেদেশে কি করে ধর্মান্ধ শক্তির পুনরুত্থান ঘটে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায়? জাতির পিতাকে তারা হত্যা করে এবং সাম্প্রদায়িকতার ভূত জাতির মাথায় আবার চাপিয়ে দেয়?’

এই প্রসঙ্গটি নিয়ে আমাকে দিল্লীতে বসে অনেক ভারতীয় সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে হয়েছে, এমনকি কুলদীপ নায়ারের মতো বিখ্যাত সাংবাদিকের সঙ্গে রীতিমতো উত্তেজনাপূর্ণ বিতর্কে জড়িত হতে হয়েছিল। আমার বক্তব্য ছিল- ভারত উপমহাদেশে সর্বদা ধর্ম সমন্বয়ের চর্চা হয়েছে। ধর্ম নিরপেক্ষতার চর্চা কখনও সমাজে বা রাজনীতিতে হয়নি। ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনীতিকরাও এটিকে স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কখনও নিজেদের জীবনে বা রাজনীতিতে তার প্রতিফলন ঘটাননি। সমাজে তা প্রতিষ্ঠা পায়নি।

আমরা ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহকে উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ বলে স্বীকৃতি দিয়েছি। অবশ্যই এটা আমাদের প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ। কিন্তু এই যুদ্ধেরও ঘোষিত লক্ষ্য স্বাধীনতা ছিল না। ছিল ক্ষমতাচ্যুত দিল্লীর বাদশাহ বাহাদুর শাহকে আবার ক্ষমতায় বসানো। এই যুদ্ধের সময় ইংরেজরা তার দুই পুত্রকেই নির্মমভাবে হত্যা করে এবং বাহাদুর শাহকে ইয়াঙ্গুনে (রেঙ্গুনে) নির্বাসনে পাঠায়। এমনকি ইন্ডিয়ান সিপাইদেরও স্বাধীনতার জন্য বিদ্রোহে যোগ দিতে দেখা যায়নি। হিন্দু সিপাইদের বলা হয়েছিল, তারা যে বন্দুকের টোটা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ব্যবহার করে তাতে গোরুর চর্বি মেশানো। আর মুসলমান সিপাইদের বলা হয়েছিল তাদের বন্দুকের টোটায় শূকরের চর্বি মেশানো। ফলে দুই ধর্মের বেশিরভাগ সিপাই ধর্মনাশের ভয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়েছিল।

অবিভক্ত ভারতে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ দুটি প্রতিষ্ঠানই প্রথমে গঠিত হয়েছিল স্বাধীনতা অর্জনের জন্য নয়। ব্রিটিশ-রাজের অনুগত রাজনৈতিক দল হিসেবে কিছু দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য দুটি দলেরই জন্ম। মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেসের নেতৃত্ব গ্রহণের পর দলটি প্রকৃত রাজনৈতিক চরিত্র অর্জন করে। অনুরূপভাবে মোহাম্মদ আলী জিন্না মুসলিম লীগের নেতৃত্ব গ্রহণের পর দলটির রাজনৈতিক চরিত্র প্রকাশ পায়।

গান্ধী-জিন্না দুজনেই বিলাতে লেখাপড়া করেছেন। ব্যারিস্টার হয়েছেন। দুজনেই ইংরেজী শিক্ষিত নেতা। প্রথমদিকে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ পরস্পরের মিত্র দল ছিল। তারপরই হিন্দু ও মুসলমানদের স্বার্থের দ্বন্দ্বে দুদল পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। গান্ধী ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলতেন। কিন্তু দেশে ফিরে শুরু করেন বৈদিক যুগের আশ্রম রাজনীতি। ধ্বনি তোলেন রাম রাজত্ব প্রতিষ্ঠার।

অন্যদিকে জিন্না ছিলেন আচার-আচরণে, কথাবার্তায় সম্পূর্ণভাবে একজন দেশী ইংরেজ সাহেব। তিনি নামাজ রোজার ধারও ধারতেন না। জানতেনও না। কিন্তু রাজনীতিতে স্লোগান তুললেন ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার। শেষ পর্যন্ত ধর্মের ভিত্তিতে তিনি দেশভাগ করে ছেড়েছেন। কথা ছিল ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমানের মিলিত স্বাধীনতা সংগ্রামের। সেই সংগ্রাম কংগ্রেস ও লীগের মধ্যে পারস্পরিক হানাহানিতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় পরিণত হয়। ১৯৪৬ সালের গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংয়ে লক্ষ লক্ষ হিন্দু ও মুসলমানের মৃত্যু হয়। লক্ষ লক্ষ নারী ধর্ষিত হয় ও প্রাণ হারায়।

প্রথম মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ শাসকরা অবিভক্ত ভারতের মানুষকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যুদ্ধে ভারতবাসীর সহযোগিতা পেলে তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা না হোক স্বায়ত্তশাসন দেয়া হবে। যুদ্ধের পর এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায় কংগ্রেস স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু মুসলমানরা তাতে সাড়া না দেয়ায় গান্ধী নতুন কৌশলের আশ্রয় নেন। প্রথম মহাযুদ্ধে তুরস্কের মুসলিম সাম্রাজ্য (খেলাফত) ইংরেজরা ধ্বংস করে এবং ভারতের মুসলমানরা তাতে বিক্ষুব্ধ হয়। গান্ধী তার অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে খেলাফত উদ্ধারের আন্দোলন যোগ করেন এবং ভারতীয় মুসলমানরা তাতে যোগ দেয়। জিন্নাও তখন এই আন্দোলনকে নাম দিয়েছিলেন ‘মধ্যযুগে ফিরে যাওয়ার আন্দোলন’ পরে তিনিই ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগের দাবি তোলেন।

আমার পুরনো ইতিহাস ঘাটার ইচ্ছা নেই। বলার কথা এই যে – ভারতের রাজনীতিতে প্রকৃত সেক্যুলারিজমের কোন চর্চা হয়নি। সমাজতন্ত্রের মতো ধর্ম নিরপেক্ষতাও ছিল কোন কোন রাজনৈতিক দলের পোশাকি নাম। পোশাকের আড়ালে ছিল তন্ত্রমন্ত্র ধর্মের আধিপত্য। গান্ধী রাম রাজত্ব প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছেন, জিন্না পাল্টা ডাক দিয়েছেন মুসলিম হোমল্যান্ড প্রতিষ্ঠার।

অর্থাৎ গোটা ব্রিটিশ আমল জুড়েই হিন্দু ভারত ও মোসলেম ভারত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন হয়েছে। স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক ভারত গড়ার দাবি ছিল স্লোগান মাত্র। সুতরাং কাঁঠাল গাছে যেমন আম ফলে না। তেমনি মূলত ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি থেকে উপমহাদেশে ধর্ম নিরপেক্ষ সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বরং ভারতে বিজেপির উত্থান, পাকিস্তানে তালেবান পন্থীদের প্রভাব বিস্তার এবং বাংলাদেশে তাদেরই অভ্যুত্থানের চেষ্টা থেকে এই বাস্তবতারই প্রকাশ ঘটেছে। অমর্ত্য সেনের মতো মানবতাবাদী পণ্ডিত অযথাই ভারতের মানুষকে দোষারোপ করেছেন।

ব্রিটিশ আমলে কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজাফফর আহমদ ছিলেন নিজে সেক্যুলারিস্টি। কিন্তু তিনিও প্রথম যে কাগজটির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তার নামছিল ‘মোসলেম ভারত’। এখন এই কাগজের নামটির তাৎপর্য অনুধাবন করার মতো। এই কাগজেই নজরুলের কবি হিসেবে প্রথম আবির্ভাব।

কোন কোন ইতিহাসবিদের আশা ছিল, অবিভক্ত ভারতে বাম রাজনীতি তথা কম্যুনিস্ট আন্দোলন প্রকৃত সেক্যুলার রাজনীতির সূচনা করবে। এ ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা আরও হতাশা ব্যঞ্জক। তারা জনগণকে ধর্মান্ধতা মুক্ত করতে পারেননি বরং নিজেরা রাজনীতির ধর্মীয় কালচারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন এবং আজ রাম ও বামের যুদ্ধে অস্তিত্ব হারিয়েছেন।

অবিভক্ত ভারতের অবিভক্ত কম্যুনিস্ট পার্টিই মুসলিম লীগের ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করার অর্থাৎ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবিতে সমর্থন দেয় এবং তাদের তাত্ত্বিক নেতা গোবিন্দ চন্দ্র অধিকারী ‘পাকিস্তান ও জাতীয় ঐক্য’ নামে পার্টির একটি থিসিস প্রচার করেন। তাতে পাকিস্তান একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠবে এবং উপমহাদেশের ঐক্য দৃঢ় হবে এই চিত্র তুলে ধরা হয়।

দেশ ভাগ হওয়ার দিনটিতে ভারতের অন্যান্য বাম দল যখন এই ভাগ মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, একমাত্র কম্যুনিস্ট পার্টি তাদের অফিসসমূহে পাকিস্তান পতাকা উত্তোলন করে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কম্যুনিস্ট পার্টি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বের আড়ালে তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করে এবং কম্যুনিস্ট শীর্ষ নেতারা অনেকে মুসলমান নাম ধারণা করে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করবেন আশা করেছিলেন। চীন ও রাশিয়ার তত্ত্বে কম্যুনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়ে যাওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানে চীনপন্থী কম্যুনিস্টরা পাকিস্তানের ভারতবিদ্বেষী সামরিক শাসকদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সঙ্গে পর্যন্ত হাত মিলিয়েছিলেন। ফলে এখানে সেক্যুলার রাজনীতি শক্ত ঘাঁটি তৈরি করতে পারেনি। জনমনে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব রয়ে গেছে।

উপমহাদেশে এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে সেক্যুলারিজম গ্রহণ এবং সেক্যুলার মুজিব নেতৃত্বের এ অভ্যুদয় একটি বড় ব্যতিক্রম। পঁচিশ বছরের আন্দোলন ও সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে নেতৃত্ব ও যে দেশের প্রতিষ্ঠা, মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় তার পতন ঘটানো কি করে সম্ভব হলো এটা একটা বড় বিস্ময়। অমর্ত্য সেনের মতো এ জন্য বাংলাদেশের মানুষের ওপর ক্ষুব্ধ না হয়ে এর বাস্তব কারণ অনুধাবন করা উচিত। ভারতে বিজেপির অভ্যুদয় ঐতিহাসিক কারণেই অনিবার্য ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে জামায়াত ও স্বাধীনতা বিরোধীদের অভ্যুত্থান ও এক সময় ক্ষমতা দখল অনিবার্য ছিল না। বিখ্যাত মার্কিন রাজনীতিক ও দার্শনিক ওয়েন্ডেল উইলকির ‘ওয়ান ওয়ার্ল্ড’ (অখ- বিশ্ব) বইটি পড়ার সময় এ সম্পর্কে আমার নিজস্ব একটি অভিমত গড়ে ওঠে। তা নিয়ে ভবিষ্যতে সময় সুযোগ পেলে আলোচনার ইচ্ছে রইলো। – জনকন্ঠ

১৮ জুন, মঙ্গলবার, ২০১৯

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment