কালের আয়নায়

বামদের ধ্বংস করে রামদের ক্ষমতায় আসা সহজ করা হলো

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

ভারতের সাধারণ নির্বাচনে বিজেপির দ্বিতীয় দফা বিশাল বিজয় নিয়ে নানা নিরীক্ষা-সমীক্ষা শেষ হয়েছে বা হতে চলেছে বলা চলে। নানা মুনি নানা মত প্রকাশ করলেও একটা ব্যাপারে তারা দ্বিমত প্রকাশ করেননি যে, দেশ শাসনে নানা ব্যর্থতা সত্ত্বেও হিন্দুত্ববাদের জোয়ারে এবারও মোদি দিল্লির সিংহাসন দখলে রেখেছেন। কংগ্রেস, আঞ্চলিক জোটগুলো, এমনকি পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূলের সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জিও মোদিবধ যজ্ঞ করে সফল হতে পারেননি। বরং বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে শক্ত ঘাঁটি গেড়েছে।

ভারতের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচন নিয়ে আমি ইতিপূর্বে একাধিক আলোচনা করেছি। তবে একেবারেই নিকট প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূলের বিপর্যয় এবং বিজেপির অভাবিত সাফল্য সম্পর্কে তেমন লিখিনি। কিন্তু দিল্লির চেয়েও কলকাতার রাজনীতির আবহাওয়াই ঢাকায় প্রভাব ফেলবে বেশি। মমতা ব্যানার্জি আমাদের নিকট কুটুম্ব। তাই পশ্চিম বঙ্গের রাজনীতির দিকেও আমাদের বেশি নজর রাখা উচিত।

ভারতের এবারের নির্বাচন যুদ্ধটা ছিল উগ্র হিন্দুত্ববাদ ও ধর্ম নিরপেক্ষতার মধ্যে। এ ক্ষেত্রে হিন্দুত্ববাদীরা ছিলেন শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ এবং সংগঠিত। অন্যদিকে ধর্ম নিরপেক্ষতার দাবিদাররা ছিলেন দুর্বল, অসংগঠিত ও নীতিভ্রষ্ট। তারা, বিশেষ করে কংগ্রেস নরম হিন্দুত্ববাদ দ্বারা বিজেপিকে ঘায়েল করবে ভেবেছিল। তারা ধর্ম নিরপেক্ষতাকে তেমন সামনে আনেনি।

গত দুই নির্বাচনের আগে কংগ্রেস যখন সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিল, তখন সোনিয়া গান্ধী নির্বাচনের প্রচার অভিযানে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের নির্বাচন ধর্ম নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার জন্য।’ সেই সোনিয়া গান্ধী ২০১৯ সালের নির্বাচনে পুত্র রাহুল ও কন্যা প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে শিব মন্দিরে ছুটেছিলেন পূজা দিতে। রাহুল নির্বাচনী প্রচারাভিযানে কপালে বিভূতি মেখে ঘোষণা করেছেন, ‘আমি শিবের ভক্ত।’

পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জিও নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদকে টার্গেট করেননি। টার্গেট করেছিলেন ব্যক্তি নরেন্দ্র মোদিকে। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের কৃষক বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের ৩০ বছরের অধিককালের রাজত্ব উৎখাত করতে পারায় তার মাথায় ঢুকে গিয়েছিল, তার দল সর্বভারতীয় দল হয়ে গেছে এবং তিনি সর্বভারতীয় নেত্রী। ভারতের রাজনীতিতে ‘মোদি হাওয়া’ দূর করতে পারলেই তিনি দিল্লির মসনদে অনায়াসে বসতে পারবেন।

তিনি আশঙ্কা করতেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বামফ্রন্ট আবার ঘুরে দাঁড়াবে এবং বামেরাই তার প্রধান শত্রু। ফলে তার সরকার গত কয়েক বছর যে নীতি অনুসরণ করেছে তা হলো, বিজেপিকে নীতিগতভাবে ঠেকানোর চেষ্টা না করে নরেন্দ্র মোদিকে তার সমালোচনা ও ব্যক্তিগত আক্রমণের টার্গেট করা। অন্যদিকে বাম রাজনীতিকে পশ্চিমবঙ্গে নিশ্চিহ্ন করার জন্য বামপন্থি কর্মী ও রাজনীতিকদের ওপর নির্মম দমন নীতি চালানো। ফলে রাজ্যের নির্যাতিত বামেরা এবার বাঁচার জন্য রাম শিবিরে ভোট দিতে বাধ্য হয়েছে।

কলকাতার কাগজগুলোর মতে, শুধু বামেরা নয়, গান্ধীবাদী কংগ্রেসের ভোটও বিজেপির ভোটবাক্সে গেছে। মমতার ‘ব্যক্তিগত শাসনের’ দৌরাত্ম্যে বিরক্ত অনেক তৃণমূল নেতাকর্মী বিজেপিতে চলে গেছেন। তৃণমূলের অনেক ভোটও বিজেপির ভোটবাক্সে গেছে। ফলে লোকসভার ভোটে দেখা গেল, পশ্চিমবঙ্গে যেখানে বিজেপির আসন সংখ্যা ছিল মাত্র দুই, তা এবার লাফিয়ে ১৮ হয়ে গেছে। সামনের রাজ্য নির্বাচনে যদি তৃণমূলের পরাজয় ঘটে (যে আশঙ্কা অনেকে করছেন), তাহলে ক্ষমতা বামফ্রন্টের হাতে যাবে না, যাবে বিজেপির হাতে।

এর সম্ভাব্যতা ত্রিপুরার গত নির্বাচনেই দেখা গেছে। ত্রিপুরায় গত কয়েক দশক ধরেই বামফ্রন্ট সরকার অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং অপরাজেয়। সেখানে ক্ষমতার হাতবদল হলে তৃণমূলের ক্ষমতা লাভের কথা ছিল; কিন্তু ক্ষমতা দখল করেছে বিজেপি। পাশের ঘরে এই আগুন লাগা থেকেও ক্ষমতাগর্বী মমতা সতর্ক হননি। তিনি দিল্লি দখলের স্বপ্নে বিভোর রয়েছেন এবং তার বাম নিধনের রাজনীতি রামদের এত বড় বিজয় এনে দেবে, তা হয়তো স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। কলকাতার দৈনিক স্টেটসম্যান মমতা ব্যানার্জির সমর্থক পত্রিকা। সেই পত্রিকায় মিহির গঙ্গোপাধ্যায় নামে এক প্রবীণ কলামিস্ট লিখেছেন, ‘সত্য-মিথ্যা বিতর্কের বিষয়। তবে কান পাতলে শোনা যায় টিএমসি (তৃণমূল কংগ্রেস) এই রাজ্যকে বিরোধীশূন্য করার জন্য আগ্রাসী চেষ্টা চালিয়েছে। বিরোধী পক্ষের উৎসাহী কর্মীদের মামলায় মামলায় জেরবার করছে। দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। পুলিশের দ্বারা অযথা টাকার লোভ দেখিয়ে পঞ্চায়েত, পুরসভা, বিধানসভা থেকে লোক ভাগিয়ে এনে বিরোধী দলকে দুর্বল করছে। সরকারের বিরুদ্ধে অবাধে রাজনৈতিক কাজকর্ম করতে দেওয়া হচ্ছে না (২৬ মে ২০১৯)।

বলা বাহুল্য, এই বিরোধী পক্ষ হচ্ছে মূলত বাম কর্মী ও রাজনীতিক এবং কিছু গান্ধীবাদী ও অন্য ছোট গ্রুপ। প্রচণ্ড দমন নীতির মুখে তারা রাম শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন এবং রাম শিবিরকে ভোট দিয়েছেন। পশ্চিম বঙ্গে বিজেপির ওপরেও অত্যাচার চালানোর চেষ্টা হয়েছে। তা তেমন সফল হয়নি। কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতায়। তাছাড়া তারাও মার দিতে চায়। এ ক্ষেত্রে তাদের গায়ে হাত দিতে পশ্চিম বঙ্গে তৃণমূলকে সতর্ক হতে হয়েছে।

ক্ষমতাদর্পীরা যতই বুদ্ধিমান হোন, তারা বুঝতে পারেন না দেশে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা তাদের নিজেদের স্বার্থেই প্রয়োজন। দেশকে বিরোধী শূন্য করলে সেই শূন্যস্থান পূর্ণ করে গোপন অপশক্তি। তারা যখন সবার অলক্ষ্যে মহীরুহ হয়ে ওঠে, তখন মহাশক্তিধরেরও আর কিছু করার থাকে না। পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী দল হিসেবে বামদের নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছেন মমতা। কিন্তু সেই শূন্যস্থান যে পূরণ করতে যাচ্ছে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি, ত্রিপুরার ঘটনার পরেও সে সম্পর্কে তার বোধোদয় হয়নি। তারই খেসারত তৃণমূল দিল এবার সাধারণ নির্বাচনে। পরবর্তী রাজ্য নির্বাচনে হয়তো আরও বড় খেসারত দিতে হবে।

মমতা ব্যানার্জি আরও একটি বড় ভুল করেছেন, তার নিকটতম প্রতিবেশী বাংলাদেশ সম্পর্কে নীতি প্রণয়নে। ক্ষমতায় আসার সময় বাংলাদেশে তার একটি বন্ধুসুলভ উজ্জ্বল ভাবমূর্তি ছিল। নির্বাচনে তার জয়লাভে শেখ হাসিনা তাকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান এবং মমতাও শেখ হাসিনাকে দিদি সম্বোধন করে বাংলাদেশের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহ দেখান।

তারপরই তিনি বাংলাদেশ-পশ্চিম বঙ্গ সম্পর্কের ব্যাপারে সম্পূর্ণ ইউটার্ন দেন। কারণ বুঝতে দেরি হয়নি। পশ্চিম বঙ্গে সংখ্যালঘু বাঙালি মুসলমানরা খুবই বৈষম্য পীড়িত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এক বিরাট সংখ্যক ধনী বিহারি মুসলমান পশ্চিম বঙ্গে পালিয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে অর্থবিত্তে, প্রতিপত্তিতে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সংখ্যালঘুদের অধিকার দানের নামে বামফ্রন্ট সরকারে এদেরই মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়েছিল এবং মমতা ব্যানার্জির মন্ত্রিসভাতেও এদেরই প্রতিষ্ঠা ও প্রভাব বিদ্যমান।

পশ্চিমবঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য-রাজনীতিতে একাধিক শক্তিশালী ‘বিহারি সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে। সংখ্যালঘু বাঙালিদের জন্য সরকার যেসব সুযোগ-সুবিধা দেয়, তা আসলে এরা ভোগ করে এবং এদের ভোট বাক্সের ভোটের লোভে বামফ্রন্ট সরকারের মতো তৃণমূল সরকারও এদের খুশি রেখে চলার নীতি গ্রহণ করেছে।

এই সিন্ডিকেটের চাপেই মমতা সহসা তার হাসিনা দিদির দিক থেকে মুখ ফেরান এবং তিস্তার পানি বণ্টন ও ছিটমহল বিনিময় প্রশ্নে ঢাকা-দিল্লি চুক্তি সম্পাদনের পথে বাগড়া দেন। পশ্চিম বঙ্গের কোনো কোনো সংবাদপত্রেই তখন খবর বেরিয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ থেকে পশ্চিম বঙ্গে আগত বিহারিদের এক বিশাল অংশ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও আওয়ামী লীগের প্রচণ্ড বিরোধী। তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এবং তাদের সমর্থন তার সরকারের পক্ষে রাখার জন্যই মমতাকে হাসিনা সরকার বিরোধী নীতি অনুসরণ করতে হচ্ছে।

তিস্তা কেন, সব সমস্যা সমাধানেই আগের মনমোহন সরকারের মতো বর্তমান মোদি সরকারও আন্তরিকভাবে আগ্রহী। কিন্তু মমতার বাধার ফলে মনমোহন সিং ঢাকায় এসেও তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারেননি, মোদিও পারেননি। কিন্তু তার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ফলে মমতার বদলে মোদি বাংলাদেশের মানুষের কাছে অধিক মিত্র বলে স্বীকৃত হয়েছেন।

তিস্তা সমস্যায় পশ্চিম বঙ্গের স্বার্থ রক্ষার নামে বাগড়া দিয়ে মমতা সাময়িক সাফল্য পেয়েছিলেন। কিন্তু এখন প্রকৃত রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন। মসজিদের খতিবদের ভাতা দান, মাদ্রাসায় সরকারি সাহায্য বৃদ্ধি ইত্যাদি ভোট ক্যাচিং বিরুদ্ধ প্রচারণার সম্মুখীন হন। বিজেপি প্রচার চালায়, মমতা ক্ষমতার লোভে মুসলিম তোষণ নীতি গ্রহণ করেছেন এবং হিন্দুদের স্বার্থ ও অধিকারের চরম ক্ষতি করছেন। এবারের নির্বাচনে এই প্রচারণা তৃণমূলের যথেষ্ট ক্ষতি করেছে।

এবারের নির্বাচনে তৃণমূল যেমন উগ্র হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে টার্গেট করে মমতাকে দিল্লির সিংহাসনে বসানোর স্বপ্ন দেখেছে; তেমনি কংগ্রেসের রাহুল নেতৃত্বও গান্ধী-নেহরুর ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতের স্বপ্ন আবার ভারতের মানুষের চোখে তুলে ধরতে পারেননি। তিনি নির্বাচনের মুখ্য ইস্যু করে তুলেছিলেন নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগসহ ব্যক্তিগত আক্রমণ। তা শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়েছে।

আঞ্চলিক দলগুলোর নেতারাও ভেবেছেন, অতীতে আঞ্চলিক নেতা দেব গৌড়া যদি একবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, তাহলে তারা হতে পারবেন না কেন? মমতা, অখিলেশ, জয়ললিতা সকলেরই এ ব্যাপারে নিজস্ব প্ল্যান ছিল। ফলে সকলে মিলে মোদির বিরুদ্ধে কোনো শক্তিশালী নেতাকে সামনে এনে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেননি। বিরোধী পক্ষ জয়ী হলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তাও ছিল অনির্ধারিত।

সবচেয়ে বড় কথা, ভারতের এবারের নির্বাচনটি ছিল ইস্যুভিত্তিক নয়, আদর্শভিত্তিক নয়, ব্যক্তিভিত্তিক। সকলেই নরেন্দ্র মোদিকে টার্গেট করেছেন; ভারতের আসল শত্রু উগ্র হিন্দুত্ববাদকে টার্গেট করেননি। ফল তারা হাতে হাতে পেয়েছেন। আমার আজকের আসল আলোচ্য বিষয় ছিল পশ্চিম বঙ্গে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ। আগামী রাজ্য নির্বাচনে ত্রিপুরার মতো বিজেপি ক্ষমতায় এলে বিস্মিত হবো না। পশ্চিম বঙ্গে ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনীতির একটা মূল শক্তি বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট। মমতা রাজ্যকে বিরোধী শূন্য করার নামে এই বামদের ধ্বংস করেছেন। রামদের ক্ষমতায় আসার পথ সহজ করে দিয়েছেন। এই অবস্থা থেকে বাংলাদেশেরও শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। – সমকাল

লন্ডন, ২১ জুন শুক্রবার, ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment