দশ দিগন্তে

ট্রাম্প হঠাৎ গোঁফ নামালেন, উদ্দেশ্য কী?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

ডোনাল্ড ট্রাম্প আকস্মিকভাবে গোঁফ নামিয়েছেন। তিনি হুকুম দিয়েছিলেন, শুক্রবার (২১ জুন) স্থানীয় সময় সকাল সাতটার দিকে (গ্রিনিচ টাইম মধ্যরাতে) মার্কিন সামরিক বাহিনীর জঙ্গি বিমান ইরানের তিনটি স্থানে ভয়াবহ আঘাত হানবে। এই হামলায় ব্যাকআপ দেওয়ার জন্য যুদ্ধ জাহাজও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। আগের দিন (বৃহস্পতিবার) হরমুজ প্রণালী এলাকায় একটি মার্কিন গোয়েন্দা ড্রোন বিমানকে ইরান গুলি করে ভূপাতিত করে। ইরানের দাবি, এই ড্রোন গোয়েন্দাগিরি করার জন্য ইরানের আকাশ-সীমানায় ঢুকেছিল। আমেরিকার দাবি, তাদের ড্রোনটি আন্তর্জাতিক আকাশ সীমায় ছিল।

এই বিতর্কের মীমাংসা হওয়ার আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিশোধ গ্রহণের হুমকি দেন এবং ইরানে আঘাত হানার জন্য সামরিক বাহিনীকে অর্ডার দেন। ইরান ও আমেরিকার মধ্যে কিছুকাল যাবত্ই গভীর যুদ্ধ-উত্তেজনা বিরাজ করছিল, ড্রোন-ঘটনা তাকে একেবারে যুদ্ধের মুখোমুখি করে দেয়। ইতিপূর্বে হরমুজ প্রণালীতে দুটি অয়েল ট্যাংকার ধ্বংস করা হয়। আমেরিকা দোষ ইরানের ওপর চাপায়। ইরান তা দৃঢ়তার সঙ্গে অস্বীকার করেছে। কিন্তু ‘তুই পানি ঘোলা না করে থাকলে, তোর বাপ করেছে’ ছাগশিশু ভক্ষণের জন্য বাঘের এই যুক্তি এখন ট্রাম্পের কণ্ঠে।

ট্রাম্প যতটা যুদ্ধবাজ, তার চাইতে বেশি চালবাজ। গত শুক্রবার সকালে তাঁর জেনারেলরা যখন ইরানে হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত, তখন তিনি এক জেনারেলকে জিজ্ঞাসা করলেন, এই হামলায় কতজন ইরানি সিভিলিয়ান মারা যেতে পারে? জেনারেল বললেন, ১৫০ জন। অমনি ট্রাম্প সুর ঘোরালেন। তাঁর মন্তব্য, আমেরিকান ড্রোনটি তো মনুষ্য চালিত ছিল না। সুতরাং ওটা ভূপাতিত করায় মানুষ মরেনি। তার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে দেড় শ মানুষ হত্যা বেশি হয়ে যাবে। তিনি হামলা চালানোর দশ মিনিট আগে তা বন্ধ করার নির্দেশ দেন।

ট্রাম্পের মতো মানুষ মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে এই হামলা বন্ধ করেছেন, তা ভাবলে ভুল করা হবে। তিনি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যে খেলা খেলেছেন, ইরানের সঙ্গেও সেই একই খেলা খেলে চালবাজিতে বাজিমাত করতে চান। তাতে সফল না হলে যুদ্ধের অপশন তো রইলই।

উত্তর কোরিয়ার হাতে পারমাণবিক বোমা আছে এবং তা আমেরিকার ভেতরে পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম। ইরানের অবস্থা তা নয়। তার হাতে পরমাণু অস্ত্রের মজুত নেই। তবে ইচ্ছা করলে বানাতে সক্ষম। ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের হুমকির সুরটা উত্তর কোরিয়ার চাইতে তাই চড়া। তবে ইরান ও উত্তর কোরিয়া দুটি দেশকেই নতি স্বীকার করানোর জন্য তার কৌশলটা একই। সুপার পাওয়ারের দানব-শক্তি প্রয়োগের হুমকি।

হুমকির সঙ্গে অবৈধভাবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ। এই নিষেধাজ্ঞা দিয়ে উত্তর কোরিয়াকে কাবু করা যায়নি। কিন্তু ইরানকে কিছুটা কাবু করা গেছে। আমেরিকার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করা কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ অবশ্যই ইরানের অর্থনীতির ওপর গভীর চাপ সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয় গালফ যুদ্ধের আগে আমেরিকা সাদ্দামের ইরাকের বিরুদ্ধে মারণাস্ত্র মজুত রাখার মিথ্যা অজুহাত তুলে দীর্ঘ বারো বছর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি রাখে। তাতে ১৭ লক্ষ শিশু ও নারী অপুষ্টি ও অনাহারে মারা যায়। তারপরই সামরিক হামলা চালিয়ে দেশটিকে ধ্বংস করা হয়। এই ধরনের বর্বরতা হিটলারও কল্পনা করতে পারেননি।

ইরাকের মতো হামলা চালিয়ে ইরানকে ধ্বংস করা যাবে না, এই সত্য ট্রাম্প অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে হক (Hawk) গ্রুপ উপলব্ধি না করলেও মার্কিন জেনারেলরা বোঝেন। খবরে দেখা যায়, ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের উগ্র গ্রুপ যখন ইরানের ওপর হামলা চালানোর জন্য প্রচণ্ড চাপ দিয়েছেন, তখন আমেরিকার একজন জেনারেল এই যুদ্ধে না জড়ানোর জন্য প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করছেন।

এই জেনারেলদের পরামর্শ শুনে ট্রাম্প ইরানে হামলা চালানো থেকে বিরত থেকেছেন, তা আমার মনে হয় না। ধুরন্ধর ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প যে যুদ্ধবাজের চাইতেও বড় চালবাজ তা আগেই বলেছি, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে তিনি সহসা পরাক্রান্ত সিংহ সেজেছিলেন। গোটা দুনিয়ায় যুদ্ধাতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল—এই বুঝি আজই যুদ্ধ শুরু হয়। পারমাণবিক অস্ত্রবাহী মার্কিন বিমান উত্তর কোরিয়ার আকাশ দিয়ে জাপান সাগরে উড়ে গেছে।

শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধের আশঙ্কা ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে বাগ্যুদ্ধে পরিণত হয়। কিমের সঙ্গে আলোচনার জন্য ট্রাম্প সিঙ্গাপুরে পর্যন্ত উড়ে যান। উত্তর কোরিয়ার ডিক্টেটরকে ব্যক্তিগত প্রশংসা পর্যন্ত করেন। কিন্তু কিমকে নরম করা বা আমেরিকার শর্ত মোতাবেক চুক্তি সম্পাদনে রাজি করা কোনোটাই করতে পারেননি। এখন দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে একটি ‘থ’ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের যুদ্ধে হুমকি বাগাড়ম্বরে পরিণত হয়েছে।

ইরানের বেলায় ট্রাম্প সাহেব তাঁর হুমকি এতটাই চড়া করেছিলেন যে, মনে হচ্ছিল এই বুঝি ইরানকে কেন্দ্র করে মহাপ্রলয় শুরু হয়ে যায়। ট্রাম্প হয়তো ভেবেছিলেন, ইরান তাঁদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় এমনিতেই কাবু, এখন যুদ্ধের হুমকিতে সহজেই নতি স্বীকার করবে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার ইরানের আকাশ সীমায় মার্কিন ড্রোন গুলি করে ধ্বংস করে ইরান প্রমাণ করে দিল, ‘শির দেগা নেহি দেগা আমামা’।

শুধু ইরানে হামলা চালানো বন্ধ করা নয়, ড্রোন ধ্বংস করে ইরান মহা ভুল করেছে এবং তার জন্য ইরানকে শাস্তি পেতে হবে বলে ট্রাম্প যে হুমকি দিতে শুরু করেছিলেন, তার আড়ালে তিনি তেহরানকে আলোচনা-বৈঠকেও ডাকছেন। খবর, ওমান সরকারের মাধ্যমে তিনি তেহরানে আলোচনা বৈঠকে বসার প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। এমনকি এমন কথাও বলছেন, মার্কিন ড্রোনে হামলা ইরানের মানবিক ভুলও (human error) হতে পারে।

পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ বলছেন, ইরানে হামলা চালাবার প্রস্তুতি ছিল ইরানকে নতি স্বীকার করানোর জন্য ট্রাম্পের চূড়ান্ত কৌশল। তা কাজে লাগেনি। তবে তার একটা লক্ষ্য পূর্ণ হতে পারে। তা হলো তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সরাসরি শীর্ষ বৈঠক। এ সম্পর্কে অনেক পর্যবেক্ষকের প্রশ্ন হলো, এই বৈঠকে কী আলোচিত হতে পারে? উত্তর কোরিয়াকেও এ ধরনের হুমকি দিয়ে বৈঠকে বসানো গেছে, কিন্তু আমেরিকার ইচ্ছা পূরণে তারা রাজি হয়নি।

বর্তমান ইরান সমস্যাও ইরান তৈরি করেনি। পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে সম্পাদিত পরমাণু শক্তি উৎপাদন সম্পর্কে চুক্তির ধারা দেশটি ভঙ্গ করেনি। এটা ট্রাম্পের হঠাৎ আবিষ্কার। তিনি তাঁর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই ওই চুক্তি থেকে একতরফা সরে আসেন এবং ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ইরানকে সামরিক হুমকি দিতে শুরু করেন।

ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তিতে আবদ্ধ অন্য দেশগুলো ট্রাম্পের অভিযোগের সঙ্গে এখনো একমত নয়। তারাও ইরানকে চুক্তি থেকে সরে না যেতে অনুরোধ জানাচ্ছে। অন্যথায় তারাও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ভয় দেখাচ্ছে। ইরান এখন শুধু আমেরিকার সামরিক হুমকি নয়, চুক্তির শরিক ইউরোপিয়ান শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকির সম্মুখীন। তেহরান তবুও তার অধিকার ও স্বার্থরক্ষায় অনড়।

ট্রাম্পের ইরান বিরোধী ভূমিকার পেছনে রয়েছে ইসরায়েল, সৌদি আরব, প্রভৃতি দেশের উসকানিও। ইরাক ও লিবিয়াকে মার্কিন সাহায্যে ধ্বংস করার পরও মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দেশ হয়ে উঠেছে। ইরানের প্রতিরোধে আমেরিকার সিরিয়ায় রেজিম চেঞ্জের চেষ্টা সফল হয়নি। ইয়েমেনে সৌদি আরবের এবং প্যালেস্টাইনে ইসরায়েলের আগ্রাসন বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসম্পদে আমেরিকার একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না।

তাই পরমাণু চুক্তি ভঙ্গ করার অসত্য অজুহাত তুলে ট্রাম্পের এই ইরান বিরোধী ষড়যন্ত্র। যেমন, ইরাককে ধ্বংস করার জন্য সাদ্দামের বিরুদ্ধে বিশ্বধ্বংসী মারণাস্ত্র রাখার মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়েছিল। যে মিথ্যা পরে প্রমাণিত হয়। তবে ইরান এখন একা নয়, শক্তিহীন ও মিত্রহীন নয় এবং গালফ যুদ্ধের পরিস্থিতিও মধ্যপ্রাচ্যে এখন বিরাজ করছে না। আমেরিকার অধিকাংশ জেনারেল এখন হঠকারী কোনো যুদ্ধে জড়াতে রাজি নন।

এই অবস্থায় ট্রাম্পকে পিছু হটতে হয়েছে। কিন্তু তার রণচণ্ডী উপদেষ্টাদের চাপে ও প্ররোচনায় তিনি এখনো আগুন নিয়ে খেলতে এগিয়ে যেতে পারেন। যদি যান, সেই আগুনে মার্কিন ইগলের ডানাই পুড়বে বেশি। – ইত্তেফাক

[ লন্ডন, ২২ জুন, শনিবার, ২০১৯ ]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment