তৃতীয় মত

বাংলাদেশে মিসর ও তুরস্কের পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে কি?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

কামাল আতাতুর্ক ও জামাল আবদুল নাসের

কিছুদিন আগে ঢাকার অন্য একটি দৈনিকে ‘শেখ হাসিনার পর কে’, শীর্ষক একটি কলাম লিখেছিলাম। এই লেখা সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ঢাকা থেকে কয়েকজন পাঠক আমাকে চিঠি লিখেছেন। তারা কেউ কেউ আমার অভিমত সমর্থন করেছেন। কেউ কেউ করেননি। তবে একজন আমার লেখার সমর্থন বা বিরোধিতা না করে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা লিখেছেন।

তিনি লিখেছেন ‘আপনি দেশের পরবর্তী নেতৃত্ব সম্পর্কে যা লিখেছেন তার আমি বিরোধিতা করি না। আমার লেখা আপনার বক্তব্যের সাপ্লিমেন্টারি হিসেবে ধরতে পারেন। আমিও আপনার মতো অনুমান করি, আগামী পাঁচ বছর পরের নির্বাচনে শেখ হাসিনা অংশ নিলে তার জয়লাভের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু তিনি যদি না দাঁড়ান বা কোনো কারণে দাঁড়াতে না পারেন, তাহলে শুধু আওয়ামী লীগের জন্য নয়, সারা দেশের জন্য নেতৃত্ব শূন্যতা দেখা দেবে। সেই শূন্যতা পূরণ করবে কে বা কারা তা নিয়েই আমার আশঙ্কা’।

নিজের মন্তব্য বিশ্লেষণ করে তিনি লিখেছেন, ‘বিএনপি’র অপমৃত্যু হয়েছে। এই দল খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানের নেতৃত্বকে মূলধন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে মনে হয় না। যদি পারত গত নির্বাচনের সময় এক দেউলিয়া নেতাকে তাদের হায়ার করতে হতো না। খালেদা জিয়ার পর যারা বিএনপির হাল ধরতে পারতেন, বিএনপির সেই প্রবীণ ও পুরনো নেতাদের তারেক রহমান তার আকাশচুম্বী উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য দল থেকে তাড়িয়েছেন। বিএনপি এখানে স্বখাত সলিলে ডুবেছে।’ ‘এবার আসি সুশীল সমাজের কথায়। আপনি তাদের পরামর্শ দিয়েছেন, স্বাধীনতার আদর্শকে ভিত্তি করে আওয়ামী লীগের বিকল্প গণতান্ত্রিক ও ধর্ম নিরপেক্ষ দল গঠন করে দেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক রাজনীতির শূন্যতা সময় থাকতে পূর্ণ করতে। আপনি ভারতের দিকে তাকিয়ে দেখুন।

৭২ বছরের পুরনো একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই দুই আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেননি। এবং কংগ্রেসের বিকল্প একটি সর্বভারতীয় সেক্যুলার দলকে ক্ষমতায় বসাতে পারেননি। বর্তমানে খণ্ড খণ্ড বাম ও গণতান্ত্রিক দল জোট বেঁধেও উগ্র ও হিংস্র হিন্দুত্ববাদের আবির্ভাব ও দিল্লিতে ক্ষমতা দখল ঠেকাতে পারেনি। গত পাঁচ বছর নরেন্দ্র মোদিকে সামনে খাড়া করে বজরং পরিবার ভারত শাসন করেছে। আগামী পাঁচ বছর করবে। তার পরিণাম সারা দক্ষিণ এশিয়ায় কী ঘটাবে তাকি আপনি বুঝতে পারছেন?’

‘আপনি লিখেছেন, বিএনপি একটি শিকড়বিহীন দল। ক্যান্টনমেন্টে তার জন্ম। নতুন নেতা তৈরি করার ক্ষমতা দলটির আগেও ছিল না। কিন্তু আওয়ামী লীগ জনগণের দল। দুঃসময়ে, দুর্দিনে তার নতুন নেতৃত্ব তৈরির সক্ষমতা আছে। প্রমাণ, দলের দুর্দিনে শেখ মুজিব, তাজউদ্দীন, শেখ হাসিনার মতো নেতার আবির্ভাব এবং নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ। আপনার এই অভিমতের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেও আমার আশঙ্কাটি ব্যক্ত করছি।’

‘এই আশঙ্কা হল ভারতের কংগ্রেসের মতো বাংলাদেশের আওয়ামী লীগও ধীরে ধীরে তার আগের চরিত্র ও জনভিত্তি হারিয়েছে। আওয়ামী লীগের দলীয় জনপ্রিয়তা নিম্নগামী। ছাত্রলীগ, যুবলীগের কার্যকলাপ এই জনপ্রিয়তা আরও ধ্বংস করেছে। নতুন নেতৃত্ব তৈরির ক্ষমতাও আওয়ামী লীগের নেই। দলটি টিকে আছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিপুল জন  সমর্থন ও দেশ শাসনে বিরাট সাফল্যকে মূলধন করে। এই মূলধন যদি আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের না থাকে, তাহলে হাসিনার বিকল্প কোনো নেতৃত্ব দেশে পাওয়া যাবে না, যিনি আওয়ামী লীগের এবং দেশের এই গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করতে পারবেন। তাহলে কে বা কারা তা পূরণ করবে, তা একবার ভেবে দেখুন।’

এই পাঠক বন্ধুর চিঠির প্রায় সবটাই এখানে তুলে দিলাম। তার বক্তব্য আমার ভালো লেগেছে। আগামী পাঁচ বছর পর যদি শেখ হাসিনা দলের এবং দেশের নেতৃত্বে না থাকেন তাহলে গণতান্ত্রিক রাজনীতির এই নেতৃত্ব-শূন্যতা কে বা কারা পূরণ করবে সে সম্পর্কে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। লিখেছেন, তুরস্ক এবং মিসরের অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

এই আশঙ্কার কথাটা আমার কখনও মনে উদয় হয়নি। শেখ হাসিনা কখনও রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে কিছুটা মডারেট মৌলবাদীদের সঙ্গে আপস করেছেন বটে, কিন্তু উগ্র ও বিপজ্জনক মৌলবাদ ও তার সন্ত্রাস থেকে দেশকে রক্ষা করেছেন। এত যে শক্তিশালী জামায়াত, তার যুদ্ধাপরাধী নেতাদের ফাঁসি দিয়ে ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। আমার মতে নবাবী আমলের বাংলায় নবাব আলিবর্দী ভয়াবহ বর্গি দস্যুদের দমন করে যে কৃতিত্ব অর্জন করেছেন, তার চাইতে বর্তমান বাংলায় বড় কৃতিত্ব জামায়াতি বর্গি দমন।

কিন্তু আমার পত্র-লেখক আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, মিসরে জামাল আবদুল নাসের তার দেশের জামায়াতিদের অর্থাৎ মুসলিম ব্রাদারহুড দলকে কঠোর হাতে দমন করেছিলেন। তাদের তাত্ত্বিক নেতা আল্লামা কুতুবকে ফাঁসি দিয়েছিলেন। একইসঙ্গে দেশে সেরা কমিউনিস্ট নেতাদেরও হত্যা করেছেন। রাশিয়ার সঙ্গে নাসেরের ঘনিষ্ঠ মৈত্রী থাকা সত্ত্বেও মিসরের প্রধান কমিউনিস্ট নেতা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এক কথায় মিসরের ধর্ম নিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী (আরব) রাজনীতি ও নেতৃত্বের একটা শূন্যতা সৃষ্টি হতে যাচ্ছিল। নাসের যাকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেছিলেন, সেই আনোয়ার সাদাত ছিলেন নাসেরের আদর্শের বিরোধী। সেটা ধরা পড়ে নাসেরের আকস্মিক মৃত্যুর পর তিনি যখন মিসরের প্রেসিডেন্ট হন। তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি নরম নীতি গ্রহণ করেন এবং নাসেরপন্থীদের কঠোর হাতে দমন করা শুরু করেন।

নাসেরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দৈনিক আল আহরাম পত্রিকার জনপ্রিয় প্রবীণ সম্পাদক মোহাম্মদ হাইকেলকে তিনি অনির্দিষ্ট কালের জন্য কারারুদ্ধ করেন। সাদাতের এবং পরবর্তী প্রেসিডেন্ট মোবারকের দীর্ঘ শাসনকাল ছিল আমেরিকা ও ইসরাইলের অক্ষশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ এবং সেক্যুলার আরব জাতীয়তাবাদী রাজনীতি থেকে দ্রুত পশ্চাদপসারণের যুগ। ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি এবং তার নেতৃত্বে এই যে শূন্যতা সৃষ্টি, সেই শূন্যতা সবার অলক্ষ্যে পূরণ করেছে মুরসির নেতৃত্বে (সম্প্রতি আদালতে বন্দি অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটেছে) উগ্র ও সন্ত্রাসী ব্রাদারহুড।

নির্বাচনে তারা বিশাল বিজয় অর্জন করে এবং মুরসি প্রেসিডেন্ট হন। সেক্যুলার আরব জাতীয়তাবাদের উদ্গাতা জামাল নাসেরের মিসরে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদীরা নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় বসতে পারে, এটা ছিল সারা বিশ্বের কাছেই এক পরম বিস্ময়। মিসরের সেক্যুলার রাজনীতিকরা মুরসিকে ক্ষমতা থেকে তাড়াতে পারেননি। সামরিক বাহিনী তাদের এবং সচেতন ছাত্র সমাজকে বুঝিয়েছে, তারা মৌলবাদীদের তাড়িয়ে মিসরকে নিরাপদ করবেন। দুর্বল সেক্যুলার শক্তি তাদের বিশ্বাস করেছে এবং সমর্থন দিয়েছে। সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মুরসির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করেছে। সেক্যুলার শক্তিকে রাজনীতিতে এখনও প্রতিষ্ঠা পেতে দেয়নি। নাসেরের মিসর এখন অতীতের ইতিহাস।

কামাল আতাতুর্কের তুরস্কে মৌলবাদী দলের উত্থান এবং নির্বাচনে বিশাল সংখ্যা গরিষ্ঠতায় ক্ষমতা দখল এ যুগের সবচাইতে বিস্ময়কর ঘটনা। ধর্ম নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠায় কামাল এতটাই চরমপন্থী ছিলেন যে, তিনি দেশে ধর্মীয় আচার-আচরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন। ইসলামী বিবাহ নিষিদ্ধ করে সিভিল ম্যারেজ প্রবর্তন করেন। আরবি ভাষায় আজান দেয়া, কোরআন পাঠ বন্ধ করা হয়, সেখানে তুর্কি ভাষার প্রচলন করা হয়।

কামালের মৃত্যুর পর তার মতাদর্শী ইসমত ইনুনু দীর্ঘকাল ক্ষমতায় ছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধেও তিনি তুরস্ককে নিরপেক্ষ রেখেছিলেন। কিন্তু তুরস্কের সেনাবাহিনী ধীরে ধীরে আমেরিকার খপ্পরে পড়ে। তারা ‘ধর্মনিরপেক্ষ কামালবাদ’ রক্ষার নামে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ শুরু করে। এমনকি সংবিধানে ব্যবস্থা করা হয় দেশ শাসনে সেনাবাহিনীর অংশীদারিত্ব হবে বাধ্যতামূলক। কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনে জয়ী হলেও সেনাপ্রধানের অনুমোদন ছাড়া ক্ষমতায় বসতে পারতেন না।

একবার তো তুরস্কের এক সেনাপ্রধান জেনারেল গারসেল দেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দায়েমকে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেন এবং বিচার প্রহসনে ফাঁসি দেন। অনেকটা তারই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পতন ও বিচার প্রহসনে। গারসেল বেশ কিছুকাল ক্ষমতায় ছিলেন। কামালপন্থী রাজনৈতিক দলসহ সব গণতান্ত্রিক দলই তার দমন-পীড়নের শিকার হয়। আন্ডারগ্রাউন্ডে শক্তি ও প্রভাব বাড়তে থাকে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর।

তুরস্কে কামালবাদকে প্রায় উৎখাত করে মডারেট রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে বিরাট জয় ও ক্ষমতা দখল তাই বিস্ময়ের ব্যাপার। কিন্তু কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এরদোগানের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাতে গিয়ে কিছুকাল আগে সামরিক বাহিনী ব্যর্থ হয়েছে। জনগণ তাদের প্রতিহত করেছে। তুরস্কের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ও দেশের প্রেসিডেন্ট চরিত্রে গণতান্ত্রিক নন। তিনি সিভিল ডিক্টেটর। তবে ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচনে তার দল বিপুলভাবে পরাজিত হওয়ায় অনেকের মনে ক্ষীণ আশা দেখা দিয়েছে তুরস্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

আমার পত্র-লেখক বন্ধু আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও নেতৃত্বে শূন্যতা স্থায়ী হলে হাসিনাবিহীন বাংলাদেশে মিসর ও তুরস্কের অবস্থার উদ্ভব হতে পারে কিনা। আমি তা মনে করি না। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান একটু বিশ্লেষণ করা দরকার। (আগামী সপ্তাহে সমাপ্য) – যুগান্তর

লন্ডন, ৩০ জুন, রবিবার ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment