‘অলি বারবার ফিরে আসে’

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

হেমন্ত মুখার্জির একটি গানের কলি, ‘অলি বারবার ফিরে আসে, অলি বারবার ফিরে যায়।বাংলাদেশের রাজনীতিতে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলির ভূমিকার সঙ্গে এই গানের কলিটি চমৎকারভাবে মিলে যায়। তিনি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নয়, ফৌজি রাজনীতিতে এসেছিলেন। বিএনপির তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ফৌজি রাজনীতির সুবাদে তিনি মন্ত্রীও হয়েছিলেন

তাঁর সৌভাগ্যসূর্য অস্তমিত হয় বিএনপির নেতৃত্বে তারেক রহমানের আবির্ভাবের পর। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আসার প্রথম দিকেও বিএনপিতে কর্নেল অলি, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতো প্রবীণ নেতাদের কদর প্রভাব দুটিই ছিল। তারেক রহমান তখন নাবালেগ। তিনি বালেগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপিরাজনীতিতে দুটি বড় পরিবর্তন ঘটে

খালেদা জিয়া অপরিণামদর্শী পুত্রের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির পর দল থেকে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক প্রবীণ নেতাদের বিতাড়ন অথবা নিষ্ক্রিয় করে রাখা শুরু হয়। দুই. জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির গোপন মিত্রতা ছিল, সেটি প্রকাশ্য আত্মীয়তায় পরিণত হয়। তারেক রহমান ঘোষণা করেন, ‘বিএনপি জামায়াত একই পরিবারের অন্তর্গত।

তারেকের জামায়াত প্রীতির প্রকাশ্য বলি হন কর্নেল অলি। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে অলির যে নেতৃত্ব প্রভাব, তাকে খর্ব করে সেখানে জামায়াতকে প্রভাব বিস্তার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সরাসরি তারেক রহমান সহায়তা দেন। এতে কর্নেল অলি ক্ষুণ্ন হন। দলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে

তারেক রহমানের ষড়যন্ত্রে বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা প্রথম মহাসচিব ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী যখন রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপমানজনকভাবে বিদায় নিতে বাধ্য হন এবং বিএনপি ছেড়ে দিয়ে বিকল্পধারা নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেন তখন মনে করা হয়েছিল, কর্নেল অলি তাঁর সঙ্গে হাত মেলাবেন। প্রথম দিকে তা মনেও হচ্ছিল। কিন্তু এক ঘরে দুই পীরের জায়গা হয়নি। কর্নেল অলি শেষ পর্যন্ত নিজে দল গঠন করেন

আমার ধারণা, যদিও ডা. বি চৌধুরী কর্নেল অলি জিয়ার নেতৃত্বে এক দল করেছেন; কিন্তু তাঁদের রাজনৈতিক মনমানসিকতা ভিন্ন। ডা. চৌধুরী জিয়াপরবর্তী খালেদানেতৃত্ব, বিশেষ করে তারেকেরছোকরারাজনীতিরসঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণ খাপ খাওয়াতে পারেননি। বিএনপিও তাঁকে আর নিজের লোক মনে করে না। সে জন্য গত সাধারণ নির্বাচনের আগে বিএনপির উদ্যোগে যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট হয়, তার নেতৃত্ব থেকে ডা. চৌধুরীকে (. কামাল হোসেনের সহায়তায়) কৌশলে বের করে দেওয়া হয়

কর্নেল অলি তারেক রহমানের রাজনীতির শিকার হয়ে দল ছেড়ে নতুন দল গঠন করলেও খালেদা তাঁর নেতৃত্বাধীন দলের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করতে পারেননি। ফলে বিএনপির বর্তমান দুর্দিনেও তিনি দলটির সঙ্গে আছেন। বিএনপির সঙ্গে তাঁর বর্তমান সম্পর্ক হচ্ছে, ‘অলি বারবার ফিরে যায়, বারবার ফিরে আসে।কর্নেল অলিও বিএনপি থেকে দূরে সরে গিয়েও বারবার ফিরে আসেন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অদ্ভুত খেলা চলছে। জনগণ কর্তৃক বারবার প্রত্যাখ্যাত এবং বার্ধক্যপীড়িত নেতারা কিছুতেই রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বের জন্য পথ ছেড়ে দিতে চান না। ক্রমাগত রাজনীতির পানি ঘোলা করছেন। . কামাল হোসেনের বয়স এখন আশির ঊর্ধ্বে, তিনি আওয়ামী লীগ ছেড়ে নিজের দল গণফোরাম গঠন করেছিলেন। ব্যর্থ হয়েছেন। বিএনপির কোলে বসে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছিলেন। সেটি এখন ভাঙা তরি। রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেও তিনি নিচ্ছেন না

ডা. বি চৌধুরীর অবস্থাও তাই। তাঁর বিকল্পধারা সাইনবোর্ড সর্বস্ব দলে পরিণত হয়েছে। পাল্টা বিকল্প দলও তৈরি হয়েছে। কর্নেল অলির লিবারেল দলের অবস্থাটা একই। তাঁর দল তাঁর নেতৃত্বের কোনো গ্রহণযোগ্যতা আছে কি জনগণের কাছে? একমাত্র শেখ হাসিনার বিরোধিতা এবং তাঁর সরকারের ছিদ্রান্বেষণ ছাড়া . কামাল, ডা. বি চৌধুরী বা কর্নেল অলিদের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক কর্মসূচি আছে কি?

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অবস্থাই এখন ত্রিশঙ্কু মহারাজের মতো, সেখানে কর্নেল অলি আবার আরেকটি ঐক্যফ্রন্ট গঠনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। কারা এই জোটে থাকবে? পুরনো জোটের বাইরে তেমন দল তো আর নেই। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যেসব দল আছে, তাদের অনেকেরই ওয়ান ম্যান পার্টি। সাইনবোর্ড আছে। কর্মী নেই। তাহলে জোট গঠনের জন্য কর্নেল অলি দল পাবেন কোথায়?

প্রশ্নটির উত্তর কর্নেল অলির হয়তো জানা। তিনি আভাস দিয়েছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যেসব দল আছে, তারাও নতুন জোটে আসতে পারে। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, বিএনপির ২০ দলীয় জোটের শরিক দল যদি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে আসতে পারে, তাহলে ২০ দলীয় জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্তর্ভুক্ত দলগুলো তাঁর জোটে আসতে পারবে না কেন? তাঁর যুক্তিটি অনুধাবন করার মতো। আগের দুই জোট এবং কর্নেল অলির জোটএই তিন জোটেরই উদ্দেশ্য লক্ষ্য যেখানে একটিই অর্থাৎ হাসিনাবধ, সেখানে এই জোটগুলোর অঙ্গাঙ্গি মিলে যেতে আপত্তি কী?

জোটগুলোর আপত্তি যে নেই তার প্রমাণ কর্নেল অলির জোট গঠনের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল তাঁকে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তির লক্ষ্যে যত আন্দোলন হবে, সবাইকে আমরা সমর্থন দেব।তাঁর বক্তব্য থেকে মনে হয়, কর্নেল অলির জোটেরও নতুন বাস্তব কোনো কর্মসূচি নেই। একমাত্র কর্মসূচি খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করা

মির্জা ফখরুলের ঘোষণা শুনে আমার মতো সন্দেহবাতিকের সন্দেহ হচ্ছে, বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা হিসেবে . কামাল হোসেনকে কমলালেবুর খোসার মতো ভালোভাবে ব্যবহারের পর এখন ছুড়ে ফেলে দিতে চায়। প্রমাণিত হয়েছে, . কামাল হোসেন বিএনপির উদ্দেশ্য লক্ষ্য পূরণে অপারগ। তাঁর নেতৃত্ব দেউলিয়া। তাঁর নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। সুতরাং পুরনো খোলসটি ফেলে দিয়ে নতুন খোলস দরকার। বিএনপি তো কৌশল জানে। ডা. বি চৌধুরীকে ফেলে দিয়ে . কামালকে নেতা বানিয়ে সেই কৌশলের সাফল্য তারা দেখিয়েছে

আমার এইঘোড়া বদলেরসন্দেহ যে সঠিক হতে পারে তার একটি প্রমাণ, কর্নেল অলি তাঁর জোট গঠনের ব্যাপারে বিএনপিকে খুশি করার জন্য আগেভাগেই আভাস দিয়েছেন। এই জোটে জামায়াতও থাকতে পারবে। তিনি বলেছেন, ‘অতীতের জামায়াত আর বর্তমানের জামায়াত এক নয়।চট্টগ্রামের রাজনীতিতে যাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অপদস্থ করেছে জামায়াত, তাঁর মুখে আজ জামায়াতের জন্য অভয়বাণী। তাঁর জোটে জামায়াতকে আশ্রয় দানের ইঙ্গিত

খোলস পাল্টে বাংলাদেশের মানুষকে ধোঁকা দেওয়া যাবে, সেই অবস্থা এখন নেই। এর ওপর কর্নেল অলি সামরিক ব্যক্তিত্ব হতে পারেন; কিন্তু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন। রাজনীতিতে তাঁর পৌনঃপুনিক ব্যর্থতা এর প্রমাণ। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এটিই তাঁর আসল গর্ব পরিচয়। কিন্তু বারবার তাঁর মতিভ্রম ঘটছে। . কামাল বা ডা. বদরুদ্দোজার ব্যর্থ রাজনীতি থেকে তিনি কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেননি। – কালের কন্ঠ

লন্ডন, সোমবার, জুলাই ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment