দশ দিগন্তে

শেখ হাসিনার এবারের চীন সফরের গুরুত্ব

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী-

শেখ হাসিনার চীন সফর সম্পর্কে দেশবিদেশে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। বিশ্ব পরিস্থিতিতে এখন নানা ধরনের অস্থিরতা। আমেরিকার ট্রাম্প-প্রশাসন দূরপাচ্য, মধ্যপ্রাচ্য— সর্বত্রই দেশলাইয়ের কাঠিতে আগুন জ্বালিয়ে রেখেছেন। যে কোনো সময় যে কোনো স্থানে তা থেকে বিস্ফোরণ সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশও এই পরিস্থিতির প্রভাবমুক্ত নয়। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, মিয়ানমার প্রভৃতি দেশের দিকেও শ্যেনদৃষ্টি পড়েছে আমেরিকার। সম্প্রতি আমেরিকার দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘১৭ কোটি নর-নারী অধ্যুষিত বাংলাদেশের বাজার তাদের দরকার। এখানে চীনকে তারা নাক গলাতে দিতে পারেন না’।

এই পটভূমিতে শেখ হাসিনার চীন সফর আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকা বলেছে, ‘চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করার লক্ষ্যেই শেখ হাসিনার এই চীন সফর’। অন্য আরেকটি ভারতীয় পত্রিকা বলেছে, সম্পর্ক শুধু উষ্ণ করা নয়, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করা এবং এ সম্পর্কে নানা ভুল বোঝাবুঝি দূর করাই হাসিনার এবারের লক্ষ্য।

শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার শুরু থেকেই চীনের সঙ্গে তার সরকারের সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টায় ব্রতী হন। এটা একটা কঠিন কাজ ছিল। প্রথমত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে চীনের বিরোধী ভূমিকার জন্য চীনের সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থাপন দুরূহ ছিল। তার উপর ভারত ও চীনের পরস্পরের বিরুদ্ধে রণংদেহী ভূমিকা ভারতের মিত্র বাংলাদেশের চীনের দিকে মৈত্রীর হাত বাড়িয়ে দেওয়া সহজ ছিল না।

হাসিনা সরকারের পররাষ্ট্র নীতির সাফল্যের প্রথম ধাপই ছিল পূর্ববর্তী খালেদা সরকার পাকিস্তানের প্ররোচনা ও স্বার্থে ভারতের সঙ্গে যে চরম তিক্ততা সৃষ্টি করে রেখেছিলেন তা দূর করা এবং মৈত্রী ও সহযোগিতার সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয় ধাপে হাসিনা সরকার বৈরী চীনের সঙ্গে সাহসের সঙ্গে বন্ধুত্বের ও পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন; কিন্তু এই ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে কোনো ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হতে দেননি।

বাংলাদেশের গত সাধারণ নির্বাচনে বিরোধী জোট এবং তাদের সমর্থক একটি সুশীল সমাজের আশা ছিল তারা দিল্লিকে বোঝাতে পারবেন, হাসিনা সরকার একটু বেশি বেইজিংয়ের দিকে ঢলেছে এবং বেইজিংকে বোঝাতে পারবেন, হাসিনা সরকার আসলে এখনো ‘ভারতের তাঁবেদার’ সরকার, ভারতের অনুকূলে এবং চীনের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছে।

বিশ্বের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের মিত্র একটি সুশীল সমাজের এই কৌশলটি কাজ দেয়নি। মোদি সরকারকে তারা পটাতে পারেননি। অন্যদিকে বাংলাদেশের গত সাধারণ নির্বাচনের সময় চীনের সরকার-নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ায় বলা হয়, ‘হাসিনা সরকার দেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দিয়েছে। এই সরকার নির্বাচনে জয়ী হলে এই স্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকবে।’ এটা যে চীনের সরকারের বক্তব্য ছিল তাতে সন্দেহ নেই।

নির্বাচনে জয়ী হয়ে সম্পর্ক নতুন করে ঝালাই করাও শেখ হাসিনার এবারের চীন সফরের উদ্দেশ্য। চীন সরকারের সঙ্গে ট্রেড ওয়্যারে অবতীর্ণ আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়ায় চীনকে প্রতিহত করার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই শেখ হাসিনার এই চীন সফর আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ জানানো নয়, বরং বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক উন্নত রাখতে চায় এ সত্যতা দুই দেশকেই জানিয়ে দেওয়া। এই সহযোগিতার জন্য ঢাকা তার সার্বভৌমত্ব কারো কাছেই বিকিয়ে দেবে না।

এশিয়ায় প্রভূত্ব অক্ষুণ্ন রাখার জন্য আমেরিকার চালবাজি ছিল চীনকে ভারতের এবং ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে খেলানো। এই খেলায় অতীতে ওয়াশিংটন সফল হয়েছে। নেহেরু ও ইন্দিরার আমলে ভারত-চীন সম্পর্ক অবনতির শেষ ধাপে পৌঁছলেও ভারত ওয়াশিংটনের চীন-বিরোধী মার্কিন সামরিক রক্ষা জোটে যোগ দিতে রাজি হয়নি। পরবর্তীকালে কংগ্রেস এবং বিজেপি দুই সরকারই আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছে এবং বর্তমান বিজেপি সরকার মার্কিন প্রতিরক্ষা ছাতার তলেও মাথা ঢাকতে রাজি হয়েছেন।

কিন্তু এক্ষেত্রে একটি মজার ব্যাপার হলো—ভারতের মোদি সরকারের চীনের সঙ্গে কোনো সাংঘর্ষিক নীতি গ্রহণ থেকে দূরে থাকা। বরং ভারত-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বেড়েছে এবং ভারতে চীনের অর্থলগ্নির পরিমাণ এখন বিশাল। সীমান্ত বিরোধে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন ঝিমিয়ে আছে। অন্যদিকে মোদি সরকারের উপর ট্রাম্প প্রশাসন তেমন প্রসন্ন নন। ভারতের ওপর কতিপয় ক্ষেত্রে তাদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ তার প্রমাণ।

এই আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশও ঘোষিত মার্কিন নীতির কাছে বশ্যতা মেনে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক শিথিল করবে তার সম্ভাবনা কম। শেখ হাসিনার এবারের চীন সফর তার প্রমাণ। আমেরিকার ধমকের কাছে বা অর্থনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকারের যুগ এখন নেই। একটি ছোটো দেশও এখন তার হুমকি অস্বীকার করতে পারে। পঞ্চাশের দশকে মিশরের আসোয়ান বাঁধ নির্মাণে অর্থদান বন্ধ করে আমেরিকা নাসেরকে নতি স্বীকার করাতে পারেনি। তখন দ্বিতীয় সুপার পাওয়ার ছিল সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়ন। নাসেরের পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিল মস্কো।

বর্তমানে সোভিয়েট ইউনিয়ন নেই। তা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যাপারে বিশ্ব ব্যাংকের চালাকির কাছে মাথা নত করেননি। বলেছেন, নিজস্ব সম্পদ দ্বারা এই সেতু নির্মাণ করবেন। পদ্মা সেতুর নির্মাণের কাজ এখন শেষ হওয়ার পথে। বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা থেকে নোবেল জয়ী ড. ইউনুসকে ব্যাংকের এবং দেশের স্বার্থে অপসারণের পর আমেরিকার ওবামা সরকারের প্রভাবশালী পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ঢাকায় শেখ হাসিনাকে ব্যক্তিগতভাবে টেলিফোন করে তার ব্যাংক সংক্রান্ত নীতি পরিবর্তনের জন্য হুমকি দিয়ে ছিলেন। মনে হচ্ছিল, এই হুমকির কাছে মাথা নত না করলে বাংলাদেশে রেজিম চেঞ্জের চেষ্টা চালাবে হিলারির স্টেট ডিপার্টমেন্ট, তা হয়নি।

হিলারির হুমকি যে কাজে লাগেনি তার বড়ো কারণ, বাংলাদেশ এখন আর ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ নয়। একটা আত্মনির্ভরশীল উন্নয়নশীল দেশ। এটা সম্ভব হয়েছে হাসিনা সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের ফলে। মার্কিন দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক কর্মকর্তা বাংলাদেশের এই গুরুত্ব এখন স্বীকার করছেন এবং মার্কেট হিসেবে তারা যে বাংলাদেশকে হাতছাড়া করতে চান না সে কথাও বলেছেন। বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের সামরিক গুরুত্বের কথা।

বাংলাদেশ এই গুরুত্ব অর্জন করেছে দক্ষ নেতৃত্ব ও সমদর্শী পররাষ্ট্র নীতির ফলে। দেশের রক্ষা ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমেরিকা, চীন ও ভারতের সাহায্য গ্রহণে হাসিনা দ্বিধা দেখাননি। এমন কি, রাশিয়ার সঙ্গেও মৈত্রীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার চুক্তি করেছেন। ভারতের সঙ্গে বড়ো বড়ো অর্থনৈতিক সহযোগিতার চুক্তি করেছেন একাধিক। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীন তো এখন বড়ো পার্টনার। এই অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য শেখ হাসিনা জাপান, বেলুরাশিয়ায় পর্যপ্ত দৌড়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে উন্নয়নের মডেল রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন।

বাংলাদেশকে সাহায্যদানের নামে কোনো দেশের যদি রাজনৈতিক বা সামরিক অভিসন্ধি থাকে, তাকে প্রতিহত বা ব্যর্থ করার কৌশল বাংলাদেশের বর্তমান সরকার জানে। তাই একদিকে যে দেশটি ছিল বিএনপি-জামায়াতের পৃষ্ঠপোষক সেই সউদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে শেখ হাসিনা সক্ষম হয়েছেন। অন্যদিকে সউদিদের অনুগত বাংলাদেশি জামায়াতিদের কঠোরভাবে দমনে সক্ষম হয়েছেন।

নজরুল কবিতায় বলেছেন, ‘করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মিত্রের সাথে পাঞ্জা’ হাসিনা-সরকার শত্রুমিত্র দুইয়ের সঙ্গেই গলাগলি করার কৌশলটি জানেন। তাই আমেরিকার সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক চাপের বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে দাঁড়াতে পারেন। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত ও চীনের সঙ্গে সমান মৈত্রী ও সহযোগিতা বজায় রাখতে পারেন।

শেখ হাসিনার এবারের চীন সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বহু উন্নয়ন পরিকল্পনায় চীনের লজিস্টিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। অন্যদিকে ভারতের সাহায্যও প্রয়োজন। এই সাহায্য ও সহযোগিতার মধ্যে যাতে সাংঘর্ষিক কারণগুলো বড়ো হয়ে না ওঠে, বাধার সৃষ্টি না করে সেজন্য শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনার দরকার। অন্যদিকে ভূ-রাজনীতিতে যে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাংলাদেশের অবস্থানও মিত্র ও সাহায্যদাতা দেশগুলোর কাছে আরো স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। শেখ হাসিনার এবারের চীন সফর সেই আবশ্যকতা পূরণ করেব। এখন আশা করা যাক, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানেও তিনি চীনের পজিটিভ সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়েছেন।

[ লন্ডন জুলাই, শনিবার, ২০১৯ ]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment