কালান্তরের কড়চা

আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসে জিঙ্গোইজমের কালো ছায়া

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এশিয়া ও আফ্রিকার পশ্চিমের অধিকৃত দেশগুলো স্বাধীনতা লাভ শুরু করার পর বার্ট্রান্ড রাসেল উৎফুল্ল হয়ে বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে সাম্রাজ্যবাদ এখন মরা সাপ।’ কোরিয়া যুদ্ধের পর যখন ভিয়েতনামে প্রথমে ফরাসিদের এবং পরে আমেরিকার নগ্ন অভিযান শুরু হয় এই বার্ট্রান্ড রাসেলই তখন হতাশ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘সাম্রাজ্যবাদ মৃত নয়, বরং পুনরুজ্জীবিত এবং আরো ভয়ংকর একটি সাপ।’

রাসেল এই ‘পুনরুজ্জীবিত সাপের’ বিরুদ্ধে সারা ইউরোপে নৈতিক প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করেছিলেন। মার্কিন প্রশাসনকে যুদ্ধাপরাধী ঘোষণা করে গণ-আদালত বসিয়ে প্রেসিডেন্টসহ যুদ্ধাপরাধী মার্কিন জেনারেলদের বিচারের ব্যবস্থা করেছিলেন। এটা এখন দূর অতীতের ইতিহাস। কিন্তু বর্তমানে আবার ফ্যাসিবাদকে কেন্দ্র করে এই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর জয়ী ইউরোপ ও আমেরিকার নেতারা ঘোষণা করেছিলেন, হিটলার, মুসোলিনি ও তোজোর পতনের পর ফ্যাসিবাদের মৃত্যু হলো। এই ফ্যাসিবাদের পুনর্জাগরণের আশঙ্কা আর নেই। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আটলান্টিকের বুকে এক জাহাজে বসে বিশ্ববাসীর জন্য একটি যুদ্ধ বিরোধী নিরাপত্তা সনদ তৈরি করেন। এর নাম দেওয়া হয় আটলান্টিক চার্টার।

এই সনদ বা চুক্তিতে সই দেওয়ার পর দুই নেতাই ঘোষণা করেছিলেন, ফ্যাসিবাদকে কবর দেওয়া হলো। বিশ্বে আর কখনো মহাযুদ্ধ ঘটার আশঙ্কা বন্ধ করা হলো। জানা যায়, আটলান্টিক চার্টারে সই দেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য চার্চিলের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। চার্চিল সেই চাপ মানতে রাজি হননি। ঘোষণা করেছিলেন, ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে নিলামে চড়ানোর জন্য আমি প্রধানমন্ত্রী হইনি।’

মূলত তখন আমেরিকা ও ব্রিটেনের উদ্যোগেই জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বলা হয়, ‘বিশ্বের যাবতীয় বিরোধের মীমাংসা জাতিসংঘের মাধ্যমে হবে। আর যুদ্ধ ঘটতে দেওয়া হবে না। কিন্তু আটলান্টিক চার্টার প্রণয়ন এবং জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যে কোরিয়া যুদ্ধ শুরু হয়। আগ্রাসন আমেরিকার। জাতিসংঘের অনুমোদন না নিয়ে আমেরিকা কোরিয়ায় হামলা চালায় এবং সদ্য প্রতিষ্ঠিত কমিউনিস্ট চীনেও হামলা চালানোর হুমকি দেয়। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে তারা বেআইনিভাবে জাতিসংঘের পতাকা ব্যবহার করে এবং আণবিক বোমা ব্যবহারের কথাও বলে।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের পর আমেরিকা তার উত্তরাধিকার গ্রহণ করে এবং সদ্য স্বাধীন এশিয়ান ও আফ্রিকান দেশগুলোতে দুর্বল গণতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে সেনা শাসনের প্রবর্তনে সহায়তা দেয়। এই সেনা শাসকদের বেশির ভাগই আমেরিকার কথিত লৌহমানব (রত্ড়হ সধহ) বা খুদে ফ্যাসিস্ট হয়ে দাঁড়ায়। সাংবাদিক ও কলামিস্ট জন পিলজারের মতে, আমেরিকাই তার নয়া সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে বিশ্বে আবার নয়া ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়।

সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে এত কথা যে লিখলাম, এর কারণ গত ৪ জুলাই ছিল আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস। এটি দল-মত-নির্বিশেষে আমেরিকার মানুষের জাতীয় উৎসব। এতকাল এভাবেই উৎসবটি পালিত হয়েছে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার জাতীয় ট্র্যাডিশন ভেঙে এই উৎসবকেও তাঁর সামরিক শক্তির মহড়া প্রদর্শন এবং ২০২০ সালের প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে তাঁর প্রচার অভিযানের সূচনা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এই অভিযোগ তুলেছে মার্কিন মিডিয়ার একটি বড় অংশ এবং আমেরিকার ডেমোক্রেটিক পার্টি।

হিটলার জার্মান রাইখস্ট্যাগ (পার্লামেন্ট) দখলের পর যে বিজয় উৎসব করেছিলেন, অনেকে এটাকে তার সঙ্গে তুলনা করেছেন। লন্ডনের সানডে টাইমসের খবরে বলা হয়েছে,  ‘ওঃ ধিং ধ চত্বংরফবহঃরধষ চবঃ চত্ড়লবপঃ’ অর্থাৎ ‘প্রেসিডেন্টের পোষা পরিকল্পনা।’ গার্ডিয়ানে বলা হয়েছে, এবার ৪ জুলাই আমেরিকার জাতীয় দিবস চরিত্র হারিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শক্তির মহড়া এবং সামনের নির্বাচনের প্রচার অভিযানে পরিণত হয়েছে। গার্ডিয়ানের এক কলামিস্টের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার ডিক্টেটর হতে চান। ডিক্টেটরের সঙ্গে ফ্যাসিস্ট কথাটি যোগ করতে ব্রিটিশ সাংবাদিক হিসেবে তিনি সম্ভবত দ্বিধা বোধ করেছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এবারের স্বাধীনতা দিবসের উৎসবে ট্র্যাডিশন ভেঙে বক্তব্যও দিয়েছেন। ১৯৫১ সালে কোরিয়া যুদ্ধের সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান স্বাধীনতা দিবসে বক্তব্য দিয়েছিলেন, আর কেউ দেননি। এবার ট্রাম্প দিয়েছেন এবং অনেক মার্কিন পত্রপত্রিকার মতেই তিনি হিটলারের ভাষা অনুকরণ করে এই ভাষণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তাঁর আমলে আমেরিকা যত শক্তিশালী হয়েছে, এত শক্তিশালী আর কখনো ছিল না। তিনি আমেরিকার সেনাবাহিনীর পরাক্রম এবং তার ইতিহাস বর্ণনা করেছেন এবং চাঁদে প্রথম মানুষ পাঠানোর একক মার্কিন কৃতিত্ব দাবি করেছেন। তিনি স্বাধীনতা দিবসে ‘স্যালুট টু আমেরিকা ইভেন্ট’ প্রবর্তন করেছেন। ওয়াশিংটনের আকাশ ফাইটার প্লেনে ভরে গিয়েছিল। ফায়ার ওয়ার্কস চলেছে সারা রাত। ওয়াশিংটনের রাস্তায় মহড়া দিয়েছে ট্যাংক বাহিনী।

এই সামরিক মহড়ার জন্য যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, তা আমেরিকার ইতিহাসে অভূতপূর্ব। জর্জিয়া থেকে ট্যাংকবহর ওয়াশিংটনে আনতে খরচ পড়েছে আট লাখ ৭০ হাজার ডলার। ন্যাশনাল পার্কের পরিচ্ছন্নতা ও মেইনটেন্যান্সের জন্য খরচ হয়েছে ২.৫ মিলিয়ন ডলার। অন্যান্য বিপুল খরচ তো আছেই। একদিকে সরকারি তহবিলের এই বিরাট অপচয়, অন্যদিকে ট্রাম্প তাঁর মালিকানাধীন ওয়াশিংটনের হোটেলগুলোতে প্রতি কক্ষের ভাড়া কয়েক গুণ বাড়িয়ে বিরাট মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছেন। আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক ওয়াশিংটনে আসেন। এবার তাঁদের পকেট ভালোভাবে কাটা হয়েছে।

এবারের জাতীয় উৎসবকে ট্রাম্প দলীয় উৎসবে পরিণত করেছিলেন। তাঁর ৪৭ মিনিটব্যাপী ভাষণের সময় তাঁর সমর্থকরা ‘ঋড়ঁৎ সড়ত্ব ুবধত্ং’ অর্থাৎ ট্রাম্পকে আরো চার বছর চাই বলে স্লোগান দিয়েছে। ট্রাম্প তাদের আশ্বাস দিয়েছেন, শুধু সারা বিশ্বেই নয়, আগামী দিনে তিনি বুধ গ্রহেও আমেরিকার পতাকা ওড়াবেন। এবারের ৪ জুলাই সম্পর্কে বিখ্যাত লেখক স্টিফেন কিং বলেছেন, ‘এ ধরনের সামরিক মহড়া সাধারণত ডিক্টেটররা আয়োজন করেন।’ আরেক মার্কিন সাংবাদিক বলেছেন, ‘আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসকে ট্রাম্প দলীয়করণ করেছেন এবং জিঙ্গোইজম প্রচারের দিবস হিসেবে উদ্যাপন করেছেন।’

ট্রাম্প এবার আমেরিকায় যা করেছেন, তা অতীতে মার্কিন পালিত টিনপট ডিক্টেটররা এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে করেছেন। পাকিস্তানে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সামরিক জান্তার নেতা জেনারেল আইয়ুব খান তাঁর ক্ষমতা দখলের দিবস ২৭ অক্টোবরকে বিপ্লব দিবস ঘোষণা করে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে এই দিবস পালন করতেন। এই দিবসে সামরিক মহড়া এবং ডিক্টেটরশিপের বন্দনাই ছিল প্রধান কাজ।

বাংলাদেশেও জেনারেল জিয়াউর রহমান যখন টিনপট ডিক্টেটর তখন তাঁর ক্ষমতা দখলে সাহায্য জোগানের জন্য ৭ নভেম্বর যে নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল, তাকে সিপাহি-জনতার বিপ্লব দিবস নাম দিয়ে ঘটা করে পালনের ব্যবস্থা হয়েছিল।

আমেরিকা এতকাল অন্যকে যা শিখিয়েছে, এখন সেটাই তার ঘাড়ে ফিরে এসেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ঘটক মাত্র। ২০২০ সালের প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনেই বোঝা যাবে আমেরিকার জাতীয় জীবনে নব্য ফ্যাসিবাদের যে কালো ছায়া নেমে এসেছে, তা দূর হবে, না আরো দৃঢ়ভাবে তার ঘাড়ে চেপে বসবে। – কালের কন্ঠ

লন্ডন, সোমবার, ৮ জুলাই ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment