রাজনীতির নাট্যমঞ্চে বিষাদ ও কৌতুক

ড. আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

জাতীয় পার্টির নেতা জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এখন ঢাকার হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে আছেন। তিনি তার রাজনৈতিক জীবনে যাই করে থাকুন, তার বর্তমান অবস্থায় শত্রু-মিত্র সকলেই তার জন্য সহানুভূতিশীল এবং তার আরোগ্য কামনা করছেন। রাজনৈতিক নেতা এরশাদ সাহেবের মতো একটি রাজনৈতিক জোটও এখন লাইফ সাপোর্টে আছে। তার নাম জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

কিন্তু এজন্য দেশে একজন মানুষও দুঃখিত নয়। কেউ জোটের আসন্ন মৃত্যুর আশঙ্কায় বিচলিত নয়। বরং সকলেই অপেক্ষা করছে কখন সুদৃশ্য মেহগনি কাঠের কফিনে ঐক্যফ্রন্টের শব শোয়ানো হবে। জেনারেল এরশাদের সমর্থক ও হিতৈষীরা যেমন আশা করছেন তিনি আবার সুস্থ হবেন, বেঁচে উঠবেন। ঐক্যফ্রন্টের কিছু নেতাও তেমনি দাবি করছেন ফ্রন্ট লাইফ সাপোর্টে থাকলেও বেঁচে আছে এবং আবার জেগে উঠবে।

ফ্রন্টের এই অবস্থা দেখে বিএনপির আরেক সাবেক নেতা কর্নেল (অব) অলি আহমদ অনেকটা ‘প্রেত পূজায়’ নেমেছেন। ঐক্যফ্রন্টের সদস্যদের নিয়েই তিনি আরেকটি যুক্তফ্রন্ট গঠন করে নতুন বোতলে পুরনো মদ চালাইয়ের খেলা দেখাতে চান। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই খেলাও শেষ পর্যন্ত ড. কামাল হোসেনের মতো একক খেলায় পরিণত হয়েছে। যাত্রার আগেই যাত্রা ভঙ্গ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ট্রাজি-কমেডি খেলার মধ্যে একটু রঙ্গরস মিশিয়েছেন ‘ভঙ্গবীর’ কাদের সিদ্দিকী। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট গড়ার শুরু থেকেই তিনি ভানুমতির খেলা শুরু করেছেন। প্রথমেই তিনি ধাঁধাঁ সৃষ্টি করেছিলেন। গত সাধারণ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী মহাজোটে, না জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেবেন?

অনেক শর্ত ঘোষণা এবং শেষ পর্যন্ত ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে দীর্ঘ একান্ত বৈঠকের পর তিনি ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে বিএনপি নেতাদের হুমকি-ধমকিকেও ছাড়িয়ে যান। প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, তিনি জেল থেকে নিজে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে নিয়ে আসবেন। তিনি ভাব দেখালেন, ঐক্যফ্রন্ট যেন নির্বাচনে জয়ী হয়েই আছে। তিনি বিজয়ী বীরের মতো জেলে ঢুকে তার নেত্রীকে মুক্ত করে আনবেন।

মুক্তিযুদ্ধের এই বীরসেনানী যে এখন বাক্যবীর সেটা প্রমাণ হলো নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের ভরাডুবিতে। এখন ঐক্যফ্রন্টের নৌকায় কেউ থাকতে চাইছেন মনে হচ্ছে না। তারা মুখে বলছেন ফ্রন্ট। জীবিত আছে এবং শীঘ্রই নতুন রাজনৈতিক কর্মসূচী নিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হবে, কিন্তু বাস্তবে ঐক্যফ্রন্ট মৃতপ্রায়। একমাত্র ড. কামাল হোসেনের ‘সিজনাল’ হুকুম-ধমকি ছাড়া ফ্রন্টের শরীরে জীবনের কোন লক্ষণ নেই। গত নির্বাচনের পর ছয় মাস কেটে গেছে। ঐক্যফ্রন্টের শরীর নাড়ানো দূরের কথা, লেজ নাড়ানোরও শক্তি নেই।

কাদের সিদ্দিকীরও ভোল পাল্টাতে দেরি হয়নি, তিনি সদ্য ঘোষণা করেছেন ‘ঐক্যফ্রন্টে তিনি থাকছে না।’ এই ঘোষণা তিনি আগেও দিয়েছেন। বলেছেন ঐক্যফ্রন্টকে তিনি কতিপয় শর্ত দিচ্ছেন। ‘এগুলো না মানলে তিনি ঐক্যফ্রন্টে থাকবেন না’। এই শর্তগুলোর মধ্যে ছিল ঐক্যফ্রন্টকে সক্রিয় করা এবং তার নতুন কর্মসূচী ঘোষণা। কাদের সিদ্দিকী জানেন, মরা ঘোড়াকে চাবুক মেরে কোন লাভ নেই। তবু তিনি সেই চাবুক মেরে দেশের মানুষকে দেখাতে চেয়েছেন তিনিই বাংলাদেশের রাজনীতিতে একমাত্র ‘জাগ্রত নেতা।’ নির্বাচনের পর আবার ঘুমিয়ে পড়তে চান না।

প্রশ্ন হলো, তিনি এতই আন্দোলনপ্রিয় হলে তার কৃষক শ্রমিক পার্টি নিয়ে একাই এগোন না কেন? মুক্তিযুদ্ধের সময়তো তিনি ভারতে না গিয়ে দেশের ভেতর নিজের কাদেরিয়া বাহিনী নিয়ে যুদ্ধ করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন এবং বীরোত্তম খেতাব পেয়েছিলেন সেই বীরত্ব তার এখন কোথায় গেল? তার পেছনে আগের সেই জন সমর্থন কোথায় গেল?

আরও একটি কথা, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে তার দলও শরিক এবং তিনিও ফ্রন্টের একজন নেতা। গত নির্বাচনের পর অন্য শরিক দল ও নেতারা হতাশ ও নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে তিনি সামনে এগিয়ে এসে ফ্রন্টের হাল ধরছেন না কেন? কেবল কামাল হোসেনের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজেকে বাঁচাতে চাইছেন কেন? কেন ফ্রন্টের সকলকে সক্রিয় করে আন্দোলন শুরু করে খালেদা জিয়াকে জেল থেকে মুক্ত করে আনছেন না? তার ‘দেবর’ হওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন না?

আসলে কাদের সিদ্দিকী জানেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এবং আওয়ামী লীগে থাকাকালে তার যে বিপুল জনপ্রিয়তা গড়ে উঠেছিল চরিত্র ভ্রষ্ট হয়ে মুক্তিযুদ্ধের শত্রুদের সঙ্গে হাত মেলানোর ফলে সেই জনপ্রিয়তা তার নেই। কোন রাজনৈতিক কর্মসূচী দিয়ে তা জন সমর্থনের বলে সফল করার ক্ষমতা তার দলের নেই, ঐক্যফ্রন্টেরও নেই। একমাত্র খালেদা জিয়া মুক্তি দাবি করে কাগুজে বিবৃতি দেয়া ছাড়া কোন রাজনৈতিক কর্মসূচীও দেয়ার মতো নেই বিরোধী দলগুলোর হাতে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানোরও কেউ নেই।

সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থে ও জেদে ড. কামাল হোসেনের মতোই আওয়ামী লীগ ত্যাগ করার পর কাদের সিদ্দিকী রাজনৈতিক কর্মকা- শুরু করেছিলেন ড. কামাল হোসেনের কাঁধে চেপেই। এখন তিনি তার অথর্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের, ভীরুতা ও অযোগ্যতার সমালোচনা করছেন। কিন্তু তখনই কি তার এই চরিত্র বৈশিষ্ট্য জানতে পারেননি? এখন তিনি বলছেন, ‘ড. কামাল হোসেনের রাজনীতি তার মতিঝিলের আইন ব্যবসায়ের চেম্বারেই সীমাবদ্ধ’।

এই সত্যটি কি কাদের সিদ্দিকী আগে জানতেন না? বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় নেতাদের হত্যার পর জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে কাদের সিদ্দিকী যখন ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধে’ ব্যস্ত তখন অক্সফোর্ডে অবস্থানরত ড. কামাল হোসেনের কাছে তিনি কি ডজনের বেশি চিঠি লিখে আমার মাধ্যমে কামাল হোসেনের কাছে পাঠাননি সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে সাহায্য ও পরামর্শ পাওয়ার জন্য? সাহায্য ও পরামর্শ পাওয়া দূরের কথা, ড. কামাল হোসেনের কাছ থেকে তার চিঠির কোন প্রাপ্তি স্বীকার ও একটি জবাবও তিনি পেয়েছিলেন কি? তথাপি আওয়ামী লীগ ছাড়ার পর কাদের সিদ্দিকী ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে গিয়ে জুটেছিলেন কেবল মাত্র তাদের দু’জনেরই হাসিনা-বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে।

হাসিনা-বিদ্বেষ ছাড়া তাদের দু’জনেরই কোন রাজনীতি নেই। হাসিনা-বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে তারা দু’জনেই স্বাধীনতার আদর্শের শত্রু দলগুলোর সঙ্গে হাত মেলাতে পেরেছেন এবং জনগণের কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। শেখ হাসিনা এদের বলেছেন, এরা দুই কাক। কাকের মতোই গাছের ডালে বসে কা-কা করা ছাড়া এদের কোন কাজ নেই। মাটিতে নামার সাহস ও জন সমর্থন নেই।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাই শুধু ঐক্যফ্রন্টেই ভাঙ্গন ধরেনি, কামাল-কাদের জুটিতেও ভাঙ্গন ধরেছে। দুজনেই এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘মাইনাস টু’ ভাগ্যের পরিহাস। এক-এগারোর সময় এই মাইনাস টু থিয়োরির অন্যতম উদ্গাতা ছিলেন ড. কামাল হোসেন। তার ঐক্যফ্রন্ট এখন লাইফ সাপোর্টে আছে। সেখান থেকে বেঁচে ওঠার সম্ভাবনা নেই। তাই বলে জাতীয় রাজনীতি এক স্থানে স্থবির হয়ে থাকবে তা আমি মনে করি না। বরং এই ফসিল নেতাদের কবল মুক্ত হলে গণতান্ত্রিক রাজনীতি বাধামুক্ত হবে ও আওয়ামী লীগের বিকল্প এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শভিত্তিক নতুন দল ও নতুন নেতৃত্ব অবশ্যই দেশে গড়ে উঠবে। দেশের মানুষ তারই প্রতীক্ষা করছে। – জনকন্ঠ

[লন্ডন, ৯ জুলাই, মঙ্গলবার, ২০১৯ ॥

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment