তৃতীয় মত

বাংলাদেশে শিশুঘাতী নারীঘাতী বর্বরতা

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘‘নারীঘাতী শিশুঘাতী বর্বরতা’পরে, ধিক্কায় হানিতে পারি যেন’’। কবি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে বুঝতে পারতেন কেবল ধিক্কার দিলে এই মহাপাপের অবসান হবে না। এজন্য দরকার হবে কঠোর আইন, কঠোর বিচার ব্যবস্থা এবং জন সমাজে জাগ্রত প্রতিরোধ চেতনা। বাংলাদেশে শিশু ও নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার সংখ্যা উত্তরোত্তর শঙ্কাজনকভাবেই বেড়ে চলেছে। এটা এখন আর শুধু অপরাধ ও পাপ নয়। ক্যান্সারের চাইতেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়া জঘন্য ব্যাধি।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, নারী ও শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের মতো জঘন্য নোংরা কাজ যারা করে তারা মানুষ নয়। ধর্ষণ রোধে যা যা করার দরকার কিংবা আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার দরকার হলে সরকার তাই করবে। ধর্ষণ প্রতিরোধে নারীরা এগিয়ে এসেছেন, এ বিষয়ে পুরুষদের সোচ্চার হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী একটি সঠিক কথাই বলেছেন, বাংলাদেশের নারীরা তাদের ও অসহায় শিশুদের ওপর এই বর্বরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ও সংঘবদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু পুরুষ সমাজ তেমনটা সোচ্চার ও সক্রিয় হননি। আর সমাজের অভিভাবক পুরুষ, তারা এই অপরাধ দমনে সচেতন ও সক্রিয় না হলে কেবল নারীদের প্রতিবাদে তার মূলোৎপাটন করা যাবে না।

শিশু ও নারী ধর্ষণের সংখ্যা শুধু বাংলাদেশে নয়, প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় ভয়াবহভাবে বেড়েছে। ভারতের দিল্লির নৈশ বাসে এক শিক্ষার্থী তরুণী নার্সকে জঘন্যভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করার পর সারা দেশে যে হৈচৈ হয়েছিল, তাতে সরকার ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রবর্তনে বাধ্য হয়েছিল। তাতে দেশটিতে ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার সংখ্যা কমেনি।

বাংলাদেশেও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল নৈশ বাসে ইয়াসমিন হত্যার (গণধর্ষণ শেষে) পর। এটাও দেশজুড়ে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল। এই ঘটনাটি ঘটিয়েছিল বাসচালক, কন্ডাক্টর ও পুলিশ মিলে। বিচারের সময় পুলিশ প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল ইয়াসমিন ছিল এক চরিত্রহীন তরুণী। সবচাইতে লজ্জার বিষয়, ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে ভিকটিম নারীকে আরও বেশি ধর্ষিত হতে হয়। থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে একশ্রেণির পুলিশ কী ধরনের জেরা করেন, ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলায় তার উদাহরণ রয়েছে।

বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ধর্ষিতা নারীর ওপর চলে এই প্রশাসনিক অসভ্যতা। লন্ডনে এক তরুণী শিক্ষক ধর্ষিত হয়ে বিচার চাইতে একবার আদালতে গিয়ে আর যাননি। তিনি বলেছেন, অপরাধী আমাকে একবার ধর্ষণ করেছে, কিন্তু আদালতে দাঁড়িয়ে পুলিশ ও উকিলের জেরার মুখে আমি কয়েকবার ধর্ষিত হয়েছি, আরও লজ্জাকরভাবে। তাকে আদালতে আসামি পক্ষের উকিল তার ব্যক্তিগত জীবনের সব তথ্য জানতে চেয়েছে। তরুণী অবিবাহিত জেনেও কত পুরুষের শয্যাসঙ্গী হয়েছেন তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। এই জেরার পূর্ব বিবরণ ব্রিটেনের প্রধান সংবাদপত্রগুলোও প্রকাশ করেছিল।

জেরার সময় শুধু এই নারীকে নয়, বহু ধর্ষিত নারীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে- ধর্ষককে তিনি নীরবে অথবা ইঙ্গিতে সম্মতি দিয়েছিলেন কিনা। ধর্ষণকালে তিনি সুখ পেয়েছিলেন কিনা। যদি পেয়ে থাকেন, তাহলে এটা ধর্ষণ নয়, পরোক্ষ সম্মতিতে যৌন মিলন। কলকাতায় একটি জঘন্য ধর্ষণের সত্য ঘটনা নিয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষ ‘দহন’ নামে একটি ছবি তৈরি করেছিলেন। তাতে দেখা যায়, এই ধর্ষণের ঘটনায় সাক্ষী এক তরুণীকে (ইন্দ্রানী হালদার) আসামি পক্ষের উকিল অশ্লীল সব প্রশ্ন করছেন।

ব্রিটেনের এক ধর্ষিতা বলেছেন, ‘অপরাধীর দ্বারা একবার ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর বিচার চাইতে গেলে বারবার ধর্ষিত হতে হয়।’ এই ভয়ে পশ্চিম দেশগুলোতেও অর্ধেকের বেশি ধর্ষিত নারী বিচার প্রার্থী হতেন না। লজ্জায় ও ভয়ে ঘটনা গোপন করতেন। পশ্চিমা দেশের নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার সংগঠনগুলোর প্রবল আন্দোলন ও বিক্ষোভের মুখে এখন ব্যাপকভাবে ধর্ষণ মামলার প্রোসিডিউর পরিবর্তন এবং অভিযোগকারিণীর প্রাইভেসি ও মর্যাদা রক্ষার আইনি ব্যবস্থা হয়েছে। তবুও আইনের ফাঁকে চলছে ধর্ষণের অভিযোগ জানাতে গেলে ধর্ষিতাকে নানাভাবে হেনস্তা।

এশিয়া-আফ্রিকার দেশগুলোতে চৌদ্দ আনা ক্ষেত্রেই ধর্ষণের পর নারীকে হত্যা করা হয়। ইউরোপ-আমেরিকাতেও তাই। তবে পাশ্চাত্যে ধর্ষণের পর হত্যার সংখ্যা কমেছে। বেড়েছে ডেট রেপের সংখ্যা। বান্ধবীকে পাবে বা বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে গিয়ে তার পানীয়ের মধ্যে ঘুমের ওষুধ বা মাদক মিশিয়ে অজ্ঞান বা আধা অজ্ঞান করার পর ধর্ষণ করা। এই অপরাধ অক্সফোর্ড, কেমব্রিজের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও বেশি ঘটছে। বান্ধবীকে যদি যৌন মিলনে সম্মত করানো না যায়, তাহলে এই ডেট রেপ ঘটান ধর্ষিতার অনেক প্রেমিক অথবা বন্ধু সহপাঠী।

বাংলাদেশসহ উপমহাদেশেও এই ঘটনা ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ্রেণির ছাত্র (অধিকাংশই শিক্ষিত এবং ধনী পুত্র) তাদের পরিচিত, অর্ধপরিচিত বান্ধবীদের জন্মদিনের পার্টির নামে হোটেলে এনে গণ ধর্ষণের শিকার করেছে, তার খবরও কিছুদিন আগে সংবাদপত্রেই পাঠ করেছি। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হল, আগে সমাজের ও রাষ্ট্রের উচ্চস্তরে নারী-নির্যাতন ও ধর্ষণ সম্পর্কে একটা রাখঢাক ভাব ছিল, এখন তা নেই।

কিছুকাল আগেও পাশ্চাত্যের মতো উন্নত দেশেও অবৈধ নারী সংসর্গের অভিযোগ উঠলে বড় বড় রাজনীতিকের রাজনৈতিক জীবন শেষ হয়ে যেত। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন তো মনিকা লিওনেস্কির সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের ঘটনায় প্রায় ইমপিচমেন্টের শাস্তি পাওয়ার মুখোমুখি হতে যাচ্ছিলেন।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অসংখ্য নারীর প্রতি অশালীন ব্যবহার, এমনকি ধর্ষণের অভিযোগ উঠলেও তিনি ড্যাম কেয়ার। বরং নারী সংসর্গ নিয়ে তিনি গর্ব প্রকাশ করেন এবং নারীদের সম্পর্কে অভব্য উক্তি করেন।

সম্প্রতি এক সাংবাদিক মহিলা বহু আগে ট্রাম্প তাকে ধর্ষণ করেছেন অভিযোগ তুলে মি-টু’র দলে যোগ দিয়েছেন। ট্রাম্প এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও গর্ব করে বলেছেন, ‘আমি ধর্ষণ করলে ২৫ বছরের তরুণীকে ধর্ষণ করব, ৫২ বছরের মহিলাকে কেন?’ মহিলার বয়স এখন ৫৮ বছর। কয়েক বছর আগে যখন তাকে ধর্ষণ করা হয়, তখনও তিনি প্রবীণা। গত শনিবার লন্ডনের ‘গার্ডিয়ান’ তাকে নিয়ে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

উন্নত, অনুন্নত, উন্নয়নশীল সব দেশেই শিশু ও নারী নির্যাতন এবং ধর্ষণ ও হত্যা দ্রুত বাড়ছে। অবশ্য দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধিও তার একটা কারণ। রাষ্ট্র এই বর্বরতা দমনের জন্য আইন করছে। কিন্তু সেই আইন ভাঙছে পুরুষ শাসিত সমাজ ও রাষ্ট্রের অধিপতিরাই। এই অপরাধ সম্পর্কে পাশ্চাত্যের নারী আন্দোলনেও মতভেদ ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে।

সংখ্যা গরিষ্ঠরা বলছেন, নারী-ধর্ষণ মানুষ হত্যার চাইতেও বড় অপরাধ। অপরদিকে এই আন্দোলনেরই একটি সংখ্যা লঘিষ্ঠ অংশ সম্প্রতি তত্ত্ব প্রচার করছেন, ধর্ষণকে যতটা বড় করে দেখানো হয়, তা ততটা বড় নয়। এটা সহনীয় অপরাধ এবং এই অপরাধ মানব চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

এই বিতর্কের ঊর্ধ্ব উঠে বলা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণ ও হত্যা মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় লজ্জা এবং সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ। বিস্ময়ের কথা, এই বর্বরতা দমনে সমাজ-বিজ্ঞানীরাও কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি জানাচ্ছেন, কিন্তু এই সামাজিক ব্যাধির উৎস কোথায় এবং অপরাধীকে শুধু শাস্তি দেয়া নয়, সমাজ দেহ থেকে কী করে এ রোগের জীবাণু উচ্ছেদ করা যায়, সে সম্পর্কে কোনো গবেষণা তাদের নেই এবং এর কার্যকর কোনো প্রতিকার ব্যবস্থাও বলতে পারছেন না।

আসলে শুধু অপরাধীকে শাস্তি দিলেই চলবে না, অপরাধের উৎস খুঁজে বের করে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে।

এই লেখা শেষ করে এনেছি, এমন সময় যুগান্তরের মাহবুব কামালের কাছ থেকে খবর পেলাম, সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদ প্রয়াত হয়েছেন। (ইন্নালিল্লাহি… রাজিউন)। – যুগান্তর

লন্ডন, ১৪ জুলাই, রোববার, ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment