এরশাদ সাহেবকে যেমন দেখেছি

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

এরশাদ সাহেব চলে গেলেন। পেছনে রেখে গেলেন এক গাদা বিতর্ক, সমালোচনা, কিছু প্রশংসা। সামরিক শাসক হিসেবে তিনি সত্যই একজন ভাগ্যবান মানুষ। গণ অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর পর তাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়নি, অন্যদেশে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়নি। জেল-জুলুম সহ্য করে দেশে রয়ে গেছেন। জেলে বসে রাজনীতি করেছেন। সংসদে সদস্য হয়েছেন। সংসদীয় বিরোধী দলের নেতা হয়েছেন। দেশের রাজনীতির ভাঙা-গড়ায় অংশ নিয়েছেন। তারপর রোগে ভুগে নব্বই বছর বয়সে শান্তিপূর্ণভাবে ইহলোক থেকে বিদায় নিয়েছেন। তার মৃত্যুতে দেশের সব লোক না কাঁদলেও কিছু লোক কেঁদেছে।

আমি তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। একজন স্বৈরাচারী সামরিক শাসক হিসেবে। আবার অতীতের পতিত স্বৈরাচারী একজন রাজনীতিক ও সাধারণ মানুষ হিসেবে। মনে হয়েছে তার পূর্বসূরি জেনারেল জিয়াউর রহমানের মতো তিনি দুর্জন নন। তিনি একজন সুজন ভদ্র এবং সদালপী। যারা কবিতা লেখেন, গান ভালোবাসেন তারা দুর্জন হতে পারেন না বলে একটা প্রবাদ শুনেছি। জেনারেল এরশাদ কবিতা লিখতেন।

তিনি এই কবিতা অপরকে দিয়ে লেখাতেন বলে বাজারে গুজব আছে। হয়তো লেখাতেন। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যে নিজে লিখতেন তার প্রমাণ আমি পেয়েছি। সে কথা পরে। তিনি গান শুনতে ভালোবাসতেন। সম্ভবত এটা তাদের বংশগত বৈশিষ্ট্য। তার ছোট ভাই জিএম কাদের যখন হাসিনা সরকারের বিমানমন্ত্রী তখন আমি একবার ঢাকায় গিয়েছিলাম। জিএম কাদের তার বাসায় আমন্ত্রণ করেছিলেন। তার বাসায় গিয়ে দেখি তিনি আমার জন্য শুধু পান-ভোজনেরই আয়োজন করেননি, গানের আসরেরও আয়োজন করেছিলেন। কয়েকজন বিখ্যাত শিল্পী আমার জন্য অপেক্ষা করেছেন। মাঝরাত পর্যন্ত গান শুনেছি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এরশাদ সাহেবের নাম একবারও শুনিনি। মুক্তিযুদ্ধের পর দেশে ফিরেও তার নাম শুনিনি এবং তার সঙ্গে পরিচিতও হইনি। সম্ভবত ’৭৩ সালে একদিন গণভবনে (পুরনো) গেছি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার জন্য। দেখি বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সচিব মোহম্মদ হানিফের (পরবর্তীকালে ঢাকার মেয়র, এখন প্রয়াত) টেবিলের সামনে একজন লম্বা একহারা চেহারার লোক দাঁড়িয়ে আছেন। তার পরনে সামরিক পোশাক কিন্তু ক্রিজ ভাঙা।

তিনি কিছুক্ষণের জন্য হলেও বঙ্গবন্ধুর দেখা পাইয়ে দেয়ার জন্য মোহম্মদ হানিফকে কাকুতি-মিনতি করছিলেন। মোহম্মদ হানিফ তাকে অক্ষমতা জানিয়ে বিদায় দেন। আমাকে দেখে হানিফ বললেন, পাকিস্তান ফেরত বাঙালী সেনা-কর্মকর্তা। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে চান। বলেছি, আগে সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লার কাছ থেকে অনুমতি আনুন।

হানিফ সেদিন আমাকে এই পাকিস্তান ফেরত সেনা অফিসারের নামটাও বলেননি। এরপর আর তার নাম জানতে পারিনি, তার সঙ্গে দেখাও হয়নি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ঢাকার কাগজে প্রথম পৃষ্ঠায় বড় করে ছাপা একটি ছবি দেখলাম। রাজধানীর রাজপথে একটা খোলা জীপে দাঁড়িয়ে আছেন জেনারেল জিয়া। তার পাশে আরেক সেনা কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন। নাম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ডেপুটি আর্মি চীফ। পরে জানতে পারি, জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট পদ দখল করার পর এরশাদ সাহেবকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল করে সেনাপ্রধান করেন। ছবি দেখে তাকে চিনতে পারি।

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর এরশাদ সাহেব সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে পুতুল প্রেসিডেন্ট পদে বসান বিচারপতি আহসানউদ্দীনকে। পরে তাকে সরিয়ে জেনারেল এরশাদ নিজেই রাষ্ট্রপতি পদে বসেন। এই সময় আমি লন্ডনে ডাঃ এম মোর্শেদ তালুকদার কর্তৃক সম্পাদিত বাংলা সাপ্তাহিক ‘জাগরণ’-এর নির্বাহী সম্পাদক।

সম্ভবত আশির দশকের মাঝামাঝি সময়। রাষ্ট্রপতি এরশাদ লন্ডন সফরে আসেন। উঠেন পার্ক এভিনিউর হিলটন হোটেলে। তার প্রেস সেক্রেটারি তখন ছিলেন তাজুল ইসলাম। সাংবাদিক জীবনে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। হঠাৎ আমার বাসায় তিনি টেলিফোন করলেন। বললেন, প্রেসিডেন্ট আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। আমি একটু বিস্মিত হয়েছিলাম। তার সামরিক শাসনের ঘোর বিরোধী ছিলাম। তার বিরুদ্ধে লন্ডনে বসে কড়া কড়া কথা লিখেছি। তা জানা সত্ত্বেও তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতে চান শুনে বিস্মিত হয়েছি।

তাজুলকে বলেছি, একজন সামরিক শাসকের সঙ্গে দেখা করতে চাই না। তবে সাংবাদিক হিসেবে দেখা করতে পারি, যদি তিনি আমাকে একটা ইন্টারভিউ দেন। তাজুল বললেন, আমি সে ব্যবস্থা করব। আপনি আসুন। আমি তারপরের দিনই রাষ্ট্রপতির সাক্ষাত পেয়েছি। তার কিছুদিন আগেই আমি লন্ডনে পলাতক নাগা নেতা ফিজোর সাক্ষাতকার নিয়েছি। কাগজে তা বেরিয়েছে।

এই সাক্ষাতকারে ফিজো স্বীকার করেছেন, ভারতের বিরুদ্ধে নাগাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধে সাহায্য যোগাত পাকিস্তান সরকার। এখন জিয়াউর রহমান এবং এরশাদ – দুই সরকারই এই সাহায্য অব্যাহত রেখেছে। তবে কম আর বেশি দুই এই যা। ফিজো আগে পাকিস্তানী পাসপোর্টে এবং এখন বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয়ে ঢাকা হয়ে বিদ্রোহী নাগা ঘাঁটিতে যান এবং লন্ডনে ফিরে আসেন। এই ইন্টারভিউর পুরোটাই ‘জাগরণ’-এ ছাপা হয়েছিল।

ফিজোর সাক্ষাতকার গ্রহণের কাছাকাছি সময়ে ব্রিটেনের তৎকালীন থ্যাচারে মন্ত্রিসভার মন্ত্রি এডউইনা কারীর সাক্ষাতকার নিয়েছিলাম। তিনি বাংলাদেশ সফরে গিয়েছিলেন। তখন ভয়ানক সাইক্লোনে দুই লাখ লোক মারা গেছে। এটা উড়িরচর ‘ডিজাস্টার’ নামে পরিচিত হয়েছিল।

এডউইনা কারী ঢাকা সফরে গিয়ে বাংলাদেশের বিশাল সংসদ ভবন দেখে অবাক হয়ে যান। রাষ্ট্রপতি এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাতকারের সময় তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘যে দেশে গণতন্ত্র নেই সে দেশে গণতন্ত্রের প্রতীক পার্লামেন্টের এত বড় ভবন কেন?’ এরশাদ সাহেব জবাব দেননি। অতঃপর এড উইনা কারী রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চান, উড়িরচরের ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে দুই লাখ নর-নারীর মৃত্যু হয়েছে। সরকার এই বিপর্যয়ে কী করছে? এরশাদ সাহেব নাকি এই প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে জবাব দিয়েছিলেন, ‘ম্যাডাম, যে দেশে এক রাতে দশ লাখ শিশু জন্ম নেয় সেখানে ঝড়ে-বন্যায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু কিছু নয়।’

পরে লন্ডনে এডউইনা কারীর সঙ্গে আমার দেখা হলে তিনি নিজে আমাকে এরশাদ সাহেবের এই মন্তব্য জানিয়েছিলেন। ঢাকার কাগজে এই মন্তব্য ছাপতে দেয়া হয়নি। এখন এরশাদ সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তার প্রেস সেক্রেটারির আমন্ত্রণ পেয়ে ঠিক করলাম, রাষ্ট্রপতির এই মন্তব্য সম্পর্কেও তাকে জিজ্ঞাসা করব।

মনে আছে, সকাল এগারোটার দিকে পার্ক এভিনিউ হিলটন হোটেলে একুশ তলায় রাষ্ট্রপতি রয়্যাল সুইটে অবস্থান করছিলেন। আমি তাজুলকে সহ তার কক্ষে ঢুকতেই তিনি দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এসে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘আপনি একজন কবি, আমিও একজন কবি। এটা দুই কবির মিলন।’ তার সঙ্গে রওশন এরশাদও ছিলেন। তিনি হাঁকডাক করে আমার জন্য চা ও কেকের অর্ডার দিলেন।

আমার মুখোমুখি একটা সোফায় বসতে বসতে তিনি বললেন, গাফ্ফার সাহেব, আপনি বঙ্গবন্ধুর ভক্ত। তাই আপনাকে একটা কথা জানাচ্ছি, বঙ্গবন্ধু দেশকে স্বাধীন করে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। তাকে বলা হয় বঙ্গবন্ধু। আমি উপজেলা পদ্ধতি প্রবর্তনের জন্য ইতিহাসে চিরদিন বেঁচে থাকব। আমাকে বলা হয় পল্লীবন্ধু। আপনি কি একথা স্বীকার করবেন?

আমি সুযোগ পেলাম, রাষ্ট্রপতিকে ইন্টারভিউ করার কাজটা তখনই শুরু করে দিলাম। বললাম, দেশে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের কাজ এবং আমলাতন্ত্রের কবলমুক্ত ক্ষমতা তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার জন্য কাজটা বঙ্গবন্ধু শুরু করেছিলেন। তিনি নির্বাচিত জেলা পরিষদের গভর্নরদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করেছিলেন।

রাষ্ট্রপতিকে বললাম, আপনার সরকার উপজেলা পদ্ধতি প্রবর্তন এবং তার চেয়ারম্যান নির্বাচিত করার যে ব্যবস্থা করছেন তা আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্র এবং জিয়াউর রহমানের গ্রাম সরকার পদ্ধতির অনুকরণে। আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের হাতে কোন ক্ষমতা ছিল না, ছিল সার্কেল অফিসারদের (ডেভলপমেন্ট) হাতে। জিয়াউর রহমানের গ্রাম সরকারের এবং আপনার উপজেলা পদ্ধতির অবস্থাও তাই। এই পদ্ধতিতে চেয়ারম্যানদের হাতে ক্ষমতা নেই। প্রকৃত ক্ষমতা সরকারী অফিসারদের হাতে এবং সরকারী কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনার হাতে। নিজের হাতে ক্ষমতা স্থায়ী ও কেন্দ্রীভূত করার জন্য আইয়ুব মৌলিক গণতন্ত্র এবং তার বাংলাদেশী শিষ্য জিয়াউর রহমান গ্রাম সরকার প্রথা প্রবর্তন করেছিলেন। আপনার উপজেলা পদ্ধতি প্রবর্তনের উদ্দেশ্যও একই বলে মনে হয়।

বিস্ময়ের কথা এরশাদ সাহেব আমার কথা শুনে বিন্দুমাত্র রাগ করলেন না। একটু হেসে বললেন, গাফ্ফার সাহেব, এদেশের সাধারণ মানুষ এখনও অবাধ গণতান্ত্রিক অধিকার লাভের যোগ্য হয়ে উঠেনি। তাদের গাইডেন্স দরকার। আমার হাতে সেই গাইডেন্স দেয়ার ক্ষমতা রেখেছি। তার জবাব শুনেও আমি বিস্মিত হয়েছি। তিনি স্বাভাবিক। তার মুখে হাসি।

এরপর এসেছি পার্বত্য এলাকায় ভারত বিরোধী তৎপরতায় সাহায্য দান এবং এডউইনা কারীর কাছে ঝড় বন্যায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু নিয়ে তার মন্তব্য প্রসঙ্গে। – জনকন্ঠ

(বাকি অংশ আগামী সপ্তহে)

[লন্ডন, ১৬ জুলাই, মঙ্গলবার, ২০১৯]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment