ট্রাম্পের কাছে ভিক্ষাপাত্র হাতে নিয়ে দাঁড়ালে লাভ হবে না

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াশিংটনে ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কিত এক বৈঠকে বাংলাদেশী এক মহিলা প্রিয়া সাহার বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে ঢাকার অন্য একটি দৈনিকে আমার কলামে কিছু কথা লিখেছি। সব কথা বলা হয়নি। আজকে জনকণ্ঠের এই লেখায় আবার তাই প্রসঙ্গটির অবতারণা করছি।

বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যে এখনও ‘নীরব অত্যাচারের’ শিকার এ কথা সত্য। চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য এখনও দূর হয়নি। সামাজিক লাঞ্ছনা ও অবিচার এখনও লুপ্ত হয়নি। তবে আওয়ামী লীগ সরকার এই অবস্থা দূর করার চেষ্টা করছে। আগের তুলনায় অবস্থার অনেকটা উন্নতি হয়েছে। এখন ঢাকাতেও আর হিন্দুদের পুলিশ পাহারায় পূজার অনুষ্ঠান করতে হয় না। চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যে বৈষম্য দূর করার চেষ্টা হচ্ছে।

তবে রাতারাতি সমস্যাটি দূর হওয়ার নয়। ইউরোপ ও আমেরিকার বর্ণবাদের মতো আমাদের উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতা একটা সামাজিক ব্যাধি। সমাজের গভীরে তা প্রোথিত। ইউরোপ-আমেরিকায় কঠোর আইন করেও এই ব্যাধি দূর করা যায়নি। কিছুটা উপশম হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে উপমহাদেশে এই ব্যাধিটি নির্মূল করার চাইতে বিস্তারে সাহায্য জোগানো হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে। এই স্বার্থেই ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়। ধর্মীয় জাতীয়তা উগ্র ধর্মান্ধতায় পরিণত হয়। যুক্ত হয় সামাজিক সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতা।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অর্থনৈতিক সাম্প্রদায়িকতা বিলুপ্ত করা যায়নি। ভারতের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় বাংলা প্রদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুরা ছিলেন রাজনীতি থেকে শুরু করে চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাবশালী সম্প্রদায়। তাদের সহায়-সম্পত্তি বেশি। পাকিস্তান আমলে এই সহায়-সম্পত্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য দখলের জন্য কখনও দাঙ্গা বাধিয়ে, কখনও নির্যাতন দ্বারা সংখ্যালঘু বিতাড়ন শুরু হয়। তাতে রাষ্ট্রীয় পোষকতা ছিল।

অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর আমলে সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ হয়। তথাপি বাংলাদেশী মুসলমানদের অনেকের মনে ভয় ছিল দেশত্যাগী অমুসলমানদের অধিকাংশই দেশে ফিরে তাদের বেদখল হয়ে যাওয়া জমি-জমা, বাড়ি-ঘর ফেরত চাইবে। এই ভয় দূর করার জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকারকেও ভারতের সঙ্গে এই মর্মে চুক্তি করতে হয় যে, ১৯৬৫ সালের আগে যেসব সংখ্যালঘু ভারতে গেছেন বাংলাদেশ তাদের গ্রহণ করবে না।

সুতরাং প্রিয়া সাহা যে ওয়াশিংটনে গিয়ে ট্রাম্পের দরবারে নালিশ জানিয়েছেন তিন কোটির বেশি সংখ্যালঘু গুম হয়ে গেছে তা সত্য নয়। এই কোটি কোটি সংখ্যালঘু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই দেশ ছেড়ে ভারতে যান অথবা যেতে বাধ্য হন। ওয়াশিংটনে গিয়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু গুম হওয়ার কাহিনী প্রচার করে প্রিয়া সাহা সংখ্যালঘু নির্যাতনকারী বিএনপি-জামায়াতের অপপ্রচারকেই সাহায্য জুগিয়েছেন। এই অপপ্রচার হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম খুন চলছে।

মাত্র সাড়ে তিন বছরে বঙ্গবন্ধু সাম্প্রদায়িকতার মূলোচ্ছেদ করে যেতে পারেননি। ভারত পারেনি ৭২ বছরেও। ইউরোপ পারেনি দু’শ বছরেও। বঙ্গবন্ধু ধর্ম নিরপেক্ষ এবং ধর্মীয় নির্যাতনমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছিলেন। যেমন করেছিলেন মধ্যযুগে মোগল সম্রাট আকবর এক ভারতীয় জাতীয়তা তৈরির চেষ্টা দ্বারা। এই উদ্যোগে তার প্রধান দুই সহচর পণ্ডিত আবুল ফজল ও বীরবলকে হত্যা দ্বারা আকবরের উদ্যোগ ভেস্তে দেয়া হয়।

বাঙালি জাতীয়তার উদ্গাতা বঙ্গবন্ধু ও তার প্রধান চার সহচরকে নির্মমভাবে হত্যা করে প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চক্র দেশকে আবার ‘ছায়া পাকিস্তানে’ রূপান্তর করে। সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে রূপান্তর করেন। সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিককে রূপান্তর করা হয়। পাকিস্তান আমলে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর পাকিস্তান সরকার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যে অবৈধ শত্রু সম্পত্তি অর্ডিন্যান্স প্রবর্তন করে যায় তার সুযোগ নিয়ে শুরু হয় সংখ্যালঘুদের সম্পত্তির অবাধ লুটপাট।

একটা উদাহরণ দেই। পাকিস্তান আমলে ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর ঢাকার ওয়ারীতে বিখ্যাত চিকিৎসক ডা. নন্দীর বিশাল ভবন ও চিকিৎসা কেন্দ্রটি দখলে যায় শর্ষিনার তখনকার পীর সাহেবের। টাঙ্গাইলে সন্তোষের মহারাজার বাড়িটি দখলে যায় মওলানা ভাসানীর। কিভাবে যায় আমার জানা নেই।

জিয়া-এরশাদ-খালেদার শাসনামলে সাধারণ সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরেও হাত দেয়া হয়। নির্যাতন ও ভয় প্রদর্শন দ্বারা কোথাও বিনা দামে, কোথাও পানির দামে এই বাড়িঘরের দখল নেয়া হয়। প্রকৃত মালিকেরা দেশ থেকে পালিয়ে বাঁচেন। তারাও কেউ গুম হননি। দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। সংখ্যালঘু নারীদের গণ ধর্ষণ তথা পূর্ণিমা শীলদের ধর্ষণের কাহিনীও বিএনপি-জামায়াতের আমলের।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শত্রু সম্পত্তি আইনের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় অর্পিত সম্পত্তি আইন, হাসিনা সরকার এই ঘৃণ্য আইনটি বাতিল করেছে। কিন্তু এখনও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এর মূল কারণ আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং সংখ্যালঘু সম্পত্তি দখলকারীদের মধ্যে রয়েছে নব্য আওয়ামী লীগারদেরও এক বিরাট অংশ। তারা প্রভাব খাটিয়ে অর্পিত সম্পত্তি আইন দ্রুত বাস্তবায়নের পথে বাধা সৃষ্টি করেছেন। শেখ হাসিনার এই ব্যাপারে আন্তরিকতার কোন অভাব নেই। তিনি দলের ভেতরের ও বাইরের এই বাধা অতিক্রমের জন্য ধীরে হলেও সাহসের সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছেন।

প্রিয়া সাহা বা তার সমর্থকরা যদি চান এই ব্যাপারে শেখ হাসিনাকে সাহায্য জোগাতে তা হলে বিদেশে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নব্য ফ্যাসিস্ট ও রেসিস্ট বলে অভিযুক্ত এক মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে ধর্ণা না দিয়ে দেশেই গণতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন করতে পারতেন। বাংলাদেশে বনসম্পদ, বৃক্ষ ও পরিবেশ রক্ষার জন্য যদি আন্দোলন হতে পারে তাহলে প্রায় দু’কোটির মতো সংখ্যালঘু রক্ষায় প্রবল গণআন্দোলন গড়ে তোলা হচ্ছে না কেন? এই আন্দোলন হলে দেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতা উচ্ছেদে শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করা হবে।

একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে দেশে নারী নির্যাতন বেড়েছে বটে, কিন্তু নির্যাতিত ও ধর্ষিত নারীরা এখন কেবল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নয়। সংখ্যা গরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের নারীদের সংখ্যাই বেশি। হত্যাকাণ্ডের বেলাতেও দেখা যাচ্ছে মৌলবাদীদের হিংস্রতার বলি হচ্ছে যে মুক্ত বুদ্ধির তরুণেরা তাদের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যাই বেশি।

এদিক থেকে প্রিয়া সাহা ওয়াশিংটনে যে বক্তব্য রেখেছেন তার প্রধান বক্তব্যটি যেমন সত্যের অপলাপ, তেমনি এই বক্তব্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য কোন কল্যাণ বহন করবে না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না এলে বা না থাকলে দু’কোটি ধর্মীয় সংখ্যালঘুও বাংলাদেশে থাকত কিনা সন্দেহ। তাদের নাগরিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতাও হতো বিপন্ন।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অবনতির শেষ পর্যায়ে গিয়ে না নামত। ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমান ও দলিত শ্রেণী আরও বেশি বৈষম্য এবং নির্যাতনের শিকার হতেন। আমেরিকা যেমন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ব্রিটেনকে উস্কাচ্ছে, তেমনি পাকিস্তান বাংলাদেশকে উস্কাত ভারতের সঙ্গে বিরোধে জড়ানোর জন্য।

বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উচিত, নিজেদের মধ্যে অনৈক্য দূর করে নিজেদের ঐক্য ও শক্তির জোরে তাদের অধিকার আদায় করে নেয়া। ট্রাম্পের মতো এক উগ্র বর্ণবাদী এবং নিজ দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনকারী ব্যক্তির কাছে গিয়ে ভিক্ষাপাত্র হাতে নিয়ে দাঁড়ালে কোন লাভ হবে না। – জনকন্ঠ

[লন্ডন, ২৩ জুলাই, মঙ্গলবার, ২০১৯]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment