কালের আয়নায়

বৃটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ‘জাতির ত্রাতা’ হতে চান

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

বরিস জনসন ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। অনেক দিন চৈত্রের ঝরাপাতার মতো পড়ন্ত অবস্থায় থাকার পর তেরেসা মে ঝরে পড়েছেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে টোরি দলে রক্তক্ষয়ী অন্তর্দ্বন্দ্ব চলাকালেই এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, বরিস তার সব শত্রুকে হটিয়ে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করবেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই তিনি ডাউনিং স্ট্রিটে নতুন সোফাসেট, চেয়ার-টেবিল ও খাটের অর্ডার দেন। কারণ তিনি হোমলেস, নিজের বাড়ি নেই।

যে স্ত্রীর সঙ্গে তিনি বসবাস করতেন, পরকীয়ার প্রতি আসক্তির দায়ে সেই স্ত্রী তার সঙ্গে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটিয়েছেন। তিনি চলে এসেছিলেন তার গার্লফ্রেন্ডের বাসায়। কিছুদিন আগে এই গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে মধ্যরাতে বিবাদের সময় গার্লফ্রেন্ডও তাকে বাড়িছাড়া করার হুমকি দিয়েছিলেন। বরিস বিবাদ মিটিয়ে নিয়েছেন এবং গার্লফ্রেন্ডই এখন তার সঙ্গে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে বসবাস করতে যাচ্ছেন। ব্রিটিশ ইতিহাসে এই প্রথম একজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তার স্ত্রী নন, একজন গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে ঢুকেছেন।

কিছুদিন আগে বরিস জনসন যখন টোরি দলের নতুন নেতা হওয়ার জন্য যুদ্ধরত, তখন এক মধ্যরাতে তিনি গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে উচ্চকণ্ঠে ঝগড়া করেন। তার এক প্রতিবেশী তা রেকর্ড করে পুলিশ ও মিডিয়াকে জানান। পুলিশ কোনো ব্যবস্থা না নিলেও মিডিয়া এটা ফলাও করে প্রচার করে। তখন মনে হয়েছিল, এই ‘কেলেঙ্কারি’ তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট করবে। কিন্তু তা হয়নি। ব্রিটেনের সাধারণ মানুষ এটাকে তার জীবনের একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে ধরে নিয়েছেন। সুতরাং মিডিয়া প্রচারণা তাকে কাবু করতে পারেনি।

ব্রিটিশ মিডিয়ার মতে, বরিস জনসন নিজেকে চার্চিলের মতো মনে করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শুরুতে ব্রিটিশ জাতির এক ঘোর সংকটের দিনে চার্চিল টোরি সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেনকে সরিয়ে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি শুধু তার দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব দূর করেননি, লেবার, লিবারেল সব দলকে ঐক্যবদ্ধ করে, একটি কোয়ালিশন গভর্নমেন্ট গঠন করে হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শক্তিশালী নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

বরিস জনসনও ব্রেক্সিট নিয়ে যখন ব্রিটেনের টোরি, লেবার নির্বিশেষে সব দল অনৈক্যে জর্জরিত, ব্রিটিশ জনগণ বিভক্ত, তখন টোরি প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মেকে সরিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেন। তার বহুকালের স্বপ্ন ও সাধনা এই পদটিতে বসা। তেরেসা মের আগের টোরি প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের পদত্যাগের পরও তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তার প্রধান মিত্ররা তাকে পরিত্যাগ করায় তেরেসা মে টোরি দলের নতুন নেতা হন এবং মন্ত্রিসভা গঠন করেন।

বরিস প্রথমে তেরেসা মের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু এই পদে তিনি বড় কোনো সাফল্য দেখাতে পারেননি। পরে ব্রেক্সিট সমস্যা সমাধানের প্রশ্নে তেরেসা মের সঙ্গে মতানৈক্যের দরুন তিনি পদত্যাগ করেন। এখন প্রশ্ন, চার্চিলের কায়দায় তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু চার্চিলের মতো ব্রিটিশ জাতির গভীর সংকটময় মুহূর্তে অনুরূপ সাহস, ধৈর্য ও দক্ষতা দেখিয়ে তিনি দল ও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে ব্রেক্সিট সংকট উত্তীর্ণ হতে পারবেন কি?

এখানেই অনেকের সন্দেহ। তিনি দলের নেতা হয়েছেন বটে; কিন্তু দলের ঐক্য ফিরিয়ে আনা এবং বিরোধীদের স্বমতে আনার কোনো পদক্ষেপ নেননি। বরং নিষ্ঠুরভাবে দলের অভ্যন্তরে শত্রুদের আপাতত দমন করেছেন। মন্ত্রিসভা থেকে তাদের উৎখাত করেছেন। লন্ডনের একটি সান্ধ্য দৈনিক এটাকে টোরি দলের নেতা পরিবর্তন নয়, রেজিম চেঞ্জ বলে আখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, বরিস জনসনের আগে যা শত্রু ছিল, নতুন কেবিনেট গঠনের পর তা আরও বেড়েছে।

বস্তুত জনসনের শত্রুপক্ষ এখনও শক্তিশালী। তাদের মধ্যে ফিলিপ হ্যামল্ড, ডেভিড লিডিংটন, ডেভিড গক, গ্রেগ ক্লার্ক তো আছেনই, রয়ে গেছেন নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী জেরেমি হান্ট, যিনি তেরেসা মের কেবিনেটে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। এই শক্তিশালী শত্রু শিবির এবং অনৈক্যে জর্জরিত দল পেছনে রেখে বরিস ব্রেক্সিট প্রশ্নে সাফল্য অর্জনে কতটা এগিয়ে যেতে পারেন, সে সম্পর্কে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করেন। যদি তিনি তা পারেন, তাহলে অবশ্যই চার্চিলের মতো ইমেজ তার গড়ে উঠবে। আর না পারলে তাকে তেরেসা মের চেয়েও অসম্মানজনকভাবে ডাউনিং স্ট্রিট ছাড়তে হবে। টোরি দল ক্ষমতা হারাবে। ব্রিটেনের সংকট আরও গভীরতর হবে। অনেকের ধারণা, এত বাধা ও শত্রুতার মুখেও বরিস জনসন যে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হলেন, তার পেছনে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আশীর্বাদ’ আছে। ডোনাল্ড যে বরিসকে পছন্দ করেন, সে কথা স্পষ্টভাবেই ব্যক্ত করেছেন।

তেরেসা মেও এ কাজটি করেছিলেন। আমেরিকার বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প নির্বাচিত হতেই বিদেশি নেতাদের মধ্যে তেরেসা মে প্রথম ওয়াশিংটনে ছুটে গিয়েছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে বিবাদে আমেরিকা ব্রিটেনকে সহযোগিতা দেবে। ফলে ইউরোপের সঙ্গে বেক্সিট চুক্তি করতে গিয়ে ব্রিটেনের দরকষাকষির হাত শক্ত হবে।

মের আশা পূর্ণ হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প চাপ দিয়েছিলেন, মার্কিন স্বার্থে ও মার্কিন নির্দেশে সম্পূর্ণভাবে তেরেসা মেকে চালিত হতে হবে। মে এতটা নির্দেশ মানতে রাজি হতে পারেননি। ফলে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কচ্যুত হলে ব্রিটেনের যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষতি হবে, সেটা আমেরিকা অনেকটা পুষিয়ে দেবে বলে তেরেসা মে যে আশা করেছিলেন, তা পূরিত হয়নি। পরে ডোনাল্ড ট্রাম্প অশালীনভাবে তেরেসা মেকে ‘আহাম্মক’ বলেছেন এবং এও বলেছেন, তেরেসা মে তার পরামর্শ শোনেননি।

এখন ট্রাম্পের প্রিয়ভাজন বরিস এই পরামর্শ যতটা শুনবেন, এই পরামর্শ শুনে ব্রেক্সিট সমস্যার সমাধান করতে চাইবেন অথবা তা পারবেন কি-না তা একমাত্র ভবিষ্যৎই বলতে পারে। বরিস ব্রিটিশ জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে কোনো চুক্তি হোক বা না হোক (ডিল অর নো ডিল), প্রতিশ্রুত ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ব্রিটেন ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসবে।

এটা তিনি কীভাবে করবেন, তিনিই জানেন। কারণ চুক্তি করে ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা এবং চুক্তি ছাড়াই বেরিয়ে আসা সম্পর্কেও টোরি পার্টির ‘রিমেইন্ডার’ বা বেরিয়ে আসার পক্ষের অংশের মধ্যে মতানৈক্য আছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা এবং বেরিয়ে না আসার পক্ষে সমর্থক সাধারণ মানুষের মধ্যেও মতভেদ এতই তীব্র যে, বেরিয়ে না আসার পক্ষের এক নারী এমপিকে বিরোধী মতের এক ব্যক্তি গুলি করে হত্যা করে।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুলাই) বরিস জনসন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কমন্স সভায় ‘ফায়ারি স্পিচ’ দিয়েছেন। তিনি লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিনের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, করবিন হতাশা ও ব্যর্থতায় ভুগছেন। তিনি দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব গ্রহণ ব্রিটেনে স্বর্ণযুগের সূচনা করবে। লেবার পার্টির নেতা করবিন তাকে ঠাট্টা করে বলেছেন, ‘নতুন প্রধানমন্ত্রী অতি আশাবাদে ভুগছেন।’

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন বলেছেন, তার আমলে আমেরিকা যত শক্তিশালী হয়েছে, আগে কখনও তা ছিল না। ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন তেমনই বলছেন, তার প্রধানমন্ত্রিত্ব ব্রিটেনে স্বর্ণযুগের সূচনা করবে। এখন দেখার রইল, এই দাবি বাস্তব হবে, না বাগাড়ম্বর বলে প্রমাণিত হবে। – সমকাল

লন্ডন, ২৬ জুলাই শুক্রবার, ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment