কালান্তরের কড়চা

এই সমস্যা শুধু প্রকৃতির নয় মানুষের দ্বারাও সৃষ্ট

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

বাংলাদেশ আবার সমস্যাক্রান্ত। এবারের বন্যা আগের প্লাবনের আকার ধারণ করেছে। দেখা দিয়েছে এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে গণপিটুনিতে ‘ছেলেধরা’ নাম দিয়ে নিরীহ লোক হত্যা। নারীরাই এই রোষের শিকার হচ্ছে বেশি। কে বা কারা গুজব ছড়িয়েছে, পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে এবং সে জন্য ছেলে-মেয়ে হরণ চলছে। তার পরই এ সম্পর্কিত আতঙ্কের প্রসার এবং গণপিটুনিতে হত্যাকাণ্ড শুরু।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে অনুপস্থিত। তিনি রোগাক্রান্ত এবং লন্ডনে চিকিৎসাধীন। তাঁর সরকার অবশ্য দেশে এই সমস্যা মোকাবেলায় তৎপর। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নিজে দেশে হাজির থাকলে সংকট মোকাবেলার শক্তি ও উদ্যোগ বিপুলভাবে বাড়ে। একবার বড় ধরনের বন্যার সময় বিবিসির ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, দুই লাখ লোক অনাহারে মারা যাবে। আর শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘একজন লোককেও অনাহারে মরতে দেব না।’ সেবার সরকার ও জনগণ একাত্ম হয়ে কাজ করেছে। একজন লোকও অনাহারে মারা যায়নি।

এবারের সমস্যাটি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের নয়, মানুষের দুর্বুদ্ধিরও। প্রকৃতি প্লাবন সৃষ্টি করে ধ্বংসকার্য চালাচ্ছে, অন্যদিকে এক শ্রেণির মানুষ গুজব-প্রভাবিত হয়ে নিরীহ নারী-পুরুষ মারছে। এ পর্যন্ত কয়েকজনকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুই সন্তানের মা তাসলিমার মৃত্যুই সবচেয়ে মর্মান্তিক। তাঁর মৃত্যু দেশময় তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

সরকার বন্যার্তদের রক্ষায় যেমন তৎপর হয়েছে, তেমনি গণপিটুনিতে হত্যা রোধেও ব্যবস্থা নিয়েছে।  জেলায় জেলায় বার্তা পাঠানো হয়েছে এবং পুলিশও তৎপর হয়েছে। মিডিয়া, ফেসবুক সহায়তা দিচ্ছে গুজব বন্ধ করার কাজে। এই ব্যাপারে শুধু আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে একটি ব্যাপারে সহমত পোষণ করতে পারছি না।

আইনমন্ত্রী বলেছেন, ‘গণপিটুনি, ধর্ষণ, আগুন লাগানোর ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা নয়। এক স্থানে এসব হলে ১০ স্থানে হয়। এগুলো বিএনপি-জামায়াতের নিখুঁত কাজের উদাহরণ।’ গণপিটুনি, ধর্ষণ যে নিছক দুর্ঘটনা নয়, আইনমন্ত্রীর এই উক্তি সঠিক। কিন্তু এগুলো শুধু বিএনপি-জামায়াতের কাজ, তাঁর এই মন্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করতে পারছি না। সবিনয়ে তাঁকে জানাচ্ছি, পৃথিবীর সব দেশেই সামাজিক অপরাধ বিরাটভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশেও বাড়ছে। বিএনপি-জামায়াত তার সুযোগ নিতে পারে। কিন্তু সব সামাজিক অপরাধের পেছনে বিএনপি-জামায়াত রয়েছে, এটা বলা নিজেদের দায়িত্ব পালনকে পাশ কাটানোর চেষ্টা মনে করা হতে পারে।

গুজব সৃষ্টি করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি আজ নতুন নয়, গণপিটুনিতে মানুষ হত্যাও এখন নতুন কিছু নয়। আমার কৈশোরকালে ব্রিটিশ আমলে গুজব শোনা গেল, যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাদের জন্য অস্ত্র নির্মাণে মানুষের মগজ লাগবে। এ জন্য দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে কয়েক লাখ মানুষ মারার ষড়যন্ত্র চলছে। তখন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হক সাহেব। তিনি ব্রিটিশ রাজের এই ষড়যন্ত্র কার্যকর করতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে বরখাস্ত করে খাজা নাজিমুদ্দীনকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। এটা ছিল মিথ্যা, গুজব।

ছোটবেলায় গ্রামের হাট-বাজারে গণপিটুনি ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। হঠাৎ রব উঠত চোর-চোর অথবা পকেটমার-পকেটমার। তার পরই দেখা যেত একটি লোককে (বেশির ভাগই বয়সে যুবক) হাট-বাজারের মানুষ ঘিরে ফেলেছে। তারপর বেদম প্রহার। প্রহূত ব্যক্তির ভাগ্য ভালো হলে তাকে আধামরা করে পুলিশের হাতে দেওয়া হতো। আর ভাগ্য ভালো না হলে মারা পড়ত। এই হতভাগ্য ব্যক্তি দোষী কি নির্দোষ, তা জানা যেত না। তাকে আহত বা হত্যা করার জন্যও সচরাচর কাউকে শাস্তি পেতে হতো না।

ডাইনি সন্দেহে নারীদের হত্যা এককালে ইউরোপে, বিশেষ করে ব্রিটেনে অত্যন্ত প্রচলিত ছিল। ডাইনি সন্দেহে ধৃত নারীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ এবং বিচার ছাড়াই তাদের আগুনে পুড়িয়ে মারা হতো। এই ডাইনি নিধন বা উইচ হান্টিংয়ের অনেক কাহিনি আছে ইংরেজি সাহিত্যেও। শিক্ষিত ব্রিটিশ সমাজে এখন আর ডাইনি অপবাদ কাউকে দেওয়া হয় না, বরং কেউ যদি তার প্রতিপক্ষকে (বিশেষ করে রাজনীতিতে) নানা ধরনের অসত্য অপবাদ দেয়, তাকে উইচ হান্টিং বলে নিন্দা করা হয়।

বাংলাদেশের গণসমাজ এখনো বিজ্ঞান সম্মত শিক্ষায় সুশিক্ষিত নয়। যে শিক্ষা দেশে প্রচলিত, তাতে ধর্মীয় কুসংস্কার, কোনো ধরনের অন্ধ বিশ্বাস থেকে সমাজ, বিশেষ করে তরুণ সমাজকে মুক্ত করার কোনো ব্যবস্থা নেই। মুক্তচিন্তা পোষণ ও প্রকাশ কতটা বিপজ্জনক, তা আমরা ব্লগার হত্যাকাণ্ডের সময় দেখেছি। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর চেহারা চাঁদে দেখা গেছে বলে যে গুজব প্রচার করা হয়, তা এ যুগে কোনো শিক্ষিত ও সভ্য সমাজে কেউ বিশ্বাস করতে পারে, এটা আমার জানা ছিল না। বাংলাদেশে শিক্ষিত সমাজেও কেউ কেউ এটা বিশ্বাস করেছে দেখেছি।

এই যুগ যুগ প্রচলিত কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস দূর করার ব্যবস্থা না করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর দোষ চাপালে লাভ হবে না। আইনমন্ত্রীকে সবিনয়ে বলি, বাংলাদেশে আইনের শাসন এখন সমাজের তৃণমূল পর্যন্ত নেই। চলছে অন্ধ-কুসংস্কারে বিশ্বাসী মোড়ল ও সমাজপতিদের এবং এক শ্রেণির ধর্ম ব্যবসায়ী মোল্লার শাসন। এই মোল্লাদের ফতোয়ার ফলে গ্রামাঞ্চলে কত নির্দোষ নারী নানা অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে নির্মমভাবে অত্যাচারিত হয় তার খবর অনেক সময় পত্রিকার পাতায়ও দেখা যায়।

বাংলাদেশে প্রকৃতি যে সমস্যা বা সংকট সৃষ্টি করে, তা মোকাবেলায় সরকার অতীতে যে দক্ষতা দেখিয়েছে, এবারও তা দেখাবে আশা করা যায়। কিন্তু মানবসৃষ্ট সমস্যা সমাধানেও সরকারকে অনুরূপ দক্ষতা দেখাতে হবে। এ জন্য অন্যের ওপর দোষারোপ না করে আইনের শাসনকে শক্তিশালী ও সমাজের সর্বস্তরে যেমন কার্যকর করতে হবে, তেমনি শিক্ষাব্যবস্থাকেও এমনভাবে সংস্কার করতে হবে, যাতে তা তরুণ প্রজন্মের মন ও মানস থেকে সর্বপ্রকার কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতা দূর করে।

ইউরোপে এবং আমেরিকায় এক গবেষণায় দেখা গেছে, দুই শতক ধরে সেক্যুলার ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষার প্রসার দ্বারাও সমাজের সর্বস্তর থেকে কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতা দূর করা যায়নি। ইংল্যান্ডের কোনো গ্রামাঞ্চলে গির্জায় মেরি মাতাকে দেখা গেছে এই গুজব প্রচারিত হওয়ার পর হাজার হাজার লোক ছুটেছিল তা দেখার জন্য। তাদের মধ্যে অনেকেই বলেছে, তারা মাতা মেরিকে গির্জার চূড়ায় দেখেছে। অন্ধ বিশ্বাসের এমনই শক্তি। এটা অনেকটা বাংলাদেশে চাঁদে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর চেহারা দেখার মতো।

বিজ্ঞানীরা তাই বলেন, সব যুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও কঠিন যুদ্ধ ধর্মান্ধতা, অন্ধ বিশ্বাস এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। সে জন্য যেমন আইনের কার্যকর প্রয়োগ দরকার, তেমনি দরকার ব্যাপক শিক্ষা বিস্তার ও সংস্কার আন্দোলন। আমাদের আইন মন্ত্রীকে অনুরোধ, গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। আর এই গুজবে যারা কান দেয়, তাদের বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যবস্থা নিন। মানুষ যাতে নিজেদের হাতে আইন তুলে না নেয়, মোড়ল ও মোল্লা শাসন যাতে সমাজের তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত না থাকে তার ব্যবস্থা করুন। কাজটা দুরূহ। তবু এটা শুরু হওয়া দরকার।

সবচেয়ে বড় দরকার গণসমাজকে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার জন্য জোরদার শিক্ষা ও সংস্কার আন্দোলন। এই কাজটা সরকার ও সংস্কৃতিসেবীদের। যুবলীগ ও ছাত্রলীগের এক বিশাল অংশ যদি নির্বাচনকালে ভোটপাত্রে ছাপ মারা তাদের দায়িত্ব নয় বুঝতে পেরে সমাজ সংস্কার ও শিক্ষামূলক আন্দোলনে যোগ দেয়, তাহলে তারা শেখ হাসিনার হাত শক্ত করবে এবং নিজেদের সুনামও ফিরিয়ে আনতে পারবে। – কালের কন্ঠ

লন্ডন, সোমবার, ২৯ জুলাই ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment