মিন্নি যেন চক্রান্তের শিকার হয়ে শাস্তি না পায়

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক দু’টি খুনের ঘটনা অনেকের মতো আমাকেও বড় আলোড়িত করেছে। একটি ফেনীর সোনাগাজীর নুসরাত হত্যা, অন্যটি বরগুনার রিফাত শরিফ হত্যা। দুটি হত্যাকাণ্ডই দেশে ভয়ানক আলোড়ন তুলেছে। দু’টি হত্যাকাণ্ডেই পুলিশ বেশ সক্রিয়। তবু ভয় হয় আসল অপরাধীরা এত শক্তিশালী যে- তারা আবার অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে শাস্তি না এড়ায়। হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় এটা আমাদের মতো দেশে প্রায়শঃ ঘটতে দেখা যায়।

নুসরাত হত্যাকাণ্ডে এটা ঘটতে যাচ্ছিল। স্থানীয় থানার ওসি নুসরাতকেই নানা আপত্তিকর জিজ্ঞাসাবাদ করে তার ভিডিও প্রচার দ্বারা তাকেই প্রকারান্তরে দোষী প্রমাণ করে, তাকে যে যৌন পীড়ন করেছে সেই মাদ্রাসার অধ্যক্ষের অপরাধ লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করেছিল।

সেই মাদ্রাসা-শিক্ষকের চক্রান্তে নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার পর দেশে এত আলোড়ন শুরু এবং প্রধানমন্ত্রী নিজে এদিকে দৃষ্টি দেয়ায় এই ঘটনাটিকে অন্যদিকে মোড় ফেরানো সম্ভব হয়নি। অপরাধীদের প্রায় সকলেই ধরা পড়েছে। বিচার চলছে। আশা করা যায়, অপরাধীরা এই বর্বরতার জন্য চরম শাস্তি পাবে।

বরগুনার রিফাত শরিফ হত্যাকাণ্ডেও দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ফলে পুলিশও ঘটনাটির তদন্তে সক্রিয়। কিন্তু অপরাধীদের ধরার শুরুতেই মূল আসামি নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যাওয়ার পর ঘটনাটির মোড় অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা হচ্ছে বলে অনেকে সন্দেহ করছেন। এই মামলায় এক নম্বর সাক্ষী ছিলেন নিহত রিফাত শরিফের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ তাকেও একজন আসামি হিসেবে গ্রেফতার করেছে এবং ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে।

এলাকার অনেকে মনে করছেন, প্রভাবশালী মহল মিন্নিকে অপরাধী সাজিয়ে ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। ফেনীর নুসরাতের মতো বরগুনার মিন্নিকেও প্রথমে স্কেপগোট বানাবার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আবার আরেক দল মনে করেন হত্যাকারীদের সঙ্গে মিন্নির যোগাযোগ ছিল। ফলে তার বিচারের দাবিতে বরগুনায় মানব বন্ধনও হয়েছে। মিন্নির বাবা-মা পরিবার তার পক্ষ নিয়েছেন। অন্যদিকে তার শ্বশুর ও শ্বশুর পরিবার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন।

এই বিভক্ত জনমত ও মিডিয়া প্রচারের ফলে মামলাটির গুরুত্ব হ্রাস এবং অপরাধীদের অত্যন্ত প্রভাবশালী গডফাদাররা মামলাটির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন বলে আমার আশঙ্কা। একটি বিচারাধীন বিষয় সম্পর্কে আমি মন্তব্য করতে চাই না। কিন্তু যে বিষয়টি আমাকে বিচলিত করছে তা হলো ধর্ষণ ও খুনের মামলায় অধিকাংশ সময়েই দেখা যায়, ভিকটিম যদি নারী হয় তাহলে তার চরিত্রে নানা অপবাদ দিয়ে তাকেই প্রথম অপরাধী বা অপরাধের সহযোগী সাজানোর চেষ্টা হয়। মিন্নির বেলায় তা যেন না হয়।

বাংলাদেশে এটা ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটেছিল। এক অসহায় তরুণীকে বাসের মধ্যে একা পেয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ রাস্তায় ফেলে দেয়া হয়। পুলিশ কনস্টেবলও এই বর্বরতায় জড়িত ছিল। ঘটনাটি মিডিয়ায় আসার পরই তাকে চরিত্রভ্রষ্টা প্রমাণের চেষ্টা হয়েছিল। নুসরাতের ব্যাপারে থানার এক ওসি তা করার চেষ্টা করেছেন। দিল্লীতে বাসের মধ্যে যে শিক্ষানবিস তরুণী নার্সকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সারা ভারতে তোলপাড় সৃষ্টি হয় তাকেও প্রথমে পতিতা বানানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

কলকাতার ঋতুপর্ণ ঘোষ ধর্ষণের একটি সত্য ঘটনা নিয়ে ছবি করেছিলেন ‘দহন’। তাতেও দেখা যায় মহিলাকে যারা ধর্ষণের চেষ্টা করেছে পুলিশ, আইন, বিচার ব্যবস্থা কেউ তাদের শাস্তি দেয়নি। মহিলার চরিত্র হনন করা হয়। এমনকি তার স্বামীও তার চরিত্রে সন্দেহ করে তাকে ধর্ষণ করেন। মহিলা গৃহছাড়া হন।

সম্প্রতি হলিউডের একটি ইংরেজী ছবি দেখেছি, তা অনেকটা বরগুনার মিন্নির ঘটনার মতো। নায়িকা এক যুবকের সঙ্গে প্রেম করে তাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তিনি বুঝতে পারেন তার স্বামী একজন খুনী। তার আগের এক স্ত্রী ও এক প্রেমিকাকে সে হত্যা করেছে। কিন্তু পুলিশের তদন্ত কার্যে শৈথিল্য এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা থাকায় সে বেঁচে গেছে। এখন সে তাকেও হত্যা করার চেষ্টা করছে। তার পালাবারও পথ নেই। ধরা পড়লে চরমভাবে নিগৃহীত হবেন। ভাগ্যক্রমে যে জিমে তিনি ব্যায়াম করতে যেতেন সেখানে এক যুবকের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং ক্রমে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা হয়। এই যুবকের কাছে একসময় তার অবস্থার কথা খুলে বলেন। যুবক তাকে আশ্রয় দেয় এবং নায়িকা খুনী স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে যুবকের কাছে চলে আসেন।

খুনী এর প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ খুঁজতে থাকে। এক মধ্যরাতে নায়িকার ঘরে ঢুকে তার ঘুমন্ত স্বামীকে খুন করে এবং পিস্তলটি নায়িকার হাতে গুঁজে দেয়। পুলিশ এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির টেলিফোন পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসে এবং নায়িকাকে হত্যাকারী হিসেবে গ্রেফতার করে। এখানেই গল্পের শেষ নয়। হলিউডি ছবির অনেক মারদাঙ্গা তাতে আছে। তা আমাদের আলোচ্য নয়। বলার কথা, এ ছবিতেও পুলিশের তদন্ত-ব্যর্থতা এবং পক্ষপাতিত্ব দেখানো হয়েছে।

মিন্নির ব্যাপারে পুলিশের হঠাৎ মনোভাব বদল কি তদন্তের ফল, না বন্ড চক্রের প্রভাবশালী অভিভাবকদের চাপের ফল- এটা এখন জানা দরকার। মিন্নিকে তার স্বামীর হত্যাকারীদের শনাক্ত করার নামে ডেকে নিয়ে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা জেরা এবং তারপরই তাকে গ্রেফতার ও আসামি করার ব্যাপারটি সন্দেহের উর্ধে নয়। এই ব্যাপারে পুলিশেরই উচিত সাধারণ মানুষের সন্দেহ ভঞ্জন করা।

নয়ন বন্ড ইংরেজী থ্রিলার বন্ড সিরিজের ছবি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একটি বন্ডচক্র গড়ে তোলে। অভিযোগ, মিন্নি এই চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, এমনকি একসময় নয়ন বন্ডের স্ত্রীও ছিলেন। বন্ডের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর তিনি রিফাত শরিফের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহের পরও তার নয়ন বন্ডের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এবং রিফাতকে হত্যার প্রস্তুতি বৈঠকেও তিনি হাজির ছিলেন।

এই অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনও জানা যায়নি। জানা যাবে মামলাটি আদালতে উঠলে। মিন্নির নয়ন বন্ডের সঙ্গে আগে বিবাহ হয়ে থাকলে বিবাহ বিচ্ছেদের পরও বা ঘনিষ্ঠতা থাকলেও সেই ঘনিষ্ঠতা চলে যাওয়ার পরও সৌজন্যমূলক সম্পর্ক রাখতে পারেন, তাদের বৈঠকেও যেতে পারেন। কিন্তু স্বামী হত্যার সাহায্য চেয়ে তাদের কাছে গিয়েছিলেন কিনা এবং সেকথা পুলিশের কাছে কবুল করেছেন কি-না, তা পুলিশই জানে।

আমার প্রশ্ন, স্বামী হত্যায় মিন্নি জড়িত থাকলে তার মোটিভটা কি? স্ত্রী স্বামীকে হত্যা করে অথবা স্বামী হত্যায় জড়িত থাকেন এমন ঘটনা অতীতে অনেক ঘটেছে এবং এখনো ঘটছে। এর পেছনে কারণ থাকে অবৈধ প্রেম অথবা সম্পত্তি ঘটিত বিবাদ। বরগুনার মিন্নি কি কোন অবৈধ প্রেমে জড়িত ছিলেন? না স্বামীর সম্পত্তি ঘটিত কোন বিবাদে লিপ্ত ছিলেন? এ ব্যাপারে কোন অভিযোগ এখনও জানা যায়নি।

মিন্নিকে রিফাত কলেজে পৌঁছে দিতে এসেছিলেন। সে সময়েই রিফাতের ওপর হামলা হয়। প্রথমে মিন্নি স্বামীকে রক্ষায় দৌড়ে যাননি, পরে যখন তাকে কুপিয়ে মারা হয় তখন দৌড়ে গেছেন। কিন্তু নয়ন বন্ড তাকে একটি আঘাতও করেনি। এসব নাকি তার দোষের প্রমাণ। স্বামী হঠাৎ আক্রান্ত হওয়ায় তিনি কিছুক্ষণ হতভম্ভ ছিলেন এবং তারপরই ছুটে গেছেন এটাই হয়তো স্বাভাবিক ঘটনা। আর আততায়ী কেন তাকে একবারও ছুরিকাঘাত করেনি এটা আততায়ী বেঁচে থাকলে জানা যেত। খুনীর মনের কথা জানার বা বলার দায়িত্বতো মিন্নির নয়।

বাংলাদেশে পুলিশ বিভাগে এখন সৎ ও দক্ষ অফিসারের সংখ্যা বেড়েছে। বিচার বিভাগও তাদের অনেক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠেছে। বরগুনায় রিফাত হত্যা মামলায় একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ক্ষমতাশালী চক্র সক্রিয় তা বুঝতে দেরি হয় না। আমার কথা, এরা যেন উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে নিস্তার না পায়। পুলিশ ও বিচার বিভাগের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না পায়। মিন্নি যেন উইট হান্টিংয়ের শিকার না হন।

খবরটা কতটা সঠিক তা এখনও জানি না। বরগুনার কোন আইনজীবী নাকি মিন্নির পক্ষে আদালতে দাঁড়াতে রাজি হননি। ফলে ঢাকা থেকে ৪১ জন আইনজীবী তার পক্ষ সমর্থনের জন্য বরগুনা যাচ্ছেন অথবা গেছেন। আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই।

এই ঘটনাও প্রমাণ দেয়, বরগুনা হত্যাকাণ্ডে অদৃশ্য এবং প্রভাবশালী গ্রুপের হাত রয়েছে। মিন্নি দোষী হলে শাস্তি পাক তাতে আমার আপত্তি থাকতে পারে না। কিন্তু তাকে যেন চক্রান্তের শিকার হয়ে শাস্তি পেতে না হয়- এটাই আমার কামনা। – জনকন্ঠ

[৩০ জুলাই, মঙ্গলবার, ২০১৯]

প্রকাশিত : ৩১ জুলাই ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment