তৃতীয় মত

দেশের রাজনীতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

বাংলাদেশের একটি বেসরকারি জনমত সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বিপুলভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে তার মন্ত্রিসভার সদস্য এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সম্পর্কে জনমত বলছে তিনি একজন সফল মন্ত্রী।

অর্থাৎ তার জনপ্রিয়তাও বেড়েছে। দেশে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা যে বিপুলভাবে বেড়েছে এটা জানার জন্য জনমত সমীক্ষার রিপোর্ট দেখার দরকার নেই। এটা দেশের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

শেখ হাসিনা এই জনপ্রিয়তা নিজে অর্জন করেছেন। কেবল পিতৃ পরিচয়ে তিনি জনপ্রিয় হননি। এজন্য তাকে দেশসেবা ও দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে। বারবার নির্যাতন, এমনকি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে।

দেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মোটামুটি স্থিতিশীলতা আনয়ন এবং একটি অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্র দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, অর্থনীতিতে প্রায় স্বাবলম্বী দেশে পরিণত করা চাট্টিখানি কথা নয়। তার পররাষ্ট্রনীতিতেও দেশটির মিত্রের সংখ্যা বেড়েছে। শত্রুরা সংখ্যায় কমেছে, অথবা নিষ্ক্রিয় হয়েছে।

এটা এখন দেশ-বিদেশে স্বীকৃত সত্য। শেখ হাসিনার বিকল্প নেতৃত্ব বাংলাদেশে নেই। ড. কামাল হোসেন, ড. ইউনূস, ডা. বদরুদ্দোজা প্রমুখ এখন ‘ভূতলে পড়িয়া শশী যান গড়াগড়ি।’ বেগম খালেদা জিয়া এক বছরের উপর জেলে। তাতে গাছের একটি পাতাও নড়ছে না।

বিএনপির যে অংশটি লন্ডনে সরকার বিরোধিতায় একটু বেশি সক্রিয় ছিল, এবার শেখ হাসিনার সফরকালে দেখা গেল, তারাও নিষ্ক্রিয়, নীরব। সরকারের সঙ্গে একটা আপসের আশায় নাকি তারেক রহমানও এখন উন্মুখ।

শেষ ভরসা ছিল, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি। অনেকে মনে করেছিলেন, এবার হয়তো জাতীয় পার্টি দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিরোধী দলের যে শূন্যতা দেখা দিয়েছে, তা পূর্ণ করতে এগিয়ে যাবে। সম্ভবত তারা যেতেন, কিন্তু তার আগেই এরশাদ সাহেবের মৃত্যুর কারণে দলটিতে দেখা দিয়েছে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব।

বেগম রওশন এরশাদ এবং তার দেবর এরশাদ সাহেব কর্তৃক মনোনীত নেতা জিএম কাদেরের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব চলেছে। হয়তো একটা আপসরফা হবে। কিন্তু এই আপসরফা শেষ পর্যন্ত টিকবে কিনা সন্দেহ।

দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিরোধী দলের এই শূন্যতা বেশি দিন স্থায়ী হওয়া ভালো নয়। তাতে এই শূন্যতা পূরণ করে অপশক্তি। শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তার বিপুল বৃদ্ধি এবং তার একজন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের একজন সফল মন্ত্রী হিসেবে দেশবাসীর কাছে স্বীকৃতি পাওয়া দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক দিক।

কিন্তু নেতিবাচক দিক হচ্ছে, শাসক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বাড়ছে না। বহু মন্ত্রী-এমপির বিরুদ্ধে মানুষের মনে বিশাল ক্ষোভ। ছাত্রলীগ-যুবলীগের এক শ্রেণীর নেতাকর্মীর কার্যকলাপে মানুষের মনে রয়েছে অসন্তোষ।

শেখ হাসিনা গত শনিবার (৩ আগস্ট) লন্ডনে পার্লামেন্ট-হাউস সংলগ্ন হলে বিশাল জনসভায় তার অসুস্থতা সত্ত্বেও যোগ দিয়েছেন এবং এক ঘণ্টার উপর বক্তৃতা দিয়েছেন। তাতে তার সরকারের উন্নয়নমূলক কার্যকলাপের একেবারে সর্বশেষ পর্যায়ের বিবরণ দিয়েছেন। তার বক্তৃতার সময় সভায় ছিল পিনড্রপ সাইলেন্স। সবাই তার বক্তৃতা মনোযোগ দিয়ে শুনেছে, হাততালি দিয়ে সমর্থন জানিয়েছে।

কেউ অস্বীকার করে না, শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে। বিশ্বে বাংলাদেশের মান-মর্যাদা বেড়েছে। যে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, তা ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার হিংসা-আগ্রাসন থেকে রক্ষা পেয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবার স্বমর্যাদায় জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

এগুলো সবই হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিবাচক দিক। কিন্তু নেতিবাচক দিকে হচ্ছে, দেশের উন্নতি হয়েছে, কিন্তু দেশবাসীর চরিত্রের উন্নতি হয়নি। মানব চরিত্রের উন্নতি ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন টিকিয়ে রাখা যায় না, সবার কাছে পৌঁছে দেয়াও যায় না।

কথাটা বলেছেন, প্রাচীনকালের অর্থশাস্ত্রের পণ্ডিত কৌটিল্য। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুও বলেছিলেন, ‘দেশের অভাব মোচনের জন্য আমি সারা বিশ্ব থেকে যা ভিক্ষা করে আনি, তা চাটার দল চেটে-পুটে খেয়ে ফেলে।’

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর গত চল্লিশ বছরে এই ‘চাটার দলের’ সংখ্যা বহুগুণে বেড়েছে। তারা দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। মিডিয়ার দখল নিয়েছে। সংসদে সংখ্যা গরিষ্ঠ আসন তাদের। এদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি শেখ হাসিনার অর্জিত জন কল্যাণমূলক কাজের সুফলকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে। সামাজিক অবক্ষয় ও দুর্নীতি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর প্রতিকার কোথায়?

নারী নির্যাতন ও নারী ধর্ষণ, ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে নিরীহ নর-নারীকে গণ পিটুনিতে হত্যা, ধর্ষিতা গৃহবধূকে পতিতা সাজিয়ে শাস্তিদান, কথায় কথায় কুপিয়ে মানুষ হত্যা, জেলায় এবং উপজেলায় ক্ষমতাশালী ও প্রভাবশালীদের প্রশ্রয়ে বরগুনার বন্ড গ্রুপের মতো সন্ত্রাসী মাফিয়া চক্রের আবির্ভাব দেশটাকে মগের মুল্লুকে পরিণত করতে চাচ্ছে বলে আশঙ্কা হয়।

শিক্ষিত মানুষেরও লোভ ও হিংসা কোন্ পর্যায়ে পৌঁছেছে তার প্রমাণ, কোনো এক সংখ্যালঘু মন্ত্রীর কাছে অবৈধভাবে বিশেষ ধরনের সুবিধা চেয়ে তা না পেয়ে তার চিকিৎসক কন্যাকে স্বামী হত্যার দায়ে ফেলার চক্রান্ত হয়েছে। এই কন্যা চিকিৎসক এবং তার বিরুদ্ধে চক্রান্তকারীরা শীর্ষস্থানীয় খ্যাতিমান চিকিৎসক।

আমাদের পুলিশের সততা ও দক্ষতা এখন অনেক বেড়েছে। কিন্তু অসাধু অংশের বিলুপ্তি এখনও ঘটেনি। নির্যাতিত নারীরা পুলিশের আশ্রয় চাইলে তার পরিণতি কী ঘটে, তার প্রমাণ ফেনীর সোনাগাজী মাদ্রাসার অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত নুসরাতের জীবন। বরগুনার খুনের ঘটনায় হাইকোর্ট পুলিশকে উপদেশ দিয়েছেন, তারা যেন তাদের দ্বারা আসামি বানানো মিন্নিকে নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে আসল আসামিকে নিয়ে মাথা ঘামায়।

এক শ্রেণীর মিডিয়া কর্মীও এখন সামাজিক অপরাধীদের রক্ষার কাজে নেমে নিজেদের ভাগ্য বানানোর চেষ্টা করছেন। আমাদের সুশীল সমাজের রাজনীতি নিয়ে যত মাথাব্যথা, সমাজ সংস্কার নিয়ে তার কিছু মাত্র নেই। অথচ এককালে অবিভক্ত বাংলায় সমাজ সংস্কারের এবং সামাজিক অবক্ষয় রোধের বিশাল আন্দোলনে নেমেছিলেন রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সৈয়দ আমির আলী, নবাব নবাব আলী, নবাব ফয়জুন্নেসা, বেগম রোকেয়ার মতো সংস্কারকরা। তাদের অনেকে এজন্য জীবন বিপন্ন করেছেন।

ধর্মীয় আন্দোলন দ্বারাও এখন সমাজ সংস্কার হয় না। কারণ, ধর্মান্ধতা ধর্মের প্রকৃত পুণ্যের শক্তিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। ফলে তাবলিগ আন্দোলনের মতো শক্তিশালী আন্দোলন সমাজ-চরিত্র বদলাতে পারছে না। তাবলিগ জামায়াতে প্রতি বছর যত লোক বাড়ে, তার চাইতে বেশি বাড়ে সামাজিক অপরাধ।

সামাজিক অবক্ষয় রোধে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল যেখানে ব্যর্থ, সেখানে বিরোধী রাজনৈতিক দল এই অবক্ষয় রোধে আর্থ-সামাজিক কর্মসূচি নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে পারত। কিন্তু দেশে গণতান্ত্রিক বিরোধী দল কোথায়? বিরোধী দল নাম দিয়ে যারা আছেন, তাদের রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো কর্মসূচি নেই, যা মানুষকে তাদের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হতে আকৃষ্ট করবে। কেবল খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি বা হাসিনা সরকারকে হটাও স্লোগান দেশের ইতিবাচক রাজনীতি বা সুস্থ ও শক্তিশালী বিরোধী দল গড়ে ওঠার ভিত্তি হতে পারে না।

তাই নেতিবাচক ইস্যু নিয়ে যারা গত নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ বিরোধী দল গঠন করতে চেয়েছিলেন, তারা ব্যর্থ হয়ে আবার ঘরে গিয়ে উঠেছেন। আবার ক্ষমতাসীন দলও সামাজিক অবক্ষয় রোধে কোনো কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণে আগ্রহ বোধ করছে না। কারণ তাদের উপর কোনো শক্তিশালী চাপ নেই। – যুগান্তর

লন্ডন, ৪ আগস্ট : রবিবার, ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment