কালের আয়নায়

আওয়ামী লীগকে মাঠে নামতে হবে

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

দেশে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে তাতে দেশের মানুষ আনন্দিত সুদূর বিদেশে বসে আমিও আনন্দিত এই অভিযান চালিয়ে হাসিনা সরকার দেশকে কলুষমুক্ত করুক, সফল হোকএটা আমারও প্রার্থনা কিন্তু এই শুদ্ধি অভিযানে একটা শুভঙ্করের ফাঁকি আছে এই ফাঁকিটা দূর না করা হলে অতীতের শুদ্ধি অভিযানগুলোর মতো এই অভিযান সাময়িক সাফল্য আনবে স্থায়ী সাফল্য পাওয়া যাবে না আমি এদিকে আওয়ামী লীগের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি

পাকিস্তান আমলে প্রথম শুদ্ধি অভিযানের কথা শুনি সামরিক শাসক আইয়ুবের ক্ষমতা গ্রহণ করার পর। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, দেশের সব রাজনীতিক দুর্নীতিবাজ। দেশ দুর্নীতিতে ভরে গেছে। এই দুর্নীতি দূর করার জন্য তিনি সেনাবাহিনী পুলিশ নামালেন। শহরেবন্দরে, গ্রামেগঞ্জের ঘরে ঘরে সেনাবাহিনী হানা দিল। যেসব ধনী ব্যক্তি আয়কর দেননি, যেসব ব্যবসায়ী দ্রব্যমূল্য যথেচ্ছ বাড়িয়ে ছিলেন, তাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিল।

তারা দ্রুত আয়কর পরিশোধ করলেন। ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য যথেষ্ট কমালেন। সাধারণ মানুষ আইয়ুবের নামে জয়ধ্বনি দিল। অনেকেই বলতে লাগলেন, আইয়ুব কেন আরও আগে ক্ষমতা নিলেন না, নিলে দেশবাসীর জীবনে স্বস্তি আসত। এভাবে বছরখানেক চলল। রাজনীতি রাজনীতিকদের বাদ দিয়ে আইয়ুব দেশ চালাতে গিয়ে ব্যর্থ হলেন। ব্যবসায়ী ধনী ব্যক্তিদের মন থেকে তখন ভয় চলে গেছে। তারা জানতেন, দেশ চালাতে আইয়ুব তাদের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য। তারা আবার সক্রিয় হলেন।

এবার সুযোগ বুঝে অসাধু ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য বাড়ালেন দশগুণ। যে সরিষা তেলের সের ছিল আড়াই টাকা, তা সাত টাকায় পৌঁছল। চাল, ডালের দাম অনুরূপভাবে বাড়ল।এটা মিলিটারি শাসনের যুগ, ঘুষ নেওয়া রিস্কি‘- এই ধুয়া তুলে ঘুষের হার বাড়ানো হলো পাঁচ টাকা থেকে ৫০ টাকা। আইয়ুব পাইকারিভাবে রাজনীতিকদের দুর্নীতিপরায়ণ আখ্যা দিয়ে তাদের জেলে পুরে অথবা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করে সামরিক অসামরিক আমলা দিয়ে দেশ চালাবেন, ভেবে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত মোনায়েম খাঁর মতো বটতলার উকিল, সবুর খান, ফজলুল কাদের চৌধুরীর মতো দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত রাজনীতিকদের ডেকে এনে মন্ত্রী বানিয়ে দেশ চালাতে বাধ্য হন। গণবিক্ষোভের মুখেই আইয়ুবি শাসনের অবসান ঘটে।

পাকিস্তান আমলে আইয়ুবের পর জেনারেল ইয়াহিয়া খান এলেন ক্ষমতায়। ক্ষমতায় এসেই তিনি দুর্নীতি দমনের নামে শুদ্ধি অভিযান শুরু করলেন। অসংখ্য ব্যবসায়ী দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তার হলো। পাকিস্তানের দুই অংশেই উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ৩০৩ জন সিএসপি অফিসারকে দুর্নীতির দায়ে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তাদের মধ্যে আমার খুব ঘনিষ্ঠ তিনচারজন বাঙালি সিএসপি অফিসার ছিলেন। এই শুদ্ধি অভিযানও পরে বিশুদ্ধ ব্যর্থতায় পরিণত হয়। ক্ষমতায় থাকাকালেমদ্যপ জেনারেলনামে পরিচিত ইয়াহিয়া নিজেই মদ্যপানজনিত মাতলামি, নারীলোলুপতা আর্থিক গুরুতর দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হন।৭১ বাংলাদেশে গণহত্যার তিনি নায়ক।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু প্রথম জেনুইন শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছিলেন। ঢাকা শহরে রেশন কার্ড দুর্নীতি তখন চরমে উঠেছিল। অসাধু পরিবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এত ভুয়া কার্ড করেছিলেন যে, সাধারণ মানুষের ঘরে রেশনের দ্রব্য পৌঁছত না। তা দিয়ে অসাধু ব্যক্তিরা দুর্নীতির জমজমাট ব্যবসা গড়ে তুলেছিল। এই ভুয়া রেশন কার্ড উদ্ধার এবং দুর্নীতিবাজদের ধরার জন্য একদিন আকস্মিকভাবে শহরে কারফিউ জারি করে সেনা পুলিশ বাহিনী ঘরে ঘরে পাঠানো হয়।

তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন টাঙ্গাইলের আবদুল মান্নান। ঘটনার দিন তার সঙ্গে আমি টাঙ্গাইলে ব্যারিস্টার শওকত আলীর বাসায় ভোরবেলা ব্রেকফাস্ট সারছিলাম। চা খেতে খেতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মান্নান একটু দর্পভরেই বলেছিলেন, ‘এতক্ষণে ঢাকার ঘরে ঘরে পুলিশ সামরিক বাহিনীর সার্চ অভিযান শুরু হয়ে গেছে।ব্যারিস্টার শওকত আলী এই অভিযানের কথা সম্ভবত আগেই জানতেন। তিনি আগে মওলানা ভাসানী এবং তার ন্যাপ দলের অনুসারী ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগে আসেন।

তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বললেন, ‘মান্নান, এই অভিযানটা এভাবে চালিয়ে আপনারা ভালো কাজ করেননি। সামরিক স্বৈরাচারী শাসকদের কায়দায় দুর্নীতি দমন অভিযান চালিয়ে তা সফল করা যায় না। আপনারা আইয়ুবমোনায়েম খাঁদের কায়দায় কেবল পুলিশ সামরিক বাহিনী দ্বারা অভিযান চালিয়েছেন। আপনাদের এত বড় দল রয়েছে, রয়েছে শক্তিশালী যুবলীগছাত্রলীগ, তাদের মাঠে না নামিয়ে কেবল পুলিশ সেনাবাহিনী নামানোর ফলে জনগণের ধারণা হবে, দেশে একমাত্র সামরিক পুলিশ বাহিনীই বুঝি দুর্নীতিমুক্ত এবং সর্বশক্তিমান। যুবলীগ, ছাত্রলীগ কাউকেই বুঝি দেশকে কলুষমুক্ত করার কাজে বিশ্বাস করা যায় না। এই ধারণা পোষণ করে কাজ করা হলে এই স্বাধীন গণতান্ত্রিক বাংলাও একদিন পুলিশ স্টেটে পরিণত হবে। আমলারাই প্রশাসনে জাঁকিয়ে বসবেন।

বঙ্গবন্ধুর আমলে এই দুর্নীতি দমন অভিযানে হাজার হাজার ভুয়া রেশন কার্ড উদ্ধার হয়েছিল। অসংখ্য লোক গ্রেপ্তার হয়েছিল। কিন্তু সংক্রান্ত দুর্নীতি দূর হয়নি। আমি টাঙ্গাইল থেকে ফিরে আসার পর একদিন শেখ ফজলুল হক মনি তার দৈনিক বাংলার বাণী অফিসে আমন্ত্রণ জানালেন। সেখানে দেশের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ভুয়া রেশন কার্ড উদ্ধারের অভিযানের কথা উঠল। বলেছিলাম, ‘এই অভিযানে যুবলীগ ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দেওয়া উচিত ছিল।যুবলীগ ছাত্রলীগ তখন খুবই শক্তিশালী জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি তোলাবাজির অভিযোগ ছিল না।

শেখ মনি আমার কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ভারাক্রান্ত স্বরে বললেন, ‘গাফ্ফার ভাই, দুঃখের কথা আর কী বলব! আমরা রক্ত দিয়ে দেশকে মুক্ত করেছি, কিন্তু প্রশাসনকে এখনও আইয়ুবমোনায়েমের আমলের গণবিরোধী আমলাদের কবল থেকে মুক্ত করতে পারিনি। এদের ষড়যন্ত্রেই এসব কাণ্ড হচ্ছে।এর কিছুদিন পরেই শেখ মনি তার কাগজবাংলার বাণীতে তার সেই ঐতিহাসিক লেখাটি লেখেন, যার শিরোনাম ছিল– ‘আইয়ুবমোনায়েমের আমলা দ্বারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রশাসন চালানো যাবে না

এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকায় দুর্নীতিবিরোধী, বিশেষ করে ক্যাসিনো তল্লাশির অভিযান শুরু করতেই আমার মনে পড়েছে শেখ মনির এই প্রবন্ধটির কথা। তার সঙ্গে অনেক ব্যাপারে আমার মতভেদ ছিল; কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসন আইয়ুবমোনায়েম আমলের আমলাদের কর্তৃত্বমুক্ত করার ব্যাপারে কোনো দ্বিমত ছিল না।

এখনও আমাদের সিভিলমিলিটারি ব্যুরোক্রেসিতে জিয়াএরশাদ একএগারোর আমলাতন্ত্রের ভূত জেঁকে বসে আছে। দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করার অভিযান থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের আয়োজন পর্যন্ত সর্বত্র এদের কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করছি। কেন দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের যুক্ত করে মাঠে নামানো হচ্ছে না? এদের সকলেই তো চোরবাটপাড় নয়।

আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগএই তিনটি প্রতিষ্ঠান এখনও দেশের সর্ববৃহৎ গণভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। এই সংগঠনের নেতৃত্বের স্তরে দুর্নীতি সন্ত্রাসের গডফাদাররা এসে আশ্রয় গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু এখনও এই সংগঠনগুলোতে রয়ে গেছে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে নিবেদিত হাজার হাজার সৎ নিবেদিত কর্মী। এরা আজ দলে কোণঠাসা বলেই আমার এক লেখায় প্রস্তাব করেছি, দেশে ছাত্র রাজনীতি পাঁচ বছরের জন্য স্থগিত রেখে ছাত্র সংগঠনগুলো নতুনভাবে গড়ে তোলা হোক।

দেশের ছাত্র যুব রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করার আরেকটি পন্থা হলো, সঠিক রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য তাদের মাঠে নামিয়ে দেওয়া। এমনকি এই দুর্নীতিবাজদের দমন নিজের দলেও। একটি সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দলগুলোকে নিযুক্ত করলেই দল আগাছামুক্ত হতে বাধ্য। নদীতে জোয়ার আসে বলেই যেমন নদীর পানি দূষিত হতে পারে না, তেমনি কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতার বৃক্ষ চূড়ায় অলসভাবে বসে না থেকে মাঠের রাজনীতিতে বিভিন্ন কর্মসূচি রূপায়ণে ব্যস্ত থাকলে তারা দুর্নীতিবাজ হতে পারে না।

এবারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানেও তাই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা উচিত ছিল। অভিযানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আওয়ামী লীগের হাতে থাকা উচিত ছিল। দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার পর ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু স্বীকার করেছিলেন, দেশ যত বড় সংকটেরই সম্মুখীন হোক, তার সমাধান কেবল সরকারি প্রশাসন দিয়ে করতে গেলে দেশটি পুলিশি স্টেটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আমি শেখ হাসিনার গণতন্ত্রনিষ্ঠার কথা জানি বলেই তাকে আন্তরিকভাবে অনুরোধ জানাই, তিনি তার রাজনৈতিক সংগঠনকে এড়িয়ে কেবল প্রশাসনিক লাঠ্যৌষধি দ্বারা দেশের কোনো সমস্যার সমাধানের নীতি যেন অনুসরণ না করেন, তাহলে দেশ পুলিশি স্টেটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা আছে। তিনি পথে পা বাড়াবেন না বলেই আমার দৃঢ়বিশ্বাস। – সমকাল

লন্ডন, ১৮ অক্টোবর শুক্রবার, ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment