দশ দিগন্তে

শাপলা চত্বরের ঘটনার পুনরাবৃত্তির হুমকি

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এশিয়া আফ্রিকার দেশগুলো যখন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের শোষণ-পীড়ন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে থাকে, তখন মনীষী বার্ট্রান্ড রাসেল মন্তব্য করেছিলেন— ‘সাম্রাজ্যবাদ (পশ্চিমা) এখন মৃত সাপ’। এর কিছুকাল পরেই আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ শুরু হয় বিশ্বের সদ্য স্বাধীন দেশগুলোতে। সেনা-ডিক্টেটর তৈরি করে স্বাধীন দেশগুলোর গণতান্ত্রিক নেতাদের হত্যা করে মার্কিন তাঁবেদার ঐ ডিক্টেটর দ্বারা নয়া সাম্রাজ্যবাদী শাসন-শোষণ শুরু হয়।

বার্ট্রান্ড রাসেল তখন মর্মাহত হয়ে লিখেছিলেন, সাম্রাজ্যবাদ মরা সাপ এই কথা বলে আমি ভুল করেছিলাম। সাম্রাজ্যবাদ মরেনি। কেবল খোলস পালটেছে। এই সাম্রাজ্যবাদী দানবদের বিরুদ্ধে নতুন করে সংগ্রাম প্রয়োজন। তিনি শুধু এই কথা বলা নয়, নয়া সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নিজে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। ভিয়েতনামে মার্কিন হস্তক্ষেপ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিনি গণআদালত গঠন করেন এবং তাতে আমেরিকা—বিশেষ করে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জনসন এবং তার ঊর্ধ্বতন সামরিক অফিসারদের বিচারের ব্যবস্থা করেন।

দীর্ঘকাল আগে বার্ট্রান্ড রাসেল সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে যে কথা বলেছিলেন, তা ভারত উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ খাটে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির পরাজয় ও পতনের পর স্বাধীন দেশটির অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম মুক্ত দেশের মাটিতে পা দিয়ে জনসভায় (যশোরে) ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের মাটিতে সাম্প্রদায়িকতাকে চিরদিনের জন্য কবর দিয়েছি।’ যশোরের ঐ জনসভাতেই বাংলাদেশে মুসলিম লীগ, জামায়াত, নেজামে ইসলাম ইত্যাদি সাম্প্রদায়িক দলগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে কলকাতায় ‘কম্পাস’ নামে একটি বিখ্যাত বামপন্থি সাপ্তাহিক ছিল। সেই সাপ্তাহিকে সৈয়দ নজরুলের ভাষণটির উল্লেখ করে লেখা হয়েছিল, ‘রাষ্ট্রপতি মহোদয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাম্প্রদায়িক শক্তির পরাজয় হয়েছে, তারা নিশ্চিহ্ন হয়নি। রণক্ষেত্রের পরাজয় রাজনৈতিক পরাজয় নয়। এই পরাজিত শক্তি সমাজের বিভিন্ন বিবরে এখন আশ্রয় নেবে, নতুন করে সংগঠিত হবে। নতুন খোলসে আবির্ভূত হবে। সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এমন একটি শক্তি, যার বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম করতে হয়। নইলে এদের নিশ্চিহ্ন করা যায় না।’

বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক দানবের পুনরুজ্জীবন সম্পর্কে কম্পাসের এই সতর্কবাণী মাত্র সাড়ে তিন বছরে সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক দলগুলো এই সময়ের মধ্যে নতুন করে সংগঠিত হয়েছে, শক্তি সঞ্চয় করেছে, দেশি-বিদেশি মিত্র সংগ্রহ করেছে, তারপর ১৫ আগস্টের নির্মম ঘটনা ঘটিয়েছে। তখন দেশ থেকে প্রায় বিতাড়িত হয়ে মস্কোতে গিয়ে ড. কামাল হোসেন ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘একাত্তরের পরাজিত শক্তি বাংলাদেশে ক্ষমতা দখল করেছে।’ এখন অবশ্য তিনি এই পরাজিত শক্তির দলেই গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।

অধুনা বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ সন্ত্রাসকে দমন করেছেন। কিন্তু সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করতে পারেননি। বরং সাম্প্রদায়িকতা যে নতুন খোলসে দেখা দিয়েছে এবং আহত সাপের চেহারা ধারণ করেছে, তার বিরুদ্ধে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে অবিরাম সংগ্রামের প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে এই সাস্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তার বাস্তবায়ন নেই, বরং গত কয়েক বছরে জামায়াতের মতো সাম্প্রদায়িক ও ঘাতক দল থেকে বিরাট এক অনুপ্রবেশকারী গোষ্ঠী আওয়ামী লীগে ঢুকেছে।

মানবতা ও স্বাধীনতার শত্রু জামায়াত ও ধর্মান্ধ সন্ত্রাসীদের দমন করার পরও রামু, কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এবং অতিসম্প্রতি ভোলার বোরহানউদ্দিনে যে ধর্মান্ধ অপশক্তির উত্থান ঘটতে পেরেছে তার কারণ এখানেই নিহিত। হাসিনা সরকারের বর্তমান শুদ্ধি অভিযানে যদি আওয়ামী লীগকে এই সাম্প্রদায়িক দানবের দখলমুক্ত করা না যায় এবং নতুন খোলসে আবির্ভূত এই ধর্মব্যবসায়ীদের উত্থান দমন করা না যায়, তাহলে ১৫ আগস্টের চাইতেও বড়ো জাতীয় ট্র্যাজেডি ঘটার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

এই অপশক্তি ইতিমধ্যে হুমকি দিয়েছে, তারা দেশে আবার শাপলা চত্বরের মতো অভ্যুত্থান ঘটাবে। ২০১৩ সালের মে মাসে শাপলা চত্বরে ধর্মান্ধ সহিংস শক্তিকে মোকাবিলা করার জন্য সরকারকে শক্তি প্রয়োগ ও আপস—এই দুই নীতি গ্রহণ করতে হয়েছিল। এটা ছিল শেখ হাসিনার প্রশংসিত রাজনৈতিক কৌশল। দুই ফ্রন্টে সাম্প্রদায়িক দানবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে তাদের তিনি ভাগ করে দিয়েছিলেন এবং দেশে সাম্প্রদায়িকতার উত্থানকে রোধ করেছিলেন।

এই সাম্প্রদায়িকতার দানব আবার শক্তি সঞ্চয় করেছে এবং দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে সরকারের পতন ঘটানোর কথা বলারও সাহস দেখাচ্ছে। এদের প্রশ্রয় দেওয়া হলে দেশের অন্যান্য সাম্প্রদায়িক দলও নতুন করে ঘোঁট পাকাবার উত্সাহ পাবে। শেখ হাসিনার উচিত হবে সাম্প্রদায়িকতার এই অর্ধমৃত সাপকে খোলস পালটানোর পর ফণা উদ্যত করার আগেই কঠোর হাতে দমন করা। এরা আল্লাহ-রসুলের প্রেমিক নয়; বরং এই পবিত্র নামকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে। আল্লাহ ও তার রসুলকে তারই সৃষ্ট ক্ষুদ্র মানব অবমাননা করতে পারে এবং তাদের হেফাজত দরকার একটি মানবগোষ্ঠীর কাছ থেকে, এ কথা বলাও সর্বশক্তিমান আল্লাহ ও তার প্রেরিত পুরুষকে অবমাননা করার মতো। এটাই এই সাম্প্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশে করছে।

রামু, কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং এখন ভোলার বোরহানউদ্দিনে ক্যাম্পে আল্লাহ ও তার রসুলের বিরুদ্ধে অবমাননাকর উক্তি প্রচার করা হয়েছে, এই অপপ্রচার চালিয়ে ধর্মপ্রিয় সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্মমভাবে অত্যাচার করা হয়েছে। তাদের নারীদের নির্যাতন করা হয়েছে। মন্দির ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। এটা বর্বরতা। এই বর্বরতার অনুষ্ঠান কি ইসলাম সমর্থন করে?

ভোলার বোরহানউদ্দিনে কোনো হিন্দু যুবক আল্লাহ-রসুলের অবমাননাকর উক্তি প্রচার করেছে এটা প্রমাণিত হয়নি। কেবল সন্দেহ ও গুজব দ্বারা চালিত হয়ে এই ভাঙচুর। যদি ধরে নেওয়া যায়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কোনো যুবক কাজটি করেছে, তাহলে তার বিচার ও শাস্তি দাবি করা যেতে পারে। কিন্তু একজনের দোষে নির্দোষ ও নিরীহ সব মানুষের ওপর এই বর্বরতা কেন?

আল্লাহর রসুলের মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি এমন সংখ্যাগরিষ্ঠ মক্কাবাসীর ঘরবাড়ি কি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে? তাদের নারীদের সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে? তাদের হত্যা করা হয়েছে? নাকি তাদের জান-মালের, নিজেদের ধর্মচর্চার সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল?

অবিভক্ত বাংলায় শ্যামসুন্দর নামে এক হিন্দু যুবক ‘রঙিলা রসুল’ নামে এক বই লেখেন এবং তাতে রসুলের (দ.) বিরুদ্ধে নানা কটূক্তি করা হয়। সাধারণ মুসলমানেরা তাতে উত্তেজিত হয়। তারা শ্যামসুন্দরকে হত্যা করে। কলকাতায় হিন্দু-মুসলমান রায়ট প্রায় লাগে লাগে অবস্থা দেখা দেয়। সময়টা ছিল রমজান শেষে ঈদ উত্সবের। এই ঈদের নামাজের বিশাল জামাত হতো কলকাতার গড়ের মাঠে। নামাজে ইমামতি করতেন মওলানা আবুল কালাম আজাদ।

এই ঈদের নামাজের খুতবায় তিনি বলেছিলেন, ‘শ্যামসুন্দরকে হত্যা করা ইসলামসম্মত নয়। তাকে বিচারে সোপর্দ করে শাস্তি দেওয়া যেত। তা করা হয়নি। এটা ধার্মিকদের কাজ নয়। ধর্মান্ধ ও মানবতার শত্রুদের কাজ। আল্লাহকে আমরা বলি সর্বশক্তিমান। মানুষ তার সৃষ্ট ক্ষুদ্র জীব। আল্লাহ তাদের নিরাপত্তা দেন ও হেফাজত করেন। এই সর্বশক্তিমান আল্লাহর বা তার রসুলের হেফাজতের কোনো দরকার নেই। যারা তাদের মর্যাদা রক্ষা ও নিরাপত্তাদানের কথা বলে, তারাই আল্লাহ ও তার রাসুলের অবমাননাকারী। তারা নিজেদের স্বার্থে এই দুটি পবিত্র নামকে ব্যবহার করে।

কলকাতার গড়ের মাঠে মওলানা আজাদ আরো বলেছিলেন, ‘পাশ্চাত্য জুড়ে এখন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে ইসলাম বিরোধী প্রচার চলছে। আমরা যেন তাদের ফাঁদে পা দিয়ে ইসলামকে সন্ত্রাসীদের ধর্ম প্রচার করার সুযোগ না দিই। এইচ জি ওয়েলসের মতো বিরাট লেখক আমাদের রসুলের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও জঘন্য উক্তি তার একটি বইতে করেছেন। আমরা কি তাকে হত্যা করতে পেরেছি, না পারব? আমরা দুর্বল এবং নিরীহ প্রতিবেশীদের ওপর অত্যাচার চালিয়ে রসুলপ্রেমের পরিচয় দিই। আল্লাহর রসুল আজ আমাদের মধ্যে থাকলে তার অনুসারীদের বর্বরতায় বাধা দিতেন! বলতেন, আল্লাহ এতই সর্বশক্তিমান যে কোনো মানুষের শক্তি নেই তার অবমাননা করার এবং কোনো মানুষের শক্তি নেই তাকে হেফাজত করার। কলকাতার কিছু মুসলমানের তো নয়ই। রসুল (দ.) বলে গেছেন, আল্লাহর শক্তি এতই সীমাহীন যে তার আদেশ অমান্য করে যারা তাকে অবজ্ঞা ও অস্বীকার করতে চাইবে, তারা আল্লাহর রোষানলে নিজেরাই ধ্বংস হবে।’

মওলানা আজাদের এই উক্তি থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশে কিছু মৌলবাদী ধর্মের নাম বিক্রি করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের (ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক) চেষ্টা করছে। ধর্মের নামে জাতির মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করছে। গণতান্ত্রিক সরকার শক্তি বলে উচ্ছেদের হুংকার দিচ্ছে। হাসিনা সরকার সাপ মেরেছে। এখন সাপের লেজের বিষও সময় থাকতে বিনাশ করতে হবে।

ভোলায় চারজন নিহত হয়েছে। এটা নিশ্চয়ই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। কিন্তু এজন্য পুলিশকে দোষারোপ করার আগে এই ছাত্রদের যারা উত্তেজিত করেছে এবং নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য রাস্তায় নামিয়েছে, ছাত্রদের মৃত্যুর জন্য যে পেছনের অপশক্তি দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। পুলিশ আত্মরক্ষা ও শান্তিরক্ষার জন্য গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছে। সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি পোড়ানো হচ্ছে, মন্দির ধ্বংস করা হচ্ছে, সেখানে কি পুলিশ নিষ্ক্রিয় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে? ভোলার ঘটনার পুনরাবৃত্তি কঠোর হাতে প্রতিহত করা দরকার। – ইত্তেফাক

[ লন্ডন, ২৬ অক্টোবর, শনিবার, ২০১৯ ]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment