ভারত-চীন শান্তি বৈঠক ॥ অন্তরালে উপমহাদেশে মোসাদের অনুপ্রবেশ

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

অক্টোবর মাসের মধ্যভাগে ভারতের চেন্নাইতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের মধ্যে শীর্ষ বৈঠক হয়ে গেল। এটা ভারত-চীন দ্বিতীয় দফা শীর্ষ বৈঠক। এটা কতটা ফলপ্রসূ হয় সেদিকে অনেক দেশী-বিদেশী রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের নজর ছিল। পাকিস্তান আশা করেছিল, কাশ্মীরে ভারতের সাম্প্রতিক চন্ডনীতি সম্পর্কে চীন ভারতকে সতর্ক করবে। বৈঠকটি হওয়ার আগেই চীনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র বলেন, ‘কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে চীনের অবস্থান হলো সমস্যাটি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হোক।’

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান স্বীকার করেছেন, কাশ্মীর সমস্যায় ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য বিদেশের রাষ্ট্রনায়কদের কাছে অনুরোধ জানানোর জন্য তার যে বিদেশ সফর তা তেমন সফল হয়নি। চেন্নাইতে চীন-ভারত আলোচনায় চীনও কাশ্মীর ইস্যুতে তেমন কোন চাপ প্রয়োগ করেছে বলে জানা যায়নি। মোদি-জিন পিং আলোচনায় দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা থেকে শুরু করে পারস্পরিক সমস্যা আলোচনাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। সেই সঙ্গে বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি। দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য সম্পর্ক আরও উন্নত করা সম্পর্কে দুই নেতা সম্মত হয়েছেন।

চেন্নাই বৈঠক শেষে যে যুক্ত ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে তাতে গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস দমন ও বিশ্বে শান্তি স্থাপনে দুই দেশ যুক্তভাবে কাজ করবে।’ এশিয়ায় অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তারে দুই দেশের মধ্যে অব্যাহত দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনার প্রেক্ষিতে চেন্নাই বৈঠক তা নিরসনে কতটা সহায়ক হবে তা নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়ায় এখনও আলোচনা চলছে।

চীন ও ভারতের সম্পর্ক নিয়ে যারা অভিজ্ঞ এমন দু’একজন পর্যবেক্ষক মতপ্রকাশ করেছেন, চেন্নাই বৈঠক আভাস দেয় চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা, ভারতের কতিপয় পার্বত্য রাজ্যের ওপর চীনের দাবি ইত্যাদি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের কোন আশঙ্কা নেই। বরং এ সকল সমস্যা সত্ত্বেও ভারত ও চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়বে। ভারতে চীনের আর্থিক বিনিয়োগ ক্রমশ বেড়েই চলছে। এটা ভারতের প্রয়োজন। অনেকে বলেন, এ জন্য বাংলাদেশে চীনের আর্থিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্পর্ক বেড়ে চলা সত্ত্বেও ভারত প্রকাশ্যে কোন আপত্তি জানাতে পারছে না।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে একটি চরিত্রগত মিল আছে। তারা দু’জনেই ব্যবসায়ের স্বার্থকে রাজনীতির উর্ধে স্থান দেন। এ জন্য তারা মুখে খুব গরম কথা বললেও যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে চান। হুমকি দিয়ে কাজ আদায় করার চেষ্টা দু’জনেরই রাজনৈতিক কৌশল। আমরা অনেকেই আশঙ্কা করছিলাম, ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলে বিশ্বে যুদ্ধ বেধে যাবে। তা হয়নি। (অনেকে মনে করেন, হিলারি প্রেসিডেন্ট হলে এতদিনে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ সম্প্রসারিত হতো। হিলারির ক্রোধ থেকে বাংলাদেশও বাঁচত না।)

ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে প্রচন্ড ধমক দিয়েছেন। মনে হয়েছিল এই বুঝি যুদ্ধ বাধল। কিন্তু বাধেনি। বরং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে তিনি একাধিক শান্তি বৈঠক করেছেন এবং তা করার জন্য সিঙ্গাপুর পর্যন্ত ছুটেছেন। ইরানকে শুধু ধমকি দেয়া নয়, অর্থনৈতিক সেঙ্কসন কঠোর করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি যুদ্ধের এমন মহড়া শুরু করেছিলেন যে, মনে হয়েছিল যুদ্ধ থামানোর আর কোন উপায় নেই। কিন্তু ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে গলা যতটা উঁচিয়েছিলেন, বর্তমানে ততটা না নামালেও ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে শান্তি বৈঠকে বসার চেষ্টা চালিয়েছেন। ইরাক ও আফগানিস্তান থেকেও তিনি মার্কিন সৈন্য ক্রমশ সরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। কুর্দীদের আপতকালে সাহায্য দানে এগিয়ে না গিয়ে কৌশলে সরে আসার চেষ্টা করছেন। এগুলো সবই ব্যবসায়ী বুদ্ধি, রাজনৈতিক বুদ্ধি নয়।

ভারতে মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের আওয়ামী সরকারের জন্য বিপদ আসন্ন। কারণ, আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক দল এবং বিজেপির শত্রু কংগ্রেসের মিত্র। সুতরাং হাসিনা সরকারকে মোদি সমর্থন দেবেন না। এই আশায় বাংলাদেশের বিএনপি ধেই ধেই করে নাচতে শুরু করেছিল। অচিরেই তার নাচ বন্ধ হয়। দেখা গেল বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক হাসিনা সরকারের সঙ্গেই মোদি সরকারের মৈত্রী বেশি।

মনে হয়েছিল মোদি সরকারের আমলে কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ অনিবার্য। বিশেষ করে সন্ত্রাসী হামলায় কাশ্মীরে অসংখ্য ভারতীয় সৈন্য নিহত হওয়ার পর আশঙ্কা করা হয়েছিল যুদ্ধ আর ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। আরএসএস নেতারা যেভাবে হুঙ্কার দেয়া শুরু করেছিল এবং পাকিস্তানের নেতারা যেভাবে তার পাল্টা উত্তর দিতে উঠেপড়ে লেগেছিল, তাতে ১৯৬৫ সালের মতো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আশঙ্কা প্রকট হয়ে উঠেছিল। তা হয়নি। দুই দেশের মধ্যে আবার শীর্ষ বৈঠক হতে দেরি হচ্ছে না। এই বৈঠকে সমস্যার সমাধান না হোক তার বেড়ে ওঠার আশঙ্কা আপাতত কমবে।

ট্রাম্প যেমন বিদেশে নয়, নিজের দেশের মাটিতে, মেক্সিকান সীমান্তে সমস্যায় জড়িত হয়েছিলেন, মোদিও তেমনি পাকিস্তানের কাছ থেকে হয়তো শঙ্কার কারণ কমাবেন, কিন্তু তার জন্য সঙ্কট অপেক্ষা করছে কাশ্মীরের মাটিতেই। অধিকৃত কাশ্মীরে তিনি যে চন্ডনীতি গ্রহণ করেছেন আপাতত তাতে সাফল্য লাভ করলেও, এই ধোঁয়া থেকেই জনআগ্নেয়গিরির লাভা বিস্ফোরিত হতে পারে। তার একটি প্রধান কারণ, উপমহাদেশের রাজনীতিতে এখন মার্কিন সিআইএ’র বদলে ইসরাইলি মোসাদের অনুপ্রবেশ বাড়ছে।

এটার শুরু প্রথম বিজেপি সরকার বা অটল বিহারী বাজপেয়ীর আমল থেকে। ভারতের স্বাধীনতার সূচনা থেকেই নেহেরু এবং তার সরকার মধ্যপ্রাচ্যে আরব দেশগুলো বিশেষ করে নিপীড়িত প্যালেস্টিনিদের বন্ধু ছিলেন। তিনি ইসরাইল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি পর্যন্ত দেননি। নেহেরুর একটা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ভূমিকা ছিল, যে ভূমিকা বিজেপি বা বিজেপির কোন নেতার নেই। বরং তাদের কোন কোন নেতার স্বাধীনতা সংগ্রামে বিরোধিতা করার রেকর্ড রয়েছে।

প্রথম দফা ক্ষমতায় এসেই বিজেপি সরকার আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করে এবং ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে তার সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সামরিক নানা প্রকাশ্য ও গোপন চুক্তি করে। এতকাল সিআইএ যা পারেনি মোসাদ তা পেরেছে। তারা ভারতের দেশরক্ষা ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করেছে। ভারত এখন বিপুল অস্ত্র ক্রয় করছে ইসরাইলের কাছ থেকে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দিল্লী সফর করে গেছেন। কোন কোন ভারতীয় পত্রিকাতেই অভিযোগ করা হচ্ছে, মোসাদ এখন সন্ত্রাস দমনে ভারতকে সাহায্যদানের নামে কাশ্মীরে প্রচন্ড দমননীতি প্রয়োগে মোদি সরকারকে পরামর্শ ও সাহায্য যোগাচ্ছে। অধিকৃত প্যালেস্টাইনে যে কায়দায় প্যালেস্টিনিদের নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হচ্ছে, তেমনভাবেই দমন করা হচ্ছে অধিকৃত কাশ্মীরের মানুষকে। এর পরিণাম কি হবে তা অবশ্য এখন বলা মুশকিল।

পাকিস্তান যেমন পঞ্চশের দশকে আমেরিকার সঙ্গে সামরিক চুক্তি করে এবং সিআইএকে অবাধে তৎপরতা চালাতে দিয়ে সারা উপমহাদেশে অস্থিরতা ও সমস্যা সৃষ্টি করেছে এবং আজ সেই সমস্যার নিজেই শিকার, ভারতের ভাগ্যেও ইসরাইলকে উপমহাদেশে ডেকে এনে একই অস্থিরতা সৃষ্টি এবং নিজেই তার শিকার হয় কিনা, এখন তা দেখার রইল।

ভারত-চীন শীর্ষ বৈঠক ও মোদি-ইমরান খান বৈঠক দ্বারা উপমহাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক উত্তেজনা কিছুটা কমবে, কিন্তু ইশান কোণের কালো মেঘের মতো উপমহাদেশে মোসাদের অনুপ্রবেশ ও তৎপরতা কি বিপদ ঘটায়, তা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ ও আশঙ্কা পোষণ করছেন। – জনকন্ঠ

(২৯ অক্টোবর, মঙ্গলবার, ২০১৯)

প্রকাশিত : ৩০ অক্টোবর ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment