ছাত্র রাজনীতির প্রশ্নে শ্রদ্ধেয় সাবেক প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কেন দ্বিমত পোষণ করি

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি। তাকে মনে করি জাতির একজন বিবেক। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ও যোগাযোগ আছে। তিনি লন্ডনে এলেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আমরা কোথাও মিলিত হই এবং দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করি। তার মতামতকে আমি অত্যন্ত গুরুত্ব দিই। মনে করি, তিনি জাতির একজন পথ নির্দেশকও।

সম্প্রতি তিনি দেশে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা সম্পর্কে যে প্রস্তাব উঠেছে, সে সম্পর্কে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে কিছু কথা বলেছেন। আমি অসুস্থতার ধাক্কা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তাই নিয়মিত পত্রিকা পাঠ হয় না। ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা সম্পর্কে তার প্রতিক্রিয়াটি দেরিতে আমার চোখে পড়েছে। ছাত্র রাজনীতি সম্পর্কে মন্তব্যটি বিচারপতি খায়রুল হকের বলেই সেটি আমি অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে পড়েছি। তাকে সশ্রদ্ধভাবে এবং বিনয়ের সঙ্গে জানাই, তার অভিমতের সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করতে পারছি না।

সাবেক প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ‘দেশে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে দিলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব সৃষ্টি হবে না। এমনকি জাতীয় নেতৃত্ব সৃষ্টিতে সংকট দেখা দেবে। তখন অছাত্রেরা নেতৃত্বে চলে আসবে। সেটা কি দেশের জন্য ভালো হবে? যারা ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তারা তো শিক্ষিত সমাজ। যে কোনো কারণেই হোক তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে হবে। মাত্র একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে দিতে হবে, সেটা কারও কাম্য নয়।’

সাবেক বিচারপতির মন্তব্যটি দীর্ঘ। আগে তার বক্তব্যের উদ্ধৃত অংশ নিয়েই একটু আলোচনা করি। দেশে ছাত্র রাজনীতি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার দাবি কেউ তুলেছেন, তা আমার জানা নেই। যতদূর জানি, দেশে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা বলতে বর্তমান ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার কথা তারা বলেছেন। তা আমিও বলেছি। ছাত্র রাজনীতি চিরতরে বন্ধ করা হলে দেশে গণতন্ত্রই বিপন্ন হবে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিও এখন নানাভাবে দূষিত। তাহলে তাও বন্ধ করার দাবি উঠবে। স্বৈরাচারীদের ক্ষমতা দখলের পথ উন্মুক্ত হবে।

আমার সবিনয় আবেদন, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অন্তত পাঁচ বছরের জন্য ছাত্র রাজনীতি স্থগিত রাখা হোক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন বা ডাকসুর নির্বাচন যদি বহু বছর স্থগিত থাকার পরেও ছাত্র নেতৃত্ব তৈরি হতে অসুবিধা হয়নি, তখন সারাদেশে নতুন ছাত্রনেতা বেরিয়ে আসতে অসুবিধা হবে না।

অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও দেখা গেছে, দীর্ঘকাল সামরিক বা স্বৈরাচারী শাসন বলবৎ থাকা ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি (ছাত্র রাজনীতি) নিষিদ্ধ থাকার সময়ই জঙ্গি এবং চরিত্রবান ছাত্র নেতৃত্ব বেরিয়ে এসেছে। ঘুণে ধরা গণতন্ত্র ফিরে এলেই ছাত্র নেতৃত্ব চরিত্র হারায়, সিন্ডিকেট ও মাফিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে অথবা এই গোষ্ঠীর অনুচর হয়ে কাজ করে। তার কারণ কি, তা কি শ্রদ্ধেয় সাবেক বিচারপতি বিবেচনা করে দেখেছেন?

সামরিক ও স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটায় জনগণ তাদের আত্মদান ও আন্দোলনের মাধ্যমে। কিন্তু ক্ষমতায় প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রতিষ্ঠিত হয় দুর্নীতিপরায়ণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী দলতন্ত্র। বাংলাদেশেও সামরিক শাসনের অবসানের পর খালেদা জিয়া এই দলতন্ত্রই প্রতিষ্ঠা করে দীর্ঘদিন চালু রেখেছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু আগের লেগাসি থেকে মুক্ত হতে পারেনি। তাই শেখ হাসিনাকে তার নিজের দলের বিরুদ্ধেও শুদ্ধি অভিযান শুরু করতে হয়েছে।

গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে ঘুণে ধরা অবস্থা থেকে মুক্ত করার এই অভিযানের সময়টাই হচ্ছে ছাত্র রাজনীতিকেও তার আগের গৌরবোজ্জ্বল চরিত্রে ফিরিয়ে আনার প্রকৃষ্ট সময়। সাবেক প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ‘ছাত্র সমাজ হচ্ছে শিক্ষিত সমাজ। এরা যে কোনো কারণেই হোক পথভ্রষ্ট হয়েছে। তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে হবে।’ আমার শ্রদ্ধেয় সাবেক প্রধান বিচারপতি যদি বর্তমানের সঠিক অবস্থা জানতেন, তাহলে এ কথা লিখতেন না।

আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লেখাপড়ার পাট উঠে গেছে বলা চলে। আগে বিভিন্ন হলে ঢুকলে ছাত্রদের পড়ার টেবিলে সাহিত্য-রাজনীতি-অর্থনীতি বিষয়ে লেখা বইপত্র দেখা যেত; এখন ছাত্রনেতা বলে কথিত অনেক ছাত্রের টেবিলে অস্ত্র ও মদের বোতল দেখা যায় বলে পত্রপত্রিকাতেই অভিযোগ বেরিয়েছে। এদের শিক্ষিত সমাজ বলে অভিহিত করা চলে কি?

আর তারা শিক্ষিত হলেই-বা কি? এই শিক্ষা তো তাদের মধ্যে উন্নত চরিত্র ও মনুষ্যত্ব জাগাতে পারেনি। বুয়েটের যে ছাত্রেরা আবরারকে হত্যা করেছে, তাদের অধিকাংশই মেধাবী ছাত্র। একজনের বাবা তো দরিদ্র ভ্যানচালক। নিজের রক্তঝরা শ্রম দিয়ে অর্জিত অর্থে তার ছেলেকে মেধাবী ছাত্র করেছেন। স্বপ্ন ছিল সে তার বাপ-মায়ের দুঃখ ঘোচাবে। সেই ছেলে পরিবারের স্বপ্নে আগুন দিয়ে বর্তমান ছাত্র রাজনীতির সন্ত্রাসের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। আবরারও ছিলেন খুবই মেধাবী ছাত্র। উচ্চশিক্ষার স্তরে এসে তাকে মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।

আমার শ্রদ্ধেয় সাবেক বিচারপতি, আপনিই বলুন, আগে যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শেখ মুজিব, শামসুল হক, অলি আহাদ প্রমুখ নেতা তৈরি হয়েছেন, এখন কি তা তৈরি হয়? না, পাঁচপাত্তু, খোকন, আওরঙ্গের দলই বেশি বেরিয়ে আসে। এই ছাত্র সমাজ যদি পথভ্রষ্ট হতো, তাহলে তাদের চরিত্র সংশোধনের কথা বলা যেত। কিন্তু এরা তো পথভ্রষ্ট নয়, সম্পূর্ণভাবে চরিত্রভ্রষ্ট। এরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে এসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতার সিন্ডিকেট মাফিয়া গ্রুপের কাছে বিক্রি হয়ে যায়।

সাবেক প্রধান বিচারপতি যাকে এখন ছাত্র রাজনীতি ভাবছেন, তা আসলে মাফিয়া রাজনীতি। যাদের ছাত্র বলে তিনি ভাবছেন, তারা ছাত্র নয়। বহুকাল আগে ছাত্রের পিতৃত্ব অর্জন করে ছাত্র ও যুব সংগঠন নামধারী বহু দলে সেই যে নেতা হয়ে বসেছেন, আর নেতৃত্ব ছাড়ছেন না। বাংলাদেশের যুবলীগে এতকাল যিনি নেতৃত্ব আঁকড়ে ধরেছিলেন, তার বয়স ৭২ বছর। বিএনপির যুবদলেও অনেক নেতার বয়স ৬০-৭০ বছর। লন্ডনে ছাত্রলীগের এক নেতা তিন সন্তানের পিতা। সাবেক প্রধান বিচারপতি কি এদের প্রকৃত ছাত্র এবং ছাত্রসমাজের নেতা বলে ভাবেন? বরং এসব অছাত্র নেতাকে তাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলো মুক্ত করে প্রকৃত ছাত্রদের তাতে আবাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষ যাতে এসব অছাত্র ছাত্র সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি হয়ে হলের কক্ষ বরাদ্দ করতে বাধ্য না হন এবং কক্ষ বরাদ্দ করার ব্যাপারে অছাত্র ছাত্রনেতারা যে ব্যাপক দুর্নীতির বাণিজ্য করেন, তা কঠোর হাতে বন্ধ করার ব্যবস্থা হওয়া দরকার।

সাবেক বিচারপতি বলেছেন, মাত্র একটি ঘটনার (আবরার হত্যাকাণ্ড) জন্য ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে দিতে হবে, তা কাম্য নয়। যদি আবরার হত্যাকাণ্ড একটি মাত্র ঘটনা হতো, তাহলে তার সঙ্গে একমত হতাম। কিন্তু কাগজ খুললেই মফস্বলের কলেজগুলোতেও লাইসেন্স, পারমিটবাজি, কলেজ দখলে রাখার দ্বন্দ্বে যে রক্তাক্ত হানাহানির খবর পড়ি, একই ছাত্র সংগঠনের দুই গ্রুপে হানাহানিতে কোনো ছাত্রনেতার মৃত্যুর খবর পাই, তা তো মাত্র একটি ঘটনা নয়।

অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষকরা হয় নিজেদের স্বার্থে অথবা ক্ষমতাসীনদের ভয়ে এসব অছাত্র নেতার হুকুমে চালিত হন অথবা নিজেরাই দলীয় রাজনীতিতে জড়িত হয়ে ছাত্রদের মারামারিতে জড়িত করেন। শিক্ষাঙ্গনে এই শিক্ষক রাজনীতির কদর্য দিক সম্পর্কে সম্প্রতি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং লেখক ড. জাফর ইকবাল একটি নিবন্ধ লিখেছেন। সাবেক প্রধান বিচারপতির নজরে নিশ্চয়ই তা পড়েছে।

তিনি নিজেই বলেছেন, ‘ছাত্র রাজনীতির নামে কেউ যদি টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, মানুষকে অত্যাচার ও নির্যাতন করে, সেটা হচ্ছে অপরাজনীতি।’ আমার মতে, এটা অপরাজনীতিও নয়; এটা সন্ত্রাস ও ক্রাইম। এই সন্ত্রাস ও ক্রাইম আমাদের ছাত্র রাজনীতিকে ছেয়ে ফেলেছে। জামায়াতের ছাত্রশিবির তো হাত কাটা, শির কাটার ক্রাইমের জন্য কুখ্যাত। কৃষকরা ক্ষেতে হালচাষের জন্য আগে আগাছা-কুগাছা থেকে জমি সম্পূর্ণ পরিস্কার করেন। জমি সম্পূর্ণ নিংড়ে নেন। এই কাজটা দেশের ছাত্র রাজনীতি সম্পর্কেও করতে হবে।

ছাত্র রাজনীতি পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হলে দুর্নীতিবাজ একশ্রেণির মন্ত্রী, এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যানের পাওয়ার হাউস ভেঙে যাবে। একশ্রেণির ছাত্রকে হাতের মুঠোয় নিয়ে সিন্ডিকেট তৈরি করে এদের মাসলশক্তির জোরে এই শ্রেণির রাজনীতিকরা তার এলাকায় বিভীষিকার রাজত্ব ও নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হলে এই পাওয়ার হাউসগুলো ভেঙে যাবে, জাতীয় রাজনীতিতেও শুদ্ধি অভিযান সফল হবে।

পাঁচ বছর ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় নতুনভাবে এর পুনর্গঠনের কাজ চালাতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে লেখাপড়ার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। ছাত্র সমাজের আগের গৌরব ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে এনে তারা যাতে দেশের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। সব ছাত্র সংগঠন নিজস্ব গঠনতন্ত্র মেনে নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের নেতা নির্বাচন করবে। ওপর থেকে তাদের কাঁধে নেতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। সর্বোপরি ছাত্র সমাজে দুর্বৃত্ত সৃষ্টির রাজা জেনারেল এরশাদ অর্ডিন্যান্স করে ছাত্র সংগঠনগুলোর বড় রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করার যে ব্যবস্থা করেছিলেন, সেটি বাতিল করতে হবে।

সরকার দেশে যে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করেছে, তাতে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অছাত্র-ছাত্রনেতারা ধরা পড়েছেন বেশি। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এদের অধিকাংশই ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির থেকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগে অনুপ্রবেশকারী। এদেরও চিহ্নিত করা দরকার। ছাত্রলীগের যেসব দুর্নীতিবাজ নেতা সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্র্যাকডাউনের মুখে পড়েছেন, তাদের বেশ কয়েকজন লন্ডনে পালিয়ে এসে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। এই সিন্ডিকেট নেতাদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে বিচারের ব্যবস্থা করা দরকার।

আমার মত হচ্ছে, দেশে ছাত্র রাজনীতির স্বার্থেই এই রাজনীতি অন্তত পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হওয়া দরকার। দেশের সুধী সমাজের এটা ভেবে দেখা আবশ্যক। আমার অভিমতে ভুল থাকতে পারে; কিন্তু এই অভিমতটাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। – সমকাল

লন্ডন, নভেম্বর শুক্রবার, ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment